১. খাগড়াছড়ি
ঘন কুয়াশার ভিতরে উঁচু নীচু পাহাড়ি রাস্তায় সতর্ক ভঙ্গিতে হাঁটছিল আমির; তার কোমরে বাঁধা একটি চামড়ার ব্যাগের ভিতরে ৩০০০ ইয়াবা ট্যাবলেট । খাগড়াছড়ি সদরে একটা হোটেলে ইয়াবার ডিলার অপেক্ষা করছে, তার কাছে সবুজ, রক্তিম আর কমলা রঙের ট্যাবলেটগুলি পৌঁছে দিতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ দুপুরের আগেই খাগড়াছড়ি সদরে পৌঁছে যাবে আমির। বছর খানেক হতে চলল এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে একটি সংঘবদ্ধ ইয়াবা পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত সে । তবে আজও তেমন বিপদের মধ্যে পড়তে হয়নি তাকে। অবশ্য বছর তিনেক আগে টেকনাফে থাকার সময় একবার ইয়াবাসহ ধরা পড়েছিল। সে সময় টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকত বাংলাদেশে। কক্সবাজার জুড়ে তল্লাশি জোরদার করায় কিছু দিন ধরে খাগড়াছড়ির গহিন সীমান্ত অঞ্চল হয়ে উঠেছে ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুট। এই কাজে ঝুঁকি আছে, তবে পয়সাও ভালো। আমিরের বয়সএখনও কুড়ি পেরোয়নি, জাতে রোহিঙ্গা সে, উদ্বাস্তু হয়ে অন্য একটি দেশে টিকে থাকতে হলে পয়সা চাই, অনেক পয়সা।
এই পাহাড়ি জনপদে এখনও ভালো করে রোদ ওঠেনি। চারিদিকে কুয়াশা ছড়িয়ে রয়েছে। পোষ মাস, পাহাড়ি বাতাসে শীতের তীক্ষ দাঁত। হাঁটতে হাঁটতে হি হি করে কেঁপে কেঁপে উঠছিল আমির। তার পরনে স্থানীয় আদিবাসীদের পোশাক, এও এক ধরনের ছদ্মবেশ। শেষ রাতের গভীর অন্ধকারে মাইনী নদী পাড় হয়েছে সে, তারপর মিরাং হয়ে দয়াধন পাড়ায় এসে পৌঁছতে পৌঁছতে এখন সূর্য উঠি উঠি করছে। জায়গাটা দীঘিনালা উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে, খাগড়াছড়ি সদরের পুবে।
কিছুক্ষণ পর রোদ উঠল। দয়াধন পাড়ার এখানে-ওখানে অনেক টিলা। ইদানীং স্থানীয় আদিবাসীরা জুমচাষের বদলে স্থানীয় আদা চাষ করছে। আদাচাষীরা আদা ভর্তি ঝুড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি সদরে যায় । আমির এদের সঙ্গে মিশে যায়। আজও মিশে গেল। খাগড়াছড়ি সদরে সময়মতো পৌঁছতে পারবে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমির বহুবার খাগড়াছড়ি সদরে গেলেও ঢাকা শহরে কখনও যায়নি । সে শুনেছে, ইয়াবা-বস ঢাকা শহর থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। আমির ইয়াবা-বস কে কখনও দেখেনি, তবে দেখার ইচ্ছে আছে। আমির জানে, খুব শিঘ্রীই তার ইয়াবা-বস-এর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ...
২. একজন যোদ্ধা
সাঈদ ইয়ামিন, বয়স ২৮, পেশায় সাংবাদিক, একটি বিখ্যাত জাতীয় দৈনিকে কর্মরত, এই মুহূর্তে মোহম্মদপুরে একটি চারতলা বাড়ির দোতলায় উঠে কলিংবেল চাপল। দরজা খুললেন জানু আপা । সাঈদকে দেখে খুশি হয়ে উঠ বললেন, ইয়ামিন! আয়, আয়, ভিতরে আয়।
সাঈদ কিছুটা কৈফিয়তের সুরে বলল, এদিকেই একটা কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম একবার দেখা করে যাই। বলতে বলতে ভিতরে ঢোকে সে। জানালা দিকে হু হু করে পৌষের রোদ ঢুকেছে ড্রইংরুমে । শেষ দুপুরের রোদে বসার ঘরটি ঝলমল করছে।
এ দিকে একবারেই যে আসিস না? জাহানারার কন্ঠে অভিযোগ। বললেন, বস।
সাঈদ বসতে বসতে বলল, বোঝই তো, খবরের কাগজের চাকরি। রাত-দিন কী রকম ব্যস্ত থাকতে হয়।
বুঝি রে বুঝি। তা শর্মী ভালো আছে?
