somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একদিন, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

২২ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হেমন্তের পূর্বাহ্ন। উজ্জ্বল রোদের ভিতরে ধূসর কুয়াশার মিশেল। সেই আশ্চর্য শীতল আলোর ভিতরে হাঁটছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। হাঁটতে হাঁটতে লেখকটি আবার গুনগুন করে গানও গাইছেন: জীবন এত ছোট ক্যানে। হেমন্তের ধূসর আকাশ থেকে আলো ঝরে ঝরে পড়ছিল তাঁর চওড়া কপালে, চশমা পরা লম্বাটে শান্ত মুখে, তাঁর ছন্নছাড়া অবয়বে।
বাংলা সাহিত্যের এই জবরদস্ত লেখকটির পরনে খুবই সাধাসিধে পোশাক। ধুতি আর পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপর একটি তসরের চাদর জড়ানো; পায়ে চটি। ব্যাস। তিনি যে বীরভূম জেলার এক অভিজাত জমিদার বংশের সন্তান সেরকম কোনও বনেদিআনার ছাপই কিন্তু লেখকটির মধ্যে নেই।
১৯৬৫ সাল। কলকাতা থেকে সমরেশ বসু এসেছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন। তারাও লেখক। আর কে না জানে, লেখকরা ঘুরে না বেড়ালে, সব খুঁটিয়ে না-দেখলে পরে লেখার মান বাড়ে না। কদিন ধরে সমরেশ বসু তাঁর লেখকবন্ধুদের নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে এই হেমন্তের হিম-হিম সাঁওতাল পরগণার শিমূলতলা চষে বেড়াচ্ছেন।
সময়টা হেমন্তকাল। আজকের দিনের মতো তো নয়, ষাটের দশকের সেইসব দিনে সাঁওতাল পরগণার সকালসন্ধ্যায় ঘোর কুয়াশা পড়ত। বাতাসের গন্ধ শুঁকে টের পাওয়া যেত আসন্ন শীতের আমেজ। এসব দিনে চড়ুইভাতি ভারি জমে ওঠে। লেখকের দলটি শালজঙ্গলের ভিতর নির্জন একটি ডাকবাঙলোয় উঠেছে। তো, আজ সকালে ডাকবাঙলোর রৌদ্রমূখর পাখিডাকা উঠোনে বসে চা খেতে খেতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যখন চড়ুইভাতির কথা তুললেন তখন সবাই হইহই করে উঠেছিল । তারপর জরুরি বৈঠক বসল। চাঁদা তোলা হল। কাছেই একটি শালগাছের নীচে কখানা ইট, শুকনো কাঠ আর বিস্তর শুকনো পাতা জড়ো করা হল। এখন কেবল চাল ডাল নুন তেল আর মাছমাংস কেনা বাকি। হাঁড়িও কিনতে হবে। এই ঈশ্বর পরিত্যক্ত স্থানে ডেকোরেটর কই যে ওসব ভাড়া দেবে?
ডাকবাঙলোর বুড়ো কেয়ারটেকার লোকটি গতকালই বলেছিল, স্থানীয় হাটটি নাকি কাছেই। সেই হাটের নাম তিলুয়াবাজার।
এই মুহূর্তে কেনাকাটার জন্য সবাই তিলুয়াবাজারের দিকে যাচ্ছেন। সমরেশ বসু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কে 'দাদা' বলে ডাকেন। দাদার পাশে হাঁটছেন সমরেশ বসু। কান পেতে গান শুনছেন। জীবন এত ছোট ক্যানে।
আজ সম্ভবত হাটবার। নইলে তিলুয়াবাজারে দুপুরের আগেই দেহাতী মানুষজনের এত ভিড় কেন? দেহাতীরা অধিকাংশই সাঁওতাল। বিক্রেতারাও সাঁওতাল। তারা বাঁশের ঝুড়িতে পন্য সাজিয়ে বসেছে।
হঠাৎ সমরেশ বসু দেখলেন একটি সাঁওতালী মেয়ে একটি খাঁচায় পায়রা নিয়ে বসে রয়েছে। পায়রাগুলি দেখতে বেশ নধর মনে হচ্ছে । খাঁচার ভিতরে ছটফট করছিল। হয়তো হাটের মানুষের ভিড়ে ভয় খেয়েছে।
সমরেশ বসু বললেন, দাদা।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গান থামিয়ে বললেন, বল, কি বলবি?
সমরেশ বসু বললেন, পায়রা কটা কেনা যাক। মাংস খাবো।
প্রথমে খাঁচার দিকে, পরে সাঁওতালী মেয়েটির দিকে তাকালেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর বললেন, পায়রার মাংস খাবি?
হ্যাঁ।
তাহলে কিনে ফ্যাল। চাঁদার টাকাপয়সা তো সব তোর কাছে রয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন।
সমরেশ বসু সাঁওতালী মেয়েটির সঙ্গে দরদাম করতে লাগলেন। পায়রার দর শুনে কলকাতার একজন লেখক বললেন, কলকাতার তুলনায় দেখছি ড্যাম চিপ।
হুমম।
পায়রা কেনা হলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাত বাড়িয়ে দিলেন বললেন, খাঁচাটা ইদিকে দে তো সমরেশ।
সমরেশ বসু খাঁচা বাড়িয়ে দিলেন। খাঁচা হাতে নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষাণিক ক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী যেন দেখলেন। তারপর খাঁচার দরজা খুলতে খুলতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, পায়রার মাংস খাবি? খা! বলে একটি একটি করে পায়রা ধরে ধরে বাইরে আকাশের দিকে উড়িয়ে দিলেন।
সমরেশ বসু (এবং অন্যারা) হাহাকার করে উঠলেন।
হেমন্তের রোদ ভর্তি ধূসর আকাশে পায়রাগুলি উড়তে লাগল।
সমরেশ বসু তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মুখের দিকে তাকালেন। সেই শান্ত
লম্বাটে মুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার চিহ্নটি নেই। বরং মিটমিট করে হাসছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় । বললেন, আরও পায়রা কিনবি নাকি? চল্, দেখি হাটে নিশ্চয়ই আরও পায়রা এসেছে।
বাঙালি বাবুর এহেন কান্ড দেখে সাঁওতালী মেয়েটি হাসছিল। হাটের অন্য দেহাতী নারীপুরুষও হাসছিল। সমরেশ বসুর ভিতরে ক্রমশ সেই হাসি সঞ্চালিত হতে থাকে। সেই সঙ্গে সমরেশ বসু যেন গভীর এক পারমার্থিক ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন ।


... অনেক বছর আগে এই ঘটনাটি আমি পড়েছিলাম কালকূট-এর লেখা ‘শাম্ব’ উপন্যাসে। উল্লেখ্য, কালকূট সমরেশ বসুরই ছদ্মনাম ।


শাম্ব
http://www.mediafire.com/?grv78grjhvaa10k
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ২:২৮
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×