somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: কৃষ্ণরাতের রাই (জন্মাস্টমী উপলক্ষ্যে রি-পোস্ট)

৩১ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১০:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিন কয়েক আগে; তখন অনেক রাত, ঘুমিয়ে ছিল রাধা; হঠাৎ ই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার; এবং তারপরে বাঁশী র সুর শুনতে পায়; কে বাঁশী বাজায়? কৌতূহলী হয়ে উঠে দ্রুতপদে আলুথালু হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে ম্লান জোছনার ভিতর হাসনুহানার গন্ধ-ভাসা উঠানে এসে দাঁড়ায়।
বাঁশী র সুর নদী র দিক থেকে ভেসে আসছিল।
দ্রুত পায় নদী পাড়ে যেতে থাকে রাধা ।
নদী পাড়ের বটের তলায় আলোছায়ায় মিশে অপূর্ব ভঙ্গিমায় বসে এক শ্যামল স্বাস্থ্যবান পুরুষ নিমগ্ন হয়ে বাঁশী বাজাচ্ছিল। দৃশ্যটায় কী ছিল। থমকে গিয়েছিল রাধা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বাঁশীর সুরে ডুবে গেল। রাগ বসন্ত। সা গা, ক্ষ্মা দা, র্ঋা, র্সা/ র্ঋা না, দা, পা ক্ষ্মগক্ষ্মদা, ক্ষ্মগঋসা। রাত্রির শেষ প্রহরের রাগ। রাধা জানে। তারপর এক সময় বসন্ত-র সুর থেমে গেলে রাধা অনেচনা বাঁশরিয়া পুরুষটিকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কে গো? এত সুন্দর করে বাঁশী বাজাও।
পুরুষটি বলল, আমার নাম কৃষ্ণ।
রাধা। (উচ্ছসিত হয়ে) কৃষ্ণ?
কৃষ্ণ। (মাথা নেড়ে) হ্যাঁ। কৃষ্ণ।
রাধা। (কৃষ্ণের মুখোমুখি বটের গুঁড়িতে বসে শুধাল) কী তোমার পরিচয়?
কৃষ্ণ। (মৃদু হেসে।) আমি পথিক।
রাধা। বুঝলাম, পথিক। তা পথিকের বুঝি ঘর থাকে না?
কৃষ্ণ। থাকে বুঝি?
রাধা । (হেসে) থাকে না আবার। তা তোমার কোথায় ঘর শুনি ?
কৃষ্ণ। আমার ঘর মথুরায়। বৃন্দাবনের কাছে।
রাধা। মথুরা-বৃন্দাবন? সে কোন্ দিকে?
কৃষ্ণ। তা ধরো এখান থেকে পশ্চিমে।
রাধা। বেশ। তা বাংলা দেশে কি বেড়াতে এসেছ?
কৃষ্ণ। হ্যাঁ। পথিক তো ঘুরে বেড়ায়।
রাধা। মথুরা কোথায় গো?
কৃষ্ণ। যমুনা নদীর পাড়ে।
রাধা। ধ্যাত। যমুনার পাড়ে তো তোমার রাধার বাড়ি।
কৃষ্ণ। তোমার নাম বুঝি রাধা?
রাধা। হ্যাঁ। বললে না মথুরা কোথায়।
কৃষ্ণ। যমুনা নদীর পাড়ে।
রাধা। (আপন মনে) তা কি করে হয়, যমুনা নামে কি দুটি নদী হয়?
কৃষ্ণ। জগতে কত নদী রাধা। দুটো নদীর নাম মিলে গেলে কি এমন ক্ষতি শুনি?
রাধা। (অভিমানী সুরে) ক্ষতির কথা আমি বললাম বুঝি।
কৃষ্ণ। বলনি?
রাধা। না। বলিনি। আচ্ছা তুমি এত সুন্দর করে বাঁশী বাজাও কি করে?
কৃষ্ণ। আমার ভিতর থেকে কে যেন বাজায়।
রাধা। কে সে?
