গুলেনার ...
একটু আগেই উত্তেজিত ছাত্রজনতার একটা বিক্ষোভ মিছিল গলিটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মিছিলকারীরা চিৎকার করে পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করেছে। ১৯৭০ সাল। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। পুরান ঢাকার উর্দু রোডের একটি তিনতলা বাড়ির দোতলার বারান্দায় চিকের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল গুলেনার । এই মুহূর্তে রোদ ঝলমলে গলিটা থমথম করছিল। কিশোরীর বিষন্ন দৃষ্টি সেই রোদ ছড়ানো গলিতে। বাংলা তেমন না বুঝলেও গুলেনার ঠিকই মিছিলের ভাষা বোঝে। তৌহিদ স্যারের কথা ভেবে ওর সঙ্কোচে জর্জরিত হয়। মিছিলের উত্তেজিত তরুণদের তিরস্কার তার ওপরও এসে পড়ে।
গুলেনার!
আম্মি ডাকল।
যাই, আম্মি। বলে চট করে ঘরের ভিতরে চলে আসে গুলেনার । ঘরটায় রোদ তেমন ঢোকেনি। সবুজ দেয়ালে নোনা ধরেছে। তবে বাতাসে জাফরানের মৃদু গন্ধ টের পাওয়া যায়। খাওয়ার ঘরের টেবিলে একটা টিফিন ক্যারিয়ার। আম্মি তাতে রুটি আর সবজি ভরে রাখছে। আকিব টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে নীচে যাবে। আকিবের বয়স বারো বছর। ফরসা। ইষৎ লালচে পাতলা চুল। মুখটি ভারি নিষ্পাপ।
আম্মি মুখ তুলে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল। যেন পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। উর্দুতে বলল, কতবার না তোকে বলেছি যখন-তখন অলিন্দে যাবি না। তোর আব্বাজান পছন্দ করেন না। রাস্তায় বেঙলি যুয়ানরা ইনকিলাব করছে। তোর মুখ দেখলে যদি পাথথর ছুঁড়ে যদি।
গুলেনারের মুখ কালো হয়ে ওঠে। কৈফিয়তের সুরে বলে, আমি তো ময়না কে দানাপানি খাওয়াতে অলিন্দে গিয়েছিলাম আম্মি।
দিলশাদ বেগম ফুঁসে উঠে বললেন, মিথ্যেবাদী। তোর মতন বয়েস আমারও ছিল।
গুলেনারও ফোঁস করে ওঠে। আম্মি সারাক্ষণই কিচকিচ করে। আম্মির কথায় আকিব হাসে। গুলেনার আগুন-চোখে আকিবের দিকে তাকায়। ওর শরীরে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে যায়। আকিবের কান মলে দিতে ইচ্ছে করছিল। সে সুযোগ হল না আকিব টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে চলে নীচে যায়। আব্বা নীচে দোকানে আছে। আকিব রোজ এ সময় আব্বাকে খাবার দিয়ে আসে।
আম্মি বলল, যা, এখন খেয়ে নে। আমায় উদ্ধার কর।
দুপদাপ পা ফেলে রান্নাঘরে চলে আসে গুলেনার। মায়ের ওপর রাগে মাথার তালু চটচট করছিল। একটা রুটি তুলে থালায় ছুড়ে মারল। আর কড়াই থেকে কাঠের বড় হাতায় এক খাবলা পাঁচমিশেলি সবজি তুলে থালায় ঢালল। ওর ফর্সা মুখটি ভীষণ গোমড়া দেখাচ্ছে। রান্নাঘরের জানালা খোলা। একটা বাঁদর উঁকি মারছে। গুলেনার ওদিকে তাকায় না। অন্য সময় হলে মুখ ভেঙচাতো। নভেম্বরের রোদ এসে পড়েছে ওর ঈষৎ লালচে চুলে, ফরসা মুখে, বাদামী ভ্রু জোড়ার ওপর, কটা চোখ আর পাতলা গোলাপি ঠোঁটের ওপর। রুটি গলা ওর দিয়ে নামতে না। ঢকঢক করে পানি খেল ও। খেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু খেতে হবে। এ বাড়িতে রুটি মাথা গুনে তৈরি হয়। খাবার নষ্ট হলে আব্বা চিল্লাচিল্লি করে। ... গতকাল রাতে আব্বা বললেন, ইস্ট পাকিস্তানে আর থাকা যাবে না দিলশাদ। দোকান বিক্রি করে করাচি ফিরে যাব ভাবছি।
