জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে আজিজুর রহমান পরমের স্বাদ পেয়েছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যু এবং একমাত্র প্রবাসী ছেলের কারণে যদিও হৃদয়ে গোপন ব্যথা জমে ছিল বৃদ্ধর । তবে পুত্রবধূর মধুর সান্নিধ্যে সে ব্যথা মাঝেমাঝে মিলিয়ে যেত। তবে পুত্রবধূটিরও বিদেশ চলে যাওয়ার কথা ছিল । কাজেই, আসন্ন বিচ্ছেদ ভাবনায় বিষন্নতায় ছেয়ে যেত আটষট্টি বছরের বৃদ্ধের মন।
অবসর জীবনে ধর্মকর্ম একটা বড় সহায়। প্রার্থনার অথই সায়রে ডুবে থাকতে জানলে হৃদয়ের ব্যথা জুড়োয়। ঝড়বৃষ্টি যাই হোক- আজকাল (এমন কী) ফজরের নামাজও মসজিদে আদায়ের চেষ্টা করেন আজিজুর রহমান । বাড়ির প্রায় কাছেই মসজিদ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ভিতর কিংবা রোদের ভিতরে ছাতা হাতে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা ছোটখাটো গড়নের বৃদ্ধকে মসজিদে যেতে দেখা যায়। মসজিদের ভিতর আতরের গন্ধ মাখা গম্ভীর নিস্তব্দতা। বড় ভালো লাগে বৃদ্ধের। এমন নিবিড় ভাবে এর আগে কখনও মসজিদের ভিতর আতরের গন্ধ মাখা গম্ভীর নিস্তব্দতা উপলব্দি করেননি আজিজুর রহমান । জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে এখন আতরের গন্ধ মাখা গম্ভীর নিস্তব্দতায় আছন্ন বোধ করছেন বৃদ্ধ । তা ছাড়া আজকাল মন দিয়ে ইমাম গাজ্জালির লেখা বইপুস্তক পড়ছেন। যতই পড়ছেন ততই ওই প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে ।
এক শুক্রবারের কথা ।
জুম্মার নামাজ পড়ে এসে খেতে বসেছেন আজিজুর রহমান । রেবা প্রায় প্রতি শুক্রবারই রান্নাবান্না নিয়ে কিছু এক্সপেরিমেন্ট করে । এতে আজিজুর রহমান-এর প্রবল সম্মতি আছে। সকাল বেলায় বৃদ্ধ শ্বশুরের হাতে বাজারের ফর্দ ধরিয়ে দেয় রেবা। আজিজুর রহমান বাজারে যান। বাজার কাছেই, জামে মসজিদের গলিতে। কখনও কখনও তার সঙ্গে বেলিও যায় । ষোল-সতেরো বছরের মেয়েটি এ সংসারে অনেক বছর ধরে আছে। বেশ বিশ্বস্ত । সংসারের কাজকর্ম সব নিপুনভাবে গুছিয়ে রাখে। রান্নাবান্না অবশ্য যা করার রেবাই করে। চমৎকার রান্নার হাত রেবার।
রেবা আজ লেবু ভাত, পনির টিক্কা, ডিম কোফতা, পালং এবং গাজরের স্যুপ রেঁধেছে । আর আপেলের সালাদ। দেশি রান্নাও দূর্দান্ত রাঁধে রেবার । মায়ের কাছে নাকি শিখেছে । বিয়ের পর ছেলের বউয়ের হাতে ধনে মাছ আর সরিষা রূপচাঁদা খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন আজিজুর রহমান ।
তোমার শাশুড়িআম্মাও ধনে মাছ রাঁধত। আর মেথি গোশ্তটাও ভালো রাঁধত মাকসুদা। বলে উদাস হয়ে গিয়েছিলেন আজিজুর রহমান ।
শাশুড়িকে চোখের দেখা দেখেনি রেবা। বিয়ের ঠিক দুবছর আগে মারা যান তিনি । রায়হানের মুখে অজস্রবার শাশুড়ির গুণের কথা শুনেছে রেবা। একমাত্র ছেলে বলেই হয়তো মার বড় ভক্ত রায়হান।
লেবু ভাতে একটা পনির টিক্কা ভেঙে মেখে মুখে দিলেন আজিজুর রহমান। অপূর্ব। রেবার প্রতি বরাবরই গভীর স্নেহ বোধ করেন আজিজুর রহমান । কনে রায়হানই পছন্দ করেছে । বিয়ের আগে সামান্যতম আপত্তি তোলেননি। আজিজুর রহমান কন্যার অভাব বোধ করতেন। একটি কন্যার সান্নিধ্যের জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন । জীবনের শেষ বেলায় মহাকালের অধিশ্বর সে বাসনা পূর্ণ করেছেন। কে জানত জীবনের শেষ বেলায় মহাকালের অধিশ্বর জীবন এভাবে পূর্ণ করে দেবেন । তবে মহাকালের অধিশ্বর অনেক কিছু কেড়েও নিলেন। মাকসুদাকে কেড়ে নিলেন । রায়হানও এখন সঙ্গহীন প্রবাসজীবনে একা একা জীবন কাটাচ্ছে। তবে রেবাকে কয়েক মাসের মধ্যেই নিয়ে যাওয়ার কথা। রেবাও মনে মনে তৈরি।
রেবা শ্বশুরের প্লেটে এক চামচ আচার তুলে দিতে দিতে বলল, আজ রান্না কেমন হয়েছে বাবা?
