somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: ভাষা শহীদ

৩০ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ৯:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৫২’র ভাষা আন্দোলনের ৫৮ বছর পর শহীদ হলেন সিরাজ উদ্দীন; অথচ আশি ছুঁই ছঁই বয়েসেও তিনি সুস্থই ছিলেন । সুঠাম গড়নের দীর্ঘ শরীরে রোগব্যাধির সংক্রমন তেমন ছিল না। বাঁ চোখে সামান্য কম দেখতেন বটে, তবে আদর্শবাদী ওই মানুষটি সেটা পাত্তাই দিতেন না । ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর গলির ভিতরে একটা ছ-তলা ফ্ল্যাটবাড়ির চার তলার বাঁ দিকের ফ্ল্যাটে থাকতেন সিরাজ উদ্দীন। এখান থেকে রমনা পার্কটা কাছেই। সকাল-বিকাল বেইলি রোডের ফুটপাত ধরে লম্বা, ফরসা মতন, কালো চশমা পরা এক বৃদ্ধকে ছড়ি হাতে হেঁটে যেতে দেখা যেত। শহরের লোকজন সিরাজ উদ্দীন কে চিনত বটে, এবং বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে ভাষা সৈনিক হিসেবে সমীহও করত।
সিরাজ উদ্দীন-এর বড় ছেলে আলী আশরাফ দীর্ঘদিন হল কানাডা প্রবাসী, খানিকটা ছন্নছাড়া স্বভাবের আলী আশরাফ বিয়ে- থা করেনি, ‘সোনালি বাংলা’ নামে এক মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করে। ছোট ছেলে ওমর খালেদ একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। বছর খানেক হল চিটাগাংয়ে পোস্টিং হয়েছে, পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকে ওমর খালেদ । সিরাজ উদ্দীন-এর ছোট মেয়ে বিলকিস-এর শ্বশুরবাড়ি সিলেট শহরের টুকেরবাজার । বিলকিস-এর ছোট মেয়ে রুমকি সিরাজ উদ্দীন- এর ফ্ল্যাটেই থেকে ঢাকায় একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে । রুমকি ছাড়াও বিপত্নীক সিরাজ উদ্দীন-এর ছোট সংসারে আছে জোছনা নামে সতোরো-আঠারো বছর বয়েসি চাঁদপুরের একটি মেয়ে। মেয়েটির রান্নার হাত ভালোই, তবে কথাবার্তায় চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষার ছাপ স্পস্ট। যেমন জোছনা মুরগিকে বলে কুরকা, মোরগকে বলে রাতা, মুড়িকে বলে উরুম, চিরুনিকে বলে কাফুই, বোনকে বলে ভোন, বাথরুমকে বলে ভাতরুম। জোছনার উচ্চারণ নিয়ে রুমকি হাসাহাসি করে। সিরাজ উদ্দীন নাতনীকে ধমক দিয়ে বলেন, অত হাসিস না রে রুমকি । এ দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে।
রুমকি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে, সব মানুষ না নানা, কিছু মানুষ। আর প্রাণ কি চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষার জন্য দিয়েছে নাকি? ধরা যাক বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে, সেই ভাষা কি জোছনার মুখের ভাষা হত, নাকি পশ্চিমবঙ্গের শুদ্ধ চলিত ভাষা? যে ভাষাকে ঐতিহাসিকভাবে পূর্ববঙ্গবাসী ১৯৪৭ সালেই টা টা গুডবাই জানিয়েছে।
সিরাজ উদ্দীন কী বলবেন। তুখোর এক প্রজন্মের মেয়ে রুমকি। রাজনীতিবিমূখ এই প্রজন্ম ঘরে বসে না থেকে কুয়াকাটা কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম জনপদ আবিস্কার করে বেড়াচ্ছে, আর সিরাজ উদ্দীন-রা ঘরে বসে বসে ‘খন্দকার মোশতাক’, ‘খন্দকার মোশতাক‘ করে অনেক সময় নষ্ট করেছেন!
