somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৬ টি লাশ পেছনে ফেলে পিছু হঠে বিএসএফ: ফিরে দেখা ১৮ এপ্রিল ২০০১

১৮ ই এপ্রিল, ২০১১ সকাল ১০:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল। সীমান্ত এলাকা রৌমারীতে বিডিআ-বিএসএফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা কভার করতে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সে সময় আমার লেখা একটি প্রতিবেন তুলে ধরছি।

সেদিনের ভোরটিও ছিল আর অন্যান্য দিনের মতোই। রৌমারী সীমান্তে বড়াইবাড়ি গ্রামের জনগণ তখনো ঘুনাক্ষরেও জানতে পারেনি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে কী ভীষণ তাণ্ডব শুরু হবে। বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলিতে গ্রামবাসী হতচকিত হয়ে ওঠে। প্রাণভয়ে তারা পালিয়ে যায় নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত বড়াইবাড়িসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ তাদের বাড়িতে ফিরে আসতে সাহস পাননি।

বড়াইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার ১৮ এপ্রিল ভোর রাতে যারা ক্ষেতের কাজে মাঠে নেমেছিল, গ্রামের চারপাশে কয়েকশ বিএসএফ জওয়ানের উপস্থিতি তাদের স্তম্ভিত করে দেয়। এ সময় বিএসএফ জওয়ানদের সামনে গ্রামবাসীর যারাই পড়েছে সবাইকেই তারা ‘হট যাও’ বলে তাড়িয়ে দেয়।

গ্রামের অধিবাসী আব্দুল কাদের মেম্বারের ছেলে শাখাওয়াত (১৮) এ সময় বাড়ির পাশের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য পাম্প চালু করতে ক্ষেতে গিয়েছিল। সেখানেই কয়েকজন বিএসএফ জওয়ান তার পথরোধ করে হিন্দিতে বিডিআর ক্যাম্পটি কোথায় তা জানতে চায়। ঘুম থেকে উঠে অকস্মাৎ এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে ভয় পেলেও বুদ্ধি হারায়নি শাখাওয়াত। সে বুঝতে পারে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে আসা বিএসএফ সদস্যদের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই শুভ হতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে সে বিএসএফ জওয়ানদের বিডিআর ক্যাম্পের সঠিক অবস্থান না দেখিয়ে গ্রামের অন্য একটি বাড়ি দেখিয়ে দেয়।

এরপর বিএসএফ তাকে ছেড়ে দিলে শাখাওয়াত বাড়ি ফিরে এসে সবাইকে ঘটনাটি খুলে বলে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পেরে কাদের মেম্বার তখনি বাংলাদেশ সীমানায় বিএসএফের প্রবেশ এবং তারা যে বিডিআর ক্যাম্পটি খুঁজছে সেই সংবাদ বিডিআর ক্যাম্পে লোক মারফত পৌঁছে দেয়। বিডিআর সদস্যরা প্রথমে ঘটনাটি পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও তারা দ্রুত প্রস্তুত হয়ে পড়ে। এই সময় বিএসএফ শাখাওয়াতের দেখিয়ে দেওয়া ভুল বাড়িটিকে বিডিআর ক্যাম্প ভেবে সেটি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এই গুলির শব্দে বিডিআর জওয়ানরা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারে। বিএসএফের তুলনায় সংখ্যায় নিতান্ত নগণ্য হওয়ায় জান বাঁচানোর তাগিদে প্রথম চোটেই তারা বিএসএফের অবস্থান লক্ষ্য করে মেশিনগানে ব্রাশফায়ার করে।

