গুয়েতেমালার মানচিত্র। গুয়েতেমালার উত্তরে পেটেন প্রদেশ । এখানেই খ্রিস্টীয় ষষ্ট-সপ্তম শতকে লক্ষ মানুষের কর্ম-কোলাহলে জমজমাট হয়েছিল তিকাল নগর।
নবম শতকে মায়ারা তিকাল নগরটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর হাজার বছর ধরে বৃষ্টিবনে ঢেকে ছিল। ১৮৪৮ সালে স্প্যানিশ সরকারের উদ্যেগে প্রগাঢ় বৃষ্টিবনের অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসে তিকাল । তারপর থেকেই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা তিকালে এসে খনন কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ইউনির্ভাসিটি অভ পেনসিলভানিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ বিশেষ অবদান রেখেছে । তারা প্রায় ১৩ বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করে মাটির আড়ালে চলে যাওয়া বিভিন্ন মায়া স্থাপনা উদ্ধার করে।
তিকালের অনেক স্থাপনা এখনও মাটির নীচে ঢাকা পড়ে রয়েছে।
তিকাল সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের পুরো জায়গার আয়তন প্রায় ২৪ বর্গমাইল। তবে এর ৮০% ভাগ জায়গায় এখনও খননকার্য করা সম্ভব হয়নি। এবং মাত্র ৪০% ভাগের মানচিত্র তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিকালের প্রধান ধর্মীয় কৃত্য কেন্দ্রের (সিরোম্যোনিয়াল কমপ্লেক্স) চতুর্দিকে ২২০ বর্গমাইল নিবিড় বৃষ্টিবন। এ কারণেই মায়া সভ্যতা কে প্রকৃত অর্থেই অরণ্যসভ্যতা বলা যায়।
তিকাল জাতীয় উদ্যানে মায়া স্থাপত্য
তিকাল ঘিরে ২২০ বর্গমাইল নিবিড় বৃষ্টিবন কে গুয়েতেমালা সরকার জাতীয় উদ্যান বা তিকাল ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে গড়ে তুলেছে। মধ্য আমেরিকায় এটিই প্রথম এ ধরণের জাতীয় উদ্যান। তিকাল জাতীয় উদ্যানে বিস্তর পশু- পাখির সমারোহ। পশুদের মধ্যে তাপির জাগুয়ার কুমির কুগার বানর এবং হরিণ উল্লেখযোগ্য । পাখিদের মধ্যে টিয়া ম্যাকাও টার্কি এবং হামিং বার্ড । এরাই দিবারাত্র বৃষ্টিবন মূখর করে রাখে। আধুনিক পর্যটকের মনে আদিম অরণ্যের অনুভূতি । নিবিড় বৃষ্টিবনের ভিতরে পুরনো উপসানালয়ের শ্যাললা ধরা দেয়াল। এসব কারণে অনেকেই তিকাল কে One of the most spiritually powerful spots on earth. মনে করে।
তিকাল সাইট ম্যাপ। উত্তরে অ্যাক্রোপলিস । দক্ষিণে প্রধান চত্তর বা গ্র্যান্ড প্লাজা। এর দু’পাশে দুটি বিখ্যাত উপাসনালয়।
তিকাল সভ্যতার সূচনা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান। ক্রমশ নগরটি মধ্য আমেরিকায় অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অন্যান্য মায়া নগরের সঙ্গে তিকাল নগরের ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। এমন কী মেক্সিকো উপত্যকার টিওটিহুয়াকান নগরের সঙ্গে তিকালের সম্পর্কের কথা জানা গেছে। ৪র্থ শতকে টিওটিহুয়াকান তিকাল আক্রমন করেছিল ।
প্রধান চত্বর বা গ্র্যান্ড প্লাজা। এর উপরিভাগটি আস্তর করা এবং সামান্য ঢালু হয়ে খালের দিয়ে গড়িয়ে গেছে। খালে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা হত। চলচ্চিত্র পরিচালক Mel Gibson Zuvi তাঁর Apocalipto ছবির মডেল হিসেবে এই প্লাজাকে নির্বাচিত করেছিলেন।
তিকালে বছরে গড়ে ৭৬.৬ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। ঘন বৃষ্টিবনের এটিই কারণ। ঘন অরণ্য ছাড়াও তিকালে চুনাপাথরের খাড়ি এবং জলাভূমি রয়েছে। গ্র্যান্ড প্লাজাটির অবস্থান সামান্য উচুঁ জায়গায়। জলাভূমির ওপর দিয়ে নির্মিত কজওয়ে দিয়ে যেতে হয়।