তা এ বছর শীত ভালোই পড়েছে।
দেখতে দেখতে ভাষার মাসও এসে গেল।
জানুয়ারি মাসের শেষের দিকের কথা। বিকেল পাঁচটার মতো বাজে। সিরাজ উদ্দীন ড্রইংরুমের সোফায় বসেছিলেন। জোছনা রান্নাঘরে। চা তৈরি করছিল । এমন সময় কলিংবেলটা বাজল। রান্নাঘর থেকে গিয়ে জোছনাই দরজা খুলে দিল । রুমকি। ইউনিভারসিটি থেকে ফিরল। ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলে নিল । তারপর ড্রইংরুমে এল। রুমকির হাতে ছোট্ট একটা চোখের ড্রপের প্লাস্টিকের শিশি। বলল, 'দুই বু কি' নানা। সত্যি দেরি হয়ে গেল।
দেরি কোথায় রে? তুই তো সময় মতোই ফিরলি।
চিনে ভাষার ‘দুই বু কি’ মানে হল, ‘আমি দুঃখিত’। রুমকি চাইনিজ ভাষা শিখছে । প্রায়ই সিরাজ উদ্দীন কে রুমকি জিগ্যেস করে, বলত তো নানা চাইনিজরা ‘হ্যালো’ কে কি বলে? সিরাজ উদ্দীন হেসে বলেন, সেকথা আমি কী করে জানব রে । আমি কি চিনে ভাষা জানি? রুমকি বলে, ‘হ্যালো’ কে চাইনিজ ভাষায় বলে নিহাও। আর ‘তুমি কেমন আছো’ কে বলে নিহাওমা? হুমম বুঝলাম। তা তুই চাইনিজ শিখে কি করবি রে রুমকি? সিরাজ উদ্দীন জিগ্যেস করেন। ওমাঃ বলে কি! এখন তো হিন্দি আর চাইনিজ ভাষার যুগ। আমেরিকানরা পর্যন্ত চাইনিজ শিখছে। পাকিস্তানে ক্লাস সিক্স থেকে চাইনিজ চাইনিজ ভাষা কম্পলসারি করেছে জানো না। তাই নাকি? হ্যাঁ।
সিরাজ উদ্দীন- এর চোখে ড্রপ দিতে দিতে আদুরে গলায় রুমকি বলল, নানা। আমার এক ফ্রেন্ড না তোমায় খুব রেসপেক্ট করে।
ওর নাম রায়হান, রায়হান কবীর। ও লাস্ট মান্থ-এ চ্যানেল সিক্সটিন- এ জয়েন করেছে। জান তো আজকাল সব জায়গাতেই কী রকম কম্পিটিশন। রায়হান তোমার একটা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ নিতে চায়।ফেব্রুয়ারি এক তারিখে চ্যানেল সিক্সটিনে প্রচার করবে।
বেশ তো, ছেলেটাকে আসতে বলল।
পর দিন দুপুরে রায়হান তার দলবল নিয়ে এল। দলবল মানে ক্যামেরাম্যান আর একজন সহকারি। রায়হান-এর বয়স ২৪/২৫। শ্যামলা, লম্বা, চশমা পরা । পরনে জ্যাকেট আর জিন্সের প্যান্ট। রায়হান হয়তো সিরাজ উদ্দীন-এর সামনে নার্ভাস ছিল। মুখ ফশকে বসল: আজ আমরা কথা বলব প্রখ্যাত ভাষা শহীদ সিরাজ উদ্দীন- এর সঙ্গে।
সিরাজ উদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে খানিকটা লাফিয়ে উঠে বললেন, না, না। আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা সৈনিক। আমি এখনও বেঁচে আছি। ছেলেটার অজ্ঞতায় অবাক হয়েছেন সিরাজ উদ্দীন।
সরি দাদু। রায়হানের চেহারা দেখার মতো হল। ইঙ্গিতে ক্যামেরা অফ করতে বলল সে।
রুমকি বসেছিল উলটো দিকের সোফায়। দাঁতে জিভ কাটল ও। তারপর চিৎকার করে বলল, আরে গাদ্ধে, তুই নানাকে এখন ‘দুই বু কি’ বল, ‘দুই বু কি’ বল ।
সিরাজ উদ্দীন হেসে ফেললেন। রায়হানও কি চিনে ভাষা শিখছে নাকি? রায়হানের মুখ কালো হয়ে উঠেছে দেখে নরম হলেন সিরাজ উদ্দীন । নরম গলায় বললেন, আচ্ছা, সাক্ষাৎকার পরে নিও, এসো আগে গল্পটল্প করি । এই, তোমারও বসো, এসো। এই জোছনা, জোছনা। আমাদের উরুম আর চা দিয়ে যা। এখন বলত রায়হান তোমার দেশের বাড়ি কই?
