somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: কর্ণফুলি

১৬ ই জুলাই, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাহাড়ি নদীর পাড়ে একটি পর্তুগিজ জাহাজ কাত হয়ে আছে। কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছিল। মুগল কামানের গোলায় উড়ে গেছে জাহাজের মাস্তুল। পর্তুগিজ সৈন্যরা সবাই নিহত; কারওই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ। অক্টোবার মাসের মাঝামাঝি। চরাচরে শীতের আগমন স্পষ্ট। মধ্যাহ্ন ক্রমশ নির্জন হয়ে রয়েছে। আকাশ থেকে ঝরছে উজ্জ্বল আলো। দূর থেকে কামানের গর্জন শোনা যায়। পলায়মান পর্তুগিজ জাহাজ উদ্দেশ্যে গোলা ছুড়ছে মুগল গোলন্দাজ বাহিনী। আক্রমনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নির্ভীক সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই মুগল সিপাহশালা। সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, চট্টগ্রাম থেকে মগ ও পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রামের নাম রাখবেন: “ইসলামাবাদ।”
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলের দক্ষিণে মরিয়ম নগর। মরিয়ম নগরের দক্ষিণ প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে একটি পাহাড়ি নদী । পাহাড়ি নদীটির কোনও নাম নেই। স্থানীয় লোকে নদীটিকে ‘পাহাড়ি নদীই’ বলে। পাহাড়ি নদী বলেই খরস্রোতা । সেই খরস্রোতা নদীতে ভাসে সাম্পান। নদীর পাড়ে অনুচ্চ টিলা। টিলায় সবুজ গাছপালা ছাড়াও বৌদ্ধ বিহার চোখে পড়ে। পাহাড়ি নদীর পাড়ে গ্রাম। সে সব গ্রামে চাকমারাই সংখ্যাগুরু। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। মরিয়ম নগরে অবশ্য মুসলিম এবং হিন্দু ধর্মালম্বীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রামে মুসলিম শাসনের পূর্বে অঞ্চলটি কখনও আরাকানি রাজবংশ কখনও বার্মার রাজা শাসন করত । সোনারগাঁও-এর সুলতান ফকরুদ্দীন মুবাররাক শাহ ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করেন। অবশ্য, ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দের পর চট্টগ্রামের উপর সুলতানি শাসন অব্যাহত রাখতে না-পারার
অন্যতম কারণ: ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শের শাহের কাছে সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ- এর পরাজয়। এই কারণে চট্টগ্রামে আবার আরাকানি দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুরা চট্টগ্রামে অবাধে হত্যা ও লুটতরাজ চালিয়ে আসছিল । অঞ্চলটি মগের মুল্লক হয়ে উঠেছিল। এ বছর, অর্থাৎ ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মুগল সেনাপতি বুর্জুগ উমিদ খান মগ ও পর্তুগিজদের অমিত বিক্রমে প্রতিহত করে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছেন।
পাহাড়ি নদীর পাড়ে রক্তিম চীবরধারী একজন ভিক্ষু দাঁড়িয়ে । মধ্যবয়েসি ভিক্ষুর নাম সৌম্যকান্তি; ইনি স্থানীয় ধর্মচক্র বিহারের অধ্যক্ষ। ভিক্ষু সৌম্যকান্তির মাথা মসৃণ ভাবে কামানো। ভরাট মুখটি প্রসন্ন । পূর্বে বিহারের সোমপুর অধ্যক্ষ ছিলেন ভিক্ষু সৌম্যকান্ত । বৌদ্ধশাস্ত্রে অসামান্য পান্ডিত্য ছাড়াও ভেষজ বিদ্যায় পারদর্শী ইনি। বিনে পয়সায় চিকিৎসা করেন। মরিয়মপুরে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু সৌম্যকান্তি। এই মুহূর্তে অপর পাড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত পর্তুগিজ জাহাজের দিকে চেয়ে আছেন তিনি। বিড়বিড় করে বলেন, অত দূর থেকে এইসব ফিরিঙ্গিরা কেন যে আসে?
