ঢাকা শহরের জায়গাগুলার নাম কে রাখছে কইতে পারো? এই জায়গার নাম সেগুনবাগিচা হয়? যাবেন কমলাপুর? তৃতীয় সিএনজি চালকও না দিলো। মোটাসোটা শরীরটা নিয়ে এঁকে বেঁকে হাঁটতে প্রাণান্ত হচ্ছেন হাসান আশরাফ, সঙ্গী রাজীব সরকার অবশ্য নির্বিকার। খেয়াল করলে রাজীবের মুখে একটু হাসিও যে দেখা যাবে না এমন নয়। অন্য চাকরি না পেলে আর কয়দিন পরই সাংবাদিকতা জীবনের এক বছর হয়ে যাবে রাজীবের। শুধু শুনে যাওয়াই যে আদর্শ যোগাযোগ এতদিনে সে বুঝে গেছে ভালোমতোই। আর ওইসব খুব একটা শুনতেও হয় না সিনিয়রদের কথার একটা তাল থাকে, কায়দামতো তাতে কিছু হু হা এর তেহাই দিয়ে গেলেই চলে।
তোমারে ক্যান লইয়া যাইত্যাছি বুঝবার পারতেছো? তোমার এই গুণডার জন্যই তুমি টিইক্যা যাবা বুঝছো? হ বিশ্বাস করো। বেশি কিছুর দরকার নাই, এই যে তুমি মুরুব্বিগো মুখে মুখে কথা কওনা এইডার বিরাট ফজিলত আছে। পরে টের পাইবা। সিগারেট খাইবা? হাত বাড়িয়ে নেয় রাজীব? নাহ আশরাফ ভাইয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে। যাকগে আমার কী? সিগারেট ধরায় রাজীব।
বৈশাখের ঢাকা দেখাচ্ছে বটে। প্রেসকাবের সামনে সচিবালয়ের পেছনে জনতা দিকশূণ্য। গাছ থেকে শুরু করে বাস, ল্যাম্পপোস্ট, সড়ক দ্বীপ, পুলিশ বক্স সবই ঘামছে। ঘামছে ভিখারি ঘামছে অস্থির পায়চারী করা কুকুর। সবার মুখেই একটা জলে পড়া ভাব, কাছে গেলেই নির্ভুল ঘামের নিজস্ব গন্ধ।
এদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানো? আচ্ছা কেউ কমলাপুরে যেতে চাচ্ছে না কেন বলতো? তোমাগো নিউজ এডিটর বলে চেঞ্জ হইছে? একটা হু দেয় রাজীব। অবশ্য আশরাফ ভাইয়ের কানে তা পৌঁছায় না। তাতে কোনো সমস্যা হয় না। এইসব প্রশ্নের কোনোটারই জবাব চায় না আশরাফ। আপাতত সে একটা বাহন চায় যেটা কমলাপুর যাবে। হাঁটতে একটুও ভালো লাগছে না তার। কোনোকালেই লাগে না।
আচ্ছা এই যে এতো লোক রাস্তায়, তুমি কী মনে করো এদের সবারই কোনো না কোনো কাজ আছে? এবারের প্রশ্নটা নিয়ে সত্যিই ভাবিত হয় রাজীব। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১০ জনের কাছ থেকে জানতে চাইবে নাকি? হ্যালো আমি দৈনিক ভালোমানুষ পত্রিকায় কাজ করি। এ মুহূর্তে আপনি রাস্তায় কেন? জ্বি খালার বাসায় কি যেতেই হবে? চাকরির তদবির? ঢাকা ঘুরতে বেড়িয়েছেন? বেশ বেশ।
কমলাপুর যেতে পারি ১০০ টাকা লাগবে। প্রেসকাব থেকে কমলাপুর ১০০ টাকা হালা তুই কস কী? না গেলে না যাবেন গালাগালি করেন ক্যান? গালাগালির দেখছস কী? তুই আমারে চিনস? সিএনজি চালক হাই তোলে। কিছু না বলে উঠে বসে আশরাফ আর রাজীব। সিএনজি স্টার্ট নেয়। জটে যুক্ত হয় আরো একটি যান।
আইচ্ছা কওতো আওয়ামী লীগ সরকারের কি মাথামুথা খারাপ? কত্তগুলা নাবালক কমিউনিস্ট আর হাবিজাবি ব্যবসায়ীরে মন্ত্রী বানাইছে। হেগো মাথার উপরে আবার বসাইছে উপদেষ্টাগো। আজীব।
পানির পিপাসা লাগছে আশরাফ ভাই নাইমা গিয়া একটা পানির বোতল কিইন্যা আনি। বলতে বলতেই নেমে যায় রাজীব। সামনের দোকান থেকে পানি কিনে ভাঙতি টাকা দিতে সময়ই জট ছেড়ে যায় অনেকটা। দৌড়ে বসে হাঁপাতে থাকে সে।
এক ঢোকে অর্ধেকের বেশি সাবাড় করে হাসান আশরাফ এর দিকে বোতলটি বাড়ায় রাজীব। নাহ থাক। পানি খাইলেই আবার পেচ্ছাপ চাপবে শালার দেশ। রিক্সার গতিতে কিছুটা এগোয় যান্ত্রিক তিন চাক্কা।
ইসরায়েলের অবস্থাডা দেখছস। কথা নাই বার্তা নাই মাইর ধইর কইরা একাকার করতেছে। আমেরিকার আক্কেলডা দ্যাখ। ওই ইহুদীরাই ওগোরে ডুবাইবো দেখিস।
পেছন দিকে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে থাকে রাজীব। বিজ্ঞাপনী সংস্থার কপি লিখনের কাজটা খারাপ না। ঠাণ্ডাঘরে কফি খেতেও অনেক ভালো লেগেছিল তার। মেয়েগুলোর কী স্বাস্থ্য!
