somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: বাবা

১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘুম ভেঙে যায় লীনার। চোখ মেলল আবছা অন্ধকারে। কিছুক্ষণ নিঃসাড় হয়ে পরে থাকে বিছানায় । ... একটা স্বপ্ন দেখছিল। মাথার ভিতরে সেই স্বপ্নের রেষ কাটেনি ... যেন একটা ছায়া-ছায়া পাহাড় ...সেই পাহাড় থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে ...টলটলে জলের হ্রদ। মনে হল বাবা যেন দাঁড়িয়ে ... মা নৌকায় ... নৌকা ভেসে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছে ... বাবা চিৎকার করে কী যেন বলল। পল্লব বলল: এখন আর ফেরার বাস নেই । রাস্তা ফাঁকা ... যেন হরতাল । রিয়াজ ভাই বলল, চল হাঁটি। উল্টো দিক থেকে একটা বাস আসছিল ...চারপাশটা কেমন আঁধার আঁধার ... বাসটা হর্ণ দিল ... মিমি হক চিৎকার করে বলল: এই সরে যাও! সরে যাও! ...
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
গলার কাছে ঘাম। সেই সঙ্গে তৃষ্ণা টের পায় লীনা। উঠে বসল। তারপর বিছানা থেকে নেমে স্লিপার খোঁজে। এখনও মাথার ভিতরে সেই স্বপ্নের টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলি ঘুরপাক খাচ্ছে...মিমি হককে দেখলাম। আশ্চর্য! দরজার কাছে পৌঁছে দরজা খুলল। ড্রইংরুমের আলো নেভানো তবে মাঝে-মাঝেই আলোর ঝিলিক ...বাবা টিভি দেখছে। পা টিপে টিপে ফ্রিজের কাছে যায় লীনা, ঠান্ডা পানির বোতল বের করে। বাতাসে চুরুটের গন্ধ । মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আবার চুরুট ধরেছে। লীনা বাধা দেয় না। বাবা নিঃসঙ্গ। বাবার জন্য খারাপ লাগে। চৌত্রিশ বছরের সংসার । মায়ের সঙ্গে এত ভাব-ভালোবাসা ছিল। চুরুট যদি একটু স্বস্তি দেয় তো দিক । তার ওপর এ বছরই রিটায়ার করল বাবা। এখন টিভি দেখে আর খবরের কাগজ পড়ে দিন কাটছে। সকালের দিকে পার্কে একা একা ঘোরাঘুরি করে। তাছাড়া সারা দিনই এই ষোল ’শ স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে বন্দি ...নিঃসঙ্গ স্মৃতির ভার বইছে ...
বোতল নিয়ে ঘরে ফিরে আসে লীনা। আলো জ্বালায় না। বিছানার ওপর বসে ঢকঢক করে পানি খায়। একবার বাথরুমে যায়। ফিরে আসে। এখন কত রাত কে জানে। জানালার বাইরে শহরটা থমথম করছে। এমন সব নির্জন অন্ধকার মুহূর্তে পল্লব উঠে আসে। তখন শরীর জুড়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। লোনা জনে ভিজে যায় লীনা । পল্লব এখন কোথায় কে জানে। বিয়ে করেছে সম্ভবত ... অনেক দিন দেখা নেই। ... এমন সব অন্ধকার সময়ে মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের মৃত্যুর পর ভীষণ কেঁদেছিল লীনা। বিবিএ ফাইনাল পরীক্ষার দু মাস পরের ঘটনা। কর্নেল আঙ্কেল ফোন করে একটা অফিসের ঠিকানা দিলেন। বললেন যোগাযোগ করতে। কর্নেল আঙ্কেল বাবার ছেলে বেলার বন্ধু। উষ্ণ সম্পর্কটা এখনও টিকে আছে। অফিসটা লালমাটিয়ায়। লীনা গিয়ে সিভি জমা দিয়ে ইন্টারভিউর দিনক্ষণ জেনে এল। ইন্টারভিউ দিয়ে ফেরার দিনই বিকেলে মায়ের শ্বাসকষ্ঠ শুরু হল। ভাগ্যিস বাবা সে সময় ঘরে ছিল। হাসপাতালের নিতে-নিতে সব