জারদাদ এর চোখ ধূসর আকাশে। হেলিকপ্টারটা খুঁজছে। গত সপ্তাহে একটি মার্কিন গানশিপ হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে দুশমনরা বাগরান জেলার ২৭ জন নিরীহ আফগান নারীপুরুষ হত্যা করেছে । সে কথা মনে পড়তেই জারদাদ-এর তাগড়া শরীরে রক্তস্রোত চঞ্চল হয়ে ওঠে। রাইফেলের ঠান্ডা ট্রিগারে ডান হাতের তর্জনী রেখে সে ভাবল ... যদি গুলি করে ঐ হেলিকপ্টার ধ্বংস করতে পারে তো ওস্তাদ দৌলত গুল খুশি হবেন ...
জারদাদ রাইফেলের টেলিস্কোপিক সাইটে চোখ রাখে।
ক্রশ চিহ্নের মাঝখানে আবছা হেলিকপ্টারটি স্থির। ফুয়েল ট্যাঙ্ক বরাবর গুলি লাগাতে পারলে হেলিকপ্টারে আগুন ধরে যাবার সম্ভাবনা আছে। তবে এত দূর থেকে ফুয়েল ট্যাঙ্ক সই করে গুলি করা মুশকিল। রাইফেলের শর্ট মিসই হলে সর্বনাশ। দশ মিনিটের মধ্যেই ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু হবে। দুশমনদের কমিউনিকেশন সিস্টেম বিদ্যুতের গতিকেও হার মানায়। একটা স্ট্রিঞ্জার রকেট লাঞ্চার হলে হেলিকপ্টার গানশিপটাকে ধ্বংস করা যেত। স্ট্রিঞ্জার রকেট লাঞ্চার ফারিদুন-এর কাছে আছে। কেবলমাত্র সেমি অটোমেটিক স্নাইপার রাইফেল সম্বল করে কাল থেকে পাহাড়ের এ দিকটায় নজর রাখছে জারদাদ।
হেলিকপ্টার ক্রশ চিহ্ন থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত টেলিস্কোপিক সাইট থেকে চোখ সরিয়ে নিল জারদাদ। ক্রমশ দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে হেলিকপ্টার । হয়তো রেকি করতে এসেছিল। এখন ফিরে যাচ্ছে। ক’দিন ধরে শোনা যাচ্ছে-মার্কিন ট্যাঙ্ক বহর উপত্যকায় প্রবেশ করবে। জারদাদকে হতাশা গ্রাস করে ... সে আকাশের দিকে তাকায়। ধূসর আকাশে হেলিকপ্টারের চিহ্ন নেই ... এলোমেলো বাতাস বইছে। সে অস্থির বাতাস পিছনের পাহাড়ে আছড়ে পড়ছে। জারদাদ ক্রল করে সতর্ক ভঙ্গিতে পিছিয়ে যেতে থাকে। বাতাসের ঝাপটায় ওর মাথায় পাকুল (গোল উলের টুপি) পড়ে যায় , দ্রুত ওঠা পরে নেয়। জারদাদ-এর পরনে ঘিয়ে রঙের সালোয়ার-কামিজ। তাতে তুষারের কণা লেপটে আছে ...