কেন আবার- আসে লুটপাট করতে! নালায়েক জালিমের দল! শুভ্র দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাটা বললেন শাহ ইলিয়াস । বৃদ্ধ স্থানীয় আমিরুল আম্বিয়া দরগার খাদেম। দরগাটি পাহাড়ি নদীর পাড়ে শালবনের জঙ্গলের ভিতরে । শাহ ইলিয়াসের ভাইয়েরা মরিয়ম নগরে ঘরসংসার ব্যাবসাবানিজ্য করলেও শাহ ইলিয়াস বাল্যকাল থেকেই নির্জনতা পছন্দ করেন। নির্জন দরগায় আল্লাহর ধ্যানে কাটান বৃদ্ধ। ভীষণ দরদী মানুষ শাহ ইলিয়াস। গ্রামবাসীর আপদ-বিপদে এগিয়ে আসেন। শাহ ইলিয়াসের সুর্মামাখা আয়ত চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় বৃদ্ধের শরীরে আরব রক্ত প্রবাহিত। তাঁরই আরব পূর্বপুরুষগন মরিয়ম নগরের পত্তন করেছিলেন। ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মুসলিম সুলতান চট্টগ্রাম জয় করেছেন বটে, তবে তারও কয়েক শ বছর আগে থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরবরা বাস করছে । মূলত ব্যবসা-বাণিজ্য উদ্দেশ্যেই আরবরা বঙ্গোপসাগরের মনোরম উপকূলে জাহাজ ভিড়িয়েছিল। সেসব কথা মনে করে শাহ ইলিয়াস বললেন, আমার পূর্বপুরুষ আরবরাও তো ছিল বহিরাগত। কই, তারা তো কখনোই কামান থেকে এখানকার স্থানীয় জনগনের উপর গোলা বর্ষণ করেনি, বা লুন্ঠন করেনি, এমন কী কাউকে হত্যা পর্যন্ত করেনি। তারা গত ৮/৯ ’শ বছর ধরে স্থানীয় জনগনের সঙ্গে মিলেমিশে ব্যবসাবাণিজ্য করেছে। এখানেই বিয়েসাদী করেছে। এ দেশকেই নিজের দেশ মনে করে।
ভিক্ষু সৌম্যকান্তি মাথা নাড়লেন। এতদ্বঞ্চলে শান্তিপ্রিয় আরবদের বসতি স্থাপনের ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে তিনি সম্যক অবগত আছেন। আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে মহামতি গৌতম বুদ্ধদেব ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলটি অতিক্রম করেই পুবের আরাকান রাজ্যে গিয়েছিলেন। তার পর থেকে গত দু হাজার বছরে আরাকানে এবং চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বৌদ্ধমঠ । অবসরে মঠের অধ্যক্ষগণ ইতিহাস চর্চা করেন। তারা শান্তিপ্রিয় আরবদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
শাহ ইলিয়াস বললেন, আজ বীর সিপাহিসালা বুর্জুগ উমেদ খান জালিমদের হাত-পা ভেঙে দিলেন। তবে দেখ এরা ঠিকই আবার বাংলায় ফিরে আসবে। তবে এ মাটিতে এই জালিমরা শেষ পর্যন্ত টিকবে না।
শাহ ইলিয়াসের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব। মাঝবয়েসি, ফরসা, ধুতি-উড়নি পরা, পাকা চুল চূড়ো করে বাঁধা, বলিরেখাময় কপালে তিলক; এখন শাহ ইলিয়াসের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। ঈষৎ মাথা নাড়লেন। রামকৃষ্ণ বৈষ্ণবের ধর্মগুরু শ্রীচৈতন্যদেব। ইঁনি ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে দেহ রেখেছেন। তারপর তাঁরই প্রেমের বাণী ছড়িয়ে দিতে ভক্তরা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলায়। রামকৃষ্ণ বৈষ্ণবের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছিল বাংলার পশ্চিমে গঙ্গা নদীর পাড়ে। মরিয়ম নগরে এঁরা দু পুরুষের বাস করছেন। রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব দূরে পর্তুগিজ জাহাজের দিকে তাকালেন। তারপর ক্ষোভের সুরে বললেন, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। ছিঃ, ভাবলেও ঘেন্না হয় যে এরা পরদেশে যায় লুন্ঠনের তরে!
তাই তো দেখছি। ভিক্ষু সৌম্যকান্তি মাথা নেড়ে বললেন। ফিরিঙ্গিরা যে কোন্ দেশ থেকে আসে তা তিনি ঠিক জানেন না। তবে সে দেশে বুদ্ধের অহিংস বাণী প্রচার করা হোক-এই ইচ্ছে তাঁর দীর্ঘদিনের। হিন্দুস্তান বুদ্ধের জন্মস্থান । কই, হিন্দুস্তান তো কখনও অপর দেশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়নি!