শেষ। মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছিল। ডিটেক্ট করতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাবার মুখ থমথম করছিল। রিয়াজ ভাই এসেছিল হাসপাতালে। বাবা অবশ্য রিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেনি। রুনা ভাবীর সঙ্গে এ্যাডজাস্ট করতে পারেনি মা। রিয়াজ ভাই বিয়ের পর আলাদা হয়ে গিয়েছিল। বাবার এতে নীরব সমর্থন ছিল। লীনার অবশ্য রিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে: ফোনে কথা হয়। রিয়াজ ভাইরা এখন মগবাজার থাকে। লুকিয়ে সে বাড়ি যায়ও। মা রিয়াজ ভাইকে খুব ভালোবাসতো । মা লুকিয়ে কাঁদত। রুনা ভাবীর সঙ্গে কেন যে মার অ্যাডজাস্ট হল না কে জানে।
মায়ের মৃত্যুর দিনেই লীনাকে দেখতে আসার কথা ছিল। কর্নেল আঙ্কেলই সে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এনেছিলেন। ছেলে ব্যবসা করে। বাবা টাঙ্গাইলের এমপি। বিরাট অবস্থা। ঢাকার মোহম্মপুরে থাকে। সিরামিক টাইলসের ব্যবসা। তো, মায়ের মৃত্যুর কারণে সে বিয়ে ক্যান্সেল হয়ে যায়। সেই ছেলেরও নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। লীনা দীর্ঘশ্বাস ফেলেনি। ও তখন মায়ের শোকে পাগলপ্রায় হয়েছিল।
লীনার চাকরি হল। অফিসটা কানাডিয়ান এক দাতা সংস্থার । জীবনের প্রথম চাকরি। মন দিয়ে কাজ শিখছে। অফিসের পরিবেশ মনোরম, দেশি-বিদেশি কলিগরা আন্তরিক। এক কলিগ ওর প্রতি খুব আগ্রহ দেখাচ্ছে। শুভ রহমান। স্মার্ট। অস্ট্রেলিয়া থেকে এমবিএ করে এসেছে। সিলভার কালারের একটা টয়োটা প্রিয়াস চালায়। লীনা এড়িয়ে চলে। তার কারণ আছে। লীনা হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে অভিজ্ঞতা সুখের না। ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় পল্লব নামে এক সহপাঠীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল ও। শ্যামলা মতন দেখতে কোঁকড়া চুলের কানে দুল পরা উড়নচন্ডী ছেলে। তো, সে ছেলে প্রেমভালোবাসা বুঝত না ... কেবল ছোঁক ছোঁক করত...সম্পর্কের দু মাসের মাথায় কলাবাগানের এক ফাঁকা ফ্ল্যাটে নিয়ে লীনাকে তুলল-লীনাও কী ঘোরে গেল। ... স্পর্শে এত সুখ কে জানত। ভাগ্যিস সময়টা অনুকূলে ছিল না...লীনার ঘোর কাটল। অজুহাত বানিয়ে বাবাকে বলে ইউনিভারসিটি বদলালো। পল্লব টেলিফোনে থ্রেট দিত ... ভয়ে হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসত ...
...শুভ রহমান আজ সন্ধ্যার পর খেতে যেতে বলল গুলশানের লা ভিঞ্চিতে...বাবার শরীর খারাপ বলে এড়িয়ে গেল ... বাড়ি ফেরার পথে খুব খারাপ লাগছিল। এভাবে কত দিন? বেশি অ্যাভোয়েড করলে শুভ রহমান প্রতিশোধ নেবে। অফিসে মিমি হক- এর প্রতি ঝুঁকবে ... বসের সেক্রেটারি মিমি হক উঠতি মডেলদের মতো সুন্দরী আর লাস্যময়ী ...বাঙালি মনেই হয় না ... সারাদিন প্রজাপতির মতো উড়ছে। অফিসের বুড়ো বস থেকে শুরু করে কানাডিয় সুপারভাইজার মিসেস ফিওনা পর্যন্ত ওর ফ্যান। হ্যাঁ, শুভ রহমানকে এড়িয়ে গেলে সে প্রতিশোধ নেবে। মিমি হক-এর সঙ্গে কি কি ফান করল সে সব জানিয়ে দেবে ইঙ্গিতে...তখন অফিসটা বিশাক্ত ঠেকবে ...