হ্যাঁ।
সাদেকা খালা?
হ্যাঁ, মা এখন ভালো, গত মাসে চোখের ছানি অপারেশন হল। তা রোমেল, রুমা ওরা কোথায়?
রোমেল গেছে ক্রিকেট খেলতে আর রুমা গেছে ওর এক ক্লাসমেইটের বাসায়।
ও।
তুই একটু বস ইয়ামিন, আমি চা করে নিয়ে আসি। বলে জাহানারা ভিতরে চলে যেতে থাকেন।
সাঈদ বলল, খালি চা, আর কিছু করো না। একেবারে খিদে নেই।
খিদে নেই কেন রে?
দুপুরে আমার এক কলিগ কাচ্চি খাওয়াল।
আচ্ছা, তাহলে শুধু চা-ই আনি।
ড্রইংরুমের এক কোণে একটা ক্রিকেট ব্যাট। ক্রিকেট-এর প্রতি রোমেলের খুব ঝোঁক। এবার কলেজে উঠল রোমেল। রোমেলের বড় রুমা- একটা প্রাইভেট ইউনিভারসিটিতে পড়ছে । কথাটা ভাবলেই সাঈদ ভিতরে ভিতরে কেমন অস্বস্তি টের পায়। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রাইভেট ইউনিভারসিটির ছাত্রছাত্রীদের টার্গেট করেছে, ওদের ইয়াবায় আসক্ত করে তুলছে । তবে ইদানীং কেবল প্রাইভেট ইউনিভারসিটিই না- বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ইয়াবার আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। সাঈদের বিশ্বাস- রুমা নেশার পথে পা বাড়াবে না, জানু আপা সংস্কৃতিমনা। সে জানে- অনেক সময় সংস্কৃতিশূন্যতাই নেশার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ...
ড্রইংরূমের দেওয়ালে টাঙানো রবীন্দ্রনাথের একটা সাদাকালো ছবি। তার ঠিক পাশেই জানু আপার স্বামী সামাদ দুলাভাইয়ের ছবি। ছবিটায় সাঈদের চোখ আটকে গেল। দু’ বছর হল সামাদ দুলাভাই মারা গেছেন। ডাক্তার ছিলেন সামাদ দুলাভাই । জানু আপা একটা স্কুলে পড়ান। ভাগ্যিস, মোহম্মদপুরের এই বাড়িটা সামাদ দুলাভাই মৃত্যুর আগে শেষ করে যেতে পেরেছেন। জানু আপা সাঈদের খালাতো বোন। ঢাকায় থাকেন বলে এখনও সম্পর্ক আছে। মাঝে মাঝে মাকে আর শর্মীকে নিয়ে আসে সাঈদ। কখনও কখনও জানু আপারাও সাঈদদের কলাবাগানের বাড়িতে যান। তবে জানু আপার প্রতি সাঈদের বিশেষ একটা টান রয়েছে। জানু আপা চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গান। জানু আপার কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনলে সাঈদ স্থান-কাল-পাত্র বিস্মৃত হয়ে যায়।
একটা ট্রেতে চা নিয়ে এলেন জাহানারা । টেবিলের ওপর ট্রে রেখে বললেন, কাগজে তোর লেখাটা নিয়মিত পড়ছি।
কোন লেখার কথা বলছ? সাঈদ বিস্মিত হল। ঝুঁকে চায়ের কাপ তুলে নিল।
ওই যে- ‘ইয়াবার আগ্রাসন’। আমার কলিগরাও লেখাটার প্রশংসা করেছে। বলে সোফায় বসলেন জাহানারা।
ওহ্। ভালো লাগার অনুভূতি টের পেল সাঈদ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ফিচার লেখে, কারও ভালো লেগেছে শুনলে ভালো তো লাগবেই।
জাহানারা বললেন, ভালোই লিখছিস। ইয়াবার বিষবড়ি যে সমাজের এত সুলভ হয়েছে, এত গভীরে পৌঁছে গেছে জানাই ছিল না- ভাবলে মাথা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে।
মাথা নাড়ল সাঈদ। তারপর হেসে বলল, তুমি বললে বিষের বড়ি, ঢাকায় যারা ইয়াবা আসক্ত তারা কিন্তু ইয়াবাকে ‘বাবা’ বলে।
বাবা? তাই নাকি?
