somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শোকোলাটল থেকে চকলেট: মজাদার ক্যান্ডির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৬ ই জুন, ২০১১ সকাল ১১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
এই বস্তুটির সঙ্গে কি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার আছে? জানি যে নেই। তবে মজার কথা হল আমাদের কাছে চকলেট যতই পরিচিত খাদ্যপন্য হোক না কে এর ইতিহাস সম্বন্ধে আমরা কিন্ত অজ্ঞ। যে কারণে মার্কিন পুষ্টি বিজ্ঞানী Alexandra Leaf আক্ষেপ করে বলেছেন: I often call chocolate the best-known food that nobody knows anything about.এই জন্যই এই পোস্ট। ভূমিকায় বলে রাখি যে মানবসভ্যতায় চকলেট মধ্য আমেরিকার মায়া-অ্যাজটেক সভ্যতার অবদান হলেও আজ আমরা যে চকলেটের সঙ্গে পরিচিত সেটি কিন্তু ইউরোপীয় কিছু গবেষকের উদ্ভাবন।






মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র। মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিঅরণ্যে কাকাও গাছ জন্মায় । লাতিন ভাষায় এই গাছকে বলা হয় থিওব্রোমা কাকাও। এই কাকাও গাছের কোকো বীজই চকলেটের মূল উপাদান।

আমরা জানি মায়া এবং অ্যাজটেক সভ্যতা উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল মধ্য আমেরিকায়, যে মধ্য আমেরিকায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিঅরণ্যে প্রভূত পরিমানে কাকাও গাছ জন্মায় । মায়া এবং অ্যাজটেকরা কোকো বীজ আগুনে ঝলসিয়ে গুঁড়ো করে তা গরম পানিতে ফেলে তার সঙ্গে মরিচ, মাঠ-বাদাম, মশলা ও ভেষজ উদ্ভিদের শিকড়-পাতা মিশিয়ে যে পানীয় তৈরি করত তার নাম ছিল: ‘শোকোলাটল’ (xocolatl)। অ্যাজটেক ভাষায় যার অর্থ: ‘তেতো পানি।’ যস্মিন দেশে যদাচার। ওই তেতো পানীয় খেয়েই মায়া-অ্যাজটেকরা ধন্য বোধ করত। মায়া-অ্যাজটেক সমাজে শোকোলাটল পানীয়টির ভীষণ কদর ছিল।



থিওব্রোমা কাকাও গাছ। এ গাছের বীজ থেকেই তৈরি হত ‘শোকোলাটল’ । তবে সাধারণ মানুষ কিন্তু শোকোলাটল পান করত না । কেবল অভিজাত এবং যোদ্ধাদের শোকোলাটল পান করার অধিকার ছিল। যাহোক। ‘শোকোলাটল’ শব্দটি স্প্যানিশ ভাষার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় প্রবিষ্ট হয়ে যায়।

মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ সূচিত হয় ষোড়শ শতকে । কলম্বাস কোকো বীজ ইউরোপে পরিচয় করিয়ে দেন বটে তবে প্রখ্যাত স্প্যানিশ বিজেতা হারনান কোরটেসই ইউরোপে কোকো বীজ বিখ্যাত করে তোলেন। কথিত আছে, অ্যাজটেক রাজা মনটেযুম্মা হারনান কোরটেস কে দেবতা ভেবেছিলেন এবং কোরটেসকে ভোজ সভায় শোকোলাটল দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন । হারনান-এর শোকোলাটল পান করে ভালো লাগেনি। শোকোলাটল পান করে হারনান বলেছিলেন, ‘শূকরের পানীয়’!



মধ্য আমেরিকার অ্যাজটেক সা¤্রাজ্য। ধনসম্পদের লোভে ইউরোপীয়রা অ্যাজটেক সা¤্রাজ্যে হানা দিয়ে অ্যাজটেক সা¤্রাজ্য তছনছ করেছিল । তবে, ইউরোপীয় হানাদাররা অ্যাজটেক সংস্কৃতি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি । কেননা, আধুনিক চকলেটের মধ্যে বেঁচে আছে অ্যাজটেকদের শোকোলাটল পানীয়র স্মৃতি!

১৫২৮ খ্রিস্টাব্দ। স্প্যানিশ বিজেতা হারনান কোরটেস জাহাজ ভরতি কোকো বীজ নিয়ে মেক্সিকো থেকে স্পেন ফিরে এলেন । শোকোলাটল নিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করলেন তিনি । শোকোলাটল পানীয় থেকে মরিচ বাদ দিয়ে চিনি ভ্যানিলা এবং সুগন্ধী মেশান এবং রাজা পঞ্চম চার্লসকে তা পরিবেশন করেন। রাজা পঞ্চম চার্লস নাকি নব-উদ্ভাবিত পানীয়টি পান করে অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন। তাতে স্প্যানিশ রাজকীয় দরবারেও রীতিমতো হুল্লোড় পড়ে যায় ... স্পেনের অভিজাত মহলে চকলেট পানীয়টির কদর তরতর করে চূঁড়ায় উঠে যায়। সেই সময় স্প্যানিশ রাজকুমারী মারিয়া থেরেসার সঙ্গে ফরাসি রাজা চতুদর্শ লুই বিয়ের কর্থাবার্তা চলছিল। হবু ফরাসি বরকে স্প্যানিশ রাজকুমারী মারিয়া থেরেসার একটি নকশাদার বাক্সে কোকো বীজ উপহার উপহার পাঠান । তাতে ফরাসি রাজপরিবার চকলেটের স্বাদ পেল ।



