রিসার্চ ল্যাব লাগোয়া ছোট্ট অফিস রুমে ঢুকে রাশেদ দেখতে পায় সুন্দর মোড়কে জড়ানো একটা প্যাকেট হাসিমুখে টেবিলে বসা।
বেশ অবাক হয় সে।
এই বিদেশ বিভুইয়ে পরিচিত এমন কেউ নেই যে এতো সুন্দর করে উপহার পাঠাবে।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে প্যাকেটটা খোলে।
এবার পুরোপুরি বাক্যহারা। ভেতরে ভাঁজ করে রাখা একটি ঘন নীল রঙ্গের নাইকি টি সার্ট।
প্রতিদিন প্রতিটি পাই-পয়সা হিসেব করে চলতে হয়। এমন দামি একটা জামা কেনার কথা কল্পনায়ও আনতে পারেনা রাশেদ। প্যাকেটটা আতিপাতি করে খুঁজেও কোনো কার্ড বা চিরকুট মিললো না।
জানা গেলনা, কে এই সহৃদয় শুভানুধ্যায়ী। রোমাঞ্চকর এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সঙ্গে আনা পিনাট বাটার মাখানো রুটি আর অরেঞ্জ জুস দিয়ে লাঞ্চ সেরে নেয়।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে। আর দশ মিনিটের মধ্যেই প্রফেসর অ্যানমেরি পিটারের লেকচার। যুক্তরাষ্ট্রের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম দিকপাল অ্যানমেরির লেকচার শোনার সুযোগ কিছুতেই মিস করতে রাজি নয় রাশেদ।
কাগজের ন্যাপকিনে মুখ মুছতে মুছতে করিডোর দিয়ে রীতিমতো ছুটতে থাকে। শেষ মাথায় লিফটের দরজা বন্ধ হয় হয় অবস্থা। তাকে ছুটে আসতে দেখে ভেতরে দাঁড়ানো প্রফেসর রবার্ট ডিয়াজ বোতাম চেপে লিফটের প্রায় বন্ধ দরজাটি খুলে দেন।
হাফাতে হাফাতে ধন্যবাদ জানায় রাশেদ
-থ্যাঙ্কু বব
রিসার্চ সুপারভাইজার রবার্টকে সংক্ষিপ্ত নামেই সম্বোধন করে রাশেদ। শুরুতে এই বয়ষ্ক প্রফেসরকে এভাবে নাম ধরে ডাকতে একটু বাধো বাধো ঠেকলেও গত কয়েক মাসে পশ্চিমা অভ্যাসটি রপ্ত হয়ে গেছে।
-হ্যাল্লো, হাউ আর ইউ ডুইন টুডে?
হাসিমুখে কুশল জানতে চায় বব। একটু থেমে যোগ করে,
-সার্টটা তোমার পছন্দ হয়েছে? এটি তোমার ক্রিসমাসের আগাম গিফট।
এবার উপহার রহস্য পরিষ্কার হয়। পরশু ববের সঙ্গে ল্যাবে কাজ করার সময় অসাবধানে দুফোঁটা ক্যামিকেল পড়ে গায়ের জামাটিতে বিচ্ছিরি দাগ বসে যায়। জন্মেও এই দাগ মেটবার নয়। দেশ থেকে আনা সাধের জামাটির এই করুন পরিণতিতে রীতিমতো আফসোস হয় রাশেদের। সখেদে বলে সে কথা। সেজন্যই এই টি সার্ট। মনে মনে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে রাশেদ।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আসার পর থেকেই নানাভাবে সাহায্য করছে বব। টিচিং অ্যাসিসট্যান্টশিপ জোগার করে দেওয়া থেকে শুরু করে থাকার জায়গার বন্দোবস্ত, টিউশন ফি কমানোর দরখাস্তে জোড়ালো রেকমেন্ডেশন- কতো কিছুই না করেছে। তার সহায়তা না পেলে এই দেশে টিকে থাকা সম্ভব হতো না।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবের ইনচার্জ হলেও ববের প্রধান আকর্ষন অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, অর্থাৎ প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন বিষয়ে। প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন নিয়ে ববের আগ্রহের কথা জানাই ছিল। খামার বাড়িতে ব্যাক্তিগত গবেষণাগারের কথাও বলেছিল সে। এক উইকঅ্যান্ডে রাশেদকে রকি গ্যাপে নিয়ে আসে বব।
মেরিল্যান্ডের রকি গ্যাপে বিশাল এলাকাজুড়ে ববের খামারবাড়ি। সেখানেই শখের ল্যাব গড়ে তুলেছে বব। টাকা থাকলে এই দেশে সবই সম্ভব। না হলে খেয়াল মেটাতে কেউ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এমন অত্যাধুনিক গবেষণাগার তৈরি করে! জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির ল্যাবের চেয়ে এই ব্যক্তিগত গবেষণাগার কোনো অংশেই কম না, বরং কিছু কিছু আধুনিক যন্ত্র দেখে হতবাক হয়ে যায় রাশেদ। ক্ষুদ্র জ্ঞানে এসব যন্ত্রপাতির দাম সম্পর্কে ধারণা করাও তার পক্ষে সম্ভব হয় না। বব যে ধনী সেটা আগেই আন্দাজ করেছিল রাশেদ। কিন্তু তার অর্থ-বিত্তের পরিমাণ যে এতো বিপুল সে সম্পর্কে কোনো ধরানাই ছিল না।
বিশাল এলাকাজুরে এই খামার বাড়ির সীমানার মধ্যেই রয়েছে জঙ্গল আর উঁচু পাহাড়। বড় একটি লেক। তবে এখানে পশুর খোয়ারটি একেবারে দেখার মতো। পোশা প্রাণী নিয়ে মার্কিনীদের আদিখ্যেতার শেষ নেই। এই দেশে আসার পর থেকেই পদে পদে দেখতে পাচ্ছে রাশেদ। রীতিমতো পার্লারে নিয়ে গিয়ে পোশা কুকুরের গায়ের পশম ছাঁটানো, মাথায় ঝুটি, শীতের পোশাক পরানো- এ ধরণের নানা রকম পাগলামি দেখে প্রথম প্রথম বেশ অবাক হলেও এখন অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু ববের পশুর খেয়াড়টি দেখার মতো।
ঝকঝকে তকতকে ঘরগুলোকে পশুর খোয়াড় বললে একে রীতিমতো অপমানই করা হয়। প্রতিটি পশুর জন্য রয়েছে পরিচ্ছন্ন পৃথক কামরা। ঠান্ডা ও গরমের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি রুমেই আছে আছে এসি এবং হিটিং সিস্টেম। এমনকী প্রতিটি রুমের সঙ্গে লাগোয়া টয়লেটগুলোও দেখার মতো।
ঘুরে দেখানোর সময় প্রতিটি পশুর কামরার সামনে গিয়ে যেভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে তাদের ভালো-মন্দ নিজ হাতে তদারক করছে বব, তা দেখে আবারও এই মানুষটির প্রতি প্রবল শ্রদ্ধা জাগে। শুধু এই পশুগুলোর দেখভালের জন্যেই মাইনে দিয়ে চারজন লোক রাখা আছে। এর পরেও নিয়মিত নিজ হাতেই এদের পরিচর্যা করে বব, তাদের আলাপ থেকে বোঝা গেল।
ল্যাবরেটরি লাগোয়া বিশাল লাইব্রেরিতে বসে কথা হচ্ছিলো ববের সঙ্গে।
-ওইকঅ্যান্ডগুলো কী করে কাটাও তুমি?
প্রশ্ন করে বব।
-তেমন কিছু না। বাজার-হাট, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোওয়া এসব আরকী।
-সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে তুমি কী আমার সঙ্গে কাজ করতে পারো? এ জন্য অবশ্য আমি তোমাকে পে করবো। শুক্রবার ইউনিভার্সিটি শেষে তুমি আমার সঙ্গে এই খামারবাড়িতে চলে আসবে, শনি-রোববার এখানে কাজ করবে। এর পর সোমবার আবার আমরা একসঙ্গে ওয়াসিংটন ফিরে যাবো।
ববের এই প্রস্তাবটি রাশেদের কাছে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো। নিজের খরচে এখানে পড়তে এসে পদে পদেই নানা ধরণের অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছে রাশেদ। সরকারি চাকুরে বাবার পক্ষে একটি টাকাও পাঠানো সম্ভব না, তাই অতি কষ্টে কাজ করেই নিজের থাকা-খাওয়া এবং পড়ার খরচ জোগার করতে হচ্ছে। তার পরে এখন বাড়ি থেকে চার আসছে প্রতি মাসে অন্তত কিছু টাকা পাঠাতে হবে। এই অবস্থায় ববের সঙ্গে কাজ করা এবং বাড়তি কিছু আয়ের ব্যবস্থা হওয়ায় যারপর নাই খুশি হয় রাশেদ। সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যায় রাশেদ।
-তাহলে আর দেরি করে লাভ কী। শুভস্য শীঘ্রম। এখন থেকেই তুমি কাজে লেগে যাও। তবে আজ এখানে তোমার প্রথম দিন, আজ তোমার সম্মানে স্পেশাল ডিনারের আয়োজন করেছি। আজ এলাকাটা ঘুরে-ফিরে দেখো, কাল সকাল থেকে আমাদের কাজ শুরু হবে।
এই কথা বলে বব ল্যাবরেটরিতে ঢুকে যায়। সময় নষ্ট না করে আমি বেড়িয়ে পড়ি জায়গাটির অপরূপ পসুন্দর প্রাকৃতিক রূপ দেখতে।
উৎকৃষ্ট মানের ওয়াইন, স্যালাড, গ্রিলড ফিস, গার্ডেন ফ্রেস ভেজিটেবল এবং বেশ কয়েক ধরণের জডজার্টসহ ভুরিভোজ শেষে দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে রাশেদের।
ডিনারের ফাঁকে ফাঁকেই নিজস্ব গবেষণা নিয়ে আলোচনা করছিল বব। শেষ দিকে ববের কথাগুলো ঠিক কানে যাচ্ছিলো না। আসলে মদের নেশাতেই এমনটি হচ্ছিলো রাশেদের। অ্যালকোহলে ততোটা অভ্যস্ত নয় বলে কয়েক পেগ ওয়াইনেই নেশা হয়ে যায়। মাথাটাও কেমন ঝিম ঝিম করছে। কোনো রকমে ববের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রাশেদ।
এর পর ঘুমের অতল সাগরে হারিয়ে যায়।
সারাটা রাত ভয়ঙ্কর দু:স্বপ্ন, তীব্র শারীরিক অস্বস্তি, যন্ত্রণা আর অদ্ভুত অনুভুতিতে কেটেছে। ছেড়া-ছেড়া দু:স্বপ্নগুলোর ভীতিকর অনুভুতিটুকু এতাটাই তীব্র যে বার বার ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠতে চেষ্টা করেছে রাশেদ। কিন্তু কে যেন বার বার টেনে তাকে ঘুমের অতলে নিয়ে গেছে। প্রবল ইচ্ছাশক্তি খাটিয়েও দু-চোখ মেলতে পারেনি রাশেদ। এই অস্থিরতা, ভীতিকর অভিজ্ঞতা আর যন্ত্রণার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা চলেন না।
কতোক্ষণ পর অচৈতন্যের গভীর থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে তা বলতে পারবে না রাশেদ। দিন ক্ষণের হিসেব যেনো একেবারেই গুলিয়ে গেছে। চোখ খলতে গিয়ে একটা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। আবারও দু চোখ বুজে ফেলে। শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের একটি শীতল স্রোত নেমে যায়। মনে হয় কোথাও একটাকিছু বড় ধরনের উলট-পালট হয়ে গেছে। চরম অশুভ কিছু একটা ঘটে গেছে তার অজান্তেই। সেই অশুভের মুখোমুখি দাঁড়ানোর শক্তি তার নেই। গায়ে প্রতিটি লোম কাঁটা দিয়ে জেগে উঠে।
একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলে রাশেদ। কিন্তু একি! ২৮ বছরের চেনা পৃথিবীটা এক রাতেই কেমন করে এতোটা পাল্টে গেল! সব কিছু কেমন কেমন লাগছে। নিজের শীররের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর হদিস মিলছে না। হাত-পা গুলো যেন শরীর থেকে খূলে নিয়েছে কেউ।
ওইতো ববকে দেখা যাচ্ছে। না ববকে নয়, দেখা যাচ্ছে তার পা। ববের পুরো শরীরটা নজরে আসছে না। অনেক কষ্টে ঘাড় উঁচু করে ববের দিকে তাকায় রাশেদ। এতেই মাথাটা ছিঁড়ে পড়তে চায়। হাসি মুখে রাশেদের দিকেই তাকিয়ে আছে বব। রক্ত জবাব মতো টকটকে লাল দুই চোখে কেমন খ্যাপার মতো দৃষ্টি। মাথার চুল উসকোখুশকো। গালে খোচা খোচা দাড়ি। ববের এই রূপ কখনোই দেখেনি সে।
অনেক কষ্টে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করে রাশেদ। কিন্তু গলা দিয়ে অদ্ভুত এক জান্তব শব্দ বের হয়। তীব্র আতঙ্কে বুক কাঁপতে থাকে।
ঠোঁটের ওপর তর্জনি রেখে চুপ থাকার নির্দেশ দেয় বব। এবার সে বলতে শুরু করে,
-কুল ডাউন, কুল ডাউন। ওয়েলকাম ব্যাক। চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে তোমার আর আমার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ এখানে রচিত হলো এক যুগান্তকারী ইতিহাস। পৃথিবীতে এই প্রথম সফল মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে তোমার নি:শর্ত আত্মত্যাগের কারণে। টানা ৩৬ ঘন্টার সফল অস্ত্রোপচারের পর তোমার মস্তিষ্কটি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে................
আরো কী কী বলে যায় বব। কিন্তু কথাগুলো রাশেদের কানে যায় না। তীব্র আতঙ্ক নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বুঝতে পারে, দুই পায়ে নয়, চারটি পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। রুমের একপাশে রাখা প্রমাণ সাইজের আয়নাটির দিকে তাকিয়ে দেখে, সেখানে একটি ষাঁড়ের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। আতঙ্কে জমে গিয়ে ববের দিকে তাকায় রাশেদ।
বব তখনো বলে চলেছে,
-বহু দিন ধরেই নানা কষ্ট স্বীকার করে এই গবেষণা চালিয়ে আসছি। দেরিতে হলেও এবার সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে। আই ডিড ইট বোথ ওয়ে। দু দিক থেকেই আমি সফল হয়েছে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তোমারও নিশ্চই কৌতুহল হচ্ছে? ওদিকে তাকিয়ে দেখো।
গবেষণাগারের এক কোনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করে বব।
তাকিয়ে দেখি, একটি চেয়ারে আমি বসে আছি। মাথাটা ঝুলে আছে বুকের ওপর। চোখ দুটো খোলা। কিন্তু তাতে কোনো ভাষা নেই। পশুর মতো নির্বাধ দৃষ্টি।
বুঝতে পারি এখন আমার জন্য অপেক্ষা করছে ববের আরামদায়ক অত্যাধুনিক পশুর খোয়াড়ের একটি কামরা।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০০৮ রাত ৯:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


