মামুন নদীয়া ছিলেন বাংলারই এক নিভৃতচারী বাউল । সর্বদা ধবল রঙের গেরুয়া পরতেন। চশমাপরিহিত মুখটি ছিল শ্যামল নিষ্পাপ । কথাবার্তার ভঙ্গিটি অত্যন্ত বিনীত । সেই মামুন নদীয়া কয়েক বছর হল ইহলোক ত্যাগ করেছেন। বড় নিঃশব্দে। তাঁর চলে যাওয়ার সময় দেশজুড়ে তেমন আলোরণ ওঠেনি । তিনি তো আর জাগতিক অর্থে ‘ধনী’ এবং ‘বিশিষ্ট’ ব্যক্তি ছিলেন না। মিডিয়া কখনও তাঁর পিছন পিছন দৌড়ায়নি, তাঁর খোঁজখবরও রাখেনি। তবে তাঁর স্বল্পকালীন জীবনটি পরিপূর্ণভাবে সার্থক হয়ে উঠেছিল । কেননা, জীবদ্দশায় তাঁর পরমের বোধ হয়েছিল।
এভাবে তাঁর জীবন সার্থক ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বাংলার মরমি দর্শন, যাকে আমরা বলি ‘ভাব’ - সেটি মামুন নদীয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ ভাবে উপলব্দি করেছিলেন । তাঁর অবিস্মরণীয় ‘আমার মন না চায় এ ঘর বাঁধি লো কিশোরী’ গানটিই তাঁর প্রমাণ।
আসুন, সেই গানে প্রবেশ করি।
আমার মন না চায় এ ঘর বাঁধি লো কিশোরী/প্রাণ না চায় এ ঘর বাধি লো কিশোরী/ চল না করি ফকিরি। শাঁইজির ওই নয়ন কোণে/ ফুলের কাননে/কত না কামিনী ফোটে রে/ রসিক মোরা (মওলা?) কেলে (খেলে?) ভ্রমরা/ গোপনে ফুলের মধু খাইল কিশোরী। ত্রিবেণীর শূন্যতে বেঁধেছে ঘরুপে (ঘররূপে?)/রূপকাষ্ঠের ছাউনি দিয়া রে।/ওই ঘরে ময়ূরূপে (ময়ূররূপে?) লুকাইছে মালিফে (মালিকে?)/ওয়াকিমুস সালাত কায়েম হয় লো কিশোরী।/নারীর ওই সিন্ধুমাঝে ভানুর এক কিরণ সাজে /তাহার মধ্যে প্রেমের বাঁচা রে।/মামুন নদীয়া বলে চল সখী গহীন জলে/শুদ্ধ প্রেম কেনাবেচা করি লো কিশোরী।
মামুন নদীয়ার এই গানের কিছু জায়গায় বাক্যচ্যূতি রয়েছে। যেমন: রসিক মোরা (মওলা?) কেলে (খেলে?) ভ্রমরা। কিংবা ... ওই ঘরে ময়ূরূপে (ময়ূররূপে?) লুকাইছে মালিফে (মালিকে?) ...এই বাক্যচ্যূতিকে ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে: Semantic Disturbance. যা এই গানটিতে অত্যন্ত সচেতনভাবেই করা হয়েছে। কিন্ত, কেন? প্রথমতঃ বাংলার মরমি লোকগানের এটি একটি সাধারণ বৈশিষ্ট । অনেক সময় আঞ্চলিক ভাষার প্রাবল্যের কারণেই এমনটি হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ বাংলার মরমি গানে কিছু আলোছায়া থাকেই। সন্ধ্যার ছায়ায় যেমন সবটা দিনের আলোর মতন পরিস্ফুট নয়, তেমনি । আর এরূপ অবোধগম্যতার কারণেই প্রাচীন তান্ত্রিক বৌদ্ধ কবিদের চর্যাপদের ভাষাকে বলা হত ‘সান্ধ্যভাষা’। সচেতন বাক্যচ্যূতি বা Semantic Disturbance বাংলার শৈল্পিক উত্তরাধিকার বলে মনে হয়।
যা হোক। এবার মামুন নদীয়ার গানটি বোঝার চেষ্টা করি। গানের সবটা যে বোঝা যাবে এমন সম্ভাবনা কম। এর কারণ মারফতি- বাউল গানে জটিল পরিভাষা ও প্রতীকের ব্যবহার। যে সমস্ত পরিভাষা ও প্রতীক নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বাইরে প্রায়শ অনালোচিত। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কী ভাবে মাতৃতান্ত্রিক বাংলার দীক্ষাটি মামুন নদীয়া এই বিশেষ গানটির শরীরে নিহিত রয়েছে, সেটি উপলব্দি করা মনে হয় সম্ভব।
আমার মন না চায় এ ঘর বাধি লো কিশোরী
