প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) অন্যতম সভ্যতা আসিরিয় সভ্যতা। আসিরিয় সভ্যতাটির উদ্ভবকাল ধরা হয় ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বে। সভ্যতাটি গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়ার উত্তরাঞ্চলে । আসুর নগর ছিল আসিরিয় সাম্রাজ্যের কেন্দ্র,। পরে অবশ্য রাজধানী নিনেভ নগরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে আসিরিয় সভ্যতা শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করলেও সামাজিক সংগঠন, বিশেষ করে সামরিক ব্যবস্থাপনা পরবর্তী সভ্যতাসমূহের আদর্শ হয়ে উঠেছিল।
ইরাকের (মেসোপটেমিয়া) মানচিত্র। উত্তরে খোরসাবাদ, নিনেভ, নিমরুদ (কালাহ) এবং আসুর নগর। সুপ্রাচীনকালে এখানেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন আসিরিয় সভ্যতা।
প্রাচীনকালে আসিরিয়া বলতে টাইগ্রিস নদীর উপরের অংশ বোঝাত। আশুর নগর থেকে আসিরিয়া নামের উদ্ভব। আশুর নগরকে কেন্দ্র করে প্রথমে একটি জাতি এবং পরবর্তীকালে একটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য অনুসারে আশুর ছিলেন শেম এর পুত্র; শেম ছিলেন পয়গম্বর নূহ (আঃ) এর পুত্র। পরে আশুর (আনশার) হয়ে উঠেছিলেন আশুর নগরটির রক্ষকারী দেবতা।
মানচিত্র প্রাচীন মেসোপটেমিয়া। উত্তরে আশুর, মাঝখানে আক্কাদ এবং দক্ষিণে ব্যাবিলন, এলাম রাজ্য ও পারস্য উপসাগার
৩৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাঞ্চলটি ছিল সুমেরিয় জাতি অধ্যুষিত। সেই একই সময়ে উত্তরাঞ্চলে ছিল সেমেটিক ভাষাভাষী অধিবাসী । এই সেমেটিক জনগনই পরে ‘আক্কাদিয়’ হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২৩ শতকের দিকে আক্কাদিয়রা সুমেরিয়দের পরাস্ত করে। অবশ্য এর ১০০ বছর পরে আক্কাদিয় সাম্রাজ্যের পতন হয়। এবং এর পরপরই আক্কাদিয় সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। (ক) আসিরিয়া (উত্তরে) এবং (খ) ব্যাবিলন (দক্ষিণে)।
শিল্পীর কল্পনায় তাইগ্রিস নদীর পাড়ের আশুর নগর
খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ থেকে আসিরিয়ায় বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ১৩৬০ খ্রিস্টাব্দে আসিরিয় শাসক আসুরউবালিট নিজেকে আসিরিয়ার রাজা ঘোষনা করেন। তিনি স্বাধীনতা রক্ষার্থে বিদেশি শক্রদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তার সময়ে আশুর ছিল আসিরিয়ার আদি রাজধানী। নগরটির অবস্থান নিনেভ এর দক্ষিণে। এটি বর্তমানে ইরাকের আশ শারকাত গ্রাম।
নমরুদ এর প্রাসাদ। নমরুদ ছিলেন আসিরিয় সম্রাট। তিনি ১২২৫ খ্রিস্টপূর্বে ব্যাবিলন দখল করে ব্যবিলনের প্রধান দেবতা মারদুকের মূর্তি আশুর নিয়ে আসেন। এতে জনগন ক্ষেপে ওঠে, এবং তার প্রাসাদ পুড়িয়ে দেয়।

তাইগ্রিস নদীর পাড়েআশুর নগরের মানচিত্র
আসিরিয়া সভ্যতার মূলে ছিল কৃষিকাজ। পানির উৎস ছিল তাইগ্রিস নদী। পানি সেচের নিপুন ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল। পরে সভ্যতা স¤প্রসারিত হলে আকরিক খনি আবিস্কার ও এসব আকরিকের ব্যবহার প্রচলন হয় । এ ছাড়া আসিরিয় সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্বে অরণ্য ছিল- যে অরণ্য ছিল কাঠ ও অন্যান্য সম্পদের প্রধান উৎস। নগরের বাইরে অধিকাংশ আসিরিয়দের জীবন ছিল ছোট ছোট গ্রামে সীমাবদ্ধ। খোরসাবাদ, নিনেভ, নিমরুদ (কালাহ) এবং আসুর-এসব নগরে বাস করত কারুশিল্পিরা । দেয়ালের গায়ে আসিরিয় ভাস্করের নিপুণ কারুকাজ আজও সভ্য পৃথিবীর বিস্ময় উদ্রেক করে।
আসিরিয় রাজা আসুরনাসিরপাল (৮৮৩-৮৫৯ খ্রিস্টপূর্ব) সিংহ শিকার করছেন। আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগেকার প্রস্তরশিল্প ...
