somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: অন্ধকারের আলো

২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ বিকাল ৫:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল। বাস থেকে নামার সময় ভিজে গেল তাহমিনা। সেই সঙ্গে ভীষণ ক্লান্তি লাগছিল । আজ অফিসে চেয়ারম্যান স্যারের সেই ভয়ঙ্কর প্রস্তাবের পর শরীর জুড়ে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল। তারপর থেকেই মাথার ভিতর কেমন এক অবশ করা অনুভূতি আর ঝিমঝিম ভাব। টেম্পুতে উঠে বসতেই শরীর অনেক ভারী ঠেকল। ক্লান্তির সঙ্গে বিষন্নতাও টের পেল তাহমিনা। তাহমিনার বাবার বাড়ি মালিবাগ মোড়ের খুব কাছেই-বাঁ পাশের একটা গলির ভিতর । মাহমুদকে বিয়ে করার পর থেকে ও বাড়ির দরজা তাহমিনার জন্য চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। মাহমুদকে মেনে নেয়নি বলে তাহমিনাও বিয়ের পর জেদ করে আর ও বাড়ি যায়নি। গত অক্টোবরে বাবা মারা গেল, তখনও যায়নি, ভাগভাঁটোয়ারার সময় ভাইয়েরা ডেকেছিল, তখনও যায়নি ...
টেম্পু স্ট্যান্ডে নেমে হাঁটতে থাকে তাহমিনা । ঝিরঝির করে বৃষ্টিটা পড়ছেই। বৃষ্টি উপেক্ষা করে বরং ঘিঞ্জি এলাকার সরু গলির ভিতর দিয়ে হাঁটতে থাকে। যতই হাঁটছে দু’পাশের বাড়িগুলি যেন চেপে আসছে। দু’বছর আগে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল-মাহমুদের স্ট্রোকের এক বছরের মাথায়। অফিসের বেতন থেকেই বাড়ি ভাড়া দিত তাহমিনা। এখন থেকে আবার বাড়ি ভাড়ার চিন্তা পেয়ে বসবে। আস্তরহীন সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠতে থাকে তাহমিনা। বাড়িওয়ালা থাকে চারতলায় । বাড়িওয়ালার নাম মানিক। স্বাস্থ্যবান পেশল শরীর। এলাকার মাস্তান; বিয়ে থা করেনি, একাই থাকে লোকটা। প্রায়ই বেশ্যাদের ধরে এনে মদের আসর বসায় ঘরে। তাহমিনাকেও বহুবার বিশ্রি ইঙ্গিত করেছে । না, বাড়ি ছাড়ার উপায় নেই। অফিসের পর বাড়ি খোঁজা মাহমুদের অসুস্থ শরীর নিয়ে বাড়ি বদলানোর ঝক্কি অনেক । তার চে মুখ বুজে সহ্য করছে তাহমিনা।
অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয় তাহমিনার । আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে নিশ্চয়ই মাহমুদ অবাক হয়ে যাবে। কাল সকালে অফিস যাচ্ছে না দেখেও হয়তো মাহমুদের বিস্ময়ের মাত্রা বাড়বে। আজকাল মাহমুদের মনমেজাজ ভীষণ তিক্ত হয়ে থাকে, কাল হয়তো গালাগাল করবে। তাহমিনা হাসে। বড় ম্লান সে হাসি। অফিস না-যাওয়ার কারণ হয়তো জিজ্ঞেস করবে। কি বলবে তাহমিনা? সব কথা কি স্বামীকেও বলা যায় ...
আজ অফিসে লাঞ্চের পর আইরিন এসে বলল, চেয়ারম্যান স্যার আপনাকে একবার যেতে বলেছেন।
চেয়ারম্যান স্যার এসেছেন? তাহমিনার ভুঁরু কুঁচকে যায়।
হুমম। আইরিনের মুখে চাপা হাসি।
তাহমিনা আঁচল ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। বুকটা সামান্য কাঁপছে। কী ব্যাপার? চেয়ারম্যান স্যার তো অনেকদিন এই অফিসে আসেন না। চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল গত জানুয়ারিতে রপ্তানী মেলার স্টলে । চিনে গিয়েছিলেন নাকি, নতুন কী প্লান্ট বসাবেন সাতক্ষীরায় ... Excellent গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তার; দেশের সফল ব্যবসায়ীদের অন্যতম, অত্যন্ত ক্ষমতাশালী মানুষ, এমন ডাকসাইটে মানুষের সামনে গেলে নার্ভাস লাগতেই পারে।
চেয়ারম্যানের রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা - আরে, এসো, এসো । কেমন আছেন তুমি?