প্রাণ না চায় এ ঘর বাধি লো কিশোরী
চল না করি ফকিরি।
মামুন নদীয়া উদাস প্রকৃতির মানুষ। তাঁর ঘরসংসারে মন বসে না। তিনি ঘর না বেধে বাউলের জীবন বেছে নিতে চান। ফকিরি করতে চান। আর লালন বলেইছেন : "ছাড়ো ফিকিরি (ধান্ধাবাজি), কর ফকিরি।" আর সেই কথাই এই গানের প্রথমেই মামুন নদীয়া পরিস্কার করেছেন। ফকিরি আর ঘরসংসার যে পরস্পরবিরোধী বস্তু- সেটি আমরা সবাই তিক্ত অভিজ্ঞতায় বুঝেছি। সংসারের সর্বত্র ক্ষুদ্র স্বার্থেরই জয়গান। পক্ষান্তরে ফকিরি পবিত্র এক মার্গ।
মামুন নদীয়া বাউলের জীবন বেছে নিতে চান। বেশ কথা।
কিন্তু, কথাটা তিনি একজন কিশোরীকে বলছেন কেন? কারণ, তিনি পথের সঙ্গীনি হিসেবে একজন কিশোরীর সাহচার্য চান। কিন্তু, কেন? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের অস্টম/নবম শতকের তান্ত্রিক বৌদ্ধদের একটি চর্যার পদ স্মরণ করতে হবে। চর্যার সেই পদটি হল:- তো বিনু তরুণি নিরন্তর ণেহে/ বোধি কি লভ ভই প্রণ বি দেঁহে। অর্থাৎ, তরুণির নিরন্তর স্নেহ বিনা বোধি বা Enlightenment লাভ করা সম্ভব না। মামুন নদীয়া বোধিলাভ বা পরমজ্ঞান লাভ করতে চান। কাজেই তিনি বাংলার পথেপ্রান্তরে সাধনসঙ্গীনি হিসেবে একজন কিশোরীর সান্নিধ্য কামনা করেন ।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রাচীনকালে বাংলায় যে তন্ত্রের উদ্ভব হয়েছি, চর্যার ওই পদটি সেই তন্ত্রচর্চারই ইঙ্গিত দেয়। তন্ত্র হল: বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নারীর সান্নিধ্য (sex না, পবিত্র সান্নিধ্য ) কামনা করা। অথচ একাদশ শতকের সেন যুগের বাংলায় তন্ত্রকে নিছক যৌনসম্ভোগ মনে করা হয়েছে বলে তন্ত্রের পতন হয়েছে । বাংলায় তন্ত্র-এর উদ্ভবের পর সে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতবর্ষজুড়ে। সেখান থেকে, অস্টাদশ-উনিশ শতকে, ইউরোপে, তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্টে। তন্ত্রের ভুল ব্যাখ্যার জন্য মার্কিন মুলুকে তন্ত্র হয়ে উঠল সীমাবদ্ধ Sex for Recreation মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্টে ফ্রি সেক্স এবং পর্নোগ্রাফির প্রসারের পিছনেও এই তন্ত্রের ভূমিকা রয়েছে বলে বলে আমার মনে হয়। কিন্তু, নিছক যৌনতার চর্চায় কোনও পরম বোধে উপনীত হওয়া যায় না। অন্যান্য নেশার ক্ষেত্রেও এই কথাই প্রযোজ্য। পরম বোধে উপনীত হওয়া চেতনাসম্পন্ন মানবজীবনের অন্যতম লক্ষ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এ্যানাক্সাগোরাসকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার জীবনের লক্ষ কি? উত্তরে এ্যানাক্সাগোরাস বলেছিলেন, আমার জীবনের উদ্দেশ্য হল বিশ্বজগৎ কে বোঝা। কাজেই পরম কোনও বোধে উপনীত হওয়ার জন্য যৌনতা নয়, বরং প্রয়োজন দর্শন এবং মননের চর্চা।
