ডিউটি অফিসার কাতল মাছের মতো বিশাল হা করে সশব্দে হাই তুললো।
জীর্ণ হাতলবিহীন কাঠের চেয়ারে তার মুখোমুখি বসে আছি বলে সাফায়েত উল্লাহ নামের এই ব্যক্তির আলজিহ্বা পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হলো। সাড়ে তিন ঘন্টা আগে যখন এই ঘরটিতে ঢুকি, তখন তিনি ১০-১২ বছরের একটি ছেলেকে দিয়ে মাথা মালিশ করাচ্ছিলেন। আরামে দু চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে এসেছিলো তার। কিন্তু তার প্রখর দৃষ্টিশক্তি থেকে রেহাই মেলেনি আমার। আধবোজা চোখেই আমাকে পুরোপুরি জরিপ করে নিলেন। ‘একে পাত্তা না দিলেও চলে’ মনে মনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে তিনি গলায় যতোটা সম্ভব পুলিশি গাম্ভীর্য ঢেলে বললেন,
কাকে চান?
ওসি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাই। উনি কী আছেন?
কী দরকার?
এ প্রশ্নের জবাবে আমার সাপ্তাহিকের নামটি বলি। এবাং আমার আসার কারণটাও খুলে বলি।
এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকানোর ফুরসত মেলে সাফায়েত উল্লাহর। আমার মাথার তেলহীন রুক্ষ চুলে বসানো রংজ্বলা ক্যাপ থেকে শুরু ভুসভুসে কালো সোয়েটার, গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট বেয়ে পায়ের ধুলোমুলিন স্যান্ডেলটি পর্যন্ত দৃষ্টি বোলান। এই অনুভুতিটি এতোটাই তীব্র যে আমার মনে হয় কেউ যেন আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা শরীরে হাত বুলাচ্ছে। সাফাতে উল্লাহর চোখে এবার স্পষ্টতই তাচ্ছিল্ল ঝড়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি নতুন নয়। অখ্যাত সাপ্তাহিকের একজন সাংবাদিককে কেউই পাত্তা দিতে চায় না। তাই এ ধরণের অবজ্ঞা মেশানো দৃষ্টি আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। আজকের এই কাজটির জন্য অবশ্য আমি আমার সাপ্তাহিকের পক্ষ থেকে আসিনি, কাজটি বাগিয়ে যেতে পারলে প্রথম সারির একটি দৈনিকে ক্রাইম রিপোর্টারের চাকরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এতো কথা এই পুলিশের এসআইয়ের কাছে ভাংলাম না।
গত সাড়ে তিন ঘন্টায় আমি এই লোকটির বিরাট ভক্ত বনে গেছি। একে যতোই দেখছি, ততোই অবাক হচ্ছি। দারুন কর্মঠ। এক মুহুর্ত বসে থাকছেন না। সারাক্ষণই কিছু না কিছু করছেন। দেশে এরকম আর কয়েকটি লোক থাকলে অলস হিসেবে বাঙালি জাতির দুর্নাম চীরতরে ঘুচে যেতো। যেমন এই মুহুর্তে সাফায়েত উল্লাহ ব্যস্ত দাঁতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আত্মগোপন কনে থাকা খাদ্যকণার অনুসন্ধানে। পুরো প্রক্রিয়াটি দেখার মতো। তার টেবিলে বিছিয়ে রাখা তেল চিটচিটে রাবারক্লথের নীচ থেকে একটা ব্লেড বের করে গভীর মনোযোগে দেশলাইয়ের একটি কাঠির মাথাকে কেটে ছুচালো করেছেন। তারপর সেটি নিয়ে নেমে পড়েছেন দাঁতের ময়লার বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এর আগে প্রায় এক ঘন্টা সময় নিয়ে গতকালের একটি দৈনিকের আগাপাশতলা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছেন। আমার হাতে অফুরন্ত সময় আছে বলেই গভীর আগ্রহ নিয়ে সাফাতে উল্লাহর কর্মকান্ড লক্ষ্য করছি। আর এ থেকেই বুঝতে পারলাম পত্রিকার সংবাদের চেয়ে বিজ্ঞাপনগুলোতেই তার বেশি ঝোঁক। বিশেষত স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ, জীবনের শেষ চিকিৎসা বা হুজুরে কেবলার ওপেন চ্যালেঞ্জ জাতীয় বিজ্ঞাপনগুলো তিনি বেশ সময় নিয়ে পড়েছেন।
কব্জি ঘুরিয়ে হাতের ঘড়েিত নজর বুলাই।
হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। সাড়ে চারটা বাজে। এখানে কাজ শেষ করে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে লেখাটা নামাতে হবে। নিউজ এডিটর কওসার ভাই এমনই নির্দেশ দিয়েছেন। পছন্দ হলে এটি হবে দৈনিকের জন্য আমার প্রথম রিপোর্ট। তাই কাজটির জন্য ব্যগ্র হয়ে আছি আমি। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কোনো ব্যপাওে অতিরিক্ত আগ্রহ প্রকাশ করলে পুলিশ সেটা নিয়ে খামোখাই প্যঁচায়। তাই চোখেমুখে যতোটা সম্ভব নির্লিপ্তভাব নিয়ে বসে আছি। যেন আমার হাতে অফুরন্ত সময়।