কৃষ্ণ। জানি না। তাকে খুঁজতেই তো পথে নামলাম।
রাধা। পেলে?
কৃষ্ণ। পেলাম মনে হয়।
রাধা। (অবাক হয়ে) কে সে?
কৃষ্ণ। আজও চিনতে পারিনি তবে নারীরুপী কেউ।
রাধা। নারী!
কৃষ্ণ। হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে।
সেই শুরু। তারপর থেকে প্রতিরাতে নদীপাড়ের বটের তলায় কৃষ্ণর সঙ্গে দেখা হচ্ছে রাধার। দিনমানে কৃষ্ণর কথা ভেবে বড় উত্তেজনা বোধ করে রাধা। তার কারণ আছে। কৃষ্ণ পুরুষ; রাধা নারী। কৃষ্ণ সবল তনুর অধিকারী। সংসারের কাজের অবসরে কৃষ্ণের নিটোল দেহটি ভেবে ভেবে রাধার পক্ষে কামবোধে জর্জরিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বাঁশী সুরে কি যাদু আছে। রাত্রে বাঁশীর সুর ভেসে এলে রাধার দেহমন কেমন শীতল হয়ে ওঠে। তারপর কৃষ্ণের মুখোমুখি হলে সর্বাঙ্গে অবশ বোধ করে রাধা। কামের কথা মনেও পড়ে না।
এ কী যাদু!
নিষ্কাম না হলে বুঝি ঈশ্বরদর্শন হয় না? সে কারণেই দেবতা জগতে বাঁশীর সুর দিয়েছেন।
রাধা এমনই ভাবে।
এক পলক কৃষ্ণকে দেখার তৃষ্ণায় বিকেল থেকেই রাধা ভারি উতলা বোধ করতে থাকে। রাধার স্বামী অয়ন ঘোষ। স্বামী কখন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে, রাধা অভিসারে বেরুবে-বিকেল থেকে এই আশায় থাকে। যমুনার পাড়ে কৃষ্ণ অপেক্ষা করছে।
অয়ন ঘোষ আজ হাট থেকে দেরি করে ফিরেছে। ভোরবেলা দুধ নিয়ে হাটে গেছে । তারপর হাট থেকেই সোনাতলার গন্ধবণিক ননীগোপালের ভাইপো মাধব তাকে সোনাতলায় ধরে নিয়ে গেল। আজ সোনাতলার গন্ধবণিক ননীগোপালের দৌহিত্রের অন্নপ্রাসন্ন ছিল। মিষ্টান্ন দেখভাল করে ঘোষপাড়ায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়াল। যমুনায় নাইতে গেল সে। নদীটি বাড়ির খুব কাছেই। নদীর পাড়ে সুবিস্তীর্ণ তেপান্তরের মাঠ, সে মাঠের পূব-উত্তর কোণেই ঘোষপাড়া। ঘোষপাড়ার দক্ষিণ পার্শ্বে উঠান ঘিরে চারখানি মাটির ঘর অয়ন ঘোষের । একপাশে ভাঁড়ার ঘর, লাউয়ের মাচা; অন্যপাশে গোয়াল ঘর।
সব মিলিয়ে আহিরের সম্পন্ন সংসার।
আজ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। আজ যে আকাশে একখানি পরিপূর্ণ নিটোল ধবধবে চাঁদ উঠবে তার ইঙ্গিত এখনই স্পষ্ট। মৃদমন্দ বাতাস বইছিল। খালি গায়ে ধূতি পরে কাঁধে গামছা ফেলে অয়ন ঘোষ পা চালিয়ে নদীপাড়ের দিকে যেতে থাকে। তেপান্তরের মাঠে তালতমালের বন, পদ্মদিঘী। পদ্মদিঘীর জল ছুঁয়ে আষাঢ়ী সন্ধ্যার বাতাস আরও মধুর হয়ে ওঠে। অয়ন ঘোষের দেহমন স্পর্শ করে সে মধুর বাতাস। নদীপাড়ে এসে সে থমকে যায়। যমুনায় পূর্ণ রুপা গলা জল । সে মুগ্ধ হয়ে দেখে। নদীর বাতাস যেন তাকে উড়িয়ে নেবে।
কোজাগরী পূর্ণিমায় যমুনার রুপা গলা জলে অবগাহন করে পরম শান্তি পেল অয়ন ঘোষ।