যাই হোক। তখন প্রশ্ন রেখেছিলাম যে মামুন নদীয়া কেন কিশোরীর সঙ্গ চাইছেন? এর খানিকটা যেন উত্তর পাওয়া গেল। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, বাংলার অন্যতম এক বৈশিষ্ট হল বাংলার লোকায়ত ধর্ম । (বাংলার লোকধর্ম সম্বন্ধে সুধীর চক্রবর্তীর ‘গভীর নির্জন পথে’ এবং অক্ষয় কুমার দত্তের ‘ভারতীয় উপাসক সম্প্রদায়’ এই বই দুটি দেখুন) ... প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে বাংলায় অনেক লোকধর্ম গড়ে উঠেছে। যেমন, কর্তাভজা, মতুয়া, বলাহাড়ি ইত্যাদি। বাউলসম্প্রদায়ও বাংলার একটি অন্যতম প্রধান লোকধর্ম। লালন তাঁর অনন্য প্রতীভার মাধ্যমে বাউলমতকে বাংলায় অসম্ভবত লোকপ্রিয় করে তুলেছেন, যা অপরাপর লোকধর্মের প্রবক্তাগণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে যাই হোক। বাংলার একটি লোকধর্ম হল: কিশোরীভজন। মতটির উদ্ভব সিলেটে। কিশোরীভজন। কি তাৎপর্যপূর্ণ নাম! মামুন নদীয়া তো কিশোরীকে ভজনা করছেন। কেন? তার কারণও চর্যার একটি পদের মাধ্যমের বোঝার চেষ্টা করেছি।
ঘরসংসার তুচ্ছ করে মামুন নদীয়া একজন কিশোরীর সঙ্গ নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়েছেন। কিন্তু, কেন? ফকিরি করবেন বলে। তো, ফকিরি কি? ফকিরি হল সৎ ও শুদ্ধপথে থাকা। পরমের সন্ধান লাভের চেষ্টা করা। Ultimate Reality -র স্বরূপ উপলব্দি করা।
যদি আল্লার সন্ধান চাও গো/ প্রেম রাখিও অন্তরের ভিতর
এই কথায় বিশ্বাস করা হল ফকিরি। ফকিরি মানে বাংলার মরমি দর্শনটিও গভীরভাবে আত্মস্থ করা। সেই সঙ্গে বিশ্বজগৎ এবং মানুষের উদ্ভব সম্বন্ধে একটি বোধগম্য ধারণায় উপনীত হওয়া। বাংলার পথেপ্রান্তরে ঘুরে ঘুরে সাধুদের সঙ্গ লাভ করে মামুন নদীয়ার সেরকম জ্ঞান লাভ হয়েছে বৈ কী। এবং সে জ্ঞানের আলোকে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে তিনি তাঁর গানে বলছেন:
শাঁইজীর ওই নয়ন কোণে/ ফুলের কাননে/কত না কামিনী ফোটে রে / রসিক মোরা (মওলা?) কেলে (খেলে?) ভ্রমরা (এই চরণে Semantic Disturbance রয়েছে) গোপনে ফুলের মধু খাইল কিশোরী।
মাতৃতান্ত্রিক বাংলার সৃষ্টিতত্ত্বের নারীর উপস্থিতি অনিবার্য। এই গানেও তাইই দেখি। কাজেই, শাঁইজী= আল্লাহ; ফুলের কানন=আল্লাহর ফুলের বাগান এবং কামিনী= নারী ধরে নিলে অর্থ এই দাঁড়ায় যে- আল্লাহর চোখের সামনে (নয়নের কোণে) ফুলের বাগানে কামিণী ফুটেছে। কিন্তু কেন?নিশ্চয় এর কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহ নিজের স্বরূপ প্রকাশ করবেন কামিনী= নারীর মাধ্যমে।
রসিক মোরা (মওলা?) কেলে (খেলে?) ভ্রমরা (এই চরণেও Semantic Disturbance রয়েছে)
এর মানে কি? এর মানে কি এই যে মওলা (আল্লাহ) নিজেই ভ্রমর হয়ে ফুলে ফুলে খেলা করছেন? অর্থাৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কামিনীদের নারীদের গর্ভবতী করছেন। এমনটি সম্ভব। কারণ, আল্লাহ নিরাকার থেকে আকার-এরকম একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। ডেনমার্কের দার্শনিক কিয়ের্কেগার্দ যেমন বলেছেন: ‘যা অসম্ভব তাই বিশ্বাসযোগ্য।’ কাজেই আল্লাহরূপী শাঁইজী নারীর মধ্যে তাঁর সৃষ্টিবীজ ফুঁকে দিয়েছে। এভাবে সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে ।
গোপনে ফুলের মধু খাইল কিশোরী।
এই ফুলের মধু কিন্তু মামুন নদীয়ার কিশোরী সাধনসঙ্গীনিটি খায়নি। ফুলের মধু খেয়েছে (অর্থাৎ সৃষ্টিবীজ ধারণ করেছে)