কজওয়ে। মায়ান ভাষায় Sacbe ... কজওয়ে উপাসনালয় এবং প্লাজার একমাত্র সংযোগ। নগর কেন্দ্র থেকে কয়েক কিলোমিটার কজওয়ে চলে গেছে। কজওয়ে নির্মাণে চুনামাটি ব্যবহার করা হত।
বৃহৎ মায়ানগরটিতে পানির উৎস ছিল বৃষ্টি। এ প্রসঙ্গে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক মন্তব্য করেছেন, The absence of springs, rivers, and lakes in the immediate vicinity of Tikal highlights a prodigious feat: building a major city with only supplies of stored seasonal rainfall. জলাধারে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হত। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ তিকাল নগরে এ রকম একটি জলাধার আবিস্কার করেছেন।
টেম্পল অভ দি গ্র্যান্ড জাগুয়ার। এর অন্য নাম এল গ্রান জাগুয়ার। এটি চুনাপাথরে ধাপসংবলিত পিরামিডটি ‘টেম্পল ওয়ান’ নামেও পরিচিত। এই উপাসনালয়টিতে ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৪ সাল অবধি খনন কার্য চলে। নির্মাণকাল আনুমানিক ৭৩০ খ্রিস্টাব্দ।
টেম্পল অভ দি গ্র্যান্ড জাগুয়ার-এর উচ্চতা ১৫৪ ফুট । উপাসনালয়ের নাম গ্র্যান্ড জাগুয়ার রাখার কারণ আছে। মায়া রাজা বসে আছেন একটি জাগুয়ারসদৃশ সিংহাসনের ওপর-এমন একটি ছবি ওই উপাসনালয়ে আবিস্কৃত হয়েছে। এই মায়া রাজার নাম জাসাও চান কাউইল ( এঁর শাসনকাল ৬৮২ থেকে ৭৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। রাজা জাসাও চান কাউইল-এর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল ওই উপাসনালয়ে ।
টেম্পল অভ দি গ্র্যান্ড জাগুয়ার। এই ছবিটি উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তোলা। মায়া সভ্যতায় চাকার ব্যবহার ছিল না, এমন কী ধাতুর ব্যবহার ছিল না। হয়তো এক একটি কাঠামো নির্মাণ করতে ১০০ কি ১৫০ বছর কেটে গেছে। আর, মায়ারা গণিত এবং জ্যোর্তিবিদ্যায় অনেক অগ্রসর ছিল ...
ঘন নিবিড় প্রায় বিচ্ছিন্ন বৃষ্টিবনে মায়াদের উন্নতির কি কারণ? কি ভাবে টিকে ছিল তিকাল নগর? মায়ারা এক নিবিড় কৃষি কৌশল বা Intensive agricultural techniques আবিস্কার করেছিল। এই পদ্ধতি অরণ্য পুড়িয়ে চাষাবাদ করার চেয়েও অনেক উন্নত ছিল।
টেম্পল অভ দি মাস্ক। ১২৫ ফুট উঁচু এই খ্রিস্টীয় অস্টম শতকে নির্মিত । অবশ্য ছাদসহ এর উচ্চতা ১৩৮ ফুট। সিঁড়ি ৩৪ ফুট চওড়া। ভিতটি ১২৩/১৩০ ফুট। রাজার জাসাও চান কাউইল- এর স্ত্রীকে এই উপাসনালয়টি উৎসর্গ করা হয়েছিল। অবশ্য রানীর সমাধিটি উপাসনালয়ের ভিতরে পাওয়া যায়নি। উপাসনালয়ের শীর্ষে একটি দরজার ওপর কাঠের তক্তার ওপর রানীর প্রতিকৃতি পাওয়া গিয়েছে।
তিকাল এর আবাসিক এলাকাটির আয়তন প্রায় ৬০ বর্গ কিলোমিটার। বেশির ভাগই ধ্বংসস্তূপ পরিস্কার করা আজও সম্ভব হয়নি। তেমন খনন কার্যও হয়নি। তিকাল নগরের লোকসংখ্যা ১০,০০০ থেকে ১,০০০০ হলেও নগরের আশেপাশে এই সংখ্যা ৪২৫,০০০ বলে পন্ডিতেরা অনুমান করছেন। আবাসিক এলাকার কাছে দূর্গ ও পরিখা আবিস্কৃত হয়েছে। ওগুলি মাটির বড় ঢিবির আড়ালে ছিল।
উত্তর অ্যাক্রোপলিস। এর নির্মানকাল ৩৫০ খ্রিস্টপূর্ব। এখনে গভীর পরিখার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। উত্তর অ্যাক্রোপলিস মূলত পরবর্তীতে শাসকদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল । সমস্ত এলাকাজুড়ে রয়েছে দেবতাদের মুখোশ, রাজকীয় প্রতিকৃতি, স্তম্ভ, তাতে হায়ারোগ্লিফিক লিপি ছড়িয়ে রয়েছে।
