চন্দনা এভাবে আমাকে ঠকাবে তা কে জানত! দু-বছরের মধুময় দাম্পত্য জীবন যে এভাবে বিষময় হয়ে উঠবে তাই বা কে জানত। তপনের সারা শরীরে ক্রোধের দাঁত ছড়িয়ে আছে। ভীষণ অস্থির লাগছিল তার। বড্ড দিশেহারা বোধ করছিল সে । সন্ধ্যার পর রাগের মাথায় ঘর থেকে বেরিয়ে স্টেশনে এসে প্ল্যাটফর্মের ওপর বেঞ্চে বসেছিল তপন। চন্দনাকে যা বলার ছিল বলে এসেছে। তোমার মতো একটা নষ্টা মেয়েছেলের সঙ্গে আমার ঘর করা সম্ভব না। পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে চিঠি বার করে তপন । হাত ভীষণ কাঁপছিল। সব সর্বনাশের মূল ওই চিঠিটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে দিল ফাঁকা প্ল্যাটফর্মের ওপর।
তপন চলে যাওয়ার পর চিঠিটা তন্ন তন্ন করে খুঁজল চন্দনা। নেই। কোথাও নেই। চিঠিটা চন্দনা বুদ্ধদেব গুহর মাধুকরী বইটার ভাঁজে রেখেছিল। কী ভাবে যেন চিঠিটা আজ তপনের হাতে পড়েছে। তার পরপরই তপনের ব্যবহার কেমন ভয়ঙ্কর আর রুক্ষ হয়ে যায়। যেন চন্দনা হাড়মাংস
খুবলে খাবে। লিকলিকে বিশাক্ত জিভে কপালে ছোবল মারবে। ছিঃ, সম্পর্ক এত ঠুনকো! চন্দনার ঘেন্না হয়। খুব ঘেন্না হয়। জন্তুর মত গরগর করতে করতে তপন বলল, ছিঃ, তুমি আমায় ঠকালে। আমি তোমার সঙ্গে আর ঘর করব ভেবেছ?
বলেই পায়ে চটি গলিয়ে জন্তুর মত গরগর করতে করতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল তপন।
কখন যে একটা ট্রেন এসে স্টেশনে থামল। তারপর চলেও গেল। টের পায়নি তপন। আচ্ছন্ন হয়ে বসেছিল বেঞ্চটায়। একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছিল।
কে যেন কাঁধে টোকা দিল।
তপন চমকে উঠল। ফিরে দেখে সূর্য। তুই! পুরনো বন্ধুকে অনেক দিন পর দেখে তীব্র বিষাদের মধ্যেও ভালো লাগল তপনের।
সূর্য হাসল। তপনের পাশে বসল বেঞ্চে ওপর । বলল, ট্রেন থেকে নেমেই দেখি তুই এখানে বসে আছিস। তুই যে কাঞ্চনপুরে থাকিস জানতাম না।
তপন ফ্যাকাশে হাসল। বলল, আছিস কেমন বল?
কাঁধ ঝাঁকিয়ে সূর্য বলল, বাউলের জীবন। কেটে যাচ্ছে একরকম।
আজও ঘুরে বেড়াচ্ছিস?
সূর্য হাসল।
তুই কি রে? বিয়ে থা করলি না। সংসারী হলি না? তপনের কন্ঠে মৃদু অনুযোগ। তবে তপন মনে মনে ভাবল, ভালোই তো, সূর্য ঘর বাঁধল না, বাঁধলে হয়তো মনে ব্যাথা পেত আমার মতো। আশ্চর্য! গতকালও আমি কি সুখি ছিলাম!
সূর্য হাসে। কাঁধ থেকে ঝুলি নামিয়ে সিগারেটের প্যাকেট বার করে।
তপন বলল, এখন চল আমার সঙ্গে।
কই?