টাকা দিতে গিয়ে আবারও গজগজ করেন আশরাফ। নোটটা পকেটে পুরে সিএনজি চলে যায়। প্রায় সন্ধ্যা নেমেছে। কমলাপুরের কন্টেইনার টার্মিনালকে ভুতূড়ে মনে হয়। মোবাইল ফোন বের করেন আশরাফ। আইচ্ছা আহেন।
শোন এইখানে নাকি পুরা দেশের ফেন্সিডিলের গোডাউন। পুলিশের চোখে পাড়া দিয়া বইসা থাকলেও এইখানে কোনোদিন রেইড হয় নাই। মাহাজনের নাম ঝন্টু ওস্তাদ। আমারে একজন কইছে পুরাডা ঘুইরা দেখাইবো। আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবসে লিড স্টোরি করুম আমি এইবার।
মফিজ নামে সুন্দর একটি তরুণ আসে। প্রায় গলা নামিয়ে বলে ওই যে দেখতাছেন ওইখানে মাল রাখা হয়। ১০ জনের একটা পাহারাদার আছে। তারা সব দিক খেয়াল রাখে। ইয়াসমিনরে টাকাডা দিয়া দিয়েন।
আপনেরা এইখানে কী করেন? পোলাপানগুলার লক্ষণ ভালো না। চার পাঁচ জন হবে। একজন পকেট থেকে আনমনে একটা পিস্তল বের করে। আপনেগোরে ওস্তাদ ডাকে। আশরাফ আর রাজীব কোনো কথা না বলে তরুণ দলটির সঙ্গে হাঁটতে থাকেন।
স্লামালেকুম দিয়ে উঠে দাঁড়ায় ঝন্টু। বয়স বেশি না। ত্রিশ হয় কি হয় না। একটা প্রায় সাজানো গোছানো ঘর। ঝন্টু ছাড়াও আরেকজন দুর্বল লোক আছে।
আপনেরা সাংবাদিক। খুব ভালা। কিন্তু এইখানে আমারে না কইয়া আসা উচিত হয় নাই আপনাগো। বিপদ আপদের কথা কিন্তু কওন যায় না। দুবলা লোকটা একটা পিস্তল বের করে। তাক করে আশরাফ আর রাজীবের মাথায়। ঝন্টু একটা গিলাফে মোড়ানো বের করে। চুমু খায়। তার মুখ এখনও তেলতেলে বিনয়ী।
এইডা কোরান শরীফ। এইখানে হাত রেখে বলেন এইখানকার ব্যাপারে কোনো লেখালেখি করবেন না। বলেন বলেন। আশরাফ আর রাজীব হাত রাখে।
শালা ঝন্টুর বাচ্চা। কোরান শরীফে হাত রাখাইয়া কসম কাটাইয়া লইলো কতবড় বদমাইশ। আর কিছু দিয়াই আমারে আটকাইতে পারতো না। রাজীবের মনে পড়ে যে সে হিন্দু। কথা না বাড়িয়ে চোখ বুজে বসে থাকে সে। (শেষ)
আমার বন্ধু খালেদ মুহিউদ্দিনের লেখা গল্পটি আমাকে সে মেইল করেছিলো। ব্লগের পাঠকদের জন্য দিয়ে দিলাম। কেমন লাগলো জানাবেন প্লিজ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