বারাসাত দাদু। রায়হান মৃদুস্বরে বলল। ততক্ষণে মাইক্রোফোন অফ করে ফেলেছে সে।
বারাসাত ? মানে পশ্চিমবঙ্গে?
হ্যাঁ।
আরে! আমিও তো ওখানকারই লোক। ১৯৪৮ সালে দেশবিভাগের পর আমার বাবা ঢাকায় চলে আসেন। জান তো ভাষা শহীদ বরকতও ছিল পশ্চিম বঙ্গের মানুষ। বরকতও ওই ১৯৪৮ সালেই ঢাকায় এসেছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আমি আর বরকত প্রায় সমবয়েসিই বলতে পার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়তাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে।
গ্রামের নাম বাবলা?
হ্যাঁ। বাবলা। বরকতের ডাক নাম কি ছিল জান?
না।
বরকতের ডাকনাম ছিল আবাই।
আবাই?
হ্যাঁ, আবাই। ও ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯৪৫ সালে তালিবপুর হাইস্কুল থেকে। আর আই এ ১৯৪৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে। তো, আমার আবার ইতিহাসে আগ্রহ আছে। ওঁর সঙ্গে একবার আমি মুর্শিদাবাদ গেছিলাম ।
রুমকি খানিকটা অবাক হয়ে বলল, তুমি আবার কবে মুর্শিদাবাদ গেলে নানা? কই, আমাকে তো বলনি তুমি?
বলিনি। বলতে ভুলে গেছি। সেই নাইনটিন ফোরটি এইট-এর কথা। ঐ বছর ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনালের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা দেন। এই সময়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। মুর্শিদাবাদ গেলাম ঐ বছরই, মানে নাইনটিন ফোরটি এইট-এর জুন মাসে। ১৬ জুন বরকতের জন্মদিন ছিল। ওই দিনেই পৌঁছলাম। যাঃ গরম পড়েছিল কী বলব। ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। যেন অবিকল ইস্ট পাকিস্তানেরই কোনও গ্রাম। অথচ দুটো ভিন্ন দেশ!
এরপর চা-টা খেয়ে ইন্টারভিউ ধারণ করে সন্ধ্যার আগে আগে রায়হান ওর দলবল নিয়ে চলে যায় ।
সিরাজ উদ্দীন মাগরিবের নামাজ পড়ে ড্রইংরুমে এসে বসলেন। রুমকি চা নিয়ে এল। রায়হানকে নানার কেমন লাগল কৌশলে তা বের করতে হবে। সিরাজ উদ্দীন চায়ের কাপ নিয়ে নাতনীকে বললেন, ওহো, ভালো কথা। তোকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ ফাহমিদা ফোন করেছিল।
কী বলল ছোট মামী? রুমকি সর্তক হয়ে যায়। রুমকির ছোট মামী ফাহমিদা রায়হানের ছোট ভাবী রেহনুমার কলিগ। দুজনেই চিটাগাঙে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। সিরাজ উদ্দীন বললেন, ফাহমিদা বলল, এক বছর হল চিটাগাঙে আছি, একবারও তো আমাদের দেখতে এলেন না।
রুমকি বলল, যাও ঘুর এস।
হ্যাঁ। আমি তো যাবই। তুইই আমার সঙ্গে চল।
সে কী! আমি না কাল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পাহাড়পুর যাচ্ছি। কেন তোমার মনে নেই?