বিমলা বৈষ্ণবী, রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব-এর সাধনসঙ্গীনি । বৃদ্ধা। ফরসা । সারা মুখে অপূর্ব লাবণ্যশ্রী। বিমলা বৈষ্ণবী শাহ ইলিয়াসকে পীরভাই বলে ডাকেন। এখন তিনি শাহ ইলিয়াসের দিকে চেয়ে বললেন, এরা যেখান থেকে আসে সে রাজ্যে কি সাধুসন্ন্যাসী নেই পীরভাই?
শাহ ইলিয়াস বললেন, আছে বৈ কী। আল্লাহ নবীরসূল সর্বত্রই পাঠিয়েছেন হেদায়েতের জন্য। তবে এরা হল জাত বেনিয়া। এরা সাধুসন্ন্যাসীর কথা শোনে না। এরা কেবল ভোগ করতেই জানে, ত্যাগ করতে জানে না। এরা মানুষ না বিমলা, এরা হল পশু!
বিমলা বৈষ্ণবী অহিংস বলেই সম্ভবত আক্ষেপের সুরে বললেন, কোন্ মার ছেলে বিদেশ বিভূঁয়ে এসে পুড়ে মরল!
পাহাড়ি নদীপাড়ে আজ সকাল থেকেই লোকজনের ভিড়। বিধস্ত পর্তুগিজ জাহাজ দেখে তাদের মুখে আনন্দের আভা। বুকে মুক্তির আনন্দ। পর্তুগিজ ও মগের অত্যাচারে এরা এতকাল অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। এরা প্রত্যেকেই মগ-পর্তুগিজদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ। এদের কারও বাপ, কারও ভাই, কারও বোনকে তুলে নিয়ে গেছে নৃশংস আক্রমনকারীরা। তারপর আর তারা ফিরে আসেনি। হয়তো হতভাগাদের দাসবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। রাতের বেলায় হানা দিয়ে সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল কেটে নিয়ে গেছে । ধ্বংসপ্রাপ্ত পর্তুগিজ জাহাজ দেখে এরা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান-এর দীর্ঘায়ূ কামনা করছে। যার যার ধর্মমত অনুযায়ী বীর মুগল সেনাপতির কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করছে ।
নদী পাড়ে লোকজনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল লালু ডোম। তার আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিষাদ। তার মায়ের নাম সুখি ডোম। বছর পাঁচেক আগে তাকে ধরে নিয়ে গেছে মগরা। আর লালু ডোমের শ্বশুর রঘু চন্ডাল কে নদী পাড়ে একা পেয়ে ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল পর্তুগিজরা। সে কথা ভেবে লালু ডোম-এর চোখ ভিজে ওঠে। সেই এই অঞ্চলের প্রকৃতি অধিবাসী। হাজার বছর ধরে এরাই বাস করে আসছে পাহাড়ি নদীর দু’পাড়ে । খর্বকায়, কোঁকড়া চুল, চ্যাপ্টা নাকের কৃষ্ণকায় শীর্ণ দেহ লালু ডোমের । লালুরা মূলত ছিল অরণ্যচারী। পরবর্তী কালে এ অঞ্চলে যারাই এসেছে তারাই লালুদের অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করেছে। এখনও লালুরা প্রান্তিক হলেও মরিয়ম নগরের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশেই আছে।
লোকজনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল সুখদেব চাকমা । হলদে বরণ তির্যক চোখের যুবক সে । এই মুহূর্তে গতরাত্রির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভোররাতে কামানের গর্জন শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল সুখদেব চাকমার। ক্ষিপ্র গতিতে জ্বরগ্রস্থ মেয়ে সোনামনি কে কোলে করে।
নদী পাড়ের শাল জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল। তার পিছন পিছন দৌড়াচ্ছিল তার স্ত্রী শিপ্রা চাকমা। মগ ও পর্তুগিজ আক্রমন হলে লুকিয়ে থাকার জন্য শাহ ইলিয়াস আমিরুল আম্বিয়া দরগার পিছনে ওপরে ডালপালা ফেলে গভীর পরিখা খুঁড়ে রেখেছিলেন। এখন মুগল আর পর্তুগিজের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। শাহ ইলিয়াস গ্রামবাসীকে আগেই বলে রেখেছিলেন, বিপদ বুঝে দরগায় চলে আসতে। পরিখায় সব মিলিয়ে একশো দেড়শ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। কামানের গোলার প্রচন্ড শব্দে কুঁকড়ে মুকড়ে বাকি রাতটা কাটল ওখানেই । ভোরবেলা ধর্মচক্র বিহার থেকে ভিক্ষু সৌম্যকান্তি এলেন খোঁজ খবর নিতে । তিনি খুশির খবর জানিয়ে বললেন, পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে মুগল সৈন্যরা জয়ী হয়েছে।