চকলেট পানরত ইউরোপীয় নারীপুরুষ। সপ্তদশ শতকের মধ্যে ইউরোপজুড়ে চকলেট পান করা ফ্যাশনে পরিনত হয়। ইউরোপের লোকে বিশ্বাস করত চকলেটে একই সঙ্গে পুষ্টি, ঔষধি ও প্রশান্তিদায়ক গুণ রয়েছে । তবে তরলটি মূল্যবান বলেই কেবল ধনী অভিজাতের শ্রেণি তা পান করে পোষাত । অবশ্য ওই শতকেরই শেষের দিকে ব্যাপক হারে চকলেট উৎপাদন শুরু হয় এবং সেটি সাধারণ ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে। তবে পানীয় হিসেবে- সলিড চকলেট তখন আবিস্কৃত হয়নি।

মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার থেকে ইউরোপে কোকো আমদানী অব্যাহত থাকে। সেই সঙ্গে চকলেট ইউরোপ মাতাতে থাকে। চকলেট পানীয়ের জনপ্রিয়তা সেই তুঙ্গে উঠে গেল, এত বছর পর আজও তার নি¤œমূখি গতি পরিলক্ষিত হয়নি। চকলেট নিয়ে শুরু হয় নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট । চকলেট পানীয়ের সঙ্গে মেশানো হয় মধু ও আখের রস । তাতে স্বাদে বৈচিত্র আসে। জায়গাটা ইউরোপ বলেই দ্রুত বদলে যাচ্ছিল অ্যাজটেকদের পানীয় শোকোলাটল। তারপর উনিশ শতকে সলিড চকলেট আবিস্কৃত হল । ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে একজন ওলন্দাজ (ওলন্দাজ = ডাচ অর্থাৎ হল্যান্ডের অধিবাসী ) ওলন্দাজ রসায়নবিদ তরল কোকে থেকে প্রায় অর্ধেক পরিমান প্রাকৃতিক ফ্যাট (অর্থাৎ কোকো মাখন) অপসারিত করবার প্রক্রিয়া আবিস্কার করেন । স্বল্প পরিমান ফ্যাটের কোকোর সঙ্গে ক্ষারীয় লবন মিশালেন। এতে আগেকার তেতো স্বাদ দূর হল। এটি ‘ডাচ কোকো’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।



ডাচ কোকো। এই কোকো গুঁড়োই আসলে আধুনিক চকলেটের মূল উপাদান। এবং এটি বিশ্বের লাভজনক খাদ্যপন্য। এর চাহিদা দিনদিন বাড়ছেই।

তবে আধুনিক চকলেটের জনক হলেন জোসেফ ফ্রে। ইনি ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ডাচ কোকোর সঙ্গে অপসারিত কোকো মাখন মিশিয়ে প্রথম চকলেট পেস্ট তৈরি করেন । যা দেখতে নীচের ছবি মতো ...



জোসেফ ফ্রে উদ্ভা্তি কোকো চকলেট পেস্ট।

এরপর ইউরোপের সাধারন মানুষের কাছে চকলেট পৌঁছতে আর তেমন দেরি হয়নি। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে Cadbury নামে একটি ছোট কোম্পানি চকলেট ক্যান্ডির বক্স ইংল্যান্ডে বাজারজাত করতে থাকে। এর ক’বছর পরই মিল্ক চকলেট বাজারে নিয়ে আসে Nestle



অস্টাদশ শতকের আমেরিকায় চকলেট তৈরি দৃশ্য।

চকলেট জিনিসটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছেছিল বৈ কী। এবং তা মার্কিনীদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অস্টাদশ শতকের সেই অগ্নিগর্ভ বিপ্লবের বছরে সৈন্যদের বেতনের বদলে দেওয়া হত চকলেট! কথাটা শুনে অনেকের চোখ কপালে উঠলে বলি : আজও দক্ষিণ আমেরিকার প্রত্যন্ত প্রদেশে প্রাচীন বাংলার কড়ির মতো কোকো বীজ বিনিময়ের মাধ্যম । যা হোক। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চকলেট শিল্পে বিনিয়োগকৃত বাৎসরিক পুঁজির পরিমান প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার এবং একজন মার্কিনী প্রতি মাসে কমপক্ষে হাফপাউন্ড চকলেট গলাধঃকরণ করে!



কোকো বীজ।

শোকোলাটল থেকে চকলেট: এই মজাদার ক্যান্ডির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সত্যিই বিস্ময়কর । মধ্য আমেরিকায় জন্মায় থিওব্রোমা কাকাও গাছ। সেই গাছের কোকো বীজ থেকে শোকোলাটল নামে তিক্ত পানীয় তৈরি করত মায়া- অ্যাজটেকরা । ষোড়শ শতকে ইউরোপীয়রা সে বীজ ইউরোপে নিয়ে নিজেদের মতো নিরন্তর এক্সপেরিমেন্ট করে অস্টাদশ শতকে উদ্ভাবন করেছিল চকলেট ক্যান্ডি আর মিল্ক চকলেট।
আর আজ?
নীচের ছবিগুলিই বলে দেয় আমাদের জীবনে চকলেটের স্থান কোথায়



চকলেট কেক।



পেনড্রাইভ



মাউস

উৎসর্গ: উৎসর্গ:

ছবি। ইন্টারনেট।

তথ্যসূত্র:

http://www.fmnh.org/chocolate/history.html
Click This Link
Click This Link
১৭টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×