পাকিস্তানি আর্মির একটা জিপ তীব্র গতিতে বাঁক নিয়ে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকার একটি গলিতে ঢুকে পড়ে। ১৯৭১ সাল; এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। গলির ভিতর কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাইভার ব্রেক কষে। জিপটা থামতেই রাইফেল হাতে জিপ থেকে লাফিয়ে নামল দশ-বারো জন খানসেনা । রাইফেলের নলে অ্যাটাচড সুতীক্ষ্ম বেয়োনেট।
ডানপাশে একটি পুরনো শ্যাওলাধরা দেয়াল। মাঝখানে ছোট একটি টিনের গেট; একজন সৈন্য লাথি মারতেই পলকা গেটটা ভেঙে পড়ল।
সৈন্যরা ভিতরে ঢুকে পড়ল।
ভিতরে হলদে রঙের পুরনো আমলের একটি তিনতলা দালানের সামনে সিমেন্ট বাঁধানো ছোট একটি উঠোন। একতলাটি গ্রিলে-ঘেরা। দালানটি খাঁ খাঁ করছিল। দেখে মনে হল দালানটি খালি, কেউ নেই।
রাইফেল উঁচিয়ে সৈন্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠে, তিনতলায় ওঠে। লাথি মেরে কিংবা রাইফেলের বাটের আঘাতে তালা ভাঙে, দরজা ভাঙে। ভিতরে লোকজন লুকিয়ে ছিল। অধিকংশই পুরুষ। তারা কাঁপছিল থরথর করে ।মুখচোখ আতঙ্কে নীল। ছ-সাত জন পুরুষকে টেনে-হিঁচড়ে নীচের উঠোনে নিয়ে আসে সৈন্যরা । তারপর ভয়ার্ত আতঙ্কগ্রস্থ পুরুষদের লাইন করে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়। ওদের বুক লক্ষ করে রাইফেল তাক করে। মেজর নির্দেশ দিলেই ব্রাশ ফায়ার করবে।
মেজর কী মনে করে একতলায় ঢুকেছে। ঘরগুলি ঘুরে ঘুরে দেখছে। এইসব খুপড়িঘরে বাইনচোত বেঙলিরা থাকে । মেজর থুঃ করে থুতু ছিটায়।
একতলার বসার ঘরের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের একটি বড় ছবি টাঙানো । ছবিটি স্বচ্ছ কাঁচে বাঁধানো, সাদা রঙের প্লাস্টিকের ফ্রেমটিও চমৎকার । কবির পরনে কালো আলখাল্লা। মাথায় কালো টুপি। ফর্সা সৌম্য মুখে ধবধবে দাড়ি। সেই জ্যোর্তিময় মুখখানি সুফিসুলভ ধ্যানে আচ্ছন্ন।
মেজরের চোখ রবীন্দ্রনাথের ছবিতে আটকে যায়। কে এই দরবেশ? মেজর বিস্মিত হয়।
উঠোন থেকে একজন বেঙলিকে ডেকে আনার জন্য একজন সৈন্যকে নির্দেশ দেয় মেজর।
একজন মাঝবয়েসি লোক এল। মুখচোখে স্পষ্ট মৃত্যুভয়।
এই দরবেশ কে? মেজর জিজ্ঞেস করল।
লোকটা বুদ্ধি করে বলল, ইনি ... ইনি আমার দাদা, মানে গ্র্যান্ডফাদার স্যার।
সত্যি বলছ?
হ্যাঁ। সত্যি বলছি।
মেজর জানে মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়ালে মিথ্যে কথা বলার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
মেজর দ্রুত উঠোনে বেরিয়ে আসে । তারপর চোস্ত উর্দুতে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলে, এরা এক কামেল পীরের খানদান। এখানে গোলাগুলির দরকার নেই। চল।
রাইফেল নামিয়ে বুটের মচমচ শব্দ তুলে পাকিস্তানি সৈন্যের দলটি উঠোন ছেড়ে চলে যায় ...
... ঘটনাটি সত্য। অনেক বছর আগে ওই পরিবারেরই এক সদস্যের কাছে শুনেছিলাম ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