কৃষিকাজের উদ্বৃত্ত থেকেই সভ্যতার উদ্ভব। তিকাল অঞ্চলে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের কৃষিকাজের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। পরবর্তী এক হাজার বছরের পরিক্রমায় তিকালে নগর সভ্যতা গড়ে ওঠে। প্রথম শতক থেকে অস্টম শতক অবধি ৩৩ জন শাসকের নাম জানা গিয়েছে। তবে তিকাল সভ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বৃষ্টির পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা তিলাক নগরের অন্যতম দূর্বলতা। তা ছাড়া বন উজার হলে খরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। যা তিকালের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৮৭০ শতকে স্থাপত্য নির্মাণের গতি শ্লথ হয়ে আসে এবং নগরের পতনের সূচনা হয় । নবম শতকে তিকাল নগরটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
তিকাল এর মায়া রাজা জাসাও চান কাউইল এর সমাধিতে প্রাপ্ত জেড মোজাইক ভাস।
১৫২৫ সালে স্প্যানিশ কনকুইসতাদোর হার্নান করতেস তিকালের ধ্বংসস্তূপের কয়েক কিলোমিটারের মধ্য দিয়ে গেলেও তিকাল নগরীটির কথা চিঠিপত্রে উল্লেখ করেননি। বিশাল ধ্বংসস্তূপটি বৃষ্টিবনে ঢেকে রইলেও স্থানীয় জনগন এর কথা কখনও ভোলেনি। তারাই উনিশ শতকের মাঝামাজি গুয়েতেমালার আবিস্কারকদের তিকাল নিয়ে গিয়েছে । তার আগে উনিশ শতকের চল্লিশের মার্কিন আবিস্কারক জন লয়েড স্টেফহেনস (১৮০৫-১৮৫২) এর লেখায় তিকাল- এর কথা প্রথম উঠে আসে।
স্টিলি নং ৩১। স্টিলি হল: লিপি বা ভাস্কর্যসংবলিত ফলক... এর রকম অনেক স্টিলি তিকালে পাওয়া গিয়েছে। স্টিলি নং ৩১ মায়া রাজা ২য় সিয়াজ চান কাউইল এর আমলের। বলা হয় Greatest Early Classic sculpture to survive at Tikal.
১৯৫১ সালে তিকালের কাছে ছোট একটি এয়ারস্ট্রিপ নির্মাণ করা হয়। এর আগে পায়ে হেঁটে কিংবা গাধার পিঠে চেপে ওখানে পৌঁছতে অনেক দিন লাগত। ১৯৫৬ সালে তিকালের মানচিত্র তৈরির কাজ শুরু হয়।
তিকাল নগরের মায়া দেবতা।
মায়াসমাজে নরবলির প্রচলন ছিল। কেননা মায়ারা বিশ্বাস করত দেবতাকে রক্ত উৎসর্গ করে সন্তুষ্ট করা যায় । নরবলির জন্য বন্দি করা হত । মায়া সভ্যতা মেক্সিকো, বেলিজ, এল সালভাদর, হন্ডুরাস এবং গুয়েতেমালায় ছড়িয়ে ছিল। সবটা মিলে বিশাল এলাকা। তবে মায়া সভ্যতার অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন নরবলির প্রথা, গণিত ও জ্যোর্তিবিজ্ঞানে উন্নতি। কুলকুলকান নামের সর্পদেবতার উপাসনা। ইত্যাদি।
এ জীবনে একবার ...একবার টেম্পল অভ দি মাস্ক- এর সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ...
গুয়েতেমালার রাজধানী গুয়েতেমালা সিটি থেকে প্রায় ১৮৮ মাইল উত্তরে তিকাল- এর অবস্থান । গাড়িতে গুয়েতেমালা সিটি থেকে ৭ ঘন্টার মতো সময় লাগে । অবশ্য গুয়েতেমালার পেটেন প্রদেশের রাজধানী ফ্লোরেস থেকে তিকাল জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব ৬৩ কিলোমিটার।
ঝুম বৃষ্টিতে এখানে আশ্রয় ...৭ম শতকে ফিরে যাওয়া কোনও মায়া কিশোর ...
উত্তর অ্যাক্রোপলিসে হাঁটতে- হাঁটতে বৃষ্টিদেবতার মুখোশ দেখে থমকে যাওয়া
এদেরই পূর্বপুরুষ এর খোঁজে ...কোনওদিন ...
তিকাল ডাকছে!
ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র:
http://www.eveandersson.com/guatemala/tikal
Click This Link
Click This Link
http://en.wikipedia.org/wiki/Tikal
Click This Link
http://www.tikalinformation.com/
http://www.mayankids.com/mmkplaces/mktikal.htm

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