ওহো। আমি তাহলে একাই যাই, কি বলিস? নইলে ফাহমিদা মন খারাপ করবে। এই সুযোগে একবার বিনোদদাকেও দেখে আসি। কতকাল হল বিনোদদাকে দেখি না। বিপ্লবী বিনোদবিহারী,বুঝলি, সূর্যসেনের সঙ্গী ছিলেন। সেই ১৯৩২ সাল, যখন চট্টগ্রাম জ্বলছিল।
রুমকি ফস করে জিগ্যেস করে বসল, নানা তুমি কি ‘খেলেইন হাম জি জান সে’ ছবিটা দেখেছ? সূর্য সেনের ওপর ছবি। সূর্যসেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিষেক বচ্চন। ডাইরেক্টর আশুতোষ গোয়ারিকার। ছবিটা দেখে আমি ভীষণ বোর হয়েছিলাম। দীপিকা পাড়ুকন এত ফেইড ক্যারেকটারে অভিনয় করতে রাজি হলেন কেন ভেবে পাই না।
সিরাজ উদ্দীন কথা ঘুরিয়ে বললেন, অভিষেক বচ্চন-এর মা যে বাঙালি জানিস? জয়া ভাদুরী। জয়ার বাবা তরুণ কুমার ভাদুরী । বড় মাপের লেখক ছিলেন । তা তোরা তো আজকাল বাংলা বইয়ের ধার ধারিস না।
রুমকি বলে, সময় কই বলো? ক্লাসটাস, পড়াশোনা আর টিভি দেখে বই পড়ার সময় পাই না। সময় পেলে অবশ্য আনিসুল হক এর বই পড়ি। ভাবছি পারমিশন পেলে ওনার দু-একটা বই ইংরেজিতে অনুবাদ করব। বলতে বলতে কেমন লাজনম্র হয়ে ওঠে রুমকি। যেন আনিসুল হক এসে রুমকির ঠিক পিছনে দাঁড়িয়েছেন।
সিরাজ উদ্দীন লক্ষ করেছেন রুমকির ইংরেজিটা বেশ ঝরঝরে। তবে বাংলা লিখলেই বিপত্তি। গত মাসে আলী আশরাফ ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস-জীবন’ সম্বন্ধে ‘ সোনালি বাংলার’ জন্য রুমকিকে একটা লেখা পাঠাতে বলল। বাংলায় রুমকি যা লিখল তা পড়ে সিরাজ উদ্দীন- এর চক্ষু চড়ক গাছ। ওদিকে আলী আশরাফও বাবার ওপর খেপে ফায়ার। বিলকিসের মেয়ে তোমার কাছে থাকে, ওর লেখায় অত গুরুচন্ডালী দোষ কেন? বিলকিসের মেয়ে লিখেছে, ‘আমরা অবসর টাইমে ক্যাম্পাসে বসে কফি পান করতে করতে রিল্যাক্স পালন করি’ । সিরাজ উদ্দীনও ছেলেকে ছাড়লেন না। কিছুটা রূঢ়স্বরেই বললেন, অত যখন বাংলা বাংলা করিস তখন বাংলাদেশে এসে থাকিস না কেন? দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো বিদেশ পড়ে আছিস কেন? আশরাফ চুপ। মিনমিন করে একবার রেমিট্যান্স শব্দটা উচ্চারণ করল কেবল।
চট্টগ্রামে ওমর খালেদ- এর ফ্ল্যাটটা মেহদীবাগে। ব্যাঙ্ক কাছেই, কাজীরদেউরী। ফাহমিদার স্কুলটাও কাছেই, আশকার দিঘীর পাড়ে।
ফাহমিদা মেয়েটা ভালোই। শ্বশুরকে ভারি ভক্তিশ্রদ্ধা করে। রাজশাহীর মেয়ে; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এম এ করেছে । ওমর খালেদ- এর প্রথম পোস্টিং পদ্মাপাড়ের ওই শহরেই ছিল। তখনই পরিচয়, প্রণয় এবং বিয়ে। সিরাজ উদ্দীন অমত করেননি। ফাহমিদার ছেলেমেয়ে দুটি । বড়টি ছেলে, নাম সামি, সামি ক্লাস ফাইভ পড়ে; আর ছোটটি মেয়ে,নাম সামিয়া, সামিয়া ক্লাস টু তে পড়ে। মজনুর মা নামে এক মধ্যবয়েসি ঝি সামি আর সামিয়া কে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। স্কুল থেকে ফিরে সামি আর সামিয়া গোছল করে, খেয়ে নেয় তারপর টিভিতে হিন্দি ভাষায় ডাবিং করা কার্টুন দেখে। বুড়ো দাদার প্রতি ওরা তেমন কৌতূহল বোধ করে না। অথচ বৃদ্ধের ঝুলিতে ওদের বলবার জন্য অনেক গল্প ছিল। সে গল্প আর বলা হয় না। যে ভাষায় বৃদ্ধ গল্পটা বলবেন সে ভাষা ওদের আকর্ষন করে না। এ ফ্ল্যাটে আসার পরই তিনি ‘হিন্দি ভাষা শিখুন’ বইটি আবিস্কার করেন । সিরাজ উদ্দীন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কার লাগে এই বই? ফাহমিদার? প্রথম নাতী হওয়ার পর সিরাজ উদ্দীন এর ইচ্ছে ছিল নাতীর নাম রাখবেন বরকত । ফাহমিদা মুখের ওপরই বলে দিল- না,না, বাবা, বরকত নামটা ব্যাকডেটেড।
সিরাজ উদ্দীন সবচে কষ্ট পেলেন আড়াল থেকে সামি আর সামিয়ার হিন্দি কথপোকথন শুনে ...