আজিজুর রহমান হাসলেন। আটষট্টি বছরের সৌম্য বৃদ্ধ। সফেদ দাড়ি ভরা মুখের হাসি বড় মধুর লাগে। বললেন, তোমার হাতের রান্না মা। আমি আর কি বলব? আমার সব কথা ফুরিয়ে গেছে।
রেবা চুপ করে থাকে। ছোট্ট শ্বাস ফেলে। বিয়ের আগে টেনশন ছিল রেবার। শ্বশুরবাড়ি নিয়ে নানান ভয়ভীতি ছিল মনে। স্বাধীন
জীবনের বদলে শ্বশুরবাড়ি তে বন্দি -হয়ে- যাওয়ার মনোকষ্টও ছিল। রায়হানের কে ভালো লাগলেও শ্বশুরবাড়ির অন্যদেরও যে ভালো লাগবে-এমন কোনও কথা নেই। তা ছাড়া রায়হানের তখন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কথা চলছিল। কাজেই বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়েই যত উদ্বেগ ঘুরপাক খাচ্ছিল মনের ভিতর। বিয়ের পর দেখা গেল ফরসা ছোটখাটো গড়নের ধবধবে দাড়িওয়ালা শ্বশুরটির মতো ভালো মানুষ রেবা ওর তেইশ বছরের জীবনে খুব বেশি দেখেনি ।
খাওয়াদাওয়ার পর আজিজুর রহমান ঘর এলেন। জুন মাস। সকালে ঝরঝরে রোদ থাকলেও দুপুরের পর থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। ঘরে আবছা অন্ধকার ছড়ানো। জানালার কাছে একটি পুরনো হাতলওয়ালা চেয়ার। সেখানে বসলেন । এই সময় খানিখ ক্ষণ ইমাম গাজ্জালী পড়েন। তারপর পানের পিক ফেলে ছোট্ট ঘুম দেন। পান জিনিসটা আগে খেতেন না বড় একটা। আজকাল খান। রেবাই মুকিমপুরী জর্দা দিয়ে সাজিয়ে দেয় পান। আজ মনে হয় ভুলে গেছে।
ধীরেসুস্থে চেয়ার থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আজিজুর রহমান ।
তারপর রেবার ঘরের দিকে যেতে থাকেন।
দরজার কাছে থমকে দাঁড়ালেন।
রেবা গুনগুন করে গাইছে:
মন মোর মেঘের সঙ্গী
উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম।
আজিজুর রহমান চমকে উঠলেন। সেই সঙ্গে গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। বছর খানেক হল বিয়ে করেছে রায়হান। বিয়ের মাস তিনেক পর ছেলেটা নিউজিল্যান্ড চলে গেল । তার পর থেকে রেবার সঙ্গে সময় কাটছে। কই, রেবা তো কখনও বলেনি ও গান গাইতে পারে। এটাই আজিজুর রহমান-এর চমকে ওঠার কারণ। রেবা কখনও বলেনি ও গান গাইতে পারে অথচ কী মধুর কন্ঠস্বর মেয়েটির। একেবারে পেশাদারি শিল্পীদের মতো। রেবা কি গান শিখত? রবীন্দ্রসংগীত? বিয়ের পর ছেড়ে দিয়েছে?