হ্যাঁ। । আসলে ইয়াবা শব্দটি একটি থাই শব্দ। যার অর্থ -‘ক্রেজি মেডিসিন’।
ক্রেজি মেডিসিন?
হ্যাঁ। আসলে ইয়াবার মূল উপাদান হল মেথামফেটামাইন, এটি এক ধরনের উদ্দীপক মানে স্টিমুলাস। একটা বিষবড়িতে এই ধর, ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম মেথামফেটামাইন আর ৪৫ থেকে ৬৫ গ্রাম ক্যাফেইন থাকে। ইয়াবার স্বাদ নানা রকম হয়। যেমন আঙুর, কমলা বা ভ্যানিলা, কখনও আবার ক্যান্ডি চকোলেটের। ইয়াবার রং হয় সবুজ, রক্তিম আর কমলা । ট্যাবলেটের ওপর ইংরেজি অক্ষর “আর” বা “ডবলিউ ওয়াই” লেখা ছোট্ট লোগো থাকে। ইয়াবা ট্যাবলেটে ক্যান্ডি চকোলেটের গন্ধ থাকে বলে অনেক সময় কম বয়েসিদের কাছে এটি বিপদজনক বলে মনে হয় না।
কি ভাবে খায়? গিলে- ঔষধের মতো করে?
হ্যাঁ। তবে কখনও কখনও অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের ওপর ট্যাবলেট রাখে, নীচ থেকে তাপ দেয়, আর তাতে ট্যাবলেট গলে যায়। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া টেনে নেয়।
তার মানে ধোঁয়াটাই ক্ষতিকর?
হ্যাঁ। ইয়াবা নার্ভাস সিস্টেমের সবচে ক্ষতি করে।
বাচ্চারা যে কেন এসব নেয়? জাহানারা মেয়ের কথা ভাবলেন। রুমা আজকাল কথায় কথায় মেজাজ দেখায়। প্রাইভেট ইউনিভারসিটিতে পড়ছে। ও কি লুকিয়ে ইয়াবা নেয়? না! তা কেন হবে? প্রাইভেট ইউনিভারসিটিতে পড়ছে বলেই ইয়াবা আসক্ত - এমন ধারণা তো অমূলক।
জাহানারা দেয়ালে টাঙানো রবীন্দ্রনাথের ছবির দিকে তাকালেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে সাঈদ বলল, আমি এ সপ্তাহের মধ্যেই খাগড়াছড়ি যাচ্ছি আপা।
খাগড়াছড়ি? কেন?
ইয়াবার চোরাচালান নিয়ে খোঁজখবর করতে। আগে বাংলাদেশে ইয়াবা আসত টেকনাফ সীমান্ত হয়ে। এখন চোরাচালানিরা বাংলাদেশে ইয়াবা আনছে খাগড়াছড়ির গহিন সীমান্ত এলাকা দিয়ে । বাংলাদেশে ইয়াবা আসার ওটাই এখন অন্যতম চোরারুট। খাগড়াছড়ি গিয়ে একটা সরেজমিন রিপোর্ট করব ভাবছি।
সাবধানে থাকিস। যারা ইয়াবার ব্যবসা করে, তারা সব ভয়ঙ্কর লোক। জাহানারার কন্ঠস্বরে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
চায়ে চুমুক দিয়ে সাঈদ বলল, অত ভয় পেলে চলে? এটা যুদ্ধ । আমি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি। পত্রিকায় ‘ইয়াবা -আগ্রাসন' লেখাটা বেরুনোর পর থেকে আমাকে ওরা টেলিফোনে থ্রেট করছে। তাই বলে কি না-লিখে চুপ করে বসে থাকব? বলতে বলতে সাঈদের চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে ওঠে ।
জাহানারার বুক কেঁপে ওঠে। বছর খানেক হল বিয়ে করেছে ইয়ামিন। ইয়ামিনের বউ শর্মী- শ্যামলা মতন মিষ্টি দেখতে, একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরি করে শর্মী । ইয়ামিন একটা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, ... যুদ্ধ না আবার সংসারটা তছনছ করে দেয় ...