অন্ধকারে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে লীনা।
দিন যায়।
সাজানো গোছানো ছিমছাম নির্জন ফ্ল্যাটে লীনা আর বাবা। কাজের লোক নেই। বাবা কাজের লোকের হাতে খেতে পারে না। মা বেঁচে থাকতে নিজের হাতে রান্না করত । এখন লীনা করে। মায়ের কাছে রান্না শিখেছে লীনা। কেবল ট্র্যাডিশনাল রান্নাই না- নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্টও করে লীনা। বাবার এতে খুব উৎসাহ। বাবা নিজেও রান্না করে। লীনা অফিসে থাকলে টিভি দেখার ফাঁকে ফ্রিজ থেকে খাবার বার করে গরম করে নেয় বাবা।
এক শুক্রবার বিকেলে কর্নেল আঙ্কেল আর মাজেদা আন্টি এলেন।
বুড়ো-বুড়ি দুজনকেই ভারি হাসিখুশি দেখালো। বিয়ের নতুন প্রস্তাব নিয়ে এলেন। ছেলে ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। নাম জিসান রহমান। একটা সুইডিশ ফার্মে আছে। আইসল্যান্ডের কোথায় যেন বাধের কাজ করছে। গতকালই দেশে এসেছে। মাস খানেক থাকবে। বিয়ে করে বউ নিয়ে যাবে। সবাই ড্রইংরুমে বসেছিল। এক ফাঁকে মাজেদা আন্টি লীনাকে ঘরে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, এখন যুগ পালটে গেছে। জিসানের টেলিফোন নাম্বার রাখ। তোরা কথা বলে নিস। তোর কথা জিসান কে বলেছি। ও তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।
লীনা চুপ করে থাকে।
মাজেদা আন্টি বললেন, তুই হলি আমার মেয়ের মতো। আমি কি যার-তার হাতে তোকে তুলে দিতে পারি। ছেলেটা খুব ভালো। অনেক টাকা বেতন পায়। মালয়েশিয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছে। ওখানেই নাকি সেটল করবে। আমার বান্ধবীর ছেলে। তোর মা চিনত সাবেরাকে। এই দ্যাখ জিশানের ছবি। বলে মোবাইলে তোলা ঝকঝকে ছবি দেখালেন।
লীনা এক পলক কেঁপে ওঠে।
চশমা পরা ফর্সা মুখ। ভারি মিষ্টি চেহারা। লম্বা। কালো টি-শার্ট পরে আছে। স্বাস্থ ভালো। লীল না দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এর সঙ্গে তো আমার বিয়ে হবে না। আমার বিয়ে হলে বাবা একা হয়ে যাবে। বেশি দিন বাঁচবে না বাবা। না, আমি বাবাকে জেনেশুনে মেরে ফেলতে পারি না।
মাজেদা আন্টি বললেন, তোর একটা ছবি দে।
কেন? একবার না দিলাম। লীনা ফোঁস করে ওঠে।
মাজেদা আন্টিও ঝাঁঝ দেখিয়ে বললেন, আগের ছবিটা ওরা ফেরত দেয়নি। জিসান দেখতে চেয়েছে। দে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও লীনা দিল।
রাতেই জিসানকে লীনাই ফোন করে। যেভাবেই হোক বিয়েটা ভাঙতে হবে। বাবাকে ছেড়ে বিদেশ যেতে পারবে না।
ওপ্রান্তে কেউ বলে, হ্যালো। কন্ঠস্বর ভারি মিস্টি। কবিতা আবৃত্তি করলে বেশ হত...
লীনা বলে, আমি লীনা।
আমি ...
জানি। আপনি জিসান রহমান। আজ মাজেদা আন্টি এসেছিলেন। লীনা শীতল কন্ঠে বলে।
ওহ্ । আপনি কেমন আছেন?
আমি ভালো আছি। যতটা সংযত হয়ে বলা যায় তত সংযত হয়ে লীনা বলল, শোনেন, আমি এই বিয়েতে রাজি নই।
একটু পর ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, ওহ্ । ওকে।
প্লিজ কথটা যেন আঙ্কেল-আন্টির কানে না যায়। আপনি বলবেন পাত্রী আমার পছন্দ হয়নি, গায়ের রং কালো। ওকে?