অনেকগুলি প্রশ্ন মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন আজিজুর রহমান ।
গানের সুর তখনও ভাসছিল মাথায়। ঘরে মেঘলা অন্ধকার ছড়ানো । বৃদ্ধের মনে হতে লাগাল তার মনটিও যেন মেঘের সঙ্গে কোথায় ভেসে চলেছে। চরাচরে বৃষ্টির অবিরাম রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম ধ্বনি। সে জলময় ধ্বনি আজিজুর রহমান এর করোটিতে বারবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়। রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টির গান যেন বৃষ্টিকে চিনিয়ে দিচ্ছে। তিনি তন্দ্রা টের পেলেন। জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। পানের কথা ভুলে গেছেন।
বিকেলের দিকে মেঘ কেটে আবার ঝরঝরে রোদ উঠল।
আজিজুর রহমান আসরের নামাজ পড়তে গেলেন মসজিদে।
বাড়ি ফেরার পথে তখনও রেবার গাওয়া গানের সুরটি মাথার ভিতরে ক্ষীণ গুঞ্জন তুলছিল।
বিকেলের দিকে আজিজুর রহমান প্রায় দিনই খোলামেলা দক্ষিণমুখি বারান্দায় এসে বসেন। আজ বারান্দাজুড়ে শেষবেলার রোদ থমকে ছিল। রুপালি রঙের গ্রিলে উত্তাল বাতাসে বেগুনি অর্কিড আর বাহারি পাতাদের নয়নাভিরাম দোল । একপাশে একটা দোলনা। রায়হান ওর মায়ের জন্য শখ করে করে দিয়েছিল। দোলনার ঠিক উলটো পাশে বড় একটা অ্যাকুয়ারিয়াম। নীলাভ পানিতে কৃষ্ণবর্ণ মলি আর সোনালি মাছের ঝাঁকের ডুব সাঁতার। অ্যাকুয়ারিয়াম ঠিক ওপরেই কাঠের একটি খাঁচা। খাঁচায় ছোট্ট একটা হলদে ক্যানারি। শক করে কিনেছে রেবা। এসব রেবাই দেখাশোনা করে। বেলি অবশ্য সাহায্য করে।
কোন ফাঁকে চিংড়ি সামোসা করেছে রেবা। এক প্লেট গরমাগরম নিয়ে এল । রেবা জানে এই জিনিসটা শ্বশুরের ভারি পছন্দের । মাসে দু-একবার বানায়। প্লেটটা ছোট্ট টেবিলের ওপর রেখে শ্বশুরের মুখোমুখি বসল রেবা। তারপর কি মনে হতেই সামান্য চেঁচিয়ে ডাকল, বেলি! বেলি!
বেলি ছুটে আসে। রেবা বলল, খাওয়ার ঘরের টেবিলের ওপর আচার আছে । যা নিয়ে আয়।
বেলি মাথা নেড়ে চলে যায়।
আজিজুর রহমান চিংড়ি সামোসায় ছোট্ট কামড় বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি গান শিখতে নাকি মা?
কথাটা শুনে রেবা লজ্জ্বাই পেল। ওর শ্যামলা মুখটি রক্তিম হয়ে উঠল। নীচের গলি থেকে রিক্সার টুংটাং শব্দ এই তিনতলা বারান্দায় উঠে আসে। কান পেতে শুনল রেবা। তারপর নরম সুরে বলল, স্কুলে গান শিখতাম। কলেজে উঠেও বেশ কিছুদিন কনটিনিউ করেছিলাম। এরপর আর করা হয়নি। বাবা হঠাৎ মারা গেলেন ।
ওহ্, আচ্ছা। বলে আজিজুর রহমান মাথা নাড়লেন।
বেলি একটা প্লেটে আচার নিয়ে এল।
আজিজুর রহমান একটা চিংড়ি সামোসায় তুলে নিয়ে আচারের প্লেটের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন, তা এখন একটা গান ধর তো মা। তখন গাইছিলে, বেশ লাগছিল শুনতে।
এ কথায় রেবার লজ্জ্বা আরও খানিকটা গাঢ় হয়ে ওঠে। ওর শ্বশুর মানুষটি ভালো। অমায়িক। তবে অমায়িক হলেও গম্ভীর মানুষ। গম্ভীর বলেই এক ধরনের ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা বোধ করে রেবা। শ্বশুর এমনিতেই কম কথা বলা মানুষ। তা ছাড়া এ বছর হজ করে আসার পর থেকে টিভি তেমন দেখেন না। খবর ছাড়া । ঘরে বসে বই পড়ে সময় কাটান। টিভি দেখার সময় সাউন্ড কমিয়ে রাখতে হয় রেবা কে। এমন মানুষকে গান শোনানো?