ঘড়ি দেখল সাঈদ। তারপর বলল, বাদ দাও তো আপা । এখন একটা গান শোনাও। চা খেলাম। এবার গান শুনে বিদায় হই। সন্ধ্যার মধ্যে অফিস যেতে হবে।
জাহানারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গান মানে রবীন্দ্রনাথের গান। সংসারের হাজার ঝামেলায় গান ভুলতে বসেছেন জাহানারা। জাহানারা যে রবীন্দ্রনাথের গান গাইত-সে কথা কেবল এই ছোট ভাইটি মনে করিয়ে দেয়। জাহানারা আর হারমোনিয়াম টেনে নিলেন না, খালি গলায় সাঈদের প্রিয় একটি গান ধরলেন,
ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী, একা একা করি খেলা-
আন্মনা যেন দ্বিালিকার ভাসানো মেঘের ভেলা ...
৩. এ্যাঞ্জেলাদের বাড়ির সামনে
এ্যাঞ্জেলাদের বাড়ি গুলশান এভিনিউয়ের ৮৪ নম্বর সড়কে। বিশাল দোতলা বাড়ি। উঁচু পাঁচিল থাকায় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কালো রঙের গেট। রুমা এই মুহূর্তে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। এ্যাঞ্জেলাকে মিস কল দিয়েছে। ওর হাত কাঁপছে।
ফোন করে এ্যাঞ্জেলা বলল, আমি এখন আসতে পারব না।
কেন? রুমা অস্থির বোধ করে।
আমি এখন ব্যস্ত। আমার বয়ফ্রেন্ড এসেছে। আমি চাই না সালমান তোকে দেখুক ।
কি!
কারণ তুই সুন্দরী। বলে এ্যাঞ্জেলা হাসল।
বিচ! চিৎকার করে উঠল রুমা। এই শব্দটি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ব্যবহার করছে।
এ্যাঞ্জেলা হাসল।
রুমা বলল, আমার বাবা দরকার।
এ্যাঞ্জেলা বলল, আমার কাছে নেই।
তাহলে! রুমার আবার চিৎকার করে উঠল।
আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি। ওখানে গেলে পাবি।
আমি একা যাব?
সমস্যা নেই, আমি ফারহানকে এখুনি ফোন করে দিচ্ছি। ও খুব ভালো। ওই তো আমাকে আজীজ মোহম্মদ ভাইয়ের ফোন নম্বর দিল। বলে বনানীর ৫নং সড়কের একটা ঠিকানা দিল এ্যাঞ্জেলা । ব্লক এফ, ...
রুমা অস্থির বোধ করে। গতকাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি। রাত বারোটার দিকে তৃষ্ণা জেগে উঠল। ভীষণ ঘাম হচ্ছিল তখন। অত রাতে ঘর থেকে বেরুনো যায় না। তা ছাড়া মা ইদানীং সন্দেহ করছে। দিন কয়েক আগে ইয়ামিন মামা ফোন করেছিল। প্রাইভেট ইউনিভারসিটির ইয়াবা আসক্ত ছাত্রছাত্রীদের সম্বন্ধে তথ্য চায়। রুমা বলেছে, ও এসব জানে না। আজকাল আর ইয়ামিন মামাকে সহ্য হচ্ছে না। কাল একবার ফোন করতেই চিৎকার করে বলল, আমাকে এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন! আমি কি ইয়াবা খাই!
এ্যাঞ্জেলা?
বল?