ওপাশে নীরবতা।
কি হল উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
ওকে। বলে ফোন অফ করে দেয়।
লীনা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তবে কান্না পায়। এভাবে ফোন বন্ধ করে দিল? দিতে পারল? লোকটা একবারও জিজ্ঞেস করল না কেন আমি বিয়েতে রাজী নই। স্টুপিড লোক। লীনা শ্বাস টানে। ঘরে অন্ধকার। বাতাসে চুরুটের গন্ধ। বাবা বারান্দায় বসে চুরুট খাচ্ছে। ভালো মানুষটা এই একটাই বদ অভ্যাস। আর কোনও দোষক্রটি নেই। মা বাবাকে নিয়ে ভীষণ গর্ব করত। বাবা অত্যন্ত সৎ ও চরিত্রবান। কখনও মাকে অপমান করেনি। যে অপমানটা অনেক নারীকে স্বামীর কাছ থেকে পেতে হয়। জীবনভর লুকিয়ে রাখে।
পরের দিনটা শুরু হল অন্য দিনের মতোই। ভোরে উঠে রুটি বানাল। টমাটো কুচি কুচি করে কেটে তাতে পেঁয়াজ কুচি মিশিয়ে ডিম ভাজল। তারপর গোছল সেরে বাবাকে নাশতার টেবিলে বসিয়ে একটা রুটি মধু মেখে সেটা গিলে পানি খেয়ে একটা বক্সে দুটি রুটি আর খানিকটা ডিম ভাজি ভরে বেরুতে বেরুতে সাতটা। ড্রাইভার ছুটি নিয়েছে। সেগুনবাগিচা মোড়ে সিএনজি পেলে গেল। উলটো দিক থেকে হর্ণ দিতে দিতে একটা লাল রঙের বাস আসছিল। সে রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল। এই সুন্দর সকালেও শরীরে রাগ টের পেল। কেমন মানুষ ওই জিসান রহমান? ফোন অফ করে দিল? একটা মেয়ের সঙ্হে কথা বলতে চানে না। ভাগ্যিস ওই ধেন্দা লোকটার সঙ্গে ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। কাজেই ভোঁতা তো হবেই। ভেবেছে আমার কোথাও এ্যাফেয়ার আছে। গাধা আর কাকে বলে।
আজও অফিসে শুভ রহমান লাঞ্চের অফার দিল। লীনা এড়িয়ে যায়। লীনা বিষন্ন বোধ করে। কিন্তু এভাবে কত দিন? জিসান রহমানকেও ফিরিয়ে দিতে হল। হঠাৎ করে বাবার যদি কিছু হয়ে যায়। তখন? পৃথিবীতে একা হয়ে যাব না? লীনা শিউরে ওঠে। চোখের সামনে দিয়ে লাঞ্চ খাওয়াতে মিমি হক কে রুমে ডেকে নিয়ে গেল শুভ রহমান ।
লীনার বিষন্নতা গভীর হয়ে ওঠে।
অফিস ছুটির পর মিমি হক কে শুভ রহমান-এর গাড়িতে উঠতে দেখল । লীনা দিকে চেয়ে মিটমিট করে হাসছিল শুভ রহমান ।
তার মানে এ পথটাও বন্ধ হয়ে গেল!
লীনা একটা সি এন জি ডেকে উঠে পড়ল। এখুনি একবার মগবাজার যেতে হবে। রুনা ভাবীর সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। সিএনজিতে উঠে বাবাকে ফোন করল লীনা। বাবা আমি মগবাজার হয়ে আসি। আমার একটু দেরি হবে।
ঠিক আছে। বাবা বলে। মায়ের মৃত্যুর পর রিয়াজ ভাইয়ের ব্যাপারে বাবা নরম হয়েছেন । রিয়াজ ভাইয়ের একটাই ছেলে । মিশাল। বাবা মিশালকে মিস করে। বাবারও ইচ্ছে রিয়াজ বউ নিয়ে এসে থাকুক। এখন সেটা জরুরি হয়ে পড়েছে। নইলে লীনা মুক্তি পাবে না।
মগবাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে সাতটা বাজল।
মিশালকে অনেক দিন দেখে না। ক্লাস ফোরে পড়ে মিশাল। ওর জন্য গলির মুখে নেমে একটা কনফেশনারিতে ঢুকে কেক আর চিপস কিনল। রিয়াজ ভাই বাসায় ছিল না। মিশাল দরজা খুলল। লীনা ওকে জড়িয়ে ধরে গালে চপাস চপাস করে চুমু খেল। মিশাল শরীর মুচরিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। কেক আর চিপস পেয়ে খুশি। ফুপ্পিকে দেখেও খুশি।
তোর মা কই রে মিশাল? লীনা জিজ্ঞেস করে।
রান্না ঘরে।
লীনা রান্নাঘরে যায়। রুনা ভাবী কি ভাজছিল কড়াইয়ে। লীনাকে দেখে বলল, ওমাঃ তুমি? আমি ভাবলাম শম্পা ভাবী।
লীনা ইঙ্গিতে বলল, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
চুলার আঁচ কমিয়ে শোবার ঘরে এল রুনা ভাবী। লীনা পিছন পিছন আসে। বিছানার ওপর বসে রুনা ভাবী বলল, বল, কি বলবে? মুখচোখ কেমন গম্ভীর।
লীনা বলল, ভাবী, মায়ের সঙ্গে তোমার যা হয়েছে হয়েছে, বাবার সঙ্গে তো তোমার কিছু হয়নি।
আঁচলে কপাল মুছে রুনা ভাবী বলল, আমার তো তোমার বাবার ওপর রাগ নেই। উনি তো আর আমার জন্য আর স্ত্রীর বিপক্ষে যাবেন না।
লীনা কথাটা বলেই ফেলল-আমাদের সঙ্গে এসে এখন তোমরা থাকতে পার না?