বিডিআরের পক্ষ থেকে পাল্টা হামলার জন্য বিএসএফ একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। বিএসএফের লক্ষ্য ছিল ভোর রাতে অতর্কিতে বিডিআর ক্যাম্পে হামলা করে ক্যাম্পের দখল নেওয়া। ফলে হঠাৎ করে বিডিআরের এই পাল্টা জবাবে তারা হতচকিত হয়ে পড়ে। প্রথম চোটেই মারা পড়ে বেশ কয়েকজন বিএসএফ সদস্য। বিডিআরের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএসএফ । এ সময় তারা বড়াইবাড়ি গ্রামের পর্বপাশে বিতর্কিত এলাকার গ্রামে আশ্রয় নিয়ে এই এলাকার গ্রামবাসীদের অর্ধশতাধিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেখান থেকেই তারা বিডিআর ক্যাম্প লক্ষ্য করে ক্রমাগত মেশিনগান ও মর্টার শেল চালাতে থাকে । বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ১৬ জন বিএসএফ জওয়ানের লাশ ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই লড়াইয়ে ঘটনাস্থলে নিহত হন বিডিআর জওয়ান কাদের। পরে বৃস্পতিবার মৃত্যু হয় আরো দুজন বিডিআর সদস্যের।
বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়ে এই যুদ্ধ চলেছিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। মাঝে মাঝে কিছু সময়ের বিরতি ছাড়া দুপক্ষ থেকেই অবিরাম গুলিবর্ষণ চলে। বৃহস্পতিবার দিনে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। জামালপুর, ময়মনসিংহ এবং ঢাকা থেকে বিডিআরের অতিরিক্ত ফোর্স চলে আসে রৌমারী ক্যাম্পে বৃহস্পতির রাতে বিএসএফের ক্যাম্প থেকে ট্রেসার চালানো হয়। এর আলোতে বড়াইবাড়ির আশপাশের তিন-চার মাইল এলাকা আলোকিত হয়ে ওঠে। আশপাশের গ্রামের আতঙ্কিত জনগণ এই আলো দেখে প্রচণ্ডরকম ভীত হয়ে পড়ে। আশপাশের সবগুলো গ্রামের মানুষ গিয়ে আশ্রয় নেয় ৫-৬ কিলোমিটার দরে বহ্মপুত্র নদের তীরে।

গ্রামবাসী দাবি করেন, ট্রেসারের আলো জ্বালিয়ে বিএসএফ মলত তাদের নিহত সদস্যদের লাশ তুলে নিয়ে গেছে। গ্রামের পশ্চিম পার্শ্বে ধানক্ষেত থেকে বিএসএফ ক্যাম্প বরাবর ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়ার চিহ্নও দেখা গেছে। এদিকে সেই রাতে গ্রাম থেকে একটি ঠেলাগাড়ি খোয়া গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম লাল মিয়া জানান। এ তথ্য অনুযায়ী বিএসএফ পক্ষে মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসেবের ১৬ জনের বেশি হতে পারে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী লাল মিয়া বলেন, প্রথম রাতে বিএসএফ যখন হামলা চালায় তখন প্রায় ৩০০ জন বিএসএফ জওয়ান সীমান্ত থেকে ৫০০ গজ ভেতরে ঢুকে পুরো গ্রামটি ঘিরে ধরে। তারা গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ধরণী নদীর ঢালে এবং উত্তর প্রান্তে বিএসএফের কাকড়িপাড়া ক্যাম্প পর্যন্ত এলাকা কর্ডন করে রাখে। মলত বিডিআর ক্যাম্পটি দখল করে বড়াইবাড়ি গ্রামের বিতর্কিত এলাকাটির দখল নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল বলে গ্রামবাসীর ধারণা। গ্রামবাসীও বলাবলি করছেন যে, দুদিন আগে তামাবিল সীমাšবর্তী পাদুয়া ক্যাম্প দখল নেওয়ার ঘটনার জের হিসেবেই বিএসএফ বড়াইবাড়ি গ্রামের সীমাšবর্তী ২১৬ একর জমি দখলের চেষ্টা চালায়। এর ফলেই এই সংঘর্ষের সত্রপাত বলে তারা মন্তব্য করেন। (শেষ)

গত বছর এই দিনে লেখাটি পোস্ট করেছিলাম। যারা তখন দেখেননি এবং এই সময়ের মধ্যে যারা ব্লগে নতুন যুক্ত হয়েছেন তাদের জন্য আবারো পোস্ট করলাম। ধন্যবাদ।
১২টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×