বাসা হইতে রিকশা দূরত্ব পার হইয়া বাসে উঠিতে হয়। বরষার দিন বলিয়া রিকশা চালকের দাবী, "আরো দুই টাকা দিতে অইবো..." তাহার ত্রিচক্রযানে উঠিবার প্রাক্কালে লক্ষ করিয়াছিলাম, সে কিন্চিত্ রগচটা টাইপের চালক। তাহার দাবীতে কর্ণপাত না করিয়া দুই হস্তে দু্ই পাদুকা লইয়া রাস্তায় জমিয়া থাকা পানির উপর লম্ফ ঝম্ফ দিয়া টক্কর দিতে উদ্দত হইলাম। এমতাবস্থায় কর্নকূহরে ত্রিচক্রযানের রগচটা চালকের কিছু খিস্তি কাহিনী প্রবেশ করিলো। মেজাজ গেলো বিগড়াইয়া!! ততক্ষনে দুই চারখানা লম্ফ ঝম্ফ দিয়া ফালাইয়াছিলাম বলিয়া ফিরিয়া গিয়া তাহার খিস্তি খাউড়ের জবাব দিতে মন চাহিলো না। তবে আপন মনে তাহার জন্য বিড়বিড় করিয়া ক্ষোভ চাপাইয়া রাস্তা টক্কর দিতে লাগিলাম। কচিত্ পরেই লক্ষ করিলাম,রাস্তার এক কোনায় কতিপয় লোক জড়ো হইয়া চেঁচামেচি করিতেছে!
অনুসণ্ধান করিয়া বুঝিলাম, ছেঁচো চোর পাকড়াও করা হইয়াছে। অগ্রসর হইয়া তাহার ছিন্ন জামার ত্যানা হইয়া যাওয়া কলার চাপিয়া ধরিলাম। পাশের একজন লোক ৯০ মাত্রার গালিগালাজ করিয়া যাইতেছে। তাহার মধ্য হইতে যে কয়খানা গালিগালাজ আমার বোধগম্য হইতেছে, তাহা মৃদু স্বরে আউড়াইয়া যাইতে মন্দ লাগিতেছিলোনা! অপর এক লোক এক কাঠি বাড়িয়া চোর ব্যটার তলপেটে সর্বশক্তি দিয়া এক খানা মুঠা ঘুষি হাঁকাইলো। তাহার কতবড় সাহস!!! আমিও লম্বা একখান দম লইয়া জোর ঘুষি চালাইয়া এইপাস ওইপাস আপন প্রসংসা শুনিতে কর্ণ খাড়া করিলাম এবং শুনিলামও। রিকশাওয়ালা ব্যাটারে পাইলে আলবাত্ এইরূপ শিক্ষা দিয়া দিতুম!! ইতোমধ্যে চোর বাবাজী মাটিতে লুটিয়া পড়িয়াছে। আমার বুক আধা হস্ত ফুলিয়া উঠিলো। জীবনে চোর পিটাইনাই। আপিসে গিয়া এইরূপ কাহিনী সকলের সামনে উপস্থাপন করিলে, মহিলা সহকর্মিনীদের লাজুক হাসি আর পুরুষ সহকর্মিদের বাহবা শুনিতে পাইবো। এই চিন্তাও মনের কোনায় ঘুরিয়া গেলো একবার। এহেন বিরত্বপূর্ণ কর্মের মাঝে এহেন ভাবনা আমায় দোলা দিয়া গেলো। আর ততক্ষণে অন্যান্য বীর পুরুষগন তাহার এক খানা হস্ত ভান্গিলো আর চোয়াল থেঁতলাইয়া দিয়াছে। ব্যাথায় কুঁকাইয়া কুঁকাইয়া সে যখন অজ্ঞান হইয়া পড়িলো নিশ্চিত হইলাম, তক্ষনে আমরা সকল বীর পুরুষগন মমতা অনুভব করিলাম। মাইনে, তাহাকে এই যাত্রায় ছাড়িয়া দিলাম। অন্যথায় তাহার হ্য়ত অপর পাড়ে পাড়ি জমাইতে হইতে পারিত। রাস্তার চোর রাসতায় পড়িয়া রইলো।
আমি বাসে চড়িলাম। জনৈক ভদ্রলোক আমায় ডাকিয়া কইলো, চোর ব্যাটার চুরিটা ছিলো কি?? আমি কইলাম, "চুরিত চুরিই!!" বস্তুত আমি জানিতাম না, সে কি চুরি করিয়াছিলো। আপিসে বীরত্ব গাথা রচনাখানি সবাইকে শুনাইলাম। ইহাতে আশাতীত ফল পাইয়াছি। সুন্দর চোখা সহকর্মিনীটি আমায় কেমন জানি দেখিতেছিল। চোর পিটাইলে রমনীর দৃষ্টি কাড়া যায় আগে জানিতাম না।
রাশি রাশি ভাবনা ভাবিতে ভাবিতে ঘর ফিরিবার পথে সকালের দাপাদাপির স্থানের পাশের দোকানীর হাতের এক খানা চা খাইতে গেলুম। ভাবখানা এমন যেন কিছুই হয়নাই। দোকানী যাহা কহিলো, তাহা এইরূপ, "এইডা নতুন মাল, তাই পাক্কা হ্য়নাই, আর যেই মাইর খাইলো, জীবনেও চুরির নাম মুখে লইবো না!! আমার চা এর পয়সা না দিয়া পালাইতেই এমন ধোলাই, চায়ের কাপখানা লইতে গেলে তো মারাই পড়তো!! হা হা হা... আপনি জবর মাইর দিচেন সার!!!!!! " আমি এক খানা অতিরক্ত টাকা তাহার হস্তে গুঁজিয়া দিয়া প্রস্থাণ করিলাম। আমার বুক ততক্ষনে গর্বে এক হস্ত ফুলিয়া উথিয়াছে। বাসায় ফিরিয়া ফ্রেশ হইয়া, রাখিয়া যাওয়া বিজ্ঞ পোকারে সেই কাহিনী কইলাম......
সমস্ত নিশীতে ঘুমের বিস্তর ব্যাঘাত ঘটিয়াছে। এইপাশ ঐপাশ করিয়াছি। কোনো লাভ হয়নাই!! পোকা বারংