প্রথম পর্ব এখানে
Click This Link
শেষ পর্ব
লন্ডন ছেড়ে আসার সময় লারিসার কাছ থেকে বেশ ঘটা করে বিদায় নিলাম। পাকেচক্রে দুই দফা বিদেশ মুল্লুকে দেখা হলেও ভবিষ্যতে আবারও দেখা হওয়ার ক্ষীণতম সম্ভাবনাও নেই, এটা জানালাম তাকে।
জবাবে মুচকি হেসে লারিসা বললো,
-ইউ নেভার নো, আবারও দেখা হতে পারে! পৃথিবীটাতো গোল, তাই না?
মনে মনে বলি, সুন্দরী, তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। পৃথিবী যে গোল সেটাতো আমিও জানি, কিন্তু আমার জন্য এই পৃথিবীর প্রতিটি স্থান অগম্য নয়; তোমার মতো। মুখে কিছু না বলে পাল্টা হেসে বিদায় নেই।
আড়ালে তখন আমার নিয়তিও বুঝি হেসেছিল। তখন কে জানতো, এর মাত্র ছয় মাসের মাথায় আবারও তার সঙ্গে দেখা হবে!
এবারের স্থান মার্কিন মুল্লুকের রাজধানী ওয়াসিংটন ডিসি।
দানে দানে তিন দান।
লন্ডনের সেমিনারের ফলোআপ সেশনের স্থান নিধারণ করা হয়েছে ওয়াসিংটনে। গাট্টিবোচকা নিয়ে পাড়ি জমাই সাত সমুদ্দুর তের নদী। দুই সপ্তার সফরের দ্বিতীয় দিনেই জানতে পারি লারিসা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হেড অফিসে আসছে। একেই বলে কাকতাল।
যথারীতি দুজনের কাজকর্ম শেষে সন্ধ্যায় ওয়াসিংটনের বিভিন্ন রেস্তোরায় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি আড্ডা চলে। এর মধ্যেই লারিসা আমার অন্যতম ঘনিষ্ট বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। ঘর-সংসার, চাকরি বাকরি, স্পোর্টস, সিনেমা, প্রেম-ভালোবাসা সবকিছু নিয়ে খোলামেলা কথা হয়।
লন্ডনেই লারিসার হাঙ্গেরিয়ান বয়ফ্রেন্ড ফ্রান্সিসের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। কাজ কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে লন্ডনে থিতু হয়ে বসবে লারিসা আর তখনই বিয়েটা সেরে ফেলবে- এমনটিই ছিল তার পরিকল্পনা। কিন্তু এবার জানতে পারি, ফ্রান্সিসের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে।
কার কারণে, কি জন্য এটি হলো, সে সম্পর্কে লারিসাও আর কিছু বললো না, পশ্চিমা ভদ্রতাবশে আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
-তুমি কী নিয়তিতে বিশ্বাস করো?
লারিসার প্রশ্নে বেশ অবাক হই।
যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে ইকনোমিক্সে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া লারিসার মুখে নিয়তির কথা! বুঝতে পারি, লারিসার মনটি আজ বিষন্ন।
-আমার গ্র্যান্ডমা বলতো, নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়তির হাতে। তোমার মনের মানুষটিকে পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে হবে না, নিয়তি ঠিক একদিন তাকে এনে তোমার সামনে দাঁড় করাবে। হয়তো ফ্রান্সিস আমার সত্যিকারের মনের মানুষ ছিল না, তাই দূরে সরে গেছে।
-অবশ্যই তোমার গ্রান্ডমার কথা ঠিক।তুমি সুন্দরী, ট্যালেন্টেড, স্মার্ট, এফিশিয়েন্ট, তোমার পেছনেইতো ছেলেরা ঘুরবে। তোমার কাউকে খুঁজতে হবে না।
একজন বন্ধু হিসেবে তাকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করি। মন ভালো করার জন্য অনেকটা সময় তার সঙ্গে পাবে কাটাই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি।
রাত বাড়ছে। বাড়ছে শীতের তীব্রতা।
কাল সকালে আমার প্রেজেন্টেশন। প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
উঠার জন্য উসখুস করতে থাকি। আমার অবস্থা বুঝে নেয় বুদ্ধিমতি লারিসা। পানীয়ের দাম চুকিয়ে সেও উঠে পড়ে।
দরজা দিয়ে বেরুবার সময় দেখি তার পা টলছে। আলাপে আলাপে কতোটা পান করেছে তা খেয়াল করিনি। এই অবস্থায় গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা অবধারিত।
সাত-পাঁচ ভেবে তার সঙ্গে হোটেল পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। প্রস্তাব করতেই লারিসা রাজি। এই টিপসি অবস্থায় সেও বোধহয় একা একা গাড়ি চালানোর ব্যপারে আস্থা পাচ্ছিলো না।
লারিসাকে নামিয়ে দিয়ে পাতাল রেল ধরে নিজের আস্তানায় ফিরে যাবো- এই পরিকল্পনা নিয়ে সওয়ার হই তার বাহনে।
হোটেলের কামড়ায় পৌছে দিয়ে শুভ রাত্রি বলে বিদায় জানাই। গালটা বাড়িয়ে দেয় রুশ সুন্দরী। এক মুহুর্ত ইতস্তত করে আলতো করে ঠোট ছোঁয়াইতার গালে-গুড নাইট কিস।
কিছু বোঝার আগেই আমার ডান হাতের কবজি ধরে হ্যাচকা টানে ভেতরে নিয়ে আসে লারিসা। দড়াম শব্দে দরজা বন্ধ হতেই সম্বিত ফিরে পাই।
কী চায় লারিসা!
নেশার ঘোরে কী করছে সে সম্পের্কে নিজেরও ধারণা নেই।
দ্রুত চিন্তা করি-মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। মাতালের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে মাথা গরম করা চলবে না।
আস্তে আস্তে রুমের ভেতর ঢুকে সোফায় বসে পড়ি।
-লারিসা, তুমি কী চাও?
-কী চাই তুমি বোঝ না? চাই তোমাকে।
কোনো জড়তা নেই তার কন্ঠে। আমার চোখে চোখ রেখে নীচু অথচ স্পষ্ট গলায় কথাগুলো বলে।
একটুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে মনে মনে আমার জবাব গুছিয়ে নেই।
-লারিসা, তুমি এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এখন তোমার প্রয়োজন একটা ভালো ঘুম। সকালে উঠে কড়া এক কাপ কফি এবং শাওয়ার নাও, তার পর আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো।
-ও, তাহলে তোমার ধারণা আমি মাতাল? নেশার ঘোরে এসব করছি? ফেরার পথে কোথাও আমার গাড়ি সামান্য টাল খেতে দেখেছো? শোন, আমি রাশান, সামান্য দু-এক ফোটা মদে টলে যাওয়ার পাত্র নই।
এবার আমি গাবড়ে যাই। রীতিমতো ঘামতে থাকি।
হোটেলের উষ্ণ আশ্রয়ের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে নভেম্বরের হাড় কাঁপানো ওয়াসিংটনের শীতের রাত। বরফ মাড়িয়ে আধ মাইল হেঁটে যেতে হবে মেট্রো স্টেশনে। পাতাল ট্রেন থেকে নেমে আবার অনেক দূর হেঁটে তার পর পৌছাবো আমার আস্তানায়।
ছিছি, এসব আমি কী ভাবছি! তবে কী নিজের অজান্তেই লারিসার কামড়ায় রাত্রি যাপনের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছি? নিজের কাছেই মরমে মরে যাই।
আমার অবস্থা আদী পুরুষ আদমের মতো। হাতের নাগালে স্বাদু গন্ধম ফল, কিন্তু স্বাদ আস্বাদন মানা।
দীঘল দুই চোখ দিয়ে আমার মনের কথা পড়ে নেয় লারিসা।
-লুক, উই আর গুড ফ্রেন্ডস। আমরা এডাল্ট এবং একে অপরকে পছন্দ করি। ইফ উই মেক লাভ, দেন ইট শ্যুড নট বি এ প্রবলেম ফর এনিবডি। আমি জানি তুমি তোমার স্ত্রীকে ভালোবাসো। আমাদের মধ্যে এখন কিছু হলে সেটা তোমার স্ত্রীর প্রতি কোনো ধরণের অন্যায় করা হবে না। তুমি তোমার স্ত্রীকে আগের মতোই ভালোবাসবে। এতে সমস্যা কোথায়? আমিতো কখনোই তোমার কাছে কোনো সম্পর্কের দাবি নিয়ে এসে দাঁড়াবো না।
আই জাস্ট নিড ইউ নাউ অ্যান্ড ডোন্ট টেল মি ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট মি।
নিজস্ব যুক্তি দাঁড় করিয়ে আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে লারিসা।
আস্তে আস্তে নিজের কাছে হেরে যেতে থাকি।
সংযমের বাধ ভেঙ্গে যায়।
আমার ভেতরের প্রতিরোধের দূর্গ পরাজিত রাজ্যের মতো বেদখল হয়ে যায়।
লারিসার মদির ঠোঁটে ডুবে যাই আমি।
অষ্মাৎ পকেটে রাখা গ্রামীণের রোমিং সেল ফোন বেজে উঠে। স্ক্রিনে ভেসে উঠে আমার চার বছরের পুত্রের অপাপবিদ্ধ মুখ। মানষ চোখে দেখতে পাই প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
হাজার বছরের লালিত মূল্যবোধ, প্রাচ্যের সংস্কার আমার ভেতরের আদিম পুরুষটির টুটি চেপে ধরে।
আমার ভেতর ফুঁসে উঠা আমি নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
দেশে ফেরার পর এক ধরনের অপরাধবোধ আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। মুহুর্তের স্খলনকে কিছুতেই আমি নিজেই মেনে নিতে পারি না। এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতেই একদিন সুযোগ বুঝে স্ত্রীকে সব খুলে বলি।
সব শোনার পর তার চোখ দেখে মনে হয়, এই গল্পের পুরোটাই সে বিশ্বাস করেছে, শুধু শেষ অংশটি ছাড়া।
-এখন থেকে হিল্লি-দিল্লি-বিলাত যেখানেই যাও আমি সঙ্গে যাবো। একা একা কোথাও যাওয়ার নামটি মুখে এনে দেখো, তোমার কী অবস্থা করি...
পুরো ঘটনা শোনার পর এই ছিলো তার মন্তব্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মে, ২০০৮ সকাল ৯:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


