এই অপরাহ্নে নলুয়া হাওরের উপর দিয়ে একটা খয়রামাথা গাঙচিল উড়ে যাচ্ছে। তারি পিছনে এক ঝাঁক ধুপনি বক। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ। আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি। আকাশটা কেমন নীল হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এলোমেলো বাতাস বইছিল। বাতাস মধুর, তবে হাওরের বাতাসে আঁষটে গন্ধও মিশেছিল। হাওরের পাড়ে মুথা ঘাসের নির্জন মাঠটি ঢালু হয়ে হাওরের জলে নেমে গেছে । জলের কিনারায় মেটে রাজহাঁস, খয়রা চখাচখি, পাতি চখাচখি আর ছোট পানকৌড়ি পাখির বিচিত্র কলরবে নির্জনতা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল । তাতে অবশ্য রাধারমনের ধ্যানভঙ্গ হয় না। মুথা ঘাসের মাঠে বসে রয়েছে ধ্যানমগ্ন রাধারমন। রাধারমনের পরনের ধুতি আর উড়নিটি পরিস্কার হলেও কোঁচকানো । তাতে ২৭ বছরের যুবকটির খেয়ালি স্বভাব ফুটে ওঠে। রাধারমনের গায়ের রং শ্যামল। কাঁধ অবধি ঝাঁকড়া চুল। মুখটা কেমন করুন। আর টলটলে চোখের দৃষ্টি বড় উদাস।
রাধারমনের বাড়ি কেশবপুর। জায়গাটি নলুয়া হাওরের কাছেই। মাঝে- মাঝে এই হাওরপাড়ের নির্জনে এসে বসে থাকে রাধারমন । একা। বসে বসে কত কী ভাবে। তখন রাধারমন মনে গানও আসে। গান কেন আসে? কোথা থেকে আসে? এই রকম বিচিত্র ভাবনার উদয় হয়। রাধারমনের জন্ম কেবশপুরেরই একটি বৈষ্ণব পুরকায়স্থ পরিবারে । বাবা রাধা মাধব দত্তও গান লিখতেন । রাধারমনের মনে গান আসাই তো স্বাভাবিক ...
হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে দূর থেকে একজন বলিষ্ট গড়নের দীর্ঘকায় বৃদ্ধকে আসতে দেখল রাধারমন। বৃদ্ধের পরনে কালো আলখাল্লা। মাথায় কালো পাগড়ী। বৃদ্ধ সম্ভবত কামেল পীর হবেন। গায়ের রং ধবধবে ফরসা। লম্বা পাকা দাড়ি। গলায় পুঁতির মালা। কাঁধে একখানা কালো ঝুলি। সত্তরের কাছাকাছি বয়স মনে হল পীর সাহেবের।
রাধরমন উঠে বসতে যাবে-বৃদ্ধ হাতের ইশারায় বসতে বললেন। তারপর ঘাসের ওপর বসলেন পীর সাহেব। বসতেই আতরের মিষ্টি গন্ধ পেল রাধারমন। পীর সাহেব কোমল কন্ঠে জিগ্যেস করলেন, কি নাম তোমার বাবা ?
রাধারমন দত্ত পুরকায়স্থ।
হুমম। তা রাধা মাধব দত্ত তোমার কে হয়?
রাধারমন অবাক। আশ্চর্য! পীর সাহেব আমার বাবার নাম জানেন? রাধারমনের বাবা রাধা মাধব দত্ত সর্বপ্রথম জয়দেবের গীতগোবিন্দ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন । সিলেট ও নদীয়ার শিক্ষিত লোকেরা বাবাকে বিলক্ষণ চিনত, শ্রদ্ধাও করত । তাই বলে একজন ফারসিভাষী পীর সাহেব বাবার নাম জানেন কি ভাবে?
