somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্যজন (গল্প)

২০ শে মে, ২০০৮ দুপুর ১২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জানালায় নীল পর্দা। মেঝেতে সুন্দর কারুকাজ করা পুরু কার্পেট। টেবিলের উপর কায়দা করে রাখা স্লিম মনিটরের পাশে দামী ফুলদানীতে তাজা ফুল। ঘরের এক কোনে একটি বুক শেলফে বেশ কিছু ব্ই সাজানো।

হঠাৎ এ ঘরে ঢুকে পড়লে মনে হবে পয়সা ওয়ালা কোনো ব্যক্তির স্টাডি রুমগোছের কিছু একটা। কেউ বলে না দিলে বোঝা মুশ্কিল যে এটি ডাক্তারের চেম্বার।

টেবিলের এক পাশে আরামদায়ক রিভলভিং চেয়ারে গা ডুবিয়ে বসে আছে শেখ জলিল। চেম্বারের বাইরে তার নেম প্লেটে নামের পেছনে ইংরেজি বর্নমালায় অনেকগুলো ডিগ্রি ঘুড়ির লেজের মতো ঝুলছে। বিলেত থেকে মানষিক রোগের চিকিৎসায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে ভালোই জাঁকিয়ে বসেছে। নয়তো ধানমন্ডিতে এতো সাজানো চেম্বার, চলনসই সুন্দরী রিসেপশনিস্ট, দামী গাড়ি-এসব মেনটেইন করা চাট্টিখানি কথা নয়।

জলিলের রুমে একটি চেয়ারে অস্বস্তি নিয়ে বসে আছে জাহিদ। হাতে নোটবুক আর পেন্সিল। বন্ধু জলিলের পীড়াপিড়িতেই আসা। খুব নাকি ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট দেখাবে। হাতের দশটি আঙ্গুল প্রজাপতির মতো কম্পিউটারের কিবোর্ডের উপর ঘোরাফেরা করছে। রোগী দেখার ফাঁকে ইন্টারনেটে ভীষন ব্যস্ত জলিল। তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে জাহিদ, স্কুলে থাকতে জলিলের টাইটেল ছিল দেড় ব্যাটারি। সেই দেড় ব্যটারি খাটো জলিল যে এতোটা ভেল্কি দেখাবে তা কী কেউ কখনো ভাবতে পেরেছিল?

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে জলিলের ইন্টারেস্টিং সাবজেক্টের ফাইল খুলে বসে জাহিদ।
নাম: মনোয়ার হোসেন মনু
বয়স: ২৭
উচ্চতা: ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
এভাবেই মনোয়ার হোসেনের যাবতীয় শারীরিক ও মানষিক বিষয়ে তথ্য দেওয়া আছে ফাইলটিতে। কোথাও কোথাও ফুট নোটে টিপিক্যাল ডাক্তারি প্যাচানো হরফে মন্তব্য লেখা।

অনেক কষ্টে পঠোদ্ধার করে যা বোঝা গেল, তা হচ্ছে মনোয়ার হোসেনের মূল সমস্যা হচ্ছে পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার। মাঝে মধ্যেই সে তার নিজস্ব স্বত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি স্বত্ত্বা তাকে গ্রাস করে নেয়। সে সময় তার আচার-আচরণ, কথা বলার ভঙ্গী; এমনকী গলার স্বরও আশ্চর্যজনকভাবে পাল্টে যায়।

এটুকু পড়ে বেশ আগ্রহ বোধ করে জাহিদ। জলিলের পীড়াপিড়িতে এসে মনে হয় খুব একটা ভুল করেনি!

