হেমন্তের পূর্বাহ্ন। উজ্জ্বল রোদের ভিতরে ধূসর কুয়াশার মিশেল। সেই আশ্চর্য শীতল আলোর ভিতরে হাঁটছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। হাঁটতে হাঁটতে লেখকটি আবার গুনগুন করে গানও গাইছেন: জীবন এত ছোট ক্যানে। হেমন্তের ধূসর আকাশ থেকে আলো ঝরে ঝরে পড়ছিল তাঁর চওড়া কপালে, চশমা পরা লম্বাটে শান্ত মুখে, তাঁর ছন্নছাড়া অবয়বে।
বাংলা সাহিত্যের এই জবরদস্ত লেখকটির পরনে খুবই সাধাসিধে পোশাক। ধুতি আর পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপর একটি তসরের চাদর জড়ানো; পায়ে চটি। ব্যাস। তিনি যে বীরভূম জেলার এক অভিজাত জমিদার বংশের সন্তান সেরকম কোনও বনেদিআনার ছাপই কিন্তু লেখকটির মধ্যে নেই।
১৯৬৫ সাল। কলকাতা থেকে সমরেশ বসু এসেছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন। তারাও লেখক। আর কে না জানে, লেখকরা ঘুরে না বেড়ালে, সব খুঁটিয়ে না-দেখলে পরে লেখার মান বাড়ে না। কদিন ধরে সমরেশ বসু তাঁর লেখকবন্ধুদের নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে এই হেমন্তের হিম-হিম সাঁওতাল পরগণার শিমূলতলা চষে বেড়াচ্ছেন।
সময়টা হেমন্তকাল। আজকের দিনের মতো তো নয়, ষাটের দশকের সেইসব দিনে সাঁওতাল পরগণার সকালসন্ধ্যায় ঘোর কুয়াশা পড়ত। বাতাসের গন্ধ শুঁকে টের পাওয়া যেত আসন্ন শীতের আমেজ। এসব দিনে চড়ুইভাতি ভারি জমে ওঠে। লেখকের দলটি শালজঙ্গলের ভিতর নির্জন একটি ডাকবাঙলোয় উঠেছে। তো, আজ সকালে ডাকবাঙলোর রৌদ্রমূখর পাখিডাকা উঠোনে বসে চা খেতে খেতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যখন চড়ুইভাতির কথা তুললেন তখন সবাই হইহই করে উঠেছিল । তারপর জরুরি বৈঠক বসল। চাঁদা তোলা হল। কাছেই একটি শালগাছের নীচে কখানা ইট, শুকনো কাঠ আর বিস্তর শুকনো পাতা জড়ো করা হল। এখন কেবল চাল ডাল নুন তেল আর মাছমাংস কেনা বাকি। হাঁড়িও কিনতে হবে। এই ঈশ্বর পরিত্যক্ত স্থানে ডেকোরেটর কই যে ওসব ভাড়া দেবে?
ডাকবাঙলোর বুড়ো কেয়ারটেকার লোকটি গতকালই বলেছিল, স্থানীয় হাটটি নাকি কাছেই। সেই হাটের নাম তিলুয়াবাজার।
এই মুহূর্তে কেনাকাটার জন্য সবাই তিলুয়াবাজারের দিকে যাচ্ছেন। সমরেশ বসু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কে 'দাদা' বলে ডাকেন। দাদার পাশে হাঁটছেন সমরেশ বসু। কান পেতে গান শুনছেন। জীবন এত ছোট ক্যানে।
আজ সম্ভবত হাটবার। নইলে তিলুয়াবাজারে দুপুরের আগেই দেহাতী মানুষজনের এত ভিড় কেন? দেহাতীরা অধিকাংশই সাঁওতাল। বিক্রেতারাও সাঁওতাল। তারা বাঁশের ঝুড়িতে পন্য সাজিয়ে বসেছে।
হঠাৎ সমরেশ বসু দেখলেন একটি সাঁওতালী মেয়ে একটি খাঁচায় পায়রা নিয়ে বসে রয়েছে। পায়রাগুলি দেখতে বেশ নধর মনে হচ্ছে । খাঁচার ভিতরে ছটফট করছিল। হয়তো হাটের মানুষের ভিড়ে ভয় খেয়েছে।
সমরেশ বসু বললেন, দাদা।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গান থামিয়ে বললেন, বল, কি বলবি?
সমরেশ বসু বললেন, পায়রা কটা কেনা যাক। মাংস খাবো।
প্রথমে খাঁচার দিকে, পরে সাঁওতালী মেয়েটির দিকে তাকালেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর বললেন, পায়রার মাংস খাবি?
হ্যাঁ।
তাহলে কিনে ফ্যাল। চাঁদার টাকাপয়সা তো সব তোর কাছে রয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন।
সমরেশ বসু সাঁওতালী মেয়েটির সঙ্গে দরদাম করতে লাগলেন। পায়রার দর শুনে কলকাতার একজন লেখক বললেন, কলকাতার তুলনায় দেখছি ড্যাম চিপ।
হুমম।
পায়রা কেনা হলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাত বাড়িয়ে দিলেন বললেন, খাঁচাটা ইদিকে দে তো সমরেশ।
সমরেশ বসু খাঁচা বাড়িয়ে দিলেন। খাঁচা হাতে নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষাণিক ক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী যেন দেখলেন। তারপর খাঁচার দরজা খুলতে খুলতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, পায়রার মাংস খাবি? খা! বলে একটি একটি করে পায়রা ধরে ধরে বাইরে আকাশের দিকে উড়িয়ে দিলেন।
সমরেশ বসু (এবং অন্যারা) হাহাকার করে উঠলেন।
হেমন্তের রোদ ভর্তি ধূসর আকাশে পায়রাগুলি উড়তে লাগল।
সমরেশ বসু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মুখের দিকে তাকালেন। সেই শান্ত
লম্বাটে মুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার চিহ্নটি নেই। বরং মিটমিট করে হাসছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় । বললেন, আরও পায়রা কিনবি নাকি? চল্, দেখি হাটে নিশ্চয়ই আরও পায়রা এসেছে।
বাঙালি বাবুর এহেন কান্ড দেখে সাঁওতালী মেয়েটি হাসছিল। হাটের অন্য দেহাতী নারীপুরুষও হাসছিল। সমরেশ বসুর ভিতরে ক্রমশ সেই হাসি সঞ্চালিত হতে থাকে। সেই সঙ্গে সমরেশ বসু যেন গভীর এক পারমার্থিক ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন ।
... অনেক বছর আগে এই ঘটনাটি আমি পড়েছিলাম কালকূট-এর লেখা ‘শাম্ব’ উপন্যাসে। উল্লেখ্য, কালকূট সমরেশ বসুরই ছদ্মনাম ।
শাম্ব
http://www.mediafire.com/?grv78grjhvaa10k
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