শোনাও মা। একটা গান শোনাও ।
রেবা আর কাল বিলম্ব না-করে গান ধরে।
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে
টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি
গান শুনতে শুনতে আজিজুর রহমান অভিভূত হয়ে পড়ে। কি এক ভালো লাগায় মন ছেয়ে যায় তার । সেই অনির্বচনীয় অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না। সেভাবে কখনও রবীন্দ্রনাথের গান মন দিয়ে শোনা হয়নি তার। এক অজ গ্রামে জন্ম । শহরের নিকট এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তারপর দীর্ঘকাল চাকরি করে এখন জীবনের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। আজ যেন এক নতুন আবিস্কার করলেন। একটি নয়-দুটি। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সঙ্গে রেবাকেও যেন আবিস্কার করলেন আজ। পুত্রবধূর শ্যামলা মিষ্টি মুখের দিকে চাইলেন। চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হয়ে গাইছে।
সকাল আমার গেল মিছে বিকেল যে যায় তারি পিছে গো ...
গান শুরু হতেই বেলি বসে পড়েছিল মেঝের ওপর। এখন চায়ের কথা মনে পড়তেই দৌড়ে চা নিয়ে এল । আজিজুর রহমান অন্যমনস্কভাবে চায়ে কাপ তুলে চুমুক দিলেন। গানের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও যেন আবিস্কার করলেন। গানের ভিতরে প্রকৃতি আর ঈশ্বরকে একাকার করে ফেলেছেন কবিগুরু। সেই সঙ্গে নিজেও যেন প্রণতি জানাচ্ছেন। আর ওই ত্রিকালদর্শী কবির এক ভক্ত কতকাল পরে চোখবুজে ধ্যানমগ্ন হয়ে সে গান গাইছে।
গান শেষ হলে ক্যানারি পাখিটি যেন ডেকে উঠল। যেন গানের কথা ও সুর এবং গায়িকার গাওয়ার ঢং তারও পছন্দ হয়েছে। কেবল অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছেরা নির্বাক। গ্রিলে অর্কিডের লতায় দামাল বাতাসের খসখস শব্দ ওঠে। আর শহর বলেই নীচের গলি থেকে সিএনজির কর্কস শব্দ আর ডিজেলের পোড়া গন্ধ সুর ও বাণীর সমস্ত মৌতাত নষ্ট করে দেয় ।
অনুরোধ করার আগেই রেবা গাইতে লাগল-
পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন নেচে ওঠে
আজিজুর রহমান মাথা নাড়লেন। হঠাৎ বুকের ভিতরে খুশি তীব্র ঢেউ টের পেলেন। খুশি আর আনন্দের তীব্র স্রোত। এত খুশি আর আনন্দ কোথা থেকে এল। ভারি অবাক কান্ড। পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন নেচে ওঠে ...এই পঙতির ভিতরে কি ছন্দ আর কি মন্ত্র লুকিয়ে আছে যে শুনলেই খুশি আর আনন্দে ভরে ওঠে মন।
তারপর বৃদ্ধ শ্বশুরকে কত যে গান শোনালো রেবা ...
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে-
আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে ।
আর,
এই কথাটি মনে রেখ ...