কিছুক্ষণ আগেই পুলিশ কুখ্যাত খুনি আজরফ আলীকে আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে খুনের মামলাই আছে একুশটি। আর ধর্ষণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধে দায়ের করা মামলার সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি হবে। অত্যন্ত ধূর্ত এই খুনি অপরাধজগতে প্রায় কিংবন্তিতুল্য। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে তাই সযন্তে গোপন রেখেছে পুলিশ। ভাগ্যক্রমে এক সোর্সের মাধ্যমে আমার কাছে খবর এসেছে এই থানা হাজতে আটকে রাখা হয়েছে আজরফকে। কালই তাকে কোর্টে চালান করা হবে। কাওসার ভাইকে খবরটা জানাতেই তিনি লাফিয়ে উঠেন। যেকোনোভাবে আজরফের একটা ইন্টারভিউ জোগারের অ্যাসাইনমেন্ট দেন আমাকে। সঙ্গে এটাও জানান, সফল হলে তার দৈনিকে ক্রাইম বিটে কাজ করার সুযোগ করে দেবেন। একটি প্রভাবশালী দৈনিকের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছে আমার দীর্ঘদিনের। আজকে ভাগ্যক্রমে সেই স্বপ্নের কাছাকাছি পৌছেছি।
এসআই সাফায়াতকে আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য জানানোর পরও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। আশার কথা হচ্ছে, আজরফ এই থানাহাজতে আটক, সেটাও অস্বীকার করেনি সাফায়াত। কিছুক্ষণ ভেবে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে ফেলি। ওসির জন্য আর অপেক্ষা করা সম্ভব না। তারচেয়ে বরং সাফায়াতকে হাত করেই কাজ বাগাতে হবে। কিন্তু কিভাবে। ঘুস দেওয়ার উপায়ও নেই। পকেটে আঝে সাকুল্যে পঞ্চাশ টাকা। প্যান্টের পকেটে হাত গলিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি; বড় কিছু পাওয়ার জন্য অনেক সময় অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। একটা পাকা চাকরির কাছে এন সিরিজের নোকিয়া মোবাইল ফোনসেটতো তুচ্ছ। ঘুস দেওয়ার শিল্পটি আমার ভালোই জানা আছে। এবারও সেটা অব্যর্থভাবেই কাজে লাগালাম। ফলশ্রুতিতে আমি হাজখানার ভেতরে আজরফের মুখোমুখি বসে আছি।
নিরাপত্তার খাতিরেই হয়তো আজরফকে আটকে রাখা এই হাজতখানা থেকে অন্য বন্দিদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার জন্য ভালোই হলো। নিরালায় হয়তো মনখুলে কথা বলবে আজরফ, যেটা অনেক সময় বেশি মানুষের সামনে সম্ভব হয় না। আমার জন্য ১৫ মিনিট বরাদ্দ করে দিয়ে হাজতের দরজাটি বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে সামনে অফিস কামড়ায় গিয়ে বসেছেন সাফায়েত। যাওয়ার আগে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যে কোনো সময় ওসি চলে আসবেন, তার আগেই আমার কাজ শেষ করতে হবে।
আজরফ আলীর কোনো ছবি কখনো পত্রিকায় ছাপা হয়নি। তাই তার হুলিয়া সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। কিন্তু নাম শুনে মধ্যবয়ষ্ক, গ্রাম্য চেহারার একটি লোকের অবয়ব মনে ভেসে উঠে। সামনাসামনি তাকে দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। দু-এক দিনের না কামানো দাঁড়ি মুখে এই লোকটির বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। দেখতে আরো একটু কম মনে হয়। মেদহীন লোকটির চোখের দিকে তাকালেই বোঝাযায়, অসম্ভব বুদ্ধি রাখে। কিন্তু কোনোভাবেই একে একুশটি খুনের আসামী বলে মনে হয়না। আর এটাই হচ্ছে আজরফের সবচেয়ে বড় সুবিধা। বুদ্ধির জোরেই এতোদিন ধরে পুলিশের হাত এড়িয়ে নির্বিঘ্নে একের পর এক অপরাধ করে গেছে। কেউ তার টিকির নাগালও পায়নি। অবশেষে নিজের দলের একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। নোকিয়া মোবাইল ফোনসেটের বিনিময়ে শুধু আজরফের সাক্ষাতকারের ব্যবস্থাই নয়, এসব তথ্যও জানিয়েছেন সাফায়েত উল্লাহ।
সময় নষ্ট না করে নোটবই আর কলম বাগিয়ে কথা শুরু করি আজরফের সঙ্গে। এক মিনি-দু মিনিট করে সময় গড়াতে থাকে। আজরফের অন্ধকার জীবনের গল্প শুনে শিউরে উঠতে থাকি আমি।
আচ্ছা পুলিশের হাত থেকে বার বার পিছলে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য কী টেকনিকটা খাটাতেন?