গতকাল থেকে উপত্যকার ওপর লক্ষ রাখছে। ওস্তাদের কাছে রিপোর্ট করার সময় হয়েছে।
পিছনে একটি গুহামুখ। গুহামুখের সামনে ছড়ানো ছিটানো বড় বড় পাথর। তারপরই রুক্ষ খাড়ি, নীচে উপত্যকা। উপত্যকায় হেলমন্দ নদীটি বইছে। নদীর পাড়ে পাইন গাছ। গম ক্ষেত। ধোঁওয়া। কৃষকের ঘরবাড়ি। ধূ ধূ প্রান্তরে মিহিন বরফের চাদর। তাতে শেষ বেলার হলদে ম্লান আলো প্রতিফলিত।কুয়াশার ঘের থাকায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে না । শক্র আক্রান্ত দেশটির মতোই বিষন্ন।
গুহার মুখে যেতেই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ফারিদুন। ছেলেটি জারদাদ-এর বয়েসি। পরনে সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ। মাথায় খয়েরি রঙের পাকুল । ফরসা মুখে লালচে দাড়ি । ফারিদুন-এর হাতে স্ট্রিঞ্জার রকেট লাঞ্চার থাকার কথা। নেই। কি ব্যাপার? জারদাদ বিস্মিত হয়। সে পশতু ভাষায় জিজ্ঞেস করল, এ কি! তোমার হাতে রকেট লাঞ্চার কোথায় ?
ফারিদুন বলল, আমি রকেট লাঞ্চার জমা দিয়েছি।
জমা দিয়েছ মানে?
তোমারও রাইফেলও জমা দিতে হবে জারদাদ।
চমকে ওঠে জারদাদ। আমার রাইফেলও জমা দিতে হবে? কেন?
ওস্তাদের হুকুম।
ওস্তাদ মানে দৌলত গুল । জারদাদ-এর ফরসা গোল মুখটা প্রগাঢ় বিস্ময়ের চিহ্ণ ফুটে উঠল।
ফারিদুন বলল, এসো আমার সঙ্গে । বলছি। বলে ঘুরে দাঁড়ায় সে। তার পর গুহার দিকে হাঁটতে থাকে।
ফারিদুনের হাঁটার ভঙ্গিটি ভারি বিষন্ন। ফারিদুন বাড়ি ছিল হেলমন্দ প্রদেশের বাগরান জেলায় । বছর দুয়েক হল ইঙ্গমার্কিন বিমান হামলায় ওর পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে। এই ছোট্ট দলটির কমবেশি সবার ইতিহাসই এমন মর্মান্তিক, এমন রক্তাক্ত। জারদাদ-এর জন্ম হেলমন্দ প্রদেশের নাদ -এ- আলী জেলায়। পাঁচ বছর আগে একটি মার্কিন এ এইচ সিক্স ফোর-এ অ্যাপাচে হেলিকপ্টার থেকে দুশমনরা গুলি চালায় ... ওর পরিবারের ১২ জন নিহত হয়। জারদাদ অচেতন অবস্থায় বাড়ির উঠানের একটি অগভীর কুয়োয় পড়ে ছিল ... দৌলত গুল তাকে উদ্ধার করেছেন। ওস্তাদ দৌলত গুল ক্ষুদ্র একটি দলের নেতা। আফগানিস্তান জুড়ে বিভিন্ন দল-উপদল ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুদ্ধ করছে। তবে দলগুলি বিচ্ছিন্ন হলেও দলগুলির পিছনে তালিবান এবং আল-কায়েদার প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। ... ১৮ বছরের জারদাদ- এর কাঁধে গুলি লেগেছিল; দৌলত গুল তার চিকিৎসা করিয়েছেন, সুস্থ হলে ট্রেনিং দিয়েছেন, হাতে তুলে দিয়েছেন সোভিয়েত নির্মিত ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী আর পি জি সেভেন লাঞ্চার আর গ্রেনেড। দৌলত গুল কে ওস্তাদ বলে সম্মান করে জারদাদ। ওস্তাদ দৌলত গুল-এর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞ সে। জীবন বাজী রেখে দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে জারদাদ । ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মাসে প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে দুশমন কাফেররা আফগানিস্তান আক্রমন করে। জন্মভূমির মাটি থেকে কাফের দুশমনদের উৎখাত করার জন্য গভীর শপথ নিয়েছে জারদাদ। তবে মোনাফেক কারজাই সরকারের সঙ্গে অনেকে তালেবান নেতা হাত মিলিয়েছে। মোনাফেক কারজাই সরকার ‘তাকম-ই-সোল’ (মীমাংসা এবং ক্ষমা) ঘোষনা করেছে। বাগরান প্রদেশের তালিবান নেতা রাইস আল বাগরানি নাকি সরকার ঘোষিত ‘তাকম-ই-সোল’ এর সুযোগ নেওয়ার কথা ভাবছেন।...এসব কারণে জারদাদ হতাশাও বোধ করে।
আফগানিস্তানের মানচিত্রে হেলমন্দ প্রদেশের অবস্থান
গুহামুখটি বেশ বড়। ভিতরে প্রকান্ড সুড়ঙ্গ এঁকে বেঁকে চলে গেছে গভীরে । সাবধানে হাঁটে ওরা। পায়ের নীচে ছড়ানো-চিটানো পাথর । আর ময়লা পানি। এক পাশের পাহাড়ের দেওয়াল ভিজে আছে। অনেকটা হাঁটার পর পায়ের তলা শুকনো ঠেকল। দু’পাশের পাথুরে দেয়ালে মশাল জ্বলে আছে। দু’পাশে বেশ কয়েকটি বড় বড় কুঠুরি। আশির দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনে সময় গোপনে এসব কুঠুরি তৈরি করা হয়েছিল। সিআইএ এজেন্টরা মুজাহিদিনদের আধুনিক নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের কলাকৌশল শেখাত । ... আর এখন? মার্কিনিদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে মুজাহিদিনদের পরের প্রজন্ম।
রাজানীতির গতিপথ এমনই বিচিত্র।
একটা কুঠরীতে ইলেকট্রনিক প্যানেল। প্যানেলের সামনে রেডিও অপারেটর আশফান্দ বসে আছে। অল্প বয়েসি ছেলে। কুঠুরীর পাথরের দেয়ালে মশাল জ্বলেছিল। দেওয়ালে রূপার ফ্রেমে বাধানো আজলান পীরের ছবি। হাঁটতে হাঁটতে মুখ ফিরিয়ে এক ঝলক ছবিটা দেখতে পেল জারদাদ। ... আজলান পীর ওস্তাদ দৌলত গুল-এর শ্বশুর এবং মুর্শিদ। ওস্তাদ সব সময় আজলান পীরের ছবি সঙ্গে রাখেন। এই গোপন আস্তানার টেলি কমিউনিকেশন কক্ষেও একটি ছবি রেখেছেন। আজলান পীরের আসল নাম আজলান বাবরাক বাহরাওয়ার। অবশ্য হেলমন্দ প্রদেশে ইনি আজলান পীর নামে পরিচিত। আজলান পীরের আস্তানা মুসা কালা জেলায় । তবে সে আস্তানা যে কোথায় আছে তা কেউই নাকি জানে না। জন্মের পর থেকে আজলান পীরের নাম শুনলেও কখনও পীরকে দেখেনি জারদাদ। এ বিষয়ে ওস্তাদ দৌলত গুল কখনও মুখ খুলেন নি । জারদাদ শুনেছে পীর ছাহেব নাকি অন্ধ আর ওস্তাদ দৌলত গুল পীর সাহেবের অন্ধ ভক্ত। বহুত রূহানি পীর। তরুণ বয়েসে আল্লাহর প্রেমে পড়েন ... আল্লাহর সন্ধানে আফগান মুলুক চষে বেড়াতেন ... একবার নাকি হেলমন্দ নদী পায়ে হেঁটে পাড় হয়েছিলেন, পায়ের পাতাও নাকি ভিজেনি -সে তাজ্জব ঘটনা পীরের ২৫ বছর বয়সে ঘটেছিল। সফেদ নূরে ভরে উঠেছিল হেলমন্দ উপত্যকা। সেই নূরের জেল্লায় অন্ধ হয়ে যান আজলান পীর। ... আল্লাহ দেখা দিয়ে চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিলেন। অচেতন হয়ে নদীর পাড়ে পড়ে ছিলেন আজলান পীর। এক পশতুন রূপবতী তরুণি তাকে উদ্ধার করে। সেবা করে। সেই তরুণির নাম আনোশা। আনোশাকে বিবাহ করেছিলেন আজলান পীর । এদের প্রথমা কন্যার নাম আফসুন। ইনিই ওস্তাদ দৌলত গুল এর স্ত্রী ...