আমার কাছে বাবা কেনার টাকা নেই।
এ্যাঞ্জেলা বলল, সমস্যা নেই, আমি ফারহানকে বলে দেব, ও ‘বাবা’ দিয়ে দেবে, টাকা লাগবে না। তবে ...
কি?
বিনিময়ে ও অন্য কিছু চাইতে পারে। বলে এ্যাঞ্জেলা হাসে।
রুমা কাঁধ ঝাঁকায়। তারপর ফোন অফ করে দেয়। রাস্তার দিকে তাকায়। সিএনজি কই সিএনজি? দ্রুত হাঁটতে থাকে। ওর এখন অন্তত দুটো ট্যাবলেট চাই ... ভীষণ ঘাম হচ্ছে, মুখ শুকনো শুকনো ঠেকছে, মুখে তাপ টের পাচ্ছে, সে তাপ সারা শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে, মাথার ভিতরে কেমন অন্ধকার অন্ধকার ... বুকের ধকধকানি স্পস্ট শোনা যায়, ইয়াবার ধোঁয়া নিতে পারলে তখন কেবলি আনন্দ আনন্দ আর আনন্দ ...
রাস্তার ঠিক মাঝখানে একটা ছাই রঙের বিশাল হাতি দেখতে পেল রুমা! হাতির পিঠে মাহুত, পিছনে হাওদা, তাতে একজন রাজা বসে ...
শরীরে শীতল স্রোত বয়ে যায় রুমার ।
৫ প্রতিপক্ষ
আমির। এই মুহূর্তে একটা ফাঁকা রুমের সাদা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আসে। ওর পরনে খাকি প্যান্ট ও সবুজ রঙের টিশার্ট। মাথা নীচু করে আসে সে। ইয়াবা বস-এর সামনে স্বাভাবিক হতে পারছে না। আজ ভোরের বাসে ঢাকা এসেছে সে, ইয়াবা-বসই তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কেন ডেকেছেন ইয়াবা-বস? ভিতরে ভিতরে টেনশন বোধ করছে সে।
জানে আলম, ঢাকা শহরের অন্যতম একজন ইয়াবা ডিলার, একটা সিঙ্গেল সোফায় পা তুলে বসে সিগারেট টানছিল। লোকটার বয়েস পয়ত্রিশের মতো হবে, ফরসা, চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখে নীল সানগ্লাস। পরনে সাদা প্যান্ট আর বাদামী জ্যাকেট। লোকটা জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা একটি ফটো বার করে আমিরের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বলে, এই নে, এই ছবিটা দেখ।
আমির কাঁপা কাঁপা হাতে ছবিটা নেয়।
জানে আলম বলে, এই লোকের নাম ইয়ামিন সাঈদ, ব্যাটা সাম্বাদিক। কাল খাগড়াছড়ি যাবে। খাগড়াছড়ির গহিন এলাকায় নাকি ইয়াবার চোরাচালান হয়, সে সব নিজের চোখে দেখে এসে খবরের কাগজে লিখবে । বলে অদ্ভূত ভঙ্গিতে হেসে উঠল জানে আলম। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, তুই এখনি খাগড়াছড়ি রওনা হয়ে যা। তারপর অপেক্ষা কর। সাম্বাদিকটা খাগড়াছড়ি গেলে চিনতে পারবি তো?
আমির মাথা নাড়ে।
শোন, সাম্বাদিকটা খাগড়াছড়ি গেলে প্রথমে খাতির করবি। তারপর বলবি আপনি যা জানতে চান, আমি জানি। তারপর ওটাকে মাইনী নদী পাড়ে নিয়ে যাবি, তারপর নির্জন স্থানে দায়ের এক কোপে মুন্ডু নামায়া নিবি, তারপর দেহসহ মুন্ডুটা মাইনী নদী তে ভাসায়া দিবি। কি পারবি না?