মানুষের ছোট্ট দলটায় খুশির তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে।
শাহ ইলিয়াস দু-হাত তুলে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেন।
সুখদেব চাকমা উল্লসিত স্বরে বলল, বীর সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান দীর্ঘজীবি হোক।
উত্তেজিত গ্রামবাসী সমস্বরে বলল, বীর সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান দীর্ঘজীবি হোক।
ভিক্ষু সৌম্যকান্তি আরও বললেন, শুনেছি বীর সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান এ অঞ্চলের নাম রাখবেন ইসলামাবাদ।
রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব বললেন, খুব ভালো সিদ্ধান্ত। আমরা ইসলামাবাদে সুখেশান্তিতে বাস করব।
হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমরা ইসলামাবাদে সুখেশান্তিতে বাস করব। গ্রামবাসী সমস্বরে বলল।
অজু করে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করলেন কৃতজ্ঞ শাহ ইলিয়াস। বৃদ্ধের সঙ্গে দরগার আরও দু’জন তরুণ খাদেমও নামাজে দাঁড়িয়ে যায় । মকবুল ও ইসমাইল। এরা পরিখা খুঁড়তে সাহায্য করেছিল। তাদের সঙ্গে আরও ক’জন গ্রামবাসী যোগ দিয়েছিল।
শিপ্রা চাকমা স্বামীর বুকে মাথা রেখে কাঁদল। নদীর পাড় থেকে তার বাবা প্রদীপ চাকমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পর্তুগিজরা ।
ভিক্ষু সৌম্যকান্তি বললেন, থাক মা। এখন আনন্দের সময়, এখন শোক করো না।
শিপ্রা চাকমা প্রাণপন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে।
সোনামনির কি জ্বর সেরেছে? ভিক্ষু সৌম্যকান্তি জিগ্যেস করলেন। সোনামনির গায়ে হাত দিয়ে শিপ্রা চাকমা বলল, হ্যাঁ।
বিমলা বৈষ্ণবী বিষ্ণু মন্দিরে যাবেন। মানত করেছিলেন দেশ অসুর মুক্ত হলে দশ কূলা ধান দেবেন । বিমলা বৈষ্ণবীর ভাই সুকুমারকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পর্তুগিজরা। মরিয়ম নগরের পুবে রায় মাধবের দীঘি। তারই দক্ষিণ পাড়ে সুপ্রাচীন বিষ্ণু মন্দির। সেখানে আজই একবার যাবেন বিমলা বৈষ্ণবী । রামকৃষ্ণ বোস্টমের আবার বাতের ব্যথা আছে। অত দূর যেতে পারবেন না। লালু ডোম-এর দিকে তাকালেন বিমলা বৈষ্ণবী । কি রে লালু?
বল মা। বিমলা বৈষ্ণবী কে লালু মা বলেই ডাকে।
আজ বিকেলে আমি একবার রায় মাধবের দিঘির পাড়ে যাব। তুই আমার সঙ্গে যাবি?
আচ্ছা, মা। যাব।

... এই মুহূর্তে ধূসর আকাশে ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখে মুগল সেনাপতি বুর্জুগ উমেদ খান কে প্রণাম করে সুখদেব চাকমা । এখন থেকে বউ-বাচ্চা নিয়ে ইসলামাবাদে সুখে থাকবে সে। কেউই আর তার ছনের তৈরি মাটির ঘরখানি পুড়িয়ে দেবার সাহস পাবে না। চাকমা পাড়ায় ঢুকে হত্যা করবে না, লুন্ঠন করবে না। অতি সাধারণ জীবন তার। তার বউ শিপ্রা চাকমা চমৎকার বাঁশের কাজ জানে। বাঁশ দিয়ে কূলা বানায়, ডুলা বানায়। ওসব মরিয়ম নগরের হাটে বিক্রি করে সুখদেব । তাছাড়া রাজহাঁস পালে সুখদেব। রাজহাঁসের ডিম বিক্রি করে।
সোনামনি চাকমা ওর বাবার পাশে চলে আসে। জ্বর নেই। ঝরঝরে লাগছে। সোনামনি চাকমার বয়স বারো। ফরসা সুন্দর হলদে গড়ন। লাল রঙের সারং পরে আছে। বাঙালি মেয়েদের মতো একমাথা কালো চুল। কানে হলুদ রঙের বুনোফুল । কি ফুল কে জানে!