এ বাড়ির রান্নাবান্না মজনুর মাই করে। সিরাজ উদ্দীন সে রান্না খেতে পারেন না, হলুদ বেশি দেয়, তবে সিরাজ উদ্দীন তাঁর বিতৃষ্ণা মুখে প্রকাশ করেন না । দু’দিনের জন্য এসেছি, অহেতুক কোন্দল বাড়িয়ে কী লাভ। তবে মজনুর মার প্রতি বৃদ্ধ কৌতূহল বোধ করেন। তার কারণ আছে। মজনুর মার চেহারা কিছুটা মঙ্গোলয়েড; বাড়ি টেকনাফ- এর উনছি প্রাং নামে একটা গ্রামে। ফাহমিদা বলল, মজনুর মার স্বামী হাতির আক্রমনে মারা গেছে । ওদের গ্রামের পিছনে পাহাড় তারপর সমুদ্র। মাঝেমাঝে পাহাড় থেকে গ্রামে হাতির পাল নেমে আসে। যেন অন্য এক বাংলাদেশের কথা শুনছেন সিরাজ উদ্দীন। পার্বত্যচট্টগ্রামে যে হাতি আছে তা তিনি জানেন। তবে হাতির আক্রমনে মরে যাওয়া কারও ঘনিষ্ট আত্মীয়াকে এই প্রথম দেখলেন। সে যাই হোক। সিরাজ উদ্দীন যেমন জোছনার মাতৃভাষা (চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষা) বোঝেন না, তেমনি মজনুর মার মাতৃভাষাও (টেকনাফের আঞ্চলিক ভাষা) তিনি বুঝতে পারেন না । অথচ মজনুর মা বাংলাদেশি। তাহলে কি দাঁড়ালো? ফাহমিদা রাজশাহীর মেয়ে। ফাহমিদাও টেকনাফের ভাষা বোঝে না। আকারে ইঙ্গিতে কাজ চালিয়ে নেয়। বাংলাদেশে এখন গ্রামীণ উন্নয়নের জোয়ার চলছে। আজকাল কাজের লোক পাওয়াই মুশকিল। ...মজনুর মার ওপর সংসার ছেড়ে দিয়ে ফাহমিদাও একরকম নিশ্চিন্ত। স্কুল থেকে ফিরে রাত এগারোটা-বারোটা অবধি টিভিতে ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখে ফাহমিদা । (এই স্বভাব রুমকিরও আছে) টিভি ড্রইংরুমে। ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ওমর খালেদের খুব ঝোঁক। বেচারা টিভিতে খেলা দেখতে পারে না, বেডরুমে পড়ে থাকে মুঠোফোন কী সব করে । ফাহমিদা বিরক্ত হবে বলে সিরাজ উদ্দীন ড্রইংরুমে না- বসে বেডরুমে কিংবা বারান্দায় বসে থাকেন।
আজ দিনটা ছুটির। সিরাজ উদ্দীন আজ সকাল দশটার দিকে বিপ্লবী বিনোদবিহারীর বাড়ি যাবেন। মুঠোফোনে সেরকমই কথা হয়েছে। সকালে ড্রইংরুমে বসে খবরের কাগজ পড়লেন সিরাজ উদ্দীন । দেশের প্রথমসারির একটি দৈনিকে ‘সাংঘর্ষিক’ শব্দটার ওপর চোখ আটকে গেল। এই ‘সাংঘর্ষিক’ শব্দটাই ভুল। শিক্ষিত সম্পাদক শব্দটি মেনে নিলেন কেমন করে? বুঝতে পারেন না বৃদ্ধ।
বাবা আসুন, চা খাবেন। ফাহমিদা বলল ।
সিরাজ উদ্দীন ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন। বললেন, ওরা এখনও ওঠেনি?