জ্বী স্যার ভালো।
বস।
তাহমিনা বসল।
আবদুস সাত্তার-এর বয়েস পঞ্চাশের কোঠায়। চুলে কলপ মেখে কালো রেখেছেন, নিখুঁতভাবে কামানো ভরাট মুখটি শ্যামল। চোখের দৃষ্টি কেমন সহজ-সরল। আবদুস সাত্তার সিগারেট টানছিলেন। খানিক ক্ষণ একথা - সেকথা বললেন। আইরিক কফি দিয়ে গেল। তাহমিনা কফি কাপে চুমুক দিল না। কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল ওর। কফি খেতে খেতে ঘোরালেন আবদুস সাত্তার। বললেন, শুনেছি তোমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ ।
জ্বী স্যার। তাহমিনা মাথা নাড়ে। অফিসে অনেকই জানে। তাদেরই কেউ কথাটা স্যারকে বলে থাকবে।
কি হয়েছিল?
মাইল্ড স্ট্রোক। তাপর থেকে ... তাহমিনার কথা শেষ হল না। আবদুস সাত্তার বললেন, আমার স্ত্রীাও দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিস। ছোট মেয়েটি হওয়ার পর থেকেই, ... বছর দশেক তো হবেই। কন্ঠে বিমর্ষতা আনার চেষ্টা করলেন আবদুস সাত্তার । ফুটল না।
আমি দুঃখিত স্যার।
না, না। দুঃখ করার কি আছে। তা কি করতেন ভদ্রলোক?
আমার হাজব্যান্ড?
হ্যাঁ।
জার্নালিস্ট।
ও। যাক-আমি ভাবছিলাম আপনাকে একটা কথা বলব।
জ্বী স্যার, বলুন।
আপনাকে আমি বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি।
স্যার!
সবই আইনসঙ্গত ভাবেই হবে, সব দায়িত্ব আমার।
ছিঃ ছিঃ এসব আপনি কী বলছেন? বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় তাহমিনা। তারপর ঘোরের মধ্যে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
তাহমিনা আপা! কি হল আপনার? আইরিন ছুটে আসে।
আইরিন ।
বলেন।
আমি সাদা কাগজে সই করে দিচ্ছি, তুমি রেজিগনেশ লেটার টাইপ করে আজই এমডির কাছে জমা দিয়ে দিও।প্লিজ। বলে টেবিল থেকে সাদা কাগজ টেনে নেয়, খসখস করে সই করে তারপর হতভম্ব আইরিনের সামনে ব্যাগটা নিয়ে দরজার কাছে চলে আসে। করিডোরে মৃদু সুগন্ধী ও নম্র আলো ছড়িয়ে। গত দু’বছর ধরে এই করিডোর দিয়ে আসা-যাওয়া করেছে।এ অফিসে আর আসবে না তাহামিনা। মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে।
অফিসের বাইরে বিমর্ষ মেঘলা দিন। রাস্তায় জ্যাম থাকলেও ফুটপাত ফাঁকা। অনেকটা হেঁটে সাইন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত এল। বাসস্টপে যাত্রী ভরতি একটা বাস থেমে আছে । কোনওমতে উঠতে পারল। লোকে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। তাহমিনা সুন্দরী বলেই তাকায়। যেমন চেয়ারম্যান স্যার আজ তাকালেন। সম্ভবত অনেক দিন ধরেই তাকাচ্ছিলেন। আজ যা বলার বললেন। আইরিন কি জানত? সম্ভবত। আইরিন সম্বন্ধে অফিসে নানারকম কানাঘুঁষা আছে। মেয়েটাকে সবাই এড়িয়েই চলে। এমডির সঙ্গে প্রায়ই ডিনার করে। এমডিও সুন্দরী সেক্রেটারিকে তোয়াজ করেন। চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তারের নাকি গাজীপুরে বাগানবাড়ি আছে। মাঝে-মাঝে ভদ্রলোক সেখানে বিশ্রাম নেন। সেই বাগানবাড়িতেও নাকি এমডি তৌহিদুর হক এর সঙ্গে বিয়ার পানের কনটেস্ট চলে। তখন নাকি আইরিনও থাকে । তাহমিনা এসব ঘটনার সত্যমিথ্যা জানে না। অফিসের কলিগদের কাছ থেকে শুনেছে।