জলিলের সঙ্গে এটি মনোয়ারের দ্বিতীয় সাক্ষাত। প্রথম সাক্ষাতে তার দ্বিতীয় স্বত্ত্বার দেখা মেলেনি। আজ সম্মোহনের মাধ্যমে দ্বিতীয় স্বত্ত্বাকে ডেকে আনবে জলিল। এ জন্যই জাহিদের ডাক পড়েছে। জলিলের ধারণা শখের গল্পকার জাহিদ মনোয়ারের চরিত্র থেকে গল্প লেখার দারুনসব মশলা পাবে। ফাইলটি পড়ে শেষ করার আগেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে মনোয়ার। একটু রোগা উজ্জ্বল শ্যামলা যুবকটির চোখে-মুখে কেমন একটা দিশেহারা ভাব।

জাহিদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় মনোয়ার। জলিল নিজের সহকারী বলে জাহিদকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার পরও একটু ইতস্তত করে মনোয়ার। তবে একটু পরই দ্বিধা ঝেড়ে বলতে শুরু করে:

- প্রথম ব্যপারটি ঘটে প্রায় ৬ বছর আগে। তবে আমি নিজে এটি বুঝতে পারিনি। গ্রামে আমরা আর আমার দুই চাচা মিলে বিশাল যৌথ পরিবার। প্রথমে সবই ভেবেছিল আমার উপর জ্বিনের আছর হয়েছে। মৌলানা ডেকে, ওঝা এনে নানা করকম ঝাড়-ফুক করিয়ে কোনো ফল হলো না। অবশেষে আপনার কাছে এলাম।

যখন আমার উপর কিছু একটা ভর করে সেই সময়ের কথা আমার কিছুই মনে থাকে না। তখন নাকি আমি অনেক উল্টা-পাল্টা কথা বলি. অদ্ভুত কাজ করি....

-মনোয়ার, আজ আমি আপনার দ্বিতীয় স্বত্ত্বাকে ডেকে আনবো। ঘাবড়াবার কিছু নেই। আপনি আরাম করে এই চেয়ারটিতে বসুন।

জলিল নিজেই উঠে গিয়ে জানালার পর্দাগুলো টেনে দিয়ে ঘরটি কিছুটা অন্ধকার করে দেয়। আষাঢ় মাসের তীব্র গরমেও জলিলের চেম্বারে আরামদায়ক শীতলতা। ঘরটি অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা কন কনে শীতে জাহিদ কেঁপে উঠে।

নরম গদি আটা ইজি চেয়ারে আরাম করে বসে আছে মনোয়ার। মাথাটা একদিকে হেলানো। আবছা অন্ধকারে মনে হয় সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে জাহিদ। কোথাও বড় ধরণের কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু বিষয়টি ঠিক সে ধরতে পারছে না। একটা অশুভ আতঙ্ক এসে তার ভেতর ভর করে।

ইজি চেয়ারের পাশে গিয়ে মনোয়ারের কাঁধে হাত রাখে জলিল। সঙ্গে সঙ্গেই স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো সোজা হয়ে বসে মনোয়ার। দু চোখ মেলে তাকায় জলিলের দিকে। কিন্তু এটি কার দৃষ্টি! কোনো মানুষের চোখ এতোটা স্থির হয় কিভাবে? মনে হচ্ছে যেন মাছের দুটি চোখ তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার চোয়ালের হাড় দুটো অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ আর রুক্ষ লাগছে। মুখের চামড়া হয়ে গেছে মড়ার মতো ফ্যাকাসে।

-কিরে দেড় ব্যটারি জইল্লা। আমারে ডাকাডাকি করতাছস ক্যান?

শ্লেষ্মা জড়ানো ঘরঘরে কন্ঠস্বরে জানতে চায় মনোয়ার।

এটি কী সত্যি মনোয়ার? তার চেহারা, গলার স্বর এতোটাই পাল্টে গেছে যে জাহিদ আর দেলোয়ার একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। পরক্ষণেই এক অজানা আতঙ্কে দুজন জমে যায়।

তাদের অবস্থা দেখে খল খল শব্দে হেসে উঠে মনোয়ারের দ্বিতীয় স্বত্ত্বা।

-কি হইলো ডাক্তরের পুত? ডাক্তরির শখ মিট্যা গেছে? আয় এইবার আমি তোর চিকিচ্ছা কইরা দেই। লগে দেহি দুস্তরেও লইয়া আইছস। তা ল্যাখক সাব বালা আছেন? সেলামলাইকুম। গফ লেখনের শখ হইছে? গফ না, আইজ আপনেরে সইত্য গটনা কমু। মজার গটনা। ল্যাকতে পারবেন?