নদীর ওপারে আঙুল তুলে সোনামনি চাকমা বলে, বাবা, বাবা? ওরা খারাপ লোক ছিল, তাই না বাবা?
কন্যার দিকে তাকায়। হ্যাঁ মা।
ওরা কি সব মরে গেছে?
হ্যাঁ,মা।
সোনামনি কি বলতে যাবে, ঠিক তখনই সোনামনির সই লীলা চাকমা ও সোনালি চাকমা দৌড়ে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ছান করবি না সোনামনি ? বেলা পড়ে এল যে।
সোনামনি ওর মায়ের দিকে তাকায়।
মেয়েটার কাল জ্বর সেরেছে। কালরাতে দরগায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই। অবশ্য ভিক্ষু সৌম্যকান্তিও নিশিন্দার আরক দিয়েছিলেন। সোনামনি এখন চান করতেই পারে। নদীতে কুয়াশা ছড়িয়ে যাচ্ছিল। শিপ্রা চাকমা বলে, যা। ছান কর গে যা।
বড় বড় পাথর ফেলে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ি নদীর ঘাট। জোয়ারের সময় পাথরগুলি জলের তলায় থাকে বলে কিছুটা পিছল হয়েই থাকে । সোনামনি চাকমা দেখেশুনে নামে । এই সময়টা ওর ভারি ভালো লাগে। জলের ওপর আকাশের ছবি কাঁপে। সে ছবি ভেঙেও যায়। পাহাড়ি নদীটি অতটা নিস্তরঙ্গ নয়, স্রোতও আছে, । তার ওপর আবার জোয়ারের সময়ও হল।
যাঃ। সোনামনি অস্ফুটস্বরে বল।
কি হল! লীলা চাকমা জিগ্যেস করে।
আমার কানের ফুল জলে ভেসে গেল। সোনামনি কাঁদতে কাঁদতে বলে ।
বিমলা বৈষ্ণবী আর লালু ডোম রায় মাধবের দিঘীর পাড়ে যাত্রা করবে। তারা কান্না শুনে নদীর ঘাটে ছুটে এল। ‘কি হল,’ ‘কি হল,’ বলতে বলতে অন্যরাও নদীপাড়ে ছুটে এল। সোনালি চাকমা বলল, নদীর জলে সোনামনির কানের দুল যে ভেসে গেছে। তাইতে ও কাঁদছে।
ভিক্ষু সৌম্যকান্তি ঈষৎ হেসে বললেন, নদীটা দুষ্টু। ওকে বকে দিলাম যাও। এখন কান্না থামাও তো খুকি।
তবু সোনামনির কান্না থামে না।
শাহ ইলিয়াস বললেন, যাও। আমি তোমায় মরকত মনির হার গড়িয়ে দেব। এখন কান্না থামাও।
তবু সোনামনির কান্না থামে না।
রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব বললেন, কেঁদো না, আমি তোমায় বুনো ফুল এনে দেব।
তবু সোনামনির কান্না থামে না।
সুখদেব চাকমা বলল, কাঁদিস না মা। আমি তোকে নস্যির হাট থেকে রূপোর দুল গড়িয়ে দেব। এখন কান্না থামা তো।
তবু সোনামনির কান্না থামে না।
লালু ডোমও ঘাটে নেমে এসেছে। কী যেন ভাবছে সে । একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিল। তারপর লালু ডোম বলল, কাঁদিস নারে সোনা। তোর কানের ফুল এ লদীর জলে ভেইসে গেল বলে আজ থেকে এ পাহাড়ি লদীর নাম হৈল কর্ণফুলি।
সোনামনি ছোট ছোট তির্যক চোখ মেলে লালু ডোমের কথাগুলোন বোঝার খানিক চেষ্টা করল। আমার কানের দুল হারালো বলে আজ থেকে এ পাহাড়ি নদীর নাম কর্ণফুলি? এর মানে কি? তাহলে কি আমি কাঁদব না?
বিমলা বৈষ্ণবী উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, বাহ্, কি সুন্দর নাম কর্ণফুলি। আমার ছেলে রেখেছে। বলে বৃদ্ধা লালুর গালে চকাস করে চুমু খেলেন।
সোনামনি কান্না থামাল। তার মুখেও যেন হাসির রেখা ফুটে উঠল।
শিপ্রা চাকমা মেয়ে দিকে চেয়ে হাসল। গর্বে আর আনন্দে তার বুকটা ভরে যাচ্ছে। আমার সোনামনির জন্যই এই পাহাড়ি নদী আজ একটা নাম পেল ...
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১২ সকাল ১০:২৪
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×