ফেরার পথে বয়েসি বটের তলায় কাকে যেন দেখে থমকে দাঁড়াল সে। ঝুপসি অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না। পুরুষালি ছায়ামূর্তি। ঘোষপাড়ার লোকে বলাবলি করে: আজকাল মধ্যরাতে কে যেন নদীপাড়ের তেপান্তরের মাঠে বাঁশী বাজায়। সে নয়তো ...অচেনা আগন্তুকের বাঁশীর সুর সেও শুনেছে । বাঁশী শুনতে ভালোবাসে অয়ন ঘোষ। অনেক অনেক কাল আগে ... অয়ন ঘোষ তখন যুবক ... মধ্যরাতে নদীপাড়ে বসে তন্ময় হয়ে বাঁশী বাজাত। তখনও বউ হয়ে রাধা এ গাঁয়ে আসেনি। কুমোর পাড়ার মেয়ে বৈশাখী। বাঁশির সুরের টানে নদীপাড়ে চলে আসত। তখন রাত ভোর না হওয়া অবধি দু’জনের কত কথা হত।
সেই বৈশাখী মরল ওলাউঠায়।
ওলাই-চন্ডীকে ডেকে ডেকেও কোনও লাভ হয়নি।
অয়ন ঘোষের বাবা সামন্ত ঘোষও ওই ভেদ বমন রোগেই মারা গিয়েছিলেন ...
বৈশাখীর মৃত্যুর পর অয়ন ঘোষ আর বাঁশী বাজায়নি। মধ্যরাতের অচেনা আগন্তকের বাজানো বাঁশীর সুর ভেসে এলে রাধা যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় - অয়ন ঘোষ তা জানে।
বৈশাখীর কথা ভেবেই বাধা দেয়নি।
রাধার ভিতরে বৈশাখীর পুর্নজন্ম হয়েছে। তারপর রাধার ভিতরে বৈশাখী লীন হয়ে গেছে।
অয়ন ঘোষ এমনই ভাবে।
উঠান জোছনার আলো থই থই করছিল। আলোর প্রয়োজন ছিল না। রাধা তবু দাওয়ায় মাটির প্রদীপ জ্বেলেছে। অয়ন ঘোষ খেতে বসেছে। কলা পাতায় আতপ চালের সাদা ধবধবে ধোঁওয়া ওঠা ভাত, এক পাশে বেগুন ভাজা, তেঁতুলের চাটনি; মাটির বাটিতে মৌরালা মাছের ঝোল; রাধা নিজেই রেঁধেছে। খেতে খেতে মাথা নাড়ে অয়ন ঘোষ। রাধা রাঁধে ভালো। বউটি তার সত্যি ভালো। তবে মাঝে-মাঝে রাধা বড্ড উদাসী হয়ে ওঠে। কী যেন ভাবে। দূর থেকে রাধার সে অপূর্ব বিষন্ন মূর্তি মুগ্ধ হয়ে দেখে অয়ন ঘোষ। শ্যামলা ছিপছিপে গড়ন রাধার; মাথায় মেঘবরন চুল, টলটলে কাজলকালো দুটি চোখ, ছোট্ট শ্যামল নাকে রুপার নথ। করতোয়া পাড়ের নন্দীগ্রামের মেয়ে রাধা। দেখেশুনে সম্বন্ধ করেই তবে বিয়ে করেছে অয়ন ঘোষ। ঠকেনি মোটেও । বউকে আদর করে ডাকে রাই।
খেতে খেতে খুশি খুশি গলায় আয়ান ঘোষ বলে, বুঝলি রাই। আজ সোনাতলার গন্ধবণিক ননীগোপালের দৌহিত্রের অন্নপ্রাসন্ন ছিল।
সে কথা আমি সাবিত্রী বুড়ির মুখে শুনেনি।
হ্যাঁ। ননীগোপালের ভাইপো মাধব আমায় হাট থেকে সোনাতলায় ধরে নিয়ে গেল। মধু ময়রার আসার কথা ছিল, সে আসেনি। আমাকেই দইমিষ্টির ভার নিতে হল। তো সে অনুষ্ঠানে এক কবির সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হল।
কবি! রাধার মুখটি ঝলমল করে ওঠে। জগতে কী এক গূঢ় রহস্যে নারী ও কবি পরস্পর পরস্পরের প্রতি গভীর টান অনুভব করে। একমাত্র কবিই যে বোঝে নারীর সুপ্ত অনুভূতি। একারণেই?