তাহমিনার কাছে এক্সট্রা চাবি থাকে। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। বসার ঘরটা ছোট । একপাশে বেতের সোফা। অন্য পাশে বিছানা। বিছানার ওপর মাহমুদ ঘুমাচ্ছে। এ-ঘরে টিভি আছে বলে এ ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকে মাহমুদ। মিনার মা-ই মাহমুদকে খাইয়ে দেয়। তারপর দুপুরের পরে চলে যায়। মিনার মার ওপর নির্ভর করে তাহমিনা। এখানকারই এক বস্তিতে থাকে মধ্যবয়েসী । মাস গেলে হাজার দুয়েক টাকা করে দেয়। আগামী মাসের বেতন দেবে কী ভাবে। সকাল ন’টার দিকে মিনার মা আসে। ঘরদোর ঝাড় দেয়, বাসনকোসন মাজে, দুপুরের রান্না করে। শোয়ার ঘরে ঢুকে শাড়ি খুলে বাথরুমে যায় তাহমিনা। তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে আসে। সাড়ে চারটার মতো বাজে। রান্নাঘরে অন্ধকার ছড়িয়ে আছে । চুলা ধরিয়ে সসপ্যানে চায়ের পানি বসাল। অফিসে এ সময় এককাপ র’ চা খায়। কাল থেকে আর খাবে না। বিয়ের সময়ও দেখেছে জীবনে ওলোট-পালোট হতে বেশি সময় লাগে না। ফ্রিজ থেকে লেবু বের করে কেটে নিল। চা বানানো শেষ। চিনির কৌটা খুলে দেখল চিনি নেই। ম্লান হাসল তাহমিনা। চায়ের কাপ নিয়ে শোয়ার ঘরে এল। বিছানায় বসে চায়ে চুমুক দিল। ওপাশের আয়নায় শরীর ফুটে ওঠে। পেলব নিটোল গড়ন, তাহমিনা মুগ্ধ হয়ে যায়। বুড়ো চেয়ারম্যানের কী দোষ দেবে।
ফোন বাজল। আইরিন। তাহমিনা আপা?
কি বলবে বল।
কাল সকালে আমরা গাজীপুর যাচ্ছি আপনি যাবেন আমাদের সঙ্গে?
না।
চলেন না, আপনার ভালো লাগবে। কি সুন্দর জায়গা। সিরামিক ইটের দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে পিছনে বাগান। ছোট্ট একটা দিঘিও আছে। চলেন না আপা, আপনার অনেক ভালো লাগবে।
আইরিন আমাকে বিরক্ত কর না।
শুনেন তাহমিনা আপা, ইন্ডিয়া থেকে কাল একজন মডেল আসবেন। সেই মডেলের অনারে চেয়ারম্যান স্যার পার্টি দিচ্ছেন। মডেলের নাম কিরণ। কিরণ ছাড়াও পরীর মতন সুন্দরী এক ডজন রাশিয়ান মেয়ে থাকবে পার্টিতে। পার্টিতে আরও যারা যারা থাকবে তাদের দেখলে আপনি চমকে উঠবেন।