বাঁ পাশে একটি বড় কুঠুরিতে প্রবেশ করে ফারিদুন । প্রবেশ মুখটি বেশ বড়। মেঝেতে অস্ত্রের স্তূপ। ডি এস এইচ কে মেশিন গান; এ কে ফর্টিসেভেন; ব্রিটিশ লি এনফিল্ড রাইফেল; সোভিয়েত নির্মিত এসভিডি -ড্রাগুনভ স্নাইপার রাইফেল; স্ট্রিঞ্জার রকেট লাঞ্চার; আর পি কে মেশিন গান; চাইনিজ সোভিয়েত ক্লোন অ্যাসাল্ট রাইফেল ... এগুলি ইরান থেকে আসে। কি ব্যাপার? জারদাদ বিস্মিত যায়।
হতবিহ্বল জারদাদ-এর হাত থেকে স্নাইপার রাইফেলটি নিল ফারিদুন । তারপর সেটি মেঝেতে রেখে সিধে হয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, আজলান পীর নতুন ফতোয়া দিয়েছেন ।
কে?
আজলান পীর।
ওহ্ । সহসা জারদাদ-এর আরষ্ট হয়ে ওঠা শরীরটি শিথিল হয়ে যায়। প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, কি ফতোয়া দিয়েছেন আজলান পীর?
ফারিদুন জেব থেকে ভাঁজ করা শুকনো তন্দুরী বার করে। তারই খানিক ছিড়ে মুখে ফেলে চিবাতে থাকে। যেন জারদাদ-এর প্রশ্নটি তার কানে যায়নি। জারদাদ অস্থির বোধ করে। মাঝে-মাঝে ফারিদুন এমন অস্বাভাবিক আচরন করে। নেশার অভ্যাস আছে ফারিদুনের । সে শুনেছে বাগরানে ফারিদুন -এর পরিবার পপি চাষ করত। মার্কিন বিমান হামলার সময় কি সব সাদা পাউডার জিভে ঠেকায় ফারিদুন। ওর ভয়ার্ত চোখমুখ নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে আতঙ্ক কাটায় ...
আজলান অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, কি ফতোয়া দিয়েছেন আজলান পীর?
কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাফেরদের অস্ত্র ব্যবহার করা জায়েজ না। ফারিদুন গম্ভীর কন্ঠে বলল।
তা হলে? জারদাদ কে কেমন বিচলিত দেখায়।
তাহলে নবীজির আমলে সাহাবিগন কাফেরদের বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধ করেছেন সেভাবে যুদ্ধ করতে হবে।
তার মানে সাইফ (আরবি তলোয়ার) হাতে?
হ্যাঁ।
উট আর ঘোড়ায় চড়ে ?
হ্যাঁ। ফারিদুন কাঁধ ঝাঁকায়। এমন ভাবে ঝাঁকায় যেন সেটিই স্বাভাবিক। তন্দুর রুটিতে কামড় দেয়।
ওহ্ । কিন্তু ... কিন্তু তা কী ভাবে সম্ভব? জারদাদ-এর মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। কিন্তু আজলান পীর যখন ফতোয়া দিয়েছেন তখন মানতেই হবে। তিনি কামেল পীর। তরুণ বয়েসে হেলমন্দ নদীতে হেঁটে পাড় হয়েছিলেন, পায়ের পাতাও নাকি ভিজেনি।
ফারিদুন বলল, চল। ওস্তাদ দৌলত গুল তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
জারদাদ-এর মনে পড়ে গেল- ওস্তাদ দৌলত গুল কে রিপোর্ট করতে হবে। আকাশে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার চক্কর মারছিল । এ এইচ সিক্স ফোর-এ অ্যাপাচে। ওস্তাদ সব লিখে রাখেন, হেডকোয়াটারে রিপোর্ট করেন।
একটা যুদ্ধ চলছে ...
