পত্রিকা অফিসে কাজ করি। প্রতিদিনই ফিরতে রাত হয়। বাড়ি ফিরে ঢাকা দেওয়া ভাত-তরকারি খেয়ে, সিগারেট টানতে টানতে কিছুক্ষণ টিভির চ্যানেল টেপাটেপি করে বিরক্ত হয়ে শেষে একটি বই বগলদাবা করে বিছানায়। এরপর যতোক্ষণ না ঘুমে দু চোখ জড়িয়ে আসে ততোক্ষণ বই পড়া। মোটামুটি এই হচ্ছে আমার নিত্যদিনের, না না দিনের নয়, রাতের রুটিন। কদাচিদ এর ব্যতিক্রম হয়। শুরুতে কয়েকদিন ঘ্যান ঘ্যান করে শেষে মাও আমার এই বাউন্ডুলেপনা মেনে নিয়েছেন।
সেদিনও যথারীতি বাড়ি ফিরে সিগারেট সহযোগে টিভি পর্ব চলছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ১টা। এমন সময় দরজায় শব্দ। ঠক ঠক ঠক। রাত করে ফিরি বলে বাসার নীচ তলায় বাইরের দিকের সুবিধাজনক ঘরটি আমি বেছে নিয়েছি। যেন কারো ঘুমের সমস্যা না করেই তালা খুলে আমার রুমে ঢুকতে পারি। ফলে বাইরের কেউ এসে সহজেই যখন তখন আমার দরজায় কড়া নাড়তে পারেন।
এতো রাতে দরজায় শব্দ শুনে কপালটা কুঁচকে গেল। কে হতে পারে? সাংবাদিকের অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে আস্তে আস্তে দরজা খুলি। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এক মধ্যবয়সী নারী দরজাজুরে দাঁড়িয়ে। এতো রাতে কী চান তিনি? আমি প্রশ্ন করার আগেই তিনি বলে উঠেন
-আপনি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক?
সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়তেই তিনি হরবর করে বলতে থাকেন,
-আমার ছেলে একরামুজ্জামানও আপনার কাগজেই কাজ করে।
এবার মনে করতে পারি, এই পাড়ারই একটি ছেলে আমাদের দৈনিকে প্রদায়কের কাজ করে। কয়েকদিন আগে অফিসে আমার ডেস্কের সামনে এসে ছেলেটি নিজের পরিচায়ও দিয়েছিল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমি ভদ্রমহিলার দিকে তাকাই। তিনি আবার বলতে শুরু করেন।
-মাঝে মধ্যেই তার ফিরতে রাত হয়। আজও আম ছেলের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। খাবার বেড়ে টেবিলে বসে থাকতে থাকতে বোধহয় একটু ঝিমুনি এসেছিল; এমন সময় নীচে রাস্তা থেকে আমার ছেলের চিৎকার ভেসে আসে। 'মা-মা বাঁচাও বাঁচাও' বলে আর্তনাদ করে উঠে আমার ছেলে। দ্রুত দৌড়ে আমি তিন তলা থেকে নীচে রাস্তায় নেমে আসি। কিন্তু রাস্তা একেবারে সুনসান। কোথাও কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। পাড়ার নাইট গার্ডটি মোড়ের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সে নাকি কিছু শুনতে পায়নি। এদিকে একরামের মোবাইলে ফোন করেও সেটা বন্ধ পাচ্ছি। পরে এই নাইট গার্ডই আপনার কাছে আসার পরামর্শ দিলো।
ঘটনার বিবরণ শুনে আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি। কোনো সন্দেহ নেই একরামুজ্জামান বড় কোনো বিপদে পড়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ১টা বেজে দশ মিনিট। দ্রুত করনীয় স্থির করে নেই। প্রথমেই ফোন দেই অফিসে। অপারেটর জানায় সাড়ে পৌনে বারটার দিকে একরাম অফিস ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে। একরামের মোবাইল ফোনে রিং দিয়ে কোনো লাভ হলো না। বন্ধ।
-চলেন থানায় যাই। ঘটনা যা-ই হোক, থানায় একটা রিপোর্ট করে রাখা দরকার। ওসি আমার পরিচিত, তাকে অনুরোধ করলে এক্ষুণি একটি দলকে আপনার বাড়ির আশপাশে টহল দেওয়ার জন্য পাঠানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া ওয়্যারলেসে অন্যা টহলদলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারবেন তিনি।
অনেক কষ্টে এতোক্ষণ চেপে রাখলেও এবার ঝরঝর করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েনি তিনি। পুত্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় তিনি দিশেহারা। কানে বাজছে ছেলের করুন আর্তনাদ। মুখে আচল চাপা দিয়ে আমাকে অুনসরণ করেন তিনি।
এতো রাতে রিক্সা কোথায় পাবো! অগত্যা দুজন হেঁটেই স্থানীয় থানার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মোড়ের কাছে আসতেই দেখি রিক্সা করে একরাম আসছে। ল্যাম্পপোস্টের স্বল্প আলোতেও বুঝতে পারলাম তার উপর দিয়ে রীতিমতো ঝড় বয়ে গেছে। ভিষণ বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। রিক্সা থামার আগেই তার মা ছুটে গেল। আমরা একরামকে দেখে যতোটা অবাক কয়েছি, তারচেয়ে হাজারগুণ অবাক হয়েছে সে আমাদের দেখে। এতো রাতে তার মা কেন রাস্তায়, আর সঙ্গে আমিইবা কেন! এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে।
একরামের কাছ থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে, অফিস থেকে রিক্সায় করে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীর হাতে পড়ে একরাম। ছুরি ও পিস্তলের মুখে তারা একরামের ওয়ালেট, মোবাইল ফোনসহ হাতের ব্যাগটি নিয়ে নিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে। এ ঘটনার পর থানায় ডায়রি করে সে বাড়ি ফিরছে, এর আগে সে বাড়ির ত্রিসীমানাতেও যায়নি।
সময়ের হিসেবে বুঝতে পারি, বাড়িতে বসে মা যখন একরামের আর্তচিৎকার শুনেছেন, ঠিক সেই সময়ই সেখান থেকে কমপক্ষে ৫ কিলোমিটার দূরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে একরাম।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতো দূর থেকে কীভাবে মা ছেলের বিপদের কথা জানতে পারলেন? শুধু তাই নয়, এই অনুভুতি কতোটা বাস্তব হলে এতো রাতে তার মা আমার মতো একজন অপরিচিত মানুষের বাড়ির দরজা ধাক্কায়! তবে কী একেই টেলিপ্যাথি বলে, নাকি এটি মা ও সন্তানের মধ্যে ব্যাখ্যার অতীত কোনো সম্পর্ক? আমি আজো এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাইনি।
(সত্য ঘটনা অবলম্বনে, গল্পের প্রয়োজনে শুধু প্রধান চরিত্রের নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছে।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