অসভ্য মেয়ে! বলে তাহমিনা মোবাইল অফ করে দেয়। শরীর কাঁপছে। চা শেষ করে শুয়ে পড়ল। এমনিতেই ঘর অন্ধকার হয়ে ছিল। ঘুম আসতে দেরি হল না। রাত সাড়ে আটটার মধ্যে রান্না শেষ করে মাহমুদকে খাইয়ে দিল। যত্ন করে রাতের ঔষধ খাইয়ে দিল। সিডেটিভ। কাল সকাল অবধি ঘুমাবে মাহমুদ । মাহমুদ আজ ঝিমিয়ে ছিল । নইলে হয়তো গালাগাল করত। আজকাল মেজাজ ভীষণ চড়া থাকে। একবার ধরে-ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হল। দিনের বেলায় এই কাজটা মিনার মা-ই করে। আগামী মাস থেকে মিনার মা আরও পাঁচশ টাকা বেশি চাচ্ছে। তাহমিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ন’টার দিকে রাজু ভাই এল।
কী ব্যাপার? তোমার ফোন বন্ধ কেন তাহমিনা ? তখন থেকে এতবার ফোন করছি।
ওহ্ ।
রাজু ভাই মাহমুদের পত্রিকা অফিসের কলিগ ছিলেন । পত্রিকায় অর্থনীতির পাতায় লেখেন। আজকাল কলিগরা কেউ না-এলেও রাজু ভাই নিয়মিত এসে খোঁজখবর নেন। তাহমিনা জানে-রাজু ভাই এমনি-এমনি আসে না; ওর নিটোল সৌন্দর্যর টানেই আসে। রাজু ভাইয়ের বাড়ি কাছেই । সিপাহী বাগ।
মাহমুদ ঘুমিয়ে পড়েছে?
হু।
তাহলে এখন আমার সঙ্গে চল।
কোথায় যাব? আশ্চর্য! তাহমিনা অবাক।
তোমার কাছে আজ আমার ছোট্ট এক আবদার আছে। রাজু ভাই বললেন।
কী।
আমাদের গলির মুখে নতুন একটা বিরিয়ানি হাউস হয়েছে। নতুন একটা আইটেম করে ওরা- কাশ্মিরী বিরিয়ানি। চল, আজ তোমাকে খাওয়াব। আর বোরহানী।
তাহমিনা হেসে বলল, বিরিয়ানি নিয়ে এলেই পারতেন।
আমার অত মনে ছিল না। এখন চল তো?
হঠাৎই তাহমিনার মনটা দুলে উঠল। আজ দু দু-বার অগ্নিপরীক্ষায় জিতে গেছে। ওর পুরস্কার পাওনা আছে। রাজু ভাইয়ের সঙ্গে বেরুলে ভালই লাগবে। মাঝে-মাঝে তো রাজু ভাইয়ের সঙ্গে বেরুতেই হয়। কখনও মাহমুদের মেডিক্যাল চেকআপের জন্য, কখনও মিডফোর্ড-ঔষধ কিনতে । সামান্য সেজে নিল তাহমিনা। হলদে শাড়ি, কালো ব্লাউজ। দু’জনে নীচে নেমে এল। সন্ধ্যার পর থেকে আর বৃষ্টি পড়ছিল না। বিরিয়ানি হাউজে পৌঁছতে সময় লাগল না। দশটার মতো বাজে। লোকজন তেমন নেই, ভিতরে অনেকটাই ফাঁকা। ঝলমলে আলো জ্বলে ছিল। হাত ধুয়ে এসে পিছনের দিকে একটা ফাঁকা টেবিলে বসল ওরা । তাহমিনার কোমল তুলতুলে শরীরে আশেপাশের সবকটা পুরুষ চোখ ঘুরছিল। তাহমিনা আঁচল টেনে নেয়।
খেতে খেতে রাজু ভাই বলল, কি? রান্না কেমন?
তাহমিনা মাথা নাড়ে। মাহমুদের মুখটা ভেসে উঠল। ওকে ছাড়া কিছু খেতে গেলে গলায় আটকে যায়। অফিসেও এমন হয়।
খেতে খেতে রাজু ভাই বললেন, মালিবাগে তোমাদের জমিতে ছ’ তালা মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং উঠছে উঠছে তাহমিনা।
আপনি কোত্থেকে শুনলেন? তাহমিনা চমকে উঠল। বুকটা ভীষণ ধক ধক করছে।
ক’দিন আগে সেগুনবাগিচায় রিপোটার্স ইউনিয়নে জামিলের সঙ্গে দেখা। ওই বলল।
ওহ্ । তাহমিনার ছোট ভাই জামিল, লেখালেখি করে, রাজু ভাইকে ভালো করেই চেনে। রাজু ভাই জিজ্ঞ্যেস করলেন, মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং উঠছে, তোমার ভাগ নেবে না তাহমিনা?