হ্যাঁ। কবি। অয়ন ঘোষ বলে।
কী নাম গো কবির?
জয়দেব।
জয়দেব। বাহ্, ভারি সুন্দর নাম তো। তা কোন্ গাঁয়ে বাস গো তোমার কবির?
অজয় নদীর পাড়ে কেঁদুলি গাঁয়ে।
কেঁদুলি গাঁয়ে? সে আবার কোথায় গো? করতোয়ার পাড়ে আমাদের নন্দীগ্রামের দিকে?
না। অজয় নদীর পাড়ে কেঁদুলি গাঁ বাংলার পশ্চিমে।
ও। তা কবির বয়স কেমন?
তরুণ। ঘুরতে বেড়িয়েছেন। ভারি দিব্যকান্তি দেখতে। আমার তৈরি মিষ্টি খেয়ে ভারি প্রশংসা করল। গৌড়াধিপতি রাজা লক্ষণসেন নাকি তাঁর কাব্য শুনে মুগ্ধ। এখান থেকে নাকি উড়িষ্যা যাবেন কবি। কবিকে কাল্ নেমতন্ন করব ভাবছি। এতবড় কবি যখন।
আচ্ছা, করো। কাল হাট থেকে বোয়াল মাছ এনে দিও। মাছ ভেজে দেব। এত বড় কবি যখন- ছোট মাছ খাওয়াই কি করে বল!
তারপর অনেক রাতে অয়ন ঘোষ ঘুমিয়ে পড়লে রাধা যমুনামুখি হয়।
আজও নদীপাড়ের বটমূলে বসেছিল কৃষ্ণ।
আপনমনে ললিত রাগে ধূন বাজাচ্ছিল। ন্ঋগমা ক্ষ্মমগা ক্ষ্মধর্সা।/ র্ঋা নধা ক্ষ্মধা ক্ষ্মমগা ঋাসা। রাধা চুপচাপ কৃষ্ণর মুখোমুখি বসে। মুগ্ধ হয়ে শোনে ললিতের সুর যতক্ষন না শেষ হয়।
অনেক ক্ষণ পর। বাঁশী থেমে গেছে। চরাচর জুড়ে স্তব্ধতা নেমেছে। কৃষ্ণ তন্ময় হয়ে বসে আছে। তারপর এক সময় তার ঘোর কাটলে রাধার দিকে তাকালো কৃষ্ণ। রাধা নরম স্বরে শুধোল, আমায় তুমি ভালোবাস কৃষ্ণ?
কৃষ্ণ। বাসী রাধা।
রাধা। তুমি বাঁশী বললে?