কথাটা শুনে গুলেনারের ফর্সা মুখে গভীর কষ্টের ছাপ ফুটে উঠেছিল। বুকে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে রাতভর ছটফট করছে। তৌহিদ স্যারের কথা ভেবে ঘুম হয়নি ওর। তৌহিদ স্যার খুব ভালো মানুষ। চোখের দিকেও কখনও সরাসরি তাকান না। শরম করে বুঝি। ইস্, কত ইচ্ছে ছিল একদিন ঘোড়াগাড়ি চড়ে স্যারের বাড়িতে বেড়াতে যাবে । সেদিন লাল চেলিটা পরবে । ঘোড়াগাড়ি চলার সময় কায়দা করে সে চেলি বাতাসে উড়িয়েও দেবে গুলেনার । স্যারের মায়ের জন্য বুন্দিয়া আর বাখরখানি নিয়ে যাবে। স্যারের এক ছোট বোন আছে। নাম আফিয়া। আফিয়ার জন্য আপেলের মোরব্বা। কিন্তু, স্যারই তো আসছেন না। মাস খানেক হল।
ঘরের জাফরান গন্ধভরা অন্ধকারের ভিতর আরও গভীরতরো অন্ধকারে ডুবে যায় গুলেনার ...
সাবির ওয়াসির-এর সাম্প্রতিক উদ্বেগ
একটু আগে টিফিন ক্যারিয়ার রেখে চলে গেছে আকিব । সাবির ওয়াসির টিফিন ক্যারিয়ার খুলে রুটি আর সবজি বের করছেন। একটু আগেই গলিতে একটা মিছিল গিয়েছে । বিক্ষুব্দ ছাত্রজনতা পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের পিন্ডি চটকেছে। মিছিলকারিরা এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানি দোকানে ঢিল না- ছুঁড়লেও সাবধানের মার তো নেই। দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক ফেলে রেখেছেন সাবির ওয়াসির । ঝাঁপির তলা দিয়ে শীতের রোদ ঢুকেছে গড়িয়ে। সাবির ওয়াসির দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তার পৈত্রিক বাড়ি করাচি। দীর্ঘদিনের বৈদুত্যিক সরঞ্জামের পারিবারিক ব্যবসা। লাহোর ও করাচির ব্যবসা বাবা আর বড়ভাই দেখাশোনা করেন। ঢাকার এই দোকানটি সিক্সটি থ্রিতে উদ্বোধন করা হয়েছিল । তারপর থেকে সাবির ওয়াসিরই দেখাশোনা করছেন। পরিবার নিয়ে ওপরে ভাড়া থাকছেন। সংসারের নানা ঝুটঝামেলার পাশাপাশি ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার কথাও ভাবতে হয়। মাস তিনেক আগের কথা। একদিন বিকেলের দিকে একটি শ্যামলা মতন বেঙলি ছেলে বালবের হোল্ডার কিনতে এল। তখনই পরিচয়। নম্র, ভদ্র ছেলে। নাম বলল: তৌহিদুর রহমান। পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুনে শঙ্কিত বোধ করেন সাবির ওয়াসির । তারপরও সপ্তাহে দুদিন এসে আকিব আর গুলেনারকে অঙ্ক আর ইংরেজি দেখিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। ছেলেটা রাজি হয়ে যায়।
তৌহিদুর রহমান-এর মতো দু-একজন বেঙলির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো সাবির ওয়াসির এর। তবে ইস্ট পাকিস্তানে যে আর বেশিদিন বাস করা যাবে না এই সত্য একরকম মেনে নিয়েছেন সাবির ওয়াসির। দোকান বিক্রি করে করাচি ফিরে যাবেন। বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। তারা রাজি হয়েছেন। চক বাজারের মৌলভী তাসাদ্দুক আলীর পাকিস্তানপ্রীতি প্রবল। বৃদ্ধ জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সদস্য। আগামী মাসের ৭ তারিখ সাধারণ নির্বাচন। মৌলভী তাসাদ্দুক আলী নাকি নির্বাচন করার তোড়জোর করছেন। তার সঙ্গেই দোকান কেনার ব্যাপারে কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছে। মৌলভী তাসাদ্দুক আলী তেজারতি কারবার করে বহুত মাল কামিয়েছেন। কালো রঙের ভক্সওয়াগেন চালান ... তবে মৌলভী তাসাদ্দুক আলী সেদিনও অভয় দিয়ে বললেন, আপনি বেচতে চাইলে আমি আপনার দোকান কিনে নেব ওয়াছির ছাব। কিন্তু মনে রাখবেন ইনডিয়ার দালাল মুজিব যতই কেরামতি দেখাক না কেন-আমরা পাকিস্তান ভাঙতে দিব না। দরকার হলে ইস্ট পাকিস্তানে রক্তের নহর বইয়ে দিব।