আল্লাহর বাগানের কামিনীরা । অর্থাৎ নারীরা ফুলের মধু খেয়ে গর্ভবতী হয়েছে। এবং আল্লাহর কুদরতে সৃষ্টির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কারণ, নারী বিনা সৃষ্টি তো সম্ভব না। যে কারণে বাংলার তন্ত্র বলে, নারী হল আদ্যবস্তু, যাকে দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে।
বোঝা গেল জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তারপর কি হল? সে বিষয়ে মামুন নদীয়া বলছেন:
ত্রিবেণীর শূন্যতে বেঁধেছে ঘরুপে (ঘররূপে?) (এই চরণে Semantic Disturbance রয়েছে)
রূপকাষ্ঠের ছাউনি দিয়া রে।
ওই ঘরে ময়ূরূপে (ময়ূররূপে?) লুকাইছে মালিফে (মালিকে?) (এই চরণেও Semantic Disturbance রয়েছে)
ওয়াকিমুস সালাত কায়েম হয় লো কিশোরী।
সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণিত হওয়ার পর পৃথিবীর সঙ্গে সাঁইজীর সম্পর্কের সরূপটি দেখিয়েছেন মামুন নদীয়া ।
ত্রিবেণীর শূন্যতে বেঁধেছে ঘরুপে (ঘররূপে?)
রূপকাষ্ঠের ছাউনি দিয়া রে।
ত্রিবেণী। অর্থাৎ তিনটি নদীর স্রোতের সঙ্গমস্থল। নদীর কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন পৃথিবীর কথাই ভাবা যায়। সেরকম একটি স্থানে কেউ একজন রূপকাষ্ঠের ছাউনি ঘর বেঁধেছে। বোঝা যায় সে ঘরের বাসিন্দা স্বর্গীয় কেউ। রূপকাঠের কথায় লালনের গান মনে পড়ে যায়।
পাড়ে কে যাবি/ নবীর নৌকাতে আয়।
রূপকাঠের অই নৌকাখানি/ নাই ডোবার ভয়।
ত্রিবেণীর শূন্যতে বেঁধেছে ঘরুপে (ঘররূপে?)
রূপকাষ্ঠের ছাউনি দিয়া রে।
ওই ঘরে ময়ূরূপে (ময়ূররূপে?) লুকাইছে মালিফে (মালিকে?)
ওয়াকিমুস সালাত কায়েম হয় লো কিশোরী।
অর্থাৎ তিনটি নদীর স্রোতের সঙ্গমস্থলে যে ঘরটি বাধা হল সে ঘরে মালিক (সাঁইজী) ময়ূররূপে লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু ময়ূরের রূপ ধরে কেন? বলা মুশকিল। ময়ূর কি কোনও কিছুর প্রতীক? ময়ূরের প্রসঙ্গ তো বাংলার লোকগানের একেবারে বিরল নয়।
কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে/ ফুলে বাইলা ভ্রমরা
ময়ূর বেশেতে সাজন রাধিকা।
অর্থাৎ রাধার কুঞ্জে কৃষ্ণ এসেছে, ফুলে ভ্রমর বসেছে, আর রাধা ময়ূরের বেশে সেজেছে। একটুকু তো বেশ পরিস্কার বোঝা যায়। কিন্তু এর সঙ্গে ... ওই ঘরে ময়ূরূপে (ময়ূররূপে?) লুকাইছে মালিফে (মালিকে?) এই কথার কি সম্পর্ক? আপাত দৃষ্টিতে নেই বলে মনে হয়, তবে ফুল, ভ্রমরা আর ময়ূরের সঙ্গে সৃষ্টিপূর্ব সাঁইজীর কাননের কোথাও যেন সাদৃশ রয়েছে। কোথায়? ... সে যাই হোক। যে ঘরে ময়ূররূপে মালিক লুকিয়ে রয়েছে সে ঘরে ‘ওয়াকিমুস সালাত’ কায়েম হয়। অর্থাৎ ‘নামাজ কায়েম হয়। নামাজ হল এবাদত বা ধ্যান বা Meditation। ঘর =যদি মানবদেহ হয়। আর বাউলের শাঁইজী যদি মানবদেহে বাস করেন তাহলে এখন অনেক গূঢ় বিষয়ই স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। অনন্তের অধীশ্বর সাঁইজী (আল্লাহ God বা ইশ্বর) কামিনী বা নারীর মাধ্যমে জগৎ এবং মানব সৃষ্টি করে সেই মানবের মাঝে বাস করে ধ্যান করছেন। এ জন্যেই লালন শিহরিত হয়ে বলছেন,
আল্লাহ, কে বোঝে তোমার অপার লীলে ...