আমির মাথা নাড়ে। সে পারবে। তাকে পারতেই হবে। তার বাবা-মা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে থাকে, যে শরণার্থী শিবিরের স্বঘোষিত চেয়ারম্যান রফিক। ওই পাষন্ড লোকটার চাঁদাবাজী, মাদক ব্যবসা, নারী পাচার, দালালী সহ নানা ধরণের অপকর্মে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। গত বছর আমিরের ছোট বোন আমিনা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, রফিক চেয়ারম্যান ১০০০ টাকা চাঁদা চাইল, কোনও মতে যোগার করে দিল, না, আমিনা বাঁচেনি। শরণার্থী শিবিরের ফরিদাকে ভালোবাসত আমির ... ফরিদা ছিল ওরই সমবয়েসি ... রফিক চেয়ারম্যান ফরিদাকে ধর্ষন করে, তারপর বেশ্যার দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারপর থেকে আমিরের কাছে খুনখারাপিও সহজ ঠেকে ... ওর কোনও আদর্শ নেই ... জন্মের পর দেখেছে নিজের কোনও দেশ নেই, অন্য দেশে উদ্বাস্তু, উদ্বাস্তুর আবার আদর্শ কি? বেঁচে থাকাই আদর্শ। খুনের জন্য ইয়াবা বস নিশ্চয়ই অনেক টাকা দেবেন, ওর এখন অনেক টাকা চাই, ... শরণার্থী শিবির থেকে বাবা-মাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেবে। তার জন্য টাকা দরকার। আমির পারবে। সে এক কোপে লোকটার মাথা কেটে ফেলবে ...
জানে আলম পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি বান্ডিল বের করে। তারপর এই নে বলে আমিরের দিকে বান্ডিল ছুড়ে দেয়। খপ করে বান্ডিল ধরে আমির। তার বুক ধক করে ওঠে। কম করে হলেও এক লাখ টাকা আছে।
এখন তুই যা। কাজ শুরু করে দে। কর্কস কন্ঠে জানে আলম বলে।
মাথা নীচু করে দ্রুত ঘর থেকে বরিয়ে যায় আমির।
৬. আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রটি মোহাম্মদপুরে। বাড়ির কাছে বলেই রুমাকে ওখানেই ভরতি করেছেন জাহানারা। রুমার বাবা নেই, রোমেলের বয়েসও অল্প। ক্লিনিক দূরে হলে কে টানাটানি করবে? বছর খানেক হতে চলল রুমা ক্লিনিকে রয়েছে ... অবস্থা এখনও শঙ্কটজনক। হ্যালুসিনেসন হচ্ছে। ডাক্তার বললেন, প্যারানোইয়া। চিৎকার চেঁচামেচি তো আছেই। স্মৃতি বিভ্রমও ঘটেছে। মাঝে-মাঝে জাহানারাকে চিনতে পারছে না। ডাক্তারা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার কথা বলছেন। তারপর তো পুর্নবাসন ...
জাহানারা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। জাহানারা ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফিরছেন। হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
রুমাকে ক্লিনিকে ভর্তি করার পর রুমার ইউনিভারসিটির একজন মিস এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি কিছু বুঝতে পারিনি। আমি কল্পনাও করতে পারিনি ওর মতো একটা ভালো মেয়ে এসবের এতটা ডিপে যাবে। বলতে বলতে ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন। জাহানারা কাঁদতে পারেন না, তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।
ফুটপাতে একটা নিউজ স্টান্ড। ও দিকে চোখ যেতেই ইয়ামিনের মুখটা ভেসে উঠল। এক বছর আগে এই মাসের ২৬ তারিখে ইয়ামিনের নিরুদ্দেশ হয়েছিল, ওর লাশ পাওয়া যায়নি। ইয়ামিনের বউ শর্মী গত এপ্রিলে একটি সন্তানের মা হয়েছে ... সে কথা মনে করতেই কেঁপে উঠলেন জাহানারা। এই পৌষের সন্ধ্যায় শহরের বাতাসে মিশে আছে শীত। কার্ডিগানের ওপর ভালো করে শালটা জড়িয়ে নিলেন জাহানারা । ইয়ামিন একটা যুদ্ধে নিহত হয়েছে, যে যুদ্ধের প্রস্তুতি এখন জাহানারাও নেবেন ...
তথ্যসূত্র:
Click This Link
২৩/১২/২০১০ দৈনিক কালের কন্ঠ
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

