somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হরপ্পা সভ্যতা (ষষ্ট পর্ব)

১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
হরপ্পা সভ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছি। সভ্যতাটি সর্ম্পকে প্রথম পর্বে ভূমিকা হিসেবে লিখেছি যে- হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । এবং হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে ভারতের ইতিহাসের সূচনা আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে । আজ আর এ কথার কোনও ভিত্তি নেই। হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ লিখিত দলিলের অভাব। প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও সেগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ( archaeological excavation ) ফলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই খননকার্যও মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সুবিশাল হরপ্পা সংস্কৃতির আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন: The totalgeographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.




হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধু অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।


ঠিক কী কারণে হরপ্পা সংস্কৃতিটি ধ্বংস হল- সে বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ আজ অবধি কোনও সুনির্দিষ্ট অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। তবে হরপ্পা সংস্কৃতিটির পতনের সময়কাল ২০০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টপূর্ব বলে ধারণা করা হয়। ওই সময়ে 'The Indus Valley Civilization as a distinct entity gradually ceased to exist'.অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, জমির উর্বরতা হ্রাস, আর্য আক্রমন এবং রোগব্যাধিকে হরপ্পা সংস্কৃতিটির ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।



এ রকম উষর প্রান্তরেই গড়ে উঠেছিল হরপ্পা সভ্যতা


কোনও একটি কারণে হরপ্পা সংস্কৃতিটির পতন হয়নি। হরপ্পা সংস্কৃতিটির পতনের পিছনে একাধিক কারণ ছিল। তবে জলবায়ূ পরিবর্তন ছিল অন্যতম একটি কারণ। ২০০০ খ্রিস্টপূর্বে সিন্ধু উপত্যকায় জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে। ভূপৃষ্টের পরিবর্তনের কারণে সিন্ধু ও সরস্বতী নদীতে প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে সমতল ও নগর প্লাবিত হয়। এরপর নতুন নগর আর গড়া হয়নি, আগে যেভাবে হয়েছিল। নগরে নির্মানের জন্য ভাঙা ইটের ব্যবহার করত। এমন কী পরবর্তীতে পয়ঃনিস্কাশন প্রণালীতেও ভাঙা ইটের ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি অনাবৃষ্টির ফলে মরুকরণ সূচিত হয় । হরপ্পা ছিল ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল । এরই পরিনতি ভয়াবহ হয়েছিল। শষ্যাগার শূন্য হয়ে পড়েছিল। কৃষিপন্যে উৎপাদন হ্রাস সভ্যতার পতনকে দ্রুত করেছিল।



হরপ্পা সংস্কৃতিটির পতনের কারণটি আজও মীমাংশা করা যায়নি


ঐতিহাসিক Mortimer Wheeler মনে করেন হরপ্পা সংস্কৃতি আর্যরা ধ্বংস করেছিল। কেননা আর্যরা যুদ্ধবিগ্রহে বেশি শক্তিশালী ছিল। তাহলে হরপ্পা সংস্কৃতি কি আর্য আক্রমনে ধ্বংস হয়েছিল? মহেনজোদারো নগরে কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে। অন্য নগরে অবশ্য পাওয়া যায়নি। তাহলে কেন মহেনজোদারো নগরে কঙ্কাল পাওয়া গেল? আর্য আক্রমন কি কেবল মহেনজোদারো নগরেই হয়েছিল? সে তো সম্ভব নয়। আর আর্যরা ভারতবর্ষে এসেছিল হরপ্পা ধ্বংসের ৫০০ বছর পর। তাছাড়া Subsequent examinations of the skeletons by Kenneth Kennedy in 1994 showed that the marks on the skulls were caused by erosion, and not violent aggression.



হরপ্পায় আজও খননকাজ চলছে


হরপ্পা সভ্যতার পতনের অন্যতম কারণ সিন্ধু এবং সরস্বতী নদীর গতিপথ পরিবর্তন। ঐতিহাসিক Sir John Marshal, Lambrick Ges E.J.H Mackay এই মতের সমর্থক। অন্য ঐতিহাসিকগণ অবশ্য এই মতকে পুরোপুরি সত্য বলে মনে করেন না। তারা বন্যাকে দায়ি মনে করেন। কয়েকটি নগরে সেরকম চিহ্ন থাকলেও কয়েকটি নগরে বন্যার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।



হরপ্পার কোনও নগরের প্রাচীর। আজও দৃশ্যমান, আজও কৌতূহলকর ...

কারও কারও মতে হরপ্পা সভ্যতা ঠিক ধ্বংস হয়নি। হরপ্পা সভ্যতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সিন্ধু অঞ্চলজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বসতি গড়ে উঠেছিল। নগরগুলি অবশ্য তার পূর্বেকার তাৎপর্য হারিয়েছিল। তবে একেবারে পরিত্যক্ত হয়নি। নগরে বাণিজ্যে অবনতি ঘটেছিল। কেননা আর্য আক্রমনে বাণিজ্য পথ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ।



এককালের হরপ্পা নগর আজ কেবলই ইটের স্তূপ ...


আগে মনে করা হত যে হরপ্পা সংস্কৃতির পতন উপমহাদেশে নাগরিক জীবনে ছেদ ঘটিয়েছিল। আসলে তা নয়। However, the Indus Valley Civilization did not disappear suddenly, and many elements of the Indus Civilization can be found in later cultures. এখন তো প্রত্নতাত্ত্বিকগণ বলছেন যে ৯০০ খ্রিস্টপূর্ব অবধি
হরপ্পা সংস্কৃতি অব্যাহত ছিল! যদিও হরপ্পা সংস্কৃতিটির পতনের সময়কাল ২০০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টপূর্ব বলে ধারণা করা হয়।



এরা আজও বেঁচে আছে, পাকিস্তান কিংবা ভারতে ...হরপ্পা সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে ...হরপ্পা সংস্কৃতির ঠিক পতন হয়নি ...সেই সময়কার নগরগুলির আর বাসযোগ্য থাকেনি ...

হার্বাড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক Richard Meadow বলেছেন the late Harappan settlement of Pirak, which thrived continuously from 1800 BCE to the time of the invasion of Alexander the Great in 325 BCE.




সেকালের একটি কুয়া । এই কুয়ায় আজ আর কেউ পানি তোলে না ঠিকই তবে এককালের এই কুয়াই ছিল প্রাচীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম এক নগরসভ্যতার প্রাণপ্রবাহ ...


প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ ও পঞ্চম পর্বের লিঙ্ক

Click This Link

Click This Link

Click This Link

Click This Link

Click This Link

ছবি: ইন্টারনেট।

তথ্যসূত্র:

http://india.mrdonn.org/indus.html
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link _harappan_culture.html
Click This Link
Click This Link
http://en.wikipedia.org/wiki/Harappa
Click This Link
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×