সাঁইজী যে মানবদেহে বাস করে ধ্যান করছেন ... এ কথাটাই মামুন নদীয়া তাঁর সাধনসঙ্গীনি কিশোরীকে বলছেন:
ওয়াকিমুস সালাত কায়েম হয় লো কিশোরী।
মামুন নদীয়া এই পরম উপলব্দির জন্যেই তো ঘরসংসার ত্যাগ করে বাংলার পথ থেকে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবং গানটির শেষ চারটি চরণে মামুন নদীয়া বলছেন:
নারীর ওই সিন্ধুমাঝে ভানুর এক কিরণ সাজে
তাহার মধ্যে প্রেমের বাঁচা রে।
মামুন নদীয়া বলে চল সখী গহীন জলে
শুদ্ধ প্রেম কেনাবেচা করি লো কিশোরী।
এই নারী হল সাঁইজীর কাননের সেই কামিনী। যাকে দিয়ে সাঁইজী সৃষ্টি সম্ভব করে তুলেছেন। সৃষ্টির পর সেই নারীর সমুদ্রে ভানুর কিরণ (সূর্যের আলো) প্রতিফলিত হয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেছে। সেই বিস্ময়কর সুন্দর নারীর সমুদ্রের ভিতর প্রেমের অধিষ্ঠান। তাইই তো হওয়ার কথা। নারীর তো প্রেমের আধার, উৎস। মামুন নদীয়া আরও বলছেন, সেই নারী-সমুদ্রের গহীন অতলে রয়েছে সত্য। শিব (শুভ অর্থে) এবং সুন্দর। যে সত্য উপলব্দির জন্য আমি ঘর ছেড়েছি, সংসার তুচ্ছ করেছি । কিন্তু কি লাভ হল? কি শিক্ষা হল? কি দীক্ষা হল? পথের শেষে আমি কি পেলাম? সে প্রসঙ্গে মামুন নদীয়া বলছেন-মামুন নদীয়া বলে চল সখী গহীন জলে/শুদ্ধ প্রেম কেনাবেচা করি লো কিশোরী। এই শুদ্ধ প্রেমই তো জীবনের পরম পাথেয়। জীবনের মূল। আবার ফিরে যাই অস্টম শতকের তান্ত্রিক বৌদ্ধদের চর্যার সেই পদে- তো বিনু তরুণি নিরন্তর ণেহে/ বোধি কি লভ ভই প্রণ বি দেঁহে। ... স্বয়ং ঈশ্বর যে নারীর মাধ্যমে জগৎ সৃষ্টি করেছেন, সেই পরমতত্ত্ব লাভের উদ্দেশ্যে সেই নারীর ভজনা করা-মাতৃতান্ত্রিক বাংলার এইই পরম দীক্ষা। যে কারণে লালন বলেছেন, নারী হও। নারী ভজ। লালনের গুরু শ্রীচৈতন্যদেব বলেছেন, ‘আমার অন্তরে রাধা বহিরঙ্গে কৃষ্ণ।’ দশম শতাব্দীর বিক্রমপুরের বজ্রযোগীনি গ্রামের অতীশ দীপঙ্কর বলেছেন, জগতের সৃষ্টির মূলে রয়েছে বজ্র। বজ্র হল নারীরই এক অনিবার্য গুণ।
গানটির ডাউনলোড লিঙ্ক
Click This Link O Dhaka/Maarefoter Potaka/05 - Maqsood O Dhaka - Fokiri (Extelligence Explained) (music.com.bd).mp3.html

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