- কিরে জইল্যা, কুনহান থনে শুরু করুম? তোর তো আবার গুণের শ্যাষ নাই। তোর বউয়ের গফটাই দুস্তরে আগে শুনাই। কি কছ?

আড়চোখে তাকিয়ে দেখি আতঙ্কে জলিল একেবারে পাথর হয়ে গেছে। চোখের পাতাও নড়ছে না। অদ্ভুত স্বরে কথা বলে চলে মনোয়ার

-বড়লুকের মাইয়া সুমনারে বিয়া কইরা শ্বশুড়ের ট্যকায় লন্ডন গেলি পড়তে। বউরে দেশে থুইয়া গেলি। বিদেশ গিয়া শ্বশুড়েরর ট্যাকা উড়াইয়া লুইচ্চামি করনের বিরাট সুবিদা হইলো। কিন্তু পোড়া কপাল, কয় মাস না যাইতেই বউ আইসা হাজির। একদিন ধরা খাইলি বউয়ের কাছে। বিলাতী মাগির নেশা তোরে তখন পুরাপুরি পাইয়া বইছে। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা কইরা বউরে দুনিয়া থনে সরাই দিলি। এতে তোর দুইটা লাব হইলো। একেতো বউ মইরা মাগিবাজির পথ খুইলা গেল; হের উপর বউয়ের লাইফ ইন্সুরেন্সের মুটা ট্যাকাও হাতায়া নিলি।

তুই ডাক্তর মানুষ। এই খুনটারে হার্ট অ্যাটাক বইলা চালাইতে কুনু অসুবিদাই হয় নাই। বিলাতের পুলিশরেও ঘোল খাওয়াইলি। আসলে ট্যকার উপর কিছু নাই। বিলাতেও ট্যকা দিয়া সব কিছুই ম্যানেজ করা যায়।

গেল মাসে তোর রিসেপশনিস্ট মাইয়াটারও প্যাট খসাইয়া আনছস। ভালোই মৌজে আছস। দেখিস, আমারে বেশি ঘাটাইসনা কইলাম। তইলে কিন্তুক এক্কেরে হাটের মইদ্যে হাড়ি ফাটাইয়া দিমু............

আরো কী কী বলে যায় মনোয়ারের দ্বিতীয় স্বত্ত্বা। কিন্তু জাহিদের কানে এসেব কিছুই ঢোকে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে জলিলের দিকে।

সুমনা যেদিন তাকে ছেড়ে জলিলের হাতে আংটি পড়ালো, তখন মনে মনে কষ্ট পেলেও অভিমান হয়নি জাহিদের। চালচুলোহীন বাউন্ডুলে জাহিদের সঙ্গে সদ্য পাশ করা ডাক্তার জলিলের কোনো তুলনাই হয় না। বিয়ের পর পরই বিলেত চলে যায় জলিল। আর জাহিদ তখন প্রায় বিনা বেতনে একটি পত্রিকায় সাব এডিটরের চাকরি করছে। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাহিদ ভাবতো, সুমনা ঠিকই করেছে। ঠিক সময়ে সে একেবারে ঠিক সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। না, সুমনার উপরও তার কোনো খেদ ছিলো না।

কিন্তু আজ! জাহিদের ভেতর সব কিছু উলট পালট হয়ে যায়। মনোয়ারের মুখ দিয়ে যে কথাগুলো বেরুলো তা কিছুতেই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। পাঁচ বছর আগে লন্ডনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার হদিস মনোয়ারইবা কিভাবে জানলো!

জাহিদ যখন বাইরের কাঠ ফাটা রোদে পা রাখছে, তখনো তীব্র চোখে জলিলের দিকে তাকিয়ে মনোয়ার। কাঠের মুর্তির মতো নিজের চেয়ারে ঠায় বসে কুল কুল করে ঘামছে জলিল।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০০৮ রাত ১:২৭
১৫টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×