আমার তো আপত্তি নেই কিন্তু -
কিন্তু কি ? লীনা বুক ঢিপ ঢিপ করছে।
সমস্যা অন্যখানে।
অন্যখানে মানে ?
তোমার ভাই অনেক দিন হল ইতালি যাওয়ার চেস্টা করছে। ওখান থেকে ওর এক বন্ধু হেল্প করছে। তুমি পারভেজ ভাইকে চেন না ?
হ্যাঁ।
সে। গত পরশু আমরা ভিসা পেয়ে গেছি। নেক্সট উইকে ফ্লাইট।
ওহ্ । লীনার মাথা টলে উঠল।
ফেরার পথে সিএনজিতে বসে ডিজেলের গন্ধে বমি পেল লীনার।
বাড়ি ফিরল অবশ বোধ নিয়ে। বাবার সামনে অবশ্য স্বাভাবিক রইল। রিয়াজ ভাইরা ইতালি চলে যাচ্ছে -এই কথাটা বাবাকে কি বলব? না থাক। রিয়াজ ভাই নিশ্চয়ই যাওয়ার আগে আসবে একবার। লীনা ঘরে ঢুকে বাথরুমে ঢুকল। নগ্ন হয়ে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে রইল অনেক ক্ষন। কান্না পাচ্ছিল ভীষণ। রিয়াজ ভাইয়ারা ইতালি চলে যাবে । মিশালকে অনেক দিন দেখবে না। এই দুঃখ। কাল থেকে অফিসে নতুন টর্চার। শুভ রহমান আর মিমি হক -এর ঘনিষ্ট দৃশ্য বারবার ফিরে আসছিল। হয়তো ওরা এখন একসঙ্গে নেই-তারপরও। শুভ রহমানকে অল্প হলেও ভালোবেসেছিল লীনা। কেবল গ্রহন করতে পারেনি। মিমি হক কে ঈর্ষা করে লীনা।
রান্না শেষ করতে করতে দশটা বাজল। বাবাকে খেতে দিয়ে ঘরে আসল লীনা । খিদে নেই। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল ...তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়ল। ... ঘুম ভাঙল অনেক রাতে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে পরে থাকে বিছানায় । চোখ মেলল আবছা অন্ধকারে। একটা স্বপ্ন দেখছিল। মাথার ভিতরে তার রেষ কাটেনি ... যেন একটা ছায়া ছায়া বিকেল ... সিঁড়ি.... হ্রদ। রিয়াজ ভাই দাঁড়িয়ে ... মাজেদা আন্টি নৌকায়। নৌকা ভেসে ভেসে দূরে সরে যাচ্ছে । মিশাল চিৎকার করে কী যেন বলল। রুনা ভাবী বলল: এখন আর বৃষ্টি পড়বে না, চল যাই । রাস্তা থই থই পানিতে ভাসছে । যেন বন্যা হয়েছে ... বাবা বলল, চল হাঁটি। উল্টো দিক থেকে বাস এল আঁধার আঁধার হর্ণ দিল এই সরে যাও সরে যাও । কর্নেল আঙ্কেল বললেন।
ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল।
ফোন বাজছে। বালিশের কাছে নকিয়াটা। জিসান। আশ্চর্য! অনেক রাত তো নয়, মোটে এগারোটা বাজে ... রূঢ় কন্ঠে বলল, আপনার তো ফোন করার কথা ছিল না।
দুঃখিত।
নীরবতা।
লীনা বলে, মাজেদা আন্টির সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছিল?