কৃষ্ণ। তুমিই তো আমার বাঁশী যে। বলে ঝুঁকে রাধার কপাল স্পর্শ করে কৃষ্ণ।
রাধা কেঁপে ওঠে। এই প্রথম পূজারীর স্পর্শ পেল রাধা। মথুরায় যা হয় হোক; বাংলায় নারীই উপাস্য। উপাসকের স্পর্সের পর রাধা শরীরময় অদ্ভূত অনুভূতি নিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
কৃষ্ণ ঝুঁকে রাধার কপাল স্পর্শ করছে ... এই দৃশ্যটি দেখে থমকে যান কবি জয়দেব। তিনি সোনাতলার গন্ধবণিক ননীগোপালের আতিথ্য বরণ করেছেন। রাতের আহার সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎই তাঁর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আষাঢ়ী পূর্ণিমার কথা স্মরণ হতেই তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে দক্ষিণমুখি পথ ধরে যমুনার পাড়ে ছুটে এসেছেন। চলতে চলতে ললিত রাগে ধূন শুন থমকে দাঁড়িয়েছেন। তারপর অপূর্ব সুন্দরী এক শ্যামল তন্বী নারীকে দেখলেন। কবি জয়দেব অবাক হয়ে ভাবছেন: কে ওই নারী? আর তখন অসংলগ্ন তুমুল হাওয়ারা নদীর দিক থেকে ছুটে আসে । সে বাতাসে রাধার চুল ছড়িয়ে যায়। তারপর চোখেমুখে লাগে। বাতাসের ঘর্ষনে বটপাতায় সরসর শব্দ ওঠে। সমুখের তেপান্তরের মাঠটি এই মুহূর্তে কোজাগরী জোছনায় উজ্জ্বল । একপাল গরু চড়ছে। কাদের গরু ওগুলো? রাধা অবাক হয়ে ভাবল। টি টি শব্দে একঝাঁক রাতচরা পাখি উড়ে গেল যমুনার দিকে। রাধা অবাক হয়ে ভাবল: কৃষ্ণ কেন বলল- তুমি আমার বাঁশী যে।
কৃষ্ণ খানিকটা গম্ভীর স্বরে বলে, কাল ভোরে আমি চলে যাচ্ছি রাধা।
এই কথার পর যেন অনন্তকাল কেটে গেল। রাধা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলল, কাল চলে যাচ্ছ। কোথায়? কৃষ্ণ বলল, যেখান থেকে আমি এসেছি। সেই মথুরায়। রাধা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, যেতেই হবে? হ্যাঁ। কেন? আমার সব তো ওখানে ... মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন। তাহলে পথে নামলে যে- পথে নেমেছি একটা প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে । কি সে প্রশ্ন? একটু চুপ করে থেকে কৃষ্ণ বলল, আমার ভিতরে বাঁশী কে বাজায়। পেলে উত্তর? হ্যাঁ। উত্তর পেলাম। বাংলা দেশে এসে পেলাম। রাধা চুপ করে থাকে। কৃষ্ণের সঙ্গে একবার তার মিলনের সাধ জাগল। তবে আকাশে বাতাসে বাঁশীর রেষ ফুরোয়নি তখনও। নাঃ, শরীর জাগবে না।
কে সে? রাধা শুধালো।
কার কথা বলছ তুমি? কৃষ্ণ অবাক হয়ে শুধায়।
যে তোমার ভিতরে বাঁশী বাজায়।
তুমি জান না কে সে?
রাধা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একজন যখন আমাকে জানল তখন সংসারে ফেরাই যায়। কেউ না জানলে সংসারের দিনগুলি দমবন্ধ হয়ে ওঠে। এখন অনেক নির্ভার লাগছে। রাধা এখন জানে কৃষ্ণের ভিতরে বাস করে কে বাঁশী বাজায়।
রাধা উঠে দাঁড়ায়।
কৃষ্ণ চেয়ে চেয়ে দেখে একটি নারী কোজাগরী জোছনায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সে ম্লান হাসে।
কবি জয়দেবও কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে নারীটিকে চলে যেতে দেখলেন।
আয়ান ঘোষ-এর ঘুম আসছিল না। ঘরের জানালা দিয়ে হু হু করে সাদা পালের মতন জোছনাময়ী বাতাস ঢুকছিল ঘরে। বাতাসের ধাক্কায় তার ঘুম ভেঙে যায়। কিংবা অনেক অনেক দিন আগে বেঁচে থাকা বৈশাখীকে স্বপ্ন দেখছিল সে। আয়ান ঘোষ উঠে বসে। রাধা পাশে নেই-কোথায় গেল রাধা। দরজা ভেজানো দেখে মুচকি হাসল। দাওয়ায় এসে দাঁড়াল সে। উঠানে টইটুম্বুর কোজাগরী পূর্ণিমা , উথালপাথাল হাওয়া। রাধা সারা বাড়িতে কোথাও নেই। রাধা কই গেছে তা অয়ন ঘোষ জানে। সে তারপরও ক্রোধে উন্মক্ত হয়ে উঠতে পারে না ... উতল শীতল বাতাস এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কিংবা তার বৈশাখীর কথা মনে পড়ে । কে যেন তার কানে ফিসফিস করে বলে: নারীপ্রকৃতি হল ধরনীর মতো; একে একা একা ভোগ করলে স্বার্থপরের মতো দেখায় না? সবই যখন অনিত্য, ক্ষণস্থায়ী -তখন প্রাচীন চার্বাক ঋষির কথা ভাবো না কেন।
আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে উঠানের জোছনায় ভূতের মতন দাঁড়িয়ে ছিল আয়ান ঘোষ।
রাধা স্বামীকে দেখে থমকে দাঁড়ায়।
রাধা। (সামান্য রেগে গিয়ে) কি বলবে বল।
অয়ন ঘোষ। এ কী রাই! কাঁদছিস যে তুই?