তপন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তপন বলে, আমার বাড়ি। কাছেই । চল।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সূর্য বলে, ইয়ে, শোন তপন। কাঞ্চনপুরের শিবশঙ্কর রায়চৌধুরী আমার অপেক্ষায় রয়েছেন।
শিবশঙ্কর রায়চৌধুরী? কেন? তপনের ভ্রুঁ কুঁচকে ওঠে।
সূর্য এদিক-ওদিক তাকিয়ে নীচুস্বরে বলল, তিনি মাস কয়েক আগে হঠাৎ করেই পুরনো দিনের কিছু মোহর পেয়ে যান । জানিস তো ওরা এককালে কত বড় জমিদার ছিল?
হুঁ। তপন গম্ভীর ভাবে মাথা ঝাঁকায়।
এখন সমস্যা হল শিবশঙ্কর রায়চৌধুরী মোহরগুলির সালতারিখ নির্ধারণ করছে পারছেন না। সেজন্যই আমাকে ডেকেছেন।
তপন বলল, আচ্ছা, সে না-হয় বুঝলাম। পুরাতত্ত্বের ব্যাপার। নে, এখন আমার সঙ্গে চল। তোকে যত শীঘ্রি সম্ভব ছেড়ে দেব। কথা দিচ্ছি।
চন্দনা ঘরের আলো নিভিয়ে বসে ছিল। চিঠি হাতছাড়া হওয়ায় ভীষণ হতাশ লাগছিল ওর । এতকাল চিঠিটা যখের ধনের মতো আগলে রেখেছিল চন্দনা। চিঠিটা আর তন্ময়কে দেওয়া হয়নি । তার আগেই তন্ময়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ছিল স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল চন্দনা। ... আজ ছুটির দিন। তপন বইয়ের খোঁজে আলমারী খুলেছিল। তখন ... তখন মাধুকরী বইটার ভিতর ভাঁজ করা চিঠিটা পায় তপন। ... তপন এখন বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে চাইছে। তপন এখন ডির্ভোস কোথায় যাব? চন্দনা ডুকরে কেঁদে ওঠে। চোখেমুখে অন্ধকার দেখে। চন্দনা ছোট থাকতে মা-বাবা কে হারিয়েছে। আত্মীয়স্বজনের কাছে মানুষ। একবার আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল ...কিন্তু চন্দনার ভিতরে যে প্রাণের স্পন্দন । ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। ওর তো কোনও দোষ নেই ...
দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে। উঠে দাঁড়ায় চন্দনা । তপন এল কি? ভীষণ নার্ভাস লাগছে। আঁচলে চোখ মুছে নেয়। আলো জ্বালায়। দরজা খুলতেই তপন বলল, দেখ চন্দ্রা, কাকে নিয়ে এসেছি।
বারান্দায় আলো জ্বলে ছিল। সেই আলোয় চন্দনা দেখল তপনের পাশে লম্বা এক যুবক দাঁড়িয়ে। যুবকের পরনে চুড়িদার পাজামা আর কালো রঙের পাঞ্জাবি। গায়ের রং শ্যামলা। মুখে চাপ দাড়ি। চোখে চশমা। কাঁধে ঝুলি। মিটমিট করে হাসছিল। ভারি মিষ্টি হাসি।
তপন বলল, চন্দ্রা, এ হল সূর্য। আমার বন্ধু । বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিল সূর্য ।
চন্দনা হাত জোর করে নমস্কার করে।
সূর্য চন্দনার বিষন্ন সুন্দর শ্যামলা মুখের দিকে তাকায়। মিটমিট করে হাসে । চন্দনা কুঁকড়ে ওঠে। বলে, আসুন। ভিতরে আসুন। বসুন।