কুঠুরী থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। পাথরের করিডোরের দু’পাশে দেওয়ালে মশাল জ্বলেছিল। ওরা পাশাপাশি হাঁটে। দু’জনের পায়ে বুটজুতা। পাথরের ওপর পায়ের শব্দ ওঠে। সে শব্দ সুড়ঙ্গ পথে বহূদূর ছড়িয়ে যায়। চক দিয়ে দেওয়ালের গায়ে পশতু ভাষায় লেখা: ‘বুশ দজ্জাল’, ‘কারজাই মোনাফেক’ । ... জায়গাটায় সালফারের গন্ধ। সালফারের গন্ধে জারদাদ-এর ঘোর লাগে । ওর কেমন শীত করতে থাকে । কেন যেন মনে হচ্ছে জীবনের শেষ ক্ষণে পৌঁছে গেছে সে । হেলমন্দ উপত্যকায় মার্কিন ট্যাঙ্ক বহর প্রবেশ করবে। তলোয়ার উঁচিয়ে ওদের ঠেকানো যাবে না । আল্লা যখন কপালে মউত রেখেছেন তখন আর কি করা ...আব্বা- আম্মা পরকালে চলে গেছেন। মৃত্যুর পর তাদের সঙ্গে কি আল্লাহ দেখা করিয়ে দেবেন?
ডান পাশে বড় একটা প্রবেশ পথ। ওরা ভিতরে ঢুকল। বেশ বড়সড় কুঠুরী । অমসৃণ হলদে পাথরের দেওয়াল ও মেঝে । বহু উপরে ছাদ। দেওয়ালে মশাল জ্বলে ছিল। কুঠরীতে নানা বয়েসি আফগান দাঁড়িয়ে। তাদের কারও হাতে তলোয়ার, কারও হাতে বর্শা, কারও হাতে দুধারি খঞ্জর।
কুঠুরীর মাঝখানে বড় একটি হলুদ রঙের চৌকো পাথর। তার ওপর বসে আছেন দৌলত গুল । বলিষ্ট গড়নের মধ্য বয়সি পুরুষ। প্রায় ৬ ফুটের মতো লম্বা। ফরসা মুখে ঘন কুচকুচে কালো দাড়ি। মাথায় কালো রঙের উলের পাকুল । সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে আছেন। কামিজের ওপর কালো রঙের চাপান। পায়ে বাদামী রঙের বুট জুতা। যুদ্ধের আগে এহসান আমান মাদ্রাসায় পড়াতেন ওস্তাদ দৌলত গুল । মাদ্রাসাটি লাস্কার গাহ- এ। লাস্কার গাহ হেলমন্দ প্রদেশের রাজধানী । দৌলত গুল-এর আকর্ষন গভীর। তালেবান যোদ্ধারা গভীর সম্মান করে তাঁকে।
দৌলত গুল-এর পাশে বড় পাথরের গায়ে কতগুলি সাইফ বর্শা, কারও হাতে খঞ্জর। ঠেস দিয়ে রাখা।
জারদাদ-এর দিকে তাকালেন দৌলত গুল। তার কাছে যেতে ইশারা করলেন। জারদাদ পা বাড়ায়। তার বুক ঢিপ ঢিপ করে। ওস্তাদের সামনে এলে স্বস্তি বোধ করে না। যদিও গভীর স্নেহ করেন ওস্তাদ। জারদাদ কাছে যেতেই ফিসফিস করে দৌলত গুল বললেন, এত দিন আমরা ভুল করেছি রে জারদাদ। নবীজির আমলে সাহাবিগন যেভাবে যুদ্ধ করেছেন সেভাবে যুদ্ধ করা সহি। তা হলে বিজয় সম্ভব।
জারদাদ মাথা নাড়ে।
আজলান পীর কি আর মিথ্যে বলতে পারেন?