আমার এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন আজরফ।
আচ্ছা প্রশ্নটা বরং অন্যভাবে জিজ্ঞেস করি, এবারইতো প্রথম আপনি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে হাজতে এসেছেন। আপনি মনে করেন, এই পরিস্থিতিতেও পালিয়ে যাওয়া সম্ভব?
আজরফের মুখে নি:শব্দ হাসি ফুটে উঠে। ফিসফিসে গলায় বলে উঠে, সম্ভব, অবশ্যই সম্ভব।
একজন মানুষের হাসি যে এতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা নিজের চোখে না দেখলে কখনোই বুঝতে পারতাম না। বিষধর গোখরা সাপের যদি হাসার ক্ষমতা থাকতো, তাহলে হয়তো তার হাসিকে আজরফের হাসির সঙ্গে তুলনা করা যেতো। সময় বয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, সময় শেষ হয়ে এসেছে। এর মধ্যেই যে মালমশল্লা যোগাড় হয়েছে তা দিয়ে প্রথম পাতায় লিড না হোক, অন্তত তিন কলাম বক্স আইটেম নিশ্চিত, সেই সঙ্গে নিশ্চিত হবে তার চাকরিটাও। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে নোটবুকটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াই। ওসি ব্যটা আসার আগেই ভাগতে হবে।
সাফায়েত উল্লাহ গভীর মনোযোগে সদ্য পাওয়া নোকিয়া মোবাইল ফোন সেটটির নানা রকম অপশন ঘেটে দেখছেন। তাকে বিরক্ত না করেই নি:শব্দে থানা কম্পাউন্ড ছেড়ে বেড়িয়ে যায় সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিকটি। ঘাড় তুলে একবার দেখেন সাফায়েত। অপশৃয়মান কালো জ্যাকেট আর রং জ্বলা ক্যাপের দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে পরক্ষণে মোবাইলে ডুবে যান।
বাইরে এসে খোলা হাওয়ায় মনখুলে শ্বাস নেয় যুবক। দু হাত আকাশে তুলে আড়মোড়া ভাঙ্গে। অভ্যাসবশত প্যান্টের পকেটে সিগারেটের প্যাকেটের তল্লাশি চালায়। বিরক্তির সঙ্গে অনুভব করে দুই পকেটই শূণ্য। অনির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে মুখ থেকে খিস্তি বেড়িয়ে আসে। হাতে অনেক কাজ, প্রথমেই দলের মীরজাফরটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর লম্বা সময় ঘাপটি মেরে থাকার জন্য খুঁজতে হবে আস্তানা। পরিস্থিতি এখন গরম হয়ে উঠবে। ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত চুপচাপ থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি থেকে এটা জানে আজরফ।
প্যান্টটা একটু ঢিলে হচ্ছে। শালার ব্যাটা সাংবাদিক বেল্টও পড়ে না। প্যান্টটা একহাতে ধরে সামনে আগাতে থাকে সে। একটু পরে হাজতে ওই ব্যটাকে আবিষ্কার করে ডিউটি অফিসারের চেহারাটা কেমন হবে সেটা ভেবে নিজের মনেই একচোট হেসে নেয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