এই কথায় শিউরে উঠেছিলেন সাবির ওয়াসির ।
বাংলাদেশ কিংবা শেখ মুজিব
গতবছর, অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান একটি সর্বদলীয় সম্মেলনের আয়োজন করেন। সম্মেলনে শেখ মুজিব তাঁর ছয়-দফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দাবীদাওয়াও পেশ করেন। সেসব সংগত প্রস্তাব প্রত্যাখাত হল। মুজিব সম্মেলন থেকে অত্যন্ত ক্ষুব্দ হয়ে বেরিয়ে আসেন। ওই বছরই ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় বাঙালির এই অবিসম্বাদিত নেতা ঘোষনা করেন ...এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে “বাংলাদেশ” নামে অভিহিত করা হবে: তিনি বলেন: একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল । ‘বাংলা’ শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে ‘বাংলাদেশ’ ডাকা হবে।’
১৯৭০- এর ঢাকা ...উত্তাল পল্টন, অপরাহ্নের তোপখানা...
আজও বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবীদাওয়ায় পল্টনে ছাত্রজনতা জমায়েত করার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ উপস্থিত ছাত্রজনতার উপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তৌহিদ দৌড়ে পুরানা পল্টনের গলির ভিতর দিয়ে বড় রাস্তা পাড় হয়ে সেগুনবাগিচায় ঢুকে পড়েছিল। এদিকে পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত । ওর পরনে পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর নীল সোয়েটার। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। কাঁধের ওপর সামান্য চোট পেয়েছিল। সেসব উপেক্ষা করে
পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিংস্টর্কের প্যাকেট আর দেশলাইয়ের বাক্স বার করে। তারপর একটি সিগারেট ধরালো। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে হাঁটতে থাকে। একটু পর তোপখানা রোডের মুখে এসে থমকে দাঁড়াল । অপরাহ্নের রোদ হেলে পড়েছে। রাস্তায় যানবাহন কম। দু-একটা রিকসা চলছে। আর পুলিশের ভ্যান।
চট করে সরে যায় ও।
আজ দুপুরের আগে সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার আজ একটি চিঠি দিয়েছেন। গোপনে সে চিঠি পাঁচটার আগেই গুপিবাগের একটি মেসে পৌঁছে দিতে হবে । চিঠিতে চলমান আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বিশ্লেষন রয়েছে, এরকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন শহীদুল্লাহ ভাই । মেসে সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল, আমির হোসেন আমু, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (তৌহিদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়) সাদেক হোসেন খোকাসহ আরও অনেকেই অপেক্ষা করছেন। তাছাড়া কমিউনিষ্ট পার্টির কমরেড অনিল মুখার্জিরও উপস্থিত থাকার কথা । আজ একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও যাওয়া দরকার। রাত ন'টায় ইকবাল হলে জরুরি মিটিং ডেকেছেন তোফায়েল ভাই। তিনিই এখন ইকবাল হলের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি।