জারদাদ মাথা নাড়ে।
তা হলে? বলে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাফেরদের অস্ত্র ব্যবহার করা জায়েজ না।বলে দৌলত গুল ঝুঁকে একটি তরবারি তুলে নিলেন। তারপর তরবারিটি জারদাদ-এর দিকে বাড়িয়ে বললেন, ধর জারদাদ, এই মুহাদ্দাবাদ (তরবারি) দিয়ে কাফের হত্যা করবি।
তরবারিটি নিতে নিতে কেঁপে উঠল জারদাদ। বাঁকানো ভারী তলোয়ার। পাঁচ ফুটের কম হবে না। বেশ পুরনো। কালচে ধাতব বাঁটটি কারুকাজ করা। তাতে ছোট ছোট ইয়াশম পাথর (জেড স্টোন) বসানো। তরবারিটি হাতে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে জারদাদ।
দৌলত গুল বললেন, আজ কাফের মোনাফেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে ফয়সালা হবে। ফিরিস্তারা আজ আমাদের পাশাপাশি কররে।
জারদাদ শিউড়ে উঠল।
রেডিও অপারেটর আশফান্দ প্রায় ছুটতে ছুটতে কুঠুরিতে ঢুকল। দৌলত গুল-এর কানে কানে কি বলল আশফান্দ। দৌলত গুল-এর ফরসা মুখটি রক্তাভ হয়ে উঠল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, কাফেরদের ট্যাঙ্ক বহর হেলম্দ উপত্যকায় প্রবেশ করেছে।
কুঠুরীতে মৃদু গুঞ্জন ছড়িয়ে যায়।
দৌলত গুল ঝুঁকে একটি মুহাদ্দাবাদ তুলে নিলেন হাতে। তারপর অসিটি শূন্যে ঘুরিয়ে হুঙ্কার দিলেন, আল্লাহু আকবার!
আল্লাহু আকবার!
কুঠুরিটি কেঁপে উঠল ।
দৌলত গুল ধীর দ্রুত পদক্ষেপে কুঠুরি থেকে বেরিয়ে যেতে থাকেন। তরবারি হাতে এক এক করে সবাই তাকে অনুসরণ করে। জারদাদ ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। ভিতরে ভিতরে কম্পন টের পায় সে । হেলিকপ্টারের কথা মনে পড়ে গেল। যাঃ, ওস্তাদকে সে কথা বলা হল না ...
বাঁ পাশে সুড়ঙ। ঢালু আঁকাবাঁকা করিডোরে কিছুদূর হাঁটলে আরেকটি গুহামুখ। দেওয়ালে অনেক গুলি আর পি জি সেভেন লাঞ্চার আর গ্রেনেড। এসব সোভিয়েত নির্মিত portable, shoulder-launched, anti-tank rocket-propelled grenade গুলি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করার জন্য খুবই কার্যকরী । যদিও কাফেরদের ট্যাঙ্ক বহর উপত্যকায় প্রবেশ করেছে ... কিন্তু এসব লাঞ্চার আর গ্রেনেড আর কাজে লাগবে না। জারদাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাফেরদের অস্ত্র ব্যবহার করা জায়েজ না। কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে হবে নবীর আমলের মতো। কিন্তু আজলান পীর এমন ফতোয়া দিলেন কেন? একবার নাকি আজলান পীর হেলমন্দ নদীতে হেঁটে পাড় হয়েছিলেন, পায়ের পাতাও নাকি ভিজেনি। কথা কি সত্য? কারও পক্ষে কি হেঁটে নদী পাড় হওয়া সম্ভব?