ফাহমিদা বসতে বসতে বলল, না, বাবা। আরেকটু ঘুমাক । আজ তো ছুটি।
সিরাজ উদ্দীন বললেন, বউমা, সামি আর সামিয়া যে হিন্দিতে কথা বলে ।
ফাহমিদা মিষ্টি করে হাসল। হাসলে শ্যামলা গালে টোল পড়ে। শূন্য কাপে লিকার ঢালতে ঢালতে বলল, টিভিতে হিন্দি কার্টুন দেখে তো। আর এখন তো সময়টা হিন্দি আর চাইনিজ ভাষার । আমেরিকানরা পর্যন্ত আজকাল হিন্দি আর চাইনিজ শিখছে। আর না- শিখেই-বা উপায় কী বলুন । চাকরি জোটাতে হবে তো। বিশ্বের বিখ্যাত সব কোম্পানী চাইনিজরা কিনে ফেলছে। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই পাকিস্তানে ক্লাস সিক্স থেকে চাইনিজ ভাষা শেখা কম্পলসারি করেছে।
তাহলে বাংলার কি হবে? সিরাজ উদ্দীন-এর কন্ঠস্বর ম্লান আর নিষ্প্রাণ শোনালো।
আচ্ছা বাবা, বাংলা শিখে কী লাভ বলুন তো। বাংলা শিখে কি কারও ভাত জুটবে? ওই চাকরির লোভেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে ইংরেজি শেখার ধুম। ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ আছে তা সাহিত্য চর্চার জন্য না বাবা, চাকরির সুবিধার জন্য । আমি ইংরেজি না জানলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে পারতাম? মাস গেলে আপনার ছেলের সংসারে কুড়ি হাজার টাকা ঢালতে পারতাম বলুন? দিন দিন জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে -
বৃদ্ধর শরীর কাঁপছিল। এই শীতের সকালেও তাঁর শরীরে ঘামছিল। চাদরের নীচে গেঞ্জি, পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছিল। চোখে সব ঝাপসা ঠেকছে। ফাহমিদা যেন কুয়াশায় ঢেকে আছে। আর ভীষন তৃষ্ণাও পেয়েছে। হাতের কাছেই গ্লাস। অথচ ডান হাত ভীষণ ভারী ঠেকছে।
ফাহমিদা বলল, ওহহো বাবা। কাল না আমার এক কলিগ আপনার কথা বলছিল। রেহনুমা। আপনি আমাদের বাসায় আছেন শুনে সে কী খুশি । আজ বিকেলে আপনাকে সালাম করতে আসবে ।
বেশ তো, আসুক না। অস্ফুট স্বরে বললেন বৃদ্ধ।
কাল বেশ মজার একটা কথা বলল রেহনুমা। ওর এক দেওর, রায়হান নাম, চ্যানেল সিক্সটিন এর রিপোর্টার। আপনার বাসায় রায়হান গিয়েছিল না? ওই যে আপনার ইন্টারভিউ নিল? রেহনুমাকে ফোন করে রায়হান বলেছে, ভাবি, আমি যখন ভুল করে সিরাজ উদ্দীন সাহেব কে ভাষা সৈনিক না বলে ভাষা শহীদ বলেছিলাম তখন সিরাজ উদ্দীন সাহেব লাফিয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘না, না। আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা সৈনিক। আমি এখনও বেঁচে আছি।’ বলে হি হি করে হেসে উঠল ফাহমিদা।
আশি ছুঁই ছুঁই সুস্থ সবল বৃদ্ধর আজ কী যে হল। তিনি বাঁ দিকে ঢলে পড়লেন ...
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×