তাহমিনা চুপ করে থাকে। রাজু ভাই বললেন, শাম্মীরা আজ যশোর গেল। ওদের বাসে তুলে দিয়ে একবার অফিসে গেলাম। তারপর অফিস থেকে তোমাদের ওখানে।
ওহ্ । রাজু ভাই আপনার মেয়েটি যা কিউট হয়েছে। ওকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে তাই না?
তা তো হবেই।
রাজু ভাই?
বল।
আপনাদের অফিসে আমাকে একটা চাকরি দেন না রাজু ভাই।
হঠাৎ? রাজু মুখ তুলে তাকায়। তোমার এত ভালো চাকরি। Excellent গ্রপ অভ ইন্ড্রাষ্ট্রি বছরে সরকারকে কত রাজস্ব দেয় জান? ৫০০ কোটি টাকা। সাতক্ষীরায় ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে নেক্স উইকে তোমাদের চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তারের একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা আমার।
ওই অফিসে আমি আর চাকরি করব না। বলে বোরহানির গ্লাসে ছোট্ট চুমুক দিল তাহমিনা। মাহমুদের মুখটা আবার ভেসে উঠল। ভালো লাগবে বলে এসেছিল। এখন আর ভালো লাগছে না।
কোনও সমস্যা?
হ্যাঁ। মাথা নাড়ল তাহমিনা।
আমাদের অফিসে চাকরি করবে?
হু।
আচ্ছা দেখি, কাল সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে একবার কথা বলে দেখি। তোমায় কাল জানাব।
প্লিজ।
তাহমিনাই জোর করে বিল দিল।
কি ব্যাপার?
আজ আমাকে বিল দিতে দিন। আজ আমার একটা স্পেশাল অকেশন আছে।
ওকে। বাইরে এসে রাজু ভাই সিগারেট ধরায়। রাজু ভাইদের বাড়ি এখান থেকে কাছেই। হাঁটতে-হাঁটতে সে বাড়ির কাছে চলেও এল ওরা। রাজু ভাই বলে, চল আমার ওখানে যাই।
এত রাতে? তাহমিনা হাসে। কেন?
কেন আবার? একটু বসে গপসপ করি। কফি খাই। ফ্রিজে কেক আছে। খাওয়াব। এখন ঘরে ফিরে কি করবে। মাহমুদ তো ঘুমাচ্ছে।
রাজু ভাই বেশ লম্বা। শ্যামলা বলিষ্ট গড়ন। চশমা পরা মিষ্টি চেহারা। আজ কালো রঙের পাঞ্জাবি পরে ছিল। তাহমিনার বড় লোভ হয়। অন্যরকম লোভ। রাতের পর রাত ঔষধে আচ্ছন্ন মাহমুদ ঘুমিয়ে থাকে। তাহমিনা জেগে থাকে। ছটফট করে।
আপনার সঙ্গে না গেলে খুব কষ্ট পাবেন রাজু ভাই?
রাজু ভাই কাঁধ ঝাঁকায়। জীবনে অনেক কিছু পাইনি। মেনে নেব।
শাম্মী ভাবী কিন্তু অনেক সুন্দর। তাহমিনা বলে।
তা অস্বীকার করব না।
তা হলে?
তা হলে কি? আজ কাশ্মীরি বিরিয়ানি কেমন লাগল তোমার?
ভালো। বলে হাসল তাহমিনা। তারপর বলল, আসি। সব সময় ভালো থাকার চেস্টা করবেন। বলে হাঁটতে থাকে তাহমিনা।
পিছন থেকে রাজু ভাইকে বলতে শুনল, তোমার জন্যই এত আয়োজন তাহমিনা। তুমি একা আছ। তুমি কি জীবনভর একাই থাকবে?