সব গান রেবার মনে আছে। আশ্চর্য! একটি গানও ভুলে নি। স্কুলে পড়ার সময় বাবা জন্মদিনে হারমোনিয়াম উপহার দিলেন। ক্লাস সিক্সে সম্ভবত। পাড়ার নিবেদিতাদি এসে গান শেখাতেন। ‘মেঘের কোলে রোদ উঠেছে বাদল গেছে টুটি’ কিংবা ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’ দিয়ে শুরু। তারপর ‘আকাশ ভরা সূর্যতারা’ কিংবা ‘আগুনের পরশমনি’। কলেজের ফাংশানে গান গাইত। একবার একটা পুরস্কারও জুটেছিল। তারপর জীবন কেমন বদলে গেল । বাবা মারা গেল। সংসারে নানা অশান্তি। বড় ভাই (আরমান) আলাদা হয়ে গেল। গান জীবন থেকে কী ভাবে যেন হারিয়ে গেল।
এ শহরে লোডশেডিং হয়। ছাদে ভরা না-হলেও ম্লান জোছনা ছড়িয়ে থাকে । ছাদে টব। টবে নানা ধরনের ফুল গাছ। রেবার ফুলগাছের বড় শখ। রেবা যখন থাকবে না তখন গাছগুলির কে যত্ন নেবে? বেলি? আমি যখন থাকব না তখন বেলি কোথায় থাকবে? দামাল হাওয়ায় ছাদে ফুলে গন্ধ ভাসে। তাতে বৃদ্ধর দীর্ঘনিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। মুখোমুখি চেয়ার বৃদ্ধ ও তার পুত্রবধূ বসে। বেলিও কাছে বসে আছে।
রেবা গায়:
আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে ...
তারপর ...
যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে এই নব ফাল্গুনের দিনে ...
শুনতে শুনতে আজিজুর রহমান-এর ঘোর লাগে। মনে হয় সমস্তটা তিনি স্বপ্নের ভিতরে দেখছেন। নির্বাক ছবির মতো সাদাকালো স্বপ্ন। সময় ফুরিয়ে আসছে। আজকাল ঘনঘন মাকসুদাকে স্বপ্ন দেখছেন । জীবনের আর বুঝি বাকি নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে মহাকালের নিয়ন্তা এ সমস্ত উপচার সাজিয়ে রেখেছেন । ভাবলে পুলকিত আর বিস্মিত হচ্ছেন আজিজুর রহমান।
কয়েক দিন পরের কথা।
সকাল থেকে রেবা বিষন্ন ছিল। গতরাত্রে রায়হানকে স্বপ্ন দেখেছে। সুন্দর একটি পাঞ্জাবি পরে পহেলা বৈশাখে রায়হান ওর বন্ধুদের সঙ্গে টিএসসি তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল । রেবাও চমৎকার একটি ধনেখালি শাড়ি পরে সেজে ঘুরছিল। ভিড়ের মধ্যে রায়হানকে দেখে ভালো লেগে যায় রেবার। রায়হানের এক বন্ধু (শ্যামলদা) রেবার মেজ ভাই (সাজ্জাদ) -এর পরিচিত। কাজেই পরিচয় করতে দেরি হয়নি। রায়হানও রেবার শ্যামলা মিষ্টি মুখের দিকে চেয়ে চমকে উঠেছিল। তারপর রেবা হয়ে উঠল রায়হানের জীবনের ধ্রুবতারা ।
সেই রায়হান এখন কোথাও কোন্ দ্বীপ দেশে পড়ে আছে।
শেষ বিকেলের বারান্দায় ম্লান আলো ছড়িয়ে ছিল।
রেবা গাইল:
কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশকুসুমচয়নে।
সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে।
আজিজুর রহমান-এর বুক দুলে ওঠে। চোখ ভিসে ওঠে। মাকসুদার ভরাট গম্ভীর মুখটি মনে পড়ে গেল। কত বছর আগে এই পৃথিবীতে যেন দেখা হয়েছিল ...কত বছর আগে ... তারপর কান্নাহাসির দোলায় ভেসে-ভেসে সংসার সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। কত ঝড়ঝাপটা বিচ্ছেদ সহেছেন । রায়হান হওয়ার আগে দুটি মেয়ে হয়ে মারা গিয়েছিল। সেই তীব্র দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন । আজিজুর রহমান তখন বিক্ষুব্দ। জীবনের ওপর অবিশ্বাস আর সন্দেহ, অফিসের পলিটিক্স আর নোংড়ামি। শারীরিক অসুস্থ্যতা, টাকা-পয়সার টানাটানি - সব পরম মমতায় মাকসুদা উষ্ণ আঁচলের তলায় ঢেকে রেখেছিল। জগৎ সংসারের আগুনের হলকা গায়ে ফোশকা ফেলতে পারেনি। সেই মাকসুদাই আজ এই মুহূর্তে একটি বিরহের গানে একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠল।