আসিরিয়ার নগরগুলিতে ঘরবাড়ি তৈরি হত কাদার তৈরি ইঁটে, কখনও কখনও পাথর, তবে পাথরে ব্যবহার সীমিত ছিল । অধিকাংশ বাড়িই হত একতলা, ছাদ সমতল। বাড়িগুলি ছিল সাদামাটা। তবে, নগরের অধিকাংশ স্থান জুড়ে থাকত রাজকীয় প্রাসাদ ও উপাসনালয়। যা হোক। আসিরিয়রা ব্যবসাবানিজ্য করত। গাধার পিঠে কাপড় ও টিন চাপিয়ে চলে যেত (বর্তমান) দক্ষিণ তুরস্ক অবধি। আসিরিয় সভ্যতায় সোনারূপা প্রচলন ছিল।
আসিরিয় বর্ণমালা
আসিরিয়রা দু’টি ভাষা ব্যবহার করত। (ক) প্রাচীন আসিরিয় বা আক্কাদিয়। এবং (খ) আধুনিক আসিরিয় বা নিও-সিরিয়। উন্নত লিখনপদ্ধতির জন্য আমারমিয় ভাষা প্রাচীন আসিরিয় ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল । যে কারণে ৭৫২ খ্রিস্টপূর্বের দিকে আসিরিয় সাম্রাজ্যে আমারিয় ভাষা দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হয়ে উঠেছিল । তবে আসিরিয়বাসী সম্পূর্নভাবে আমারমিয় ভাষা গ্রহন করেনি, তারা যে আরামিয় ভাষা বলত তাতে প্রচুর আক্কাদিয় শব্দ ছিল। এ কারণে পন্ডিতগন এই ভাষার নাম দিয়েছেন: আসিরিয়-আরামিক।
আসিরিয় রাজা আসুরনাসিরপাল এর প্রস্তর মূর্তি । তার প্রাসাদ ছিল কালহুতে-বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উত্তরে। প্রাসাদের দেয়ালে রয়েছে ছবি। রাজা আসুরনাসিরপাল এর শাসনামলে আসিরিয়া সাম্রাজ্যটির অভূতপূর্ব স¤প্রসারণ ঘটেছিল, এর মূলে ছিল সামরিক সংগঠন। শুরুতে বলেছিলাম- প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে আসিরিয় সভ্যতা শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রনী ভূমিকা পালন করলেও সামাজিক সংগঠন ও সামরিক ব্যবস্থাপনা পরবর্তী সভ্যতাসমূহের আদর্শ হয়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিকগন আসিরিয়ার প্রসঙ্গে সামরিক শক্তির কথা যতটা বলেন, প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতা সম্বন্ধে ততটা বলেন না। আসিরিয় সভ্যতার ওপর একটি বিখ্যাত ইংরেজি বইয়ের নাম: The Might That Was Assyria.