একমুখ ধোঁওয়া ছাড়ে তৌহিদ। অস্থির বোধ করে সে। এসব ব্যস্ততার কারণে গুলেনারদের বাড়িয়ে মাসখানেক যাওয়া হচ্ছে না। আজই একবার যেত; দু-দুটো কাজ পড়ে গেল। গুলেনার অপেক্ষা করছে ...মেয়েটি কি ভাবছে কে জানে ... খুব স্পর্শকাতর মেয়ে। মাস খানেক আগে গুলেনার বলল, স্যার একদিন আমাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
শুনে তৌহিদ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছিল। গুলেনার আমাদের বাড়িতে যেতে চায়। কিন্তু, তা কি ভাবে সম্ভব? পূর্ব বাংলার মানুষ এই মুহূর্তে পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। পাকিস্তানি মেয়েকে দেখলে আব্বা গম্ভীর হয়ে যাবেন। মাও হয়তো কথাই বলবে না ... আফিয়া হয়তো সামনেই আসবে না ...তাছাড়া গুলেনারের আব্বা কি মেয়েকে যেতে দেবেন? মনে হয় না। গুলেনারে মা আর ভাই সঙ্গে এলে হয়তো রাজি হবে। তবে তাতেও তো সমস্যা সুরাহা হবে না। ওদিকে গুলেনার একদিন বলল, আচ্ছা, স্যার। আপনার মা কি আপেলের মোরব্বা খেতে পছন্দ করেন?
তৌহিদ কি উত্তর দেবে ভেবে পায়নি।
তৌহিদদের ছোট্ট অলীক সংসার
গতবছর (১৯৬৯) ৫ ডিসেম্বর শেখ মুজিব যখন বললেন: I on behalf of Pakistan announce today that this land will be called ‘Bangladesh’ instead of ‘East Pakistan.’... ঠিক সেই দিনই তৌহিদের বাবা মিজানুর রহমান কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্রটি জমা দেন। হাবীব ব্যাংকে চাকরি করতেন ভদ্রলোক । পাকিস্তান সরকারের চাকরি আর করবেন না। যদিও আরও বছর পাঁচেক চাকরির মেয়াদ ছিল। মাইনেও ভালো ছিল। তবে কথা কম বলা মানুষ মিজানুর রহমান। কতকটা মিতভাষী ধরণের; যেন শপথ নিয়ে মৌনব্রত পালন করছেন। এ ধরনের মানুষের আবেগ-অনুভূতি তীব্র হয়। যে আবেগ কথায় প্রকাশ পায় না, পায় সিদ্ধান্তে। সে যাই হোক। পরিবারের কর্তার চাকরি ছাড়ার পরপরই ছোট্ট সংসারটি অথই সাগরে ভাসতে লাগল। বাজার বন্ধ। ঘরভাড়াও বাকি পড়ল। তৌহিদরা থাকে টিপু সুলতান রোড। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বেলাবো। তৌহিদের মা জিন্নতুননেছা স্বামীর ওপর রাগ করে ছোট মেয়ে আফিয়াকে নিয়ে নরসিংদীর শিবপুর চলে গেলেন । জিন্নতুননেছার বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো। বাবাও বেঁচে আছেন। ... ভাগ্যিস বছর দুয়েক আগে (১৯৬৮) মতিঝিলে পূর্বানী হোটেলটির উদ্বোধন হয়েছিল। কিছুটা দৌড়াদৌড়ি করে তৌহিদ-এর বড় ভাই আফজাল সে হোটেলে একটা চাকরি পেয়ে যায়। মাইনে ভালো। তৌহিদদের ছোট্ট সংসারটা অনেকটা অলৌকিকভাবেই যেন টিকে গেল । শিবপুর থেকে মা আর ছোট বোনকে নিয়ে এল তৌহিদ। এবার বড়ছেলে আফজালের বিয়ের জন্য উতলা হয়ে উঠলেন জিন্নতুননেছা । পাত্রী অবশ্য মোটামুটি ঠিক। সেলিনা ইডেন কলেজে পড়ে; টিপু সুলতান রোডের উত্তর মৈশুন্ডির একটি কালী মন্দিরের পাশে সেলিনাদের বাড়ি। জিন্নতুননেছা গেল সপ্তাহে আংটি পরিয়ে এলেন। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হল আসছে বছর (১৯৭১) ৭ মার্চ । বিয়ের দিনক্ষণ দেরি করে স্থির করার কারণ আছে। সেলিনার বড় মামা বিলেত থাকে। তিনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখের আগে দেশে আসতে পারছেন না। বড় ভাই না-এলে মেয়ের বিয়ের বিয়ে হবে না। এরকম এক শক্ত গোঁ ধরেছেন সেলিনার মা লতিফা বানু। লতিফা বানু বিয়ের সময় বড় ভাই পঁচিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন ...