রায়হানকে মনে করে রেবা গাইল:
চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।
অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে।।
ধরায় যখন দাও না ধরা হৃদয় তখন তোমায় ভরা,
এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে।।
তোমায় নিয়ে খেলেছিলেম খেলার ঘরেতে।
খেলার পুতুল ভেঙে গেছে প্রলয় ঝড়েতে।
থাক্ তবে সেই কেবল খেলা, হোক-না এখন প্রাণের মেলা
তারের বীণা ভাঙল, হৃদয়-বীণায় গাহি রে।
আজিজুর রহমান-এর জীবনের শেষ বেলা চমৎকার কাটছে । ত্রিকালদর্শী এক কবির গানের বাণী আর সুরে ক্ষণে ক্ষণে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছেন। অবসর জীবনের নিঃসঙ্গ বোধ ঘুচে গেছে। জীবনের মানে ধরা দিয়েছে যেন। সকল দৃশ্যের অন্তরালে রয়েছে যে পরম মন-তার উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞচিত্তে বার বার সালাম জানাচ্ছেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি এক নির্মল আলোর ভোরে মসজিদ থেকে ফিরে বারান্দায় এসে বসলেন আজিজুর রহমান। আজ ভোর থেকে শরীর খারাপ লাগছিল। ডাক্তার সকালবিকেল হাঁটতে বলেছেন। হাঁটলে ক্লান্ত লাগে। শরৎকাল। নীলাভ আকাশ। মধুর বাতাস। সে মধুর বাতাসে কী সের যেন কানাকানি । রোদের রং সমুদ্রের ফেনার মতো উজ্জ্বল।
রেবা চা নিয়ে এল। দুধ আর চিনি ছাড়া চা। চায়ের কাপ শ্বশুরকে দিয়ে মুখোমুখি বসল রেবা। ওকে কেমন বিষন্ন দেখাচ্ছিল। আঁচল ঠিক করতে করতে ম্লান স্বরে রেবা বলল, আপনার ছেলে কালরাতে ফোন করেছিল। অনেক রাতে হয়ে গিয়েছিল। আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই আপনাকে বলা হয়নি।
ছেলের প্রসঙ্গে বৃদ্ধর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভালো আছে রায়হান?
হ্যাঁ। বলে মাথা নাড়ল রেবা। এ মাসের শেষেই দেশে আসছে।
ওহ!
আপনার ছেলে আমাকে নিতে আসছে। কাগজপত্র ফাইনাল। নভেম্বরের ফাস্ট উইকে আমরা নিউজিল্যান্ড চলে যাচ্ছি।
ওহ্ । হাসলেন বৃদ্ধ।
আশ্বিন মাসের উজ্জ্বল আলো ভরা বারান্দায় কেমন এক ঠান্ডা নিস্তব্দতা জমে ছিল । ক্যানারি পাখিটিও চুপ করে ছিল। একটুকুও ডাকাডাকি করছিল না। অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছেরাও চুপ করে ছিল। কেবল এলোমেলো বাতাসে দোলখাচ্ছি গ্রিলের লতানো পাতারা।
ধীরে সুস্থে চা-টুকু শেষ করলেন বৃদ্ধ। তারপর মুচকি হেসে বললেন, চলে যাচ্ছ। সে তো বুঝলাম। কিন্তু আজ কি গান শোনাবে শুনি ?
রেবা হাসল। বড় ম্লান সে হাসি। তারপর আপনমনে গেয়ে উঠল -
জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন
নয়ন আমার রূপের পুরে সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন
তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার, বাজাই আমি বাঁশি-
গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণের কান্নাহাসি।
এখন সময় হয়েছে কি? সভায় গিয়ে তোমায় দেখি
জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব এ মোর নিবেদন।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১১ দুপুর ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