তপন আর সূর্য ভিতরে ঢোকে। তপন চন্দনার দিকে তাকিয়ে চোখের ইঙ্গিত করে। চন্দনা বলে, সূর্যদা আপনি একটু বসুন। আমি এখুনি আসছি।
বলে রান্নাঘরে চলে এল চন্দনা।
আজ তেমন রান্নাবান্না হয়নি। এখন চুলায় চায়ের জল চাপিয়ে বঁটির সামনে বসে চাল কুমড়ো কুটতে বসল। কুচো চিংড়ি দিয়ে চাল কুমড়ো রাঁধবে। সকালে কুচো চিংড়ি জলে ভিজিয়ে রেখেছিল। বড়া ভাজবে । ঘরে আতপ চাল আর বেসন আছে। ভাত, ডাল, চাল কুমড়ো দিয়ের কুচো চিংড়ির তরকারি, কুচো চিংড়ির বড়া, দই। ব্যাস।
খেতে খেতে সূর্য উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, রান্না অপূর্ব হয়েছে বউদি।
চন্দনা হাসে।
আসলেই চন্দ্রার রান্নার হাত ভালো। তপন বলল।
চন্দনা স্বামীর দিকে তাকায়। বন্ধু আসার পর থেকে তপন কেমন বদলে গিয়েছে। ভাগ্যিস সূর্যদা এসেছেন। নইলে ... ভাবতে পারে না চন্দনা।
তপন বলল, সূর্য কিন্তু কবিতা লেখে চন্দ্রা।
অমাঃ, তাই? সূর্যর দিকে পটলচেরা চোখে তাকায় চন্দনা। চোখে বিদ্যুতের ঝিলিক।
তপন মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। সূর্য খোলামেলা কবিতা লিখত বলে মেয়েরা ওর কবিতা খুব পছন্দ করত।
কী রকম শুনি ? সূর্যর প্লেটে এক চামচ আচার তুলে দিতে দিতে চন্দনা বলল।
একবার সূর্য লিখেছিল, রেখেছি হাত সাদা জোছনার তুলতুলে স্তনে ...
চন্দনা মুখে আঁচলচাপা দেয় । হাসে। বেশ লোক তো! জোছনা রাতকে নারী মনে করেন। আর কেমন রান্নার প্রশংসা করলেন। এমন করে তো সচরাচর কেউই প্রশংসা করে না। সূর্যদা একেবারেই অন্যরকম মানুষ। কবি। সেজন্যেই হয়তো। চন্দনা ভিতরে ভিতরে খুব কাঁপছে। খুব ইচ্ছে করছে কবির সঙ্গে দীঘির পাড়ে বসে সারারাত গল্প করতে। কিন্তু, ইচ্ছে করলেই বা কী। সে স্বাধীনতা কি আছে? সংসারে মেয়েরা পুরুষের ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছেগুলি জলাঞ্জলি দিতে দিতে স্নায়ূবিক অসুখ বাঁধিয়ে কোনওমতে বেঁচে আছে।
খাওয়ার পর তপন আর সূর্যদা বাইরে চলে যায়। সিগারেট খেতে হয়তো। কতকাল পর বন্ধুকে কাছে পেয়েছে। তাছাড়া আজ রাতে ঝরঝরে জোছনাও ফুটেছে। বাড়ি সামনে বিশাল কামিনীর দীঘি। দীঘির পাড়ে কলাঝোপ। আধোঅন্ধকারে জোনাক পোকা জ্বলে আর নিভে। কলাঝোপের পাশে রেললাইন। দীঘির চারধারে চারটি পুরাতন পাথরের ঘাট। সেই ঘাটেই বসল ওরা।
বারান্দায় এসে দাঁড়ায় চন্দনা। তার আগে আলো নিভিয়ে দেয়। দূর থেকে দেখে ওদের। অভিমানে বুক উথলে ওঠে ওর। আমার বিরুদ্ধে তপন সূর্যদাকে কত কথা বলে যাচ্ছে এই মুহূর্তে । সূর্যদার মন বিষিয়ে দিচ্ছে। এক এক করে বলে যাচ্ছে আমি কীরকম নষ্টা! বিয়ের আগে একজনের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল ... তার প্রমানও তো তপনের কাছে আছে। হয়তো তন্ময়ের কাছে লেখা চিঠিটা দেখাবে তপন যদি এখনও চিঠিটা না ছিঁড়ে ফেলে থাকে ...
তন্ময়ের কাছে লেখা ওই শেষ চিঠিটার জন্য চন্দনার বুকটা হুহু করে ওঠে । দীঘি পাড় থেকে অশান্ত ভেজা বাতাস ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে চন্দনাকে। তন্ময়ের শ্যামল মুখখানি স্মরণ করে কতকাল পর এই জোছনা ঝরা রাতের অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে চন্দনা।
তারপর দিঘির পাড়ে বসে থেকে দু’বন্ধুর কত যে কথা হল ...
তপন একসময় ঘরে ফিরে আসে।
একা।
সূর্যদা এলেন না?
তপন পাঞ্জাবি খুলতে-খুলতে বলল, না।
চন্দনা বিষন্ন বোধ করে। মনে মনে ভাবল: কেন সূর্যদা এলেন না? আশ্চর্য! এত নিষ্ঠুর মানুষ হয়! রান্নার প্রশংসা করলেন। চায়ের প্রশংসা করলেন। আমার দিকে বার কয়েক মুগ্ধ চোখে তাকালেন পর্যন্ত । রাতে থাকবেন ভেবেছিলাম ...আশ্চর্য!
কাঁধে তোয়ালে ফেলে তপন বলল, সূর্য ওরকমই। ছন্নছাড়া পাগল মানুষ। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। কোথাও বছর ভর থাকে, কোথাও দু’দিনও থাকে না। এমনই খেয়ালি ও।
চন্দনা চুপ করে থাকে। ভিতরে ভিতরে কাঁপন টের পায়। এখন যদি চিঠি আর ডির্ভোসের প্রসঙ্গটা তোলে তপন?
বাথরুম যাওয়ার আগে নরম সুরে তপন বলল, কাল সকালে তোমায় চেক আপ করাতে ডাক্তার সিকদারের চেম্বারে নিয়ে যাব।
চন্দনা চমকে ওঠে। তারপর আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে দৌড়ে পাশের ঘরে চলে যায়। ছোট্ট এই ঘরটা এ বাড়ির স্টোররুম। মেঝেতে চালডালের বস্তা আর মশলা - পেঁয়াজ ডালা রাখা । ছোট আলমারীও আছে একটা। তার তাকে কৌটায় টিনি-দুধ আর সর্ষের তেলের শিশি। স্টোররুমের বাতাসে পুরনো পেঁয়াজ-রসুন আর বাসী মশলার মিশ্র গন্ধ। চন্দনা ছাতা পরা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পা ছড়িয়ে বসে হু হু করে কাঁদে।
অন্ধকারে ...
... তারপর বছর ঘুরে যায়।
চন্দনার কোলজুড়ে খেলা করে এক শিশু । সারাক্ষণ ঘুরিয়ে - ফিরিয়ে ছেলের চাঁদমুখ দেখে চন্দনা। দেখতে-দেখতে ভাবে: ওই ছন্নছাড়া পাগল মানুষটা আমাকে এই ছেলেটা দিয়ে গেল। কিন্তু, সে তো আর এল না ... এই কথা মনে করে জানলার পর্দা ফাঁক করে আকাশের সূর্যের দিকে তাকায় চন্দনা। নাঃ, সূর্যের দিকে তো তাকিয়ে থাকা যায় না ... তবে জানলা গলে বিছানায় তার কিছু আলো এসে পড়ে। সেই উষ্ণ আলোর নাম রোদ। উদোম ছেলের গায়ে সর্ষের তেল মেখে রোদে ফেলে রাখে চন্দনা। আর ভাবে: এই একটুখানি রোদ-টোদ না পেলে মানুষ বাঁচে কী করে ...
উৎসর্গ: সকাল রায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