হ্যাঁ। আমি আজ আন্টির বাড়ি গিয়েছিলাম।
লীনা চুপ করে থাকে। জিসান বলে, আপনি আমার কাছে একটা কিছু লুকাচ্ছেন। যদিও আমার অধিকার নেই তারপরও বলি সত্যি কথাটা কি বলা যাবে?
আমি কিছু একটা লুকাচ্ছি? আপনার একথা আপনার মনে হল কেন?
আপনার ছবি দেখে মনে হল আপনি ...
আপনি ... আপনি কি আমার ছবি দেখেছেন?
হ্যাঁ।
ওহ্ ।
জিসান বলে, আপনার ছবি দেখে আপনাকে অন্যরকম মনে হল ... মানে আপনার চোখ ... আমার মনে হল আপনার সঙ্গে আমার একবার কথা বলা দরকার।
ঠিক তখনই জানালায় বাতাস এসে লীনার দুঃখী কপালে চুমু খায়। এই বহুতলে নীচ থেকে গাড়ির হর্ণ ও রাত্রির কিছু কোলাহল ভেসে আসে ...চুরুটের গন্ধ পায় ...বাবা কি বারান্দায় বসেছে ...বসে বসে মায়ের কথা ভাবছে? অনেক রাত্রি অবধি বারান্দায় বসে থাকে বাবা ...তখন মাথার ওপরের দূরবর্তী আকাশের নক্ষত্রগুলি মিটমিট করে জ্বলে ... পৃথিবীর এক নিসঙ্গ মানুষকে দেখে ...
লীনা বলল, সত্যি কথাটা আপনাকে বলা যাবে।
বলুন, তাহলে ।
কিন্তু প্লিজ মাজেদা আন্টি কে আবার বলবেন না যেন।
আচ্ছা বলব না। কথা দিলাম।
ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে লীনা বলে, দেখেন আমার মা নেই। আমার এক ভাই আছে, সে ভাই আবার আলাদা থাকে। এ মাসেই ফ্যামেলি নিয়ে বিদেশ চলে যাওয়ার কথা। এই অবস্থায় আমার বিয়ে করা সম্ভব না। বাবা একা হয়ে যাবে।
জিসান বলল, বুঝেছি। আমি আপনার সিদ্ধান্ত কে শ্রদ্ধা করি। আমি আর আপনাকে ফোন করব না।
লীনা যেন স্পস্ট দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়।
লীনা এবার ওর শেষ কার্ডটা ছুড়ে দিল। বলল, কিন্তু আপনি যদি চান এ বিয়ে হতে পারে। তবে -
তবে ?
আমার কিছু শর্ত আছে। আপনাকে সে শর্ত মানতে হবে।
জিসান বলল, আমি আপনার সব শর্ত মেনে নেব।
সবটা না শুনেই? এত দুঃখেও হাসি পায় লীনার।
হ্যাঁ।
রাত্রির বাতাসের চুমুতে লীনা ভিজে যায়। সত্যি!
সত্যি। এবার বলুন কি আপনার শর্ত ?
এক নম্বর : আপনার বিদেশ যাওয়া চলবে না। আপনাকে দেশে থাকতে হবে। এখানে চাকরি করতে হবে।
রাজি। আর?
আর ... আর আমার পাস্ট নিয়ে কখনও প্রশ্ন করবেন না। কথাটা বলার সময় লীনার কন্ঠস্বর কেমন কঠোর হয়ে ওঠে এবং মনের গভীরে
পল্লবের মুখটা একবার ফ্ল্যাশ করে ওঠে। পল্লব এখন কোথায়?
আচ্ছা করব না । জিসান বলল। আর?
আর ...আর ...আমার বাবা অসুস্থ। বাবাকে ছেড়ে আমি অন্য কোথাও যাব না। বাবাও মায়ের স্মৃতি ফেলে কোথাও যাবে না। আপানাকে ... আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে।
আমি রাজি। জিসান বলল।
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×