বিয়ের দিন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই বাড়ছিল উদ্বেগ । পূর্বপাকিস্তানের রাজনীতি আবহ যেভাবে ক্রমশ উতপ্ত হয়ে উঠছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ঘরে ঘরে বাঙালির মুখেচোখে গভীর উৎকন্ঠার ছাপ স্পষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর পুর্ব বাংলার বাঙালিদের ঘৃনা দিনদিন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে।
এই রকম এক অস্বস্তিকর গুমোট পরিস্থিতিতে গুলেনার তৌহিদদের বাড়িতে আসতে চায়।
তা কি করে সম্ভব?
যুদ্ধের পর, শীতের শূন্যতার ভিতর
...না, তৌহিদের আর গুলেনারদের সেই উর্দু রোডের বাড়ি যাওয়া হয়নি।
পূর্ব বাংলার পরবর্তী দিনগুলি অসম্ভব উত্তাল আর বিপদজনক হয়ে উঠেছিল।
তারপর মুক্তিযুদ্ধ ...রক্ত আর আগুনের নদীতে ভাসল তৌহিদ ...
যুদ্ধের পর সেই মৃত্যুসম অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ তৌহিদ এক নতুন মানুষ। অনেকটা বিস্ময় আর মনভর্তি শূন্যতা নিয়ে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের সেই তিনতলা বাড়িতে গিয়েছিল সে। একা। পরনে খাকি শার্ট, কালো প্যান্ট, কাঁধে স্টেনগান; শীর্ণমুখে একমুখ দাড়ি আর একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ। অগ্নিদগ্ধ আর মর্টারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন বাড়িটা খাঁ খাঁ করছিল ... শূন্য পোড়ো দালানে একা একা ফাঁকা পরিত্যক্ত ঘরগুলিতে ঘুরছিল ও। ফাঁকা ঘরে শীতের নির্জনতা ছড়িয়ে ছিল । ভাঙা জানালায় শীতের রংশূন্য ধূসর আকাশ। আগেকার সেই জাফরানের গন্ধ মুছে গেছে, তার বদলে বারুদ আর চুনাপাথরের গন্ধ টের পায় সে । বারান্দায় একটা খাঁচায় একটি ময়না পাখি ছিল ... এখানেই এক কোণে ছোট একটি টেবিল ছিল। ভাইবোন দুটিকে পড়াত ... গুলেনার-এর মা চা পাঠিয়ে দিতেন। কখনও আকিবের হাতে ... কখনও গুলেনারের হাতে ... মাঝেমাঝে গুলেনারও প্লেটভরতি বুন্দিয়া আর বাখরখানি নিয়ে আসত। কখনও আপেলের মোরব্বা । তৌহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নীচে নেমে আসার জন্য দরজার দিকে এগুতে থাকে। ঠিক তখনই শীতল শূন্য ঘরে কে যেন বলে ওঠে ... স্যার, একদিন আমাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যাবেন?
উৎসর্গ: কবি শিরীষ ...
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১২ সকাল ১০:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