রাধা। ( ফুঁপিয়ে উঠে ) কাঁদছি মনের সুখে।
অয়ন ঘোষ। হঠাৎ এত সুখ উথলে উঠল যে তোর?
রাধা। আজ আমাকে একজন চিনে ফেলল যে।
অয়ন ঘোষ। হুম। যে তোকে চিনতে পেরেছ তাকে আমার ভীষণ ইর্ষে হচ্ছে রে রাই।
রাধা। কেন? তাকে আপনার ইর্ষা হচ্ছে কেন?
অয়ন ঘোষ। (দীর্ঘশ্বাস চেপে) আমি যে তোকে ঠিক চিনতে পারলাম না রাধা।
রাধা। একেবারেই কি চেনেননি?
অয়ন ঘোষ। তা ক্ষানিক চিনেছি বটে। যতটুকু চিনেছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট রে রাধা।
রাধা। (নরম স্বরে) সে আমার বড় সৌভাগ্য স্বামী।
অয়ন ঘোষ। তাছাড়া তুই ঘরদোরের যতœ নিস। আর রাঁধিসও ভালো।
রাধা। (হেসে) আমি ভালো রাঁধি? না, আপনি ভোজনরসিক?
অয়ন ঘোষ। (হেসে) সে একই হল। যা । এখন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড় গে যা। কাল আবার ভোরে উঠে দুধ দুইতে হবে।
রাধা ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
কী কথা মনে পড়তে অয়ন ঘোষ বলে, ওহ্ হো। এই রাই শোন।
আবার কী হল?
কাল খানিকটা দুধ সরিয়ে রাখিস ।
কেন?
তোর মনে নেই? কাল কবি জয়দেব আসবেন। পায়েস রাঁধিস। হাট থেকে পাটালি গুড় এনে দেব।
রাধার মনে পড়ল কবি জয়দেবের কথা। রাধা ঠিক করল কবিকে সে সব বলবে। কে আমি কে কৃষ্ণ ...ললিতের বসন্তের সুরের কী মানে ...সব ...সব কবিকে রাধা বলে দেবে।
ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢেকে রাধা।
একা হতেই রাধার মনে হল- কৃষ্ণ কাল ভোরে মথুরায় ফিরে যাবে। রাধার অভ্যন্তরে দুঃখেরা তরল দুধের মতন ফেনিয়ে ওঠে। কান্নাভেজা চোখে রাধা জানালা দিয়ে চেয়ে দেখল ধবল পূর্ণিমার রাতটি নিমিষে কালো মেঘে ঢেকে গেছে। ।
কৃষ্ণরাত যেন!
নাঃ, কবিকে কিছুই বলবে না রাধা।
যদি সে প্রকৃতই কবি হয় তো সে কবি ভেবে নিক ঠিক কী ঘটেছিল যমুনা তীরে ...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১২ দুপুর ১:০৪
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×