রাধারমন বলল, রাধা মাধব দত্ত আমার বাবা।
হুঁ। পীর সাহেব মাথা নাড়লেন। বললেন, আমার নাম শাহ্ নাসির উদ্দীন। নিবাস মুর্শিদাবাদ। সিলেটে শাহ জালাল-এর দরগা জিয়ারত করতে এসেছিলাম । বড় কামেল পীর ছিলেন শাহজালাল। বলে পীর সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আকাশের দিকে তাকালেন। আশ্বিনের নীল আকাশে একটি তিলিহাঁস উড়ে যাচ্ছে।
রাধারমন মাথা নাড়ে।
... সে জানে পূণ্যভূমি সিলেটের অন্যতম পূণ্যাত্মা হলেন শাহ্ জালাল পীর । মারাফত-সম্প্রদায়ের অন্যতম কামেল পীর শাহ্ জালাল । মারাফতের নানা দিক সম্বন্ধে রাধারমন তার বাবার কাছে জেনেছিল। মারাফাতের মূলে আল্লাহর প্রতি প্রেম বা আল্লাহর প্রতি অনুরাগ। যেমন কৃষ্ণর প্রতি রাধার অনুরাগ বা প্রেম । কেবল ভিন্ন সম্প্রদায় হওয়ায় ভাষা ও শব্দ বদলে গেছে । মূলতত্ত্ব ওই একই। আল্লার ভিতরে বান্দার বিলীন হওয়ার আর্তি।
পীর সাহেব চারিদিকে বলেন, আমার এই পানি ভরা অঞ্চল ভালো লাগে। সিলেট এলে একা একা ঘুরে বেড়াই। মনের ভিতরে কী রকম দোলা লাগে। আমি একজন সংসারত্যাগী মিসকিন। ত্রিভূবনে আমার কেউ নেই। মুর্শিদাবাদের নবাবদের মাজারে খাদেমগিরি করি ...আমার বয়েস হয়েছে। আমার আর কোনও চাওয়া-পাওয়া নাই। জীবদ্দশায় যদি আল্লাহ একবার দর্শন দিতেন ।
ওহ্ । রাধারমন কেঁপে উঠল। রাধারমন নিজেকে রাধা মনে করে। রাধা ভাবে কৃষ্ণের দর্শন চায় রাধারমন। হায়, সেই দর্শন যে সহজে পায় না ... এই বিরহ মনের ভিতরে গভীর দুঃখের অনুভূতি সৃষ্টি করে ...
পীর সাহেব বললেন, বহু বছর আমার এদিকে আসা হয় না। কুড়ি বছর আগে একবার এদিকটায় এসেছিলাম। তখনই রাধামাধব দত্ত মানে তোমার বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।
রাধারমন অস্ফুটস্বরে বলে, আপনি কি আমার বাবাকে চিনতেন?
পীর হেসে বললেন, তিনিও এই হাওরের পাড়ে বসে থাকতেন। এই তোমার মতোই । আল্লাহর ধ্যানে নির্জনতা আবশ্যক।
ওহ্ । বলে আকাশের তাকালো রাধারমন । আশ্বিনের নীল আকাশে একটি কালালেজ জৌরালি পাখি উড়ে যাচ্ছে। রাধারমনের বুকটা হুহু করে ওঠে। বাবা বেঁচে নেই। সেই শোক আজও পোড়ায়। তা ছাড়া বাবা ছিলেন রাধারমনের আধ্যাত্মিক গুরু। বৈষ্ণব সাধন-মার্গের দীক্ষা বাবার হাতেই হয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর রাধারমন দিশেহারা ও বিষন্ন বোধ করে । একা একা হাওর পাড়ে বসে থাকে। বাবার স্মৃতিচারণ করে। গায় গায়...
... রাধারমনের পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজবৈদ্য। তাদেরই অন্যতম হলেন চক্রপানি দত্ত। তাঁরই বংশধর রাধা মাধব দত্ত যে কবি হবেন তা কে ভেবেছিল? রাধারমনের মায়ের নাম সুবর্ণা দেবী। স্নেহময়ী মা। এখন স্বামীর শোকে চোখের জল ফেলেন। বাবা বেঁচে থাকতেই গুনময়ীকে বিবাহ করে ঘরে তুলেছে রাধারমন। গুনময়ীর পিতার নাম নন্দকুমার সেন। নিবাস মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রাম। নন্দকুমার সেন এর পূর্বপুরুষ শিবানন্দ। ইনি শ্রীচৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ ছিলেন ... তবে সব ছাপিয়ে বাবার স্মৃতিই চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ... বালক রাধা ছিল বাবার চোখের মনি ... কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন বাবা ... অক্ষর জ্ঞান দিয়েছেন। ছেলেকে নিয়ে হাওরের পাড়ে বসে থাকতেন। গান করতেন। একবার ... বাবার সঙ্গে বিশ্বনাথের বৈখাশী মেলায় গিয়েছিল বালক রাধা । পহেলা বৈশাখে মেলা বসে। সহসা ঝড় উঠল। ধুলি ঝড়। বালক রাধা চোখেমুখে অন্ধকার দেখে । বাবা কে দেখতে পাচ্ছে না । এলোমেলো হাঁটছিল, আর কাঁদছিল ... ঠিক তখনই অন্ধকার ধুলিঝড়ের ভিতরে কে যেন হাত টান দিল ... কে? অনেকক্ষণ বুঝতে পারেনি। পরে বিমলা বৈষ্ণবী কে দেখে কান্না থামিয়েছিল বালক রাধা । বিমলা বৈষ্ণবী বালক রাধার দূর সম্পর্কের পিসি হন। বিমলা পিসিই বাড়ি পৌঁছে দিল। পরে বাবা বাড়ি ফিরে বালক রাধাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না ...কিশোর বয়েসে বাবাই একতারা তুলে দিয়েছিল হাতে। কিশোর রাধা একদিন একতারা হাতে গুনগুন করে গাইছিল:
শামরে তোমার সনে, শামরে তোমার সনে।
একেলা পাইয়াছি রে শাম এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলব রে শাঁই ...
গান শুনে বাবা কিশোর রাধাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্না । কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বাঙালি জাতি আমাদের সবাইরে ভুইলা গেলেও তোরে ঠিকই মনে রাখব দেখিস । বাঙালি একদিন রাধারমনের গান শুনব দেখিস ।
সেই কথা মনে করলে শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে ।
পীর সাহেব বললেন, তোমার বাবা রাধামাধব দত্ত আমায় গান শুনিয়েছিলেন। মাশহুর গান বাঁধতেন তোমার বাবা।
রাধরমন জানে বাবার গায়কী ছিল অসাধারণ। বাবা যখন গাইত-
নিতাই করিয়া আগে চলিলেন অনুরাগে
আইলা সভাই শান্তিপুরে
মুড়াইছে মাথার কেশ ধর্যাছে সন্ন্যাসীর বেশ
দেখিয়া সভার প্রাণ ঝুরে।
তখন শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠত।
তুমি কি গান কর বাবা ? পীর সাহেব জিগ্যেস করলেন।
রাধারমন মাথা নাড়ে।
শুনি, কেমন গাও তুমি? বলে পীর সাহেব নড়েচড়ে বসলেন।
রাধারমন গান ধরল:
আমার বন্ধু দয়াময়
তোমারে দেখিবার মনে লয়।
শাহ্ নাসির উদ্দীন চোখ বুজলেন । তিনি মুর্শিদাবাদ-এর মানুষ। ওখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব নেই । বাংলা তিনি ভালোই বোঝেন। গান শুনতে-শুনতে তাঁর ঘোর লাগে। গানে এক বন্ধুর কথা আছে। দয়াময় বন্ধু। যাকে দেখার আশায় সতের বছর বয়েসে সংসার ত্যাগ করেছেন শাহ্ নাসির উদ্দীন। তিনি মুর্শিবাদের নবাবদের ঘনিষ্ট আত্মীয়। তবে তাঁর স্থূল নবাবী জীবনের ভোগবিলাস ভালো লাগেনি। কিশোর বয়েস থেকে হিন্দুস্তানের নানা স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছে। পারস্য গিয়েছেন। মক্কা শরীফে গিয়ে হজ করেছেন। মনে মধ্যে কেবল একটিই আর্তি ...
আমার বন্ধু দয়াময়
তোমারে দেখিবার মনে লয়।
চোখ বুজে দুটি চরণই বারবার গাইল রাধারমন। যেন দু পঙতিতেই সম্পন্ন হয়েছে গান। প্রকাশ পেয়েছে মনের ভাব। যেন আর কিছু বলার নাই।
এক সময় গান শেষ হল ...
চোখ খুলল রাধারমন। আশ্চর্য! পীর সাহেব নেই। কেবল হাওরের জলের কিনারে ভুতিহাঁস, কোড়া, ধলাবুক ডাহুক আর মেটেমাথা টিটি পাখির কলরব। পীর সাহেব কোথায় গেলেন? নাকি তিনি আসেননি? আমি কাউকে দেখিনি? সবই কল্পনা? আমার বিভ্রম ঘটেছিল? কিন্তু তা কি করে হয়? বাতাসে এখনও আতরের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে।
হঠাৎ চোখে পড়ল ... ঘাসের ওপর একটি রুমাল পড়ে আছে। হলুদ রঙের বেশ বড় রুমাল। ভাঁজ করা। রাধারমন ঝুঁকে রুমাল তুলে ভাঁজ খুলে দেখে রুমালের ভিতরে তিনটি শুকনো আখরোট, কয়েকটা কিসমিস আর একটি সোনার মোহর রয়েছে।
রাধারমনের শরীর কেঁপে ওঠে।
দরবেশ আমাকে প্রণামী দিয়ে গেলেন? আমার গান ভালো লেগেছে তাঁর ? আমাকে আর্শীবাদ করে গেলেন? রাধারমন অভিভূত বোধ করে। এক রকম ঠিক করাই ছিল যে গানের জন্যেই রাধারমন তার জীবন নিবেদন করবে। এখন হাতের মুঠোয় সোনার মোহর নিয়ে সে ইচ্ছে আরও প্রগাঢ় হয়ে উঠল । শেষ বেলার রোদে ঝিকিয়ে ওঠে মোহর। ... এই হাওরের পাশে কীর্তনের একটি আশ্রম খুলবে রাধারমন। তারপর গান বাঁধবে। একটার পর একটা। ভাবতে ভাববে ভাব আসে রাধারমনের । চোখ বুজে ফেলে রাধারমন । তারপর গাইতে থাকে-
ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে ভ্রমন কইও গিয়া।
ভ্রমর রে, কইও কইও কইও রে ভ্রমর কৃষ্ণরে বোঝাইয়া
মুই রাধা মইরা যাইমু কৃষ্ণ হারা হইয়ারে
ভ্রমর কইও গিয়া ।
ভ্রমর রে, আগে যদি জানতাম রে ভ্রমর যাইবারে ছাড়িয়া
মাথার কেশর দুই ভাগ করি রাখিতাম বান্ধিয়ারে,
ভ্রমর কইও গিয়া ।
ভ্রমর রে, ভাইবা রাধারমন বলে শোনরে কালিয়া
নিভভা ছিল বুকের আগুন কে দিলায় জ্বালাইয়ারে ...
ঘটনাটি কাল্পনিক ...
রাধারমন দত্তের জীবনীর জন্য বাংলাপিডিয়ার ওপর নির্ভর করেছি।
উৎসর্গ: তপন বাগচী।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