তখন বলছিলাম যে আসিরিয় নগরগুলিতে ঘরবাড়িগুলি ছিল সাদামাটা, তবে রাজকীয় প্রাসাদ ও উপাসনালয়গুলি -নগরের অধিকাংশ স্থান দখল করে রাখত। তৎকালীন সময়ে ধর্ম গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করত এবং সে ধর্মের পৃষ্টপোষক ছিলেন শাসকবর্গ । ধর্মীয় চেতনার দিক থেকে আসিরিয় ধর্ম ছিল বহু দেবতাবাদী। যেমন, আনশার ছিলেন আকাশদেবতা। ‘আনশার’ শব্দটি এসেছে আশুর থেকে।
আসিরিয়ার রাজা প্রধান দেবতা আশুর এর পুরোহিত ছিলেন
মনে থাকার কথা-৩৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে মেসোপটেমিয়া ছিল সুমেরিয় জাতি অধ্যুষিত, সেই সঙ্গে মেসোপটেমিয়ায় সেমেটিক ভাষাভাষী জনগনও ছিল । আসিরিয়রা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি লাভ করেছিল পূর্বসূরীদের কাছ থেকে । যা হোক। আনশার ছিলেন আশুর নগরের রক্ষাকারী দেবতা, তেমনি ইশতার ছিলেন নিনেভ নগরের রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এর পাশাপাশি ইশতার ছিলেন প্রেম ও যুদ্ধের দেবী। কৃষিকাজের দেবতার নাম ছিল নিসরোখ। আর, নাবু ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা।
আসিরিয়রা নগর অবরোধ করছে (আধুনিক শিল্পীর চোখে)
আসিরিয় সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন আশুরবনিপাল। তার সময়কাল ৬৬৯-৬২৭ খ্রিস্টপূর্ব; তিনিই আসিরিয় সাম্রাজ্যে রশেষ উল্লেখযোগ্য শাসক। তাঁর সময়ে মিশরের উত্তরাঞ্চল ও পারস্য আসিরিয় সভ্যতার অর্ন্তগত হয়েছিল এবং আশুরবনিপাল তার ভাইকে ব্যবিলনের শাসনভার অর্পন করেছিলেন। তার শাসনামলে নিনেভ ছিল আসিরিয়ার রাজধানী।
আশুরবনিপাল।
সম্রাট আশুরবনিপাল সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি সুমের ও আক্কাদিয় ভাষা জানতেন, যা তৎকালীন সময়ে শাসকবর্গের কাছে অজানা ছিল। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় তিনিই প্রথম গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে অজস্র কাদার তৈরি লিপিফলক ছিল। কয়েকটি লিপিফলকে বিশ্বজগতের ব্যাখ্যার (যদিও অবৈজ্ঞানিক) চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রন্থাগারের অন্যতম সাহিত্যকর্ম হল গিলগামেশ। যা হোক। গ্রন্থাগারে লোককাহিনীও অর্ন্তভূক্ত ছিল। যা হোক। আশুরবনিপাল সুশাসক ছিলেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে অভিযোগকারীর কথা শুনতেন। দোষগুণ যাচাই করে প্রাদেশিক শাসকদের তিনি নিজে বাছাই করতেন। তার মৃত্যুর পর আসিরিয় সাম্রাজ্যটি সুযোগ্য শাসকের অভাবে ভেঙে পড়ে।
আসিরিয় সাম্রাজ্যের মানচিত্র
আসিরিয় শিল্পকলা
আসিরিয় সভ্যতার অবসান হয় ৬১২ খ্রিস্টপূর্বে । কত বছর আগেকার কথা! কিন্তু, আজও ইরাকের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিজেদের আসিরিয় বলে দাবি করে। এরা আধুনিক আসিরিয় বা নিও-সিরিয় ভাষায় কথা বলে, এবং লেখে । অজস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আজও এরা ঐহিত্যবাহী আসিরিয় সংস্কৃতি আকঁড়ে ধরে রেখেছে। ধর্মীয় দিক থেকে এই ক্ষুদ্র সম্পদায়টি খ্রিস্টান, ঠিক মূলস্রোতের খ্রিস্টান ধর্ম নয়, এদের ধর্মটি সিরিয়াক ক্রিশ্চিনিটি নামে পরিচিত । এরা এখনও ইরাকে উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।
কুড়ি শতকের আসিরিয় জনগন। এরা আজও,দুঃখজনক হলেও, ধর্মীয় সন্ত্রাসের শিকার।
ছবি ও তথ্য: ইন্টারনেট।
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৪:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