না!
আজলান পীর এর নামে এসব মিথ্যে কথা সচেতনভাবে ছড়ানো হয়েছে।
আসন্ন মৃত্যুর আগে জারদাদ যেন বুঝতে পারে এইসব আজলান পীররা তার মাতৃভূমিকে দীর্ঘকাল ধরে মৃত করে রেখেছে। আর মৃতদের দেশে সবই সম্ভব-ভিনদেশি সামরিক শক্তি ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে ...
শেষ শীতের অপরাহ্নের মরাটে আলো ছড়িয়ে আছে। রুক্ষ পাথরের চাতালের ওপর অনেকগুলি উট আর ঘোড়া। কয়েকজন তালেবান যোদ্ধা উটের রশি আর ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে ছিল । এদের প্রত্যেকের হাতেই তলোয়ার, বর্শা আর খঞ্জর । অথচ গতকালও এদের হাতে একে ফর্টি সেভেন ছিল।
দৌলত গুল লাগাম ধরে একটা ঘোড়া পরীক্ষা করে দেখছেন। ঘোড়াটি সাদা রঙের । নধর হৃষ্টপুষ্ট। সন্তুষ্ট হয়ে ঘোড়াটির ওপর ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে চরে বসলেন তিনি । ঘোড়াটি চি হি হি করে ডেকে উঠল। একটি উট গা ঝারা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। ফারিদুন সেই উটের ওপর বসেছে। ফারিদুন-এর হাতে একটা দুধারি আরবি খঞ্জর। বাঁটটা হাতির দাঁতের।
ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটি খয়েরি রঙের ঘোড়ার ওপর সওয়ার হল জারদাদ।
প্রশস্ত প্রস্তরসঙ্কুল পার্বত্য ঢালু হয়ে পাকদন্ডীর পথটি উপত্যকায় নেমে গেছে।
দৌলত গুল সবার আগে তরবারি উঁচিয়ে নধরকান্তি অশ্বের ওপর বসে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছেন। অন্যেরা সারিবদ্ধ হয়ে তাকে অনুসরণ করতে থাকে। কেউবা উটে, কেউবা ঘোড়ায়। অশ্বক্ষুরধ্বনি আওয়াজ শোনা যায়।
নীচে হেলমন্দ উপত্যকায় শোঁশোঁ বাতাস বইছে। উপত্যকার বুক চিরে হেলমন্দ নদীটি বইছে। অবশ্য এই শীতে শীর্ণ হয়ে আছে। নদীর দু’তীরে বিস্তির্ণ গমের ক্ষেত আর পাইন গাছের সারি। ধূ ধূ প্রান্তরে মিহিন বরফের চাদর। তাতে শেষ বেলার হলদে ম্লান আলো প্রতিফলিত। দূরে ধূসর পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ক্ষতবিক্ষত দন্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি। শত চেষ্টা করেও তাঁর চোখ দুটির ক্ষতি করা যায়নি ...
বুদ্ধ একটি অদ্ভূত দৃশ্য দেখছেন:
হেলমন্দ উপত্যকায় পশ্চিম দিক থেকে ইঙ্গ-মার্কিন ট্যাঙ্ক বহর প্রবেশ করেছে। সেই বহরে রয়েছে ইউ এস এম সিক্স জিরো এ থ্রি এবং ব্রিটিশ চ্যালেঞ্জার টু ট্যাঙ্কের ভীতিকর সমাবেশ। সমস্ত প্রতিরোধ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের তোপে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা ... তবুও শেষ বেলার বিষন্ন আলোর ভিতর উট এবং ঘোড়ার পিঠে চরে তলোয়ার উঁিচয়ে আ আ আ করে এক বিচিত্র ধ্বনি তুলে ক্ষুদ্র একটি যোদ্ধার দল নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




