প্রশ্নটা অনেক ঐতিহাসিকই উত্থাপন করেছেন। তা হল- ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্তির হয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ কি ছিল? এককালে ভারতবর্ষে যে ধর্মটি ছিল অপ্রতিরোধ্য, ভারতবর্ষ থেকে সেই ধর্মটির বিলুপ্তি ঘটল কি কারণে। এ বিষয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব রয়েছে। কারও মতে ভারতবর্ষে তুর্কি আক্রমন, কারও মতে বৌদ্ধধর্মের বার্ধক্য ও ক্লান্তি; কারও মতে বৌদ্ধ-মেধা চিনে পাচার হয়ে গিয়েছে, কারও মতে আবার অত্যধিক তন্ত্রের চর্চা বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটিয়েছে। আসলে এই যুক্তিগুলির কোনওটিই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় না। তার কারণ, তুর্কি আক্রমনের ফলে কেবল মাত্র বৌদ্ধধর্মেরই বিলুপ্তি ঘটবে কেন? অন্য ধর্মের বেলায় তো তেমন কিছু ঘটেনি। আর, কে না জানে-বৌদ্ধধর্মে যুগে যুগে নতুন রূপ লাভ করেছে; হীনযান থেকে মহাযান, মহাযান থেকে বজ্রযান; কাজেই ধর্মটির বার্ধক্য ও ক্লান্তির প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া মহাযানী বৌদ্ধদের এক ক্ষুদ্র অংশই চিনে গিয়েছিল। এবং তন্ত্রের প্রাধান্য ভারতের অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও তো দেখি। তাহলে?
আসলে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্তির হওয়ার প্রকৃত কারণটি বৌদ্ধধর্মের প্রকৃত স্বরূপের মধ্যেই নিহিত। তার আগে বলে নিই যে বৌদ্ধধর্মের মূল বিষয়গুলি সর্বভারতীয় হিন্দুধর্মের মধ্যে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে আজ আর তা আলাদা ভাবে চেনার উপায় নেই । এ প্রসঙ্গে Constance A. Jones এবং James D. Ryan লিখেছেন, Buddha (the Awakened One) is revered among contemporary Hindus, who usually consider Buddhism to be another form of Hinduism. The flag of India even shows the Dharma Chakraor “wheel of the law,” which is a Buddhist symbol. The places where the Buddha was born (Lumbini in NEPAL), preached his first sermon (Sarnath near BENARES [Varanasi]), where he died (Vaishali), and where he reached enlightenment (Bodhgaya) are still visited as holy places by Hindus. ( Encyclopedia of Hinduism. page,137) তা ছাড়া ভারতবর্ষে বুদ্ধকে বৈদিক দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়েছিল। মৎসপুরাণে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েচে । ভাগবতপুরাণেও বুদ্ধকে বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়েছিল। বুদ্ধকে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিষ্ণুর নবম অবতার মনে করা হয়। (আসলে, বুদ্ধ ছিলেন একজন দার্শনিক। ধর্মের দেশে দর্শনও ধর্মীয় রূপ লাভ করে বৈ কী! উল্লেখ্য, দার্শনিক কপিল ছিলেন বিশ্বের প্রাচীনতম সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা। ভারতীয়গণ তাঁকেও ‘মুনি’ বলে সম্বধোন করেন!) ... যা হোক। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম এবং তান্ত্রিক হিন্দুধর্মে একই নাম ও চরিত্রের দেবদেবী বর্তমান। হয়তো এ কারণেই বৌদ্ধশাস্ত্রের বিশিষ্ট পন্ডিত টি.ডব্লিউ. রিজ অনেকটা রসিকতা করে মন্তব্য করেছেন -‘গৌতমবুদ্ধ হিন্দু হিসেবেই
জন্মেছিলেন এবং হিন্দু হিসেবেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁর মতবাদ হিন্দু ঐতিহ্যেরই অন্তর্গত।’ স্বামী বিবেকানন্দ যখন বেদান্ত দর্শন প্রচারের জন্য রামকৃষ্ণ মঠ (এই ‘মঠ’ শব্দটি কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ) স্থাপন করলেন তখন তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের পরনের পোশাকটিও আমাদের বৌদ্ধভিক্ষুদের গেরুয়ার কথা মনে করিয়ে দেয় বৈ কী।
হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্মের এই অভিন্নতাই প্রমাণ করে যে-ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্মের ঠিক বিলুপ্তি হয়নি, সর্বভারতীয় হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ধর্মটি লীন হয়ে গেছে মাত্র। তাছাড়া পন্ডিতরা মনে করেন যে, ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মটি কোনওদিনই একটি সুসংগঠিত ধর্ম রূপে গড়ে ওঠেনি। বেদান্ত দর্শনের মতই বৌদ্ধধর্ম একটি বিশেষ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী মাত্র, যে দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বনে বিভিন্ন ধরনের সাধনপদ্ধতি বিভিন্ন যুগে গড়ে উঠেছিল। অনেক পন্ডিত আবার বৌদ্ধধর্মকে একটি দার্শনিক ভাবধারা হিসেবে বিচার করেন। কাজেই, ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্ম একটি সুসংগঠিত ধর্ম হিসেবে গড়ে উঠলেও ভারতবর্ষে তেমনটি প্রয়োজন ছিল না। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্ম ছিল মূলত মঠবাসী ভিক্ষুদের জীবনচর্যা; যাঁরা মঠ বা বিহারে বাস করে জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা শাখার চর্চা করতেন, জীবনের রহস্য নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেন এবং বইপত্র লিখতেন। ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ, তারা যে ধর্মেরই হোক না কেন, বৌদ্ধভিক্ষুদের গভীর ভাবে সম্মান করতেন এবং তাদের বেঁচে থাকবার জন্য যথাসাধ্য দান করতেন। বৌদ্ধমঠের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয় রাজন্যবর্গ, সামন্ত শ্রেণি এবং শ্রেষ্ঠীগণ। ভারতবর্ষজুড়ে অসংখ্য বৌদ্ধস্তূপ, চৈত্য, গুহামন্দির, বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব এবং বৌদ্ধদেবদেবীর মূর্তি গড়ে ওঠার এও একটি কারণ-অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা। বুদ্ধের নিজস্ব মতবাদ তাঁর সমকালীন ধর্মীয় জীবনের প্রেক্ষিতেই গড়ে উঠেছিল, যা তার সমকালীন অন্যান্য চিন্তাবিদের চেয়ে তেমন ভিন্নতর ছিল না। এর অর্থ এই যে বুদ্ধের জীবদর্শন ছিল সর্বভারতীয়। যে জীবনদর্শন বিপুল সংখ্যক ভারতীয় গ্রহন না-করলেও ধর্মটি টিকে থাকার জন্য সাহায্য করেছিল ভারতীয় বলেই।
কেবল বৌদ্ধধর্মই নয়- বৌদ্ধধর্ম থেকে উদ্ভূত হীনযান, মহাযান বা বজ্রযানকে পন্ডিতেরা প্রথাগত ধর্ম না বলে বিশিষ্ট সাধনপদ্ধতি বলে মনে করেন। আসলে ধর্ম বিষয়টিই সাধারণ গৃহীদের জন্য, বৌদ্ধধর্মের উচ্চমার্গীয় সূক্ষ্মতত্ত্বে সাধারণ সংসারী মানুষের আকৃষ্ট হওয়ার তো কথা নয়। তারা দুঃখ এড়িয়ে সুখের সন্ধান করে। অথচ বৌদ্ধধর্মের অন্তর্গত চেতনাই হল মানুষের দুঃখ। বুদ্ধ বলেছেন, ‘সমুদ্রের যেমন একটি মাত্র স্বাদ এবং সেই স্বাদ লবনের, সেই রকম আমার ধর্মমতেরও একটি মাত্র স্বাদ, সেই স্বাদ দুঃখের হাত থেকে মুক্তি অর্জনের।’ এই ধর্মমত অনুসারে যথাযথ জীবনযাপন এবং নির্ভুল চিন্তার দ্বারা মানুষ দুঃখকে এড়াতে পারে। এ ধরণের দিক নির্দেশ কি সাধারণ মানুষকে আকর্ষন করার কথা? তাছাড়া, বুদ্ধ মনে করতেন, ইন্দ্রিয়গোচর এই বিশ্বের কোনও অস্তিত্বই নেই। যারা অজ্ঞ, কোনও কোনও কারণ ও কার্য তাদের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। তারা সমুদ্রের ওপর তরঙ্গকে সমুদ্র থেকে আলাদা করে দেখে। এই দেখা যেমন মিথ্যা, সমুদ্র থেকে স্বতন্ত্রভাবে তরঙ্গের সত্যিই যেমন কোন অস্তিত্ব নেই, কোনও ব্যক্তি বা বস্তুরও তেমন কোনও অস্তিত্ব নেই। চিন্তাশীল মানুষ ব্যতীত এ ধরণের কূট দার্শনিক বক্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোই স্বাভাবিক। বুদ্ধ আরও মনে করতেন, জীব পাঁচটি উপাদান দ্বারা গঠিত। এগুলি হল রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান। এই পাঁচটি উপাদান অনাত্ম, অনিত্য এবং অকাম্য। অর্থাৎ এগুলির আত্মা নেই, এগুলি চিরকালীন নয় এবং এই উপাদানগুলি দুঃখের সৃষ্টি করে । কাজেই আত্মার অনুপস্থিতি যিনি উপলব্দি করেন তিনিই কেবল জানেন যে ব্যক্তি হিসেবে তার কোনও অস্তিত্বই নেই, তাই পরিবেশের সঙ্গে তার কোনও সর্ম্পক নেই। তিনি মুক্ত এবং স্বাধীন। প্রতি মুহূর্তে এই উপাদানগুলির পরির্তন ঘটে। প্রতি মুহূর্তে পুরনো মানুষের মৃত্যু ঘটে, নতুন মানুষের জন্ম হয়। সাধারণ মানুষের পক্ষে দার্শনিক বুদ্ধের এসব উপলব্দি আয়ত্ব করা সহজ নয়, কেবল মঠবাসী চিন্তাশীল ভিক্ষুগণই এসব দার্শনিক তত্ত্বে আকৃষ্ট হতে পারেন । একারণেই বৌদ্ধধর্ম ধর্ম নয়, বরং বিশিষ্ট সাধনপদ্ধতি।
মহাযানী ভিক্ষুরা এ বিষয়টি ঠিকই উপলব্দি করেছিলেন। এবং বুদ্ধপূজার প্রবর্তন করে সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন। তবে সফল হয়নি। কেননা, জগৎ কে মহাযানী ভিক্ষুরা মনে করতেন ‘বন্ধ্যা নারীর কন্যার সৌন্দর্যর মত মিথ্যা।’ ( কেননা, ইন্দ্রিয়গোচর এই বিশ্বের কোনও অস্তিত্বই নেই।) এ ধরণের বিস্ময়কর উপমা সাধারণ ভারতীয়র পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না।
ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের পূজা ও ভক্তি ভিত্তিক আনুষ্ঠানিক ধর্ম থেকে বৌদ্ধধর্ম থেকে উদ্ভূত যান বা সাধনমার্গ ছিল একেবারেই পৃথক। তবে যানগুলি মধ্যে দুটি বিষয়ে সাদৃশ্য ছিল। প্রথমতঃ বুদ্ধকে তারা তাদের তত্ত্বের উৎস মনে করতেন। দ্বিতীয়তঃ তাদের দার্শনিক পরিভাষা ছিল অভিন্ন। যদিও যানগুলির অভ্যন্তরীণ দার্শনিক ব্যাখ্যায় একে অন্যের সঙ্গে পার্থক্য ছিল ব্যাপক । তবে পন্ডিতদের কাছে এসব যান আসলে চিন্তাপরিমন্ডল বা থটকমপ্লেক্স। এই মতটি হিন্দু দার্শনিক দ্বারাও সমর্থিত হয়েছে। হিন্দু দার্শনিকগণও বৌদ্ধধর্মকে একটি বিশেষ দার্শনিক পদ্ধতি হিসেবে দেখেছেন, ধর্ম হিসেবে নয়। অদ্বৈতবাদের প্রবক্তা শঙ্করাচার্য বৌদ্ধমত খন্ডন করেছেন। ইনিও বৌদ্ধমতকে সাংখ্য, মীমাংসা এবং বেদান্তের মত একটি বিশিষ্ট চিন্তাপদ্ধতি হিসেবেই দেখেছেন।
কাজেই বৌদ্ধধর্ম একটি চিন্তাপরিমন্ডল হওয়ায় তার ভারত থেকে বিলুপ্তির প্রশ্নই আসে না। এ প্রসঙ্গে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন: ‘বৌদ্ধধর্ম বা দর্শন এখানে (অর্থাৎ ভারতবর্ষে) সেই ভূমিকাই পালন করেছিল, যা ভিন্ন ক্ষেত্রে বেদান্তের দ্বারা সাধিত হয়েছিল। বেদান্ত যেমন কোনও ধর্মব্যবস্থা নয়, অথচ বেদান্তের ঈশ্বরবাদী ব্যাখ্যাকেই ভিত্তি করে যেমন একদিকে কাশ্মীর শৈবধর্ম, শৈব সিদ্ধান্ত ও বীরশৈব ধর্ম এবং অপর দিকে বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়, সনক সম্প্রদায়, ব্রহ্ম সম্প্রদায়, রুদ্র সম্প্রদায় ও গৌড়ীয় সম্প্রদায় গড়ে ওঠে (এমন কি শাক্ত, সৌর ও গাণপত্যদের কয়েকটি শাখা বেদান্তকে ভিত্তি করেছিল) সেই রকম বৌদ্ধমতও বিভিন্ন যান বা সাধনপদ্ধতি ছাড়াও মহাযানাসুরী অনেকগুলি লৌকিক ধর্মের উদ্ভবেরও কারণ হয়েছিল।’ (ধর্ম ও সংস্কৃতি: প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট । পৃষ্ঠা, ১২০)
তথ্যসূত্র:
নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য: ধর্ম ও সংস্কৃতি: প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট ।
সুনীল চট্টোপাধ্যায়; প্রাচীন ভারতের ইতিহাস। (দ্বিতীয় খন্ড)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