তাহমিনা হাঁটতে থাকে। বিয়ের দু’বছর পর সন্তান নেবার সিদ্ধান্ত নেবে-ঠিক তার আগে স্ট্রোক করল মাহমুদ। কি আর করা-বন্ধ্যাজীবনই মেনে নিয়েছিল তাহমিনা। যে নারী ঠিক বন্ধ্যা না, অথচ যে নারীকে বন্ধ্যা থাকতে হয়, সেই নারীর অনেক যন্ত্রণা। রাজু ভাইয়ের সহানুভূতি তাহমিনা বোঝে ঠিকই-কিন্তু করার কিছুই নেই। মালিবাগের বাবার বাড়িতে মাল্টিস্টোরিড দালান উঠছে। ওই দালানের ভাগ নিতে ভাইদের পা ধরবে না।
সাড়ে দশটার মতো বাজে। লোড শেডিং চলছে। সরু গলির বাতাসে ভাসছিল ড্রেনের দুর্গন্ধ। একটা রিকশা টুং টাং বেল বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে যায়। দেওয়ালের ওপাশের বাড়ির শিশুর চিৎকার শুনতে পায় তাহমিনা। তাহমিনার ভিতরেই জন্মের আকাঙ্খায় একটি শিশু চিৎকার করতে থাকে। পৃথিবীতে আসবে বলে অপেক্ষমান পুরুষের সঙ্গে যেতে বলে। তাহমিনার অক্ষত জরায়ূ আচঁড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করে দেয়। অজস্রবর্ণের আতশবাজীর নীরব বিস্ফোরণ ঘটে যায় তাহমিনার মাথার ভিতরে । সারা শরীরে ঘামস্রোত টের পায় ও।
বাড়ির সামনে আবছা অন্ধকার। একটা মটরসাইকেল দাঁড়িয়ে। হেলমেট মাথায় মটরসাইকেল আরোহীর সঙ্গে কথা বলছে বাড়িওয়ালা মানিক । গা শিরশির করে উঠল তাহমিনার। লোকটা কখনোই ভাড়া নিতে আসে না, ভাড়া দিয়ে আসতে হয়। তখন বাড়িতে একা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে থাকে লোকটা। একবার লুঙ্গি সরিয়ে বিশ্রি ইঙ্গিত করেছিল। আরেকবার বিদায় নেবার সময় দরজার খুব কাছে এসে পড়েছিল লোকটা। কী কারণে জাপটে ধরার সাহস পায়নি। হয়তো মাহমুদ সাংবাদিক বলেই।
আরে আপা, আপনারেই তো আমি খুঁজতেছি। আমার কী সৌভাগ্য।
কী ব্যাপার?
শুনেন আপা। গবমেন্টে ষড়যন্ত্র কইরা জিনিসপত্রের দাম যেইভাবে বাড়াইয়া যাইতেছে, আমাগো সংসার চলনই কঠিন হইয়া পড়ছে। তাহমিনা জানে কী বলবে মানিক। লোকটা কন্ঠস্বর এবার বদলে যায়। সিগারেট টানছিল। একমুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলল, সামনের মাস থেকে পাঁচশ টাকা ভাড়া বাড়ায় দিবেন আপা। নাইলে আগামী মাসের এক তারিখে দুই মাসের নুটিশ দিয়া বাড়ি ছাইড়া দেন। তাহমিনার মাথা টলে ওঠে। সারা শরীরের রক্ত জমে যায়। ঘোরের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। সিঁড়িতে অন্ধকার। তবে কেমন এক নীলাভ আলো ছড়িয়ে আছে, এ আলো অন্ধকারের আলো আর বেলি ফুলের মিষ্টি সুগন্ধও ছড়িয়ে আছে ... এ সুগন্ধ অন্ধকারের আলোর সুগন্ধ ... একটু পর শব্দ করে মটরসাইকেল চলে যায়। তাহমিনার শরীর আড়ষ্ট হয়ে ওঠে। ও জানে মানিক এখুনি দ্রুত অন্ধকার সিঁড়িতে উঠে আসবে। ... এক্ষুণি অত্যন্ত নির্দয় ভাবে পিষ্ট হতে হবে ওকে। তাতেও অন্ধকারের আলোর এতটুকুও ম্লান হবার কথা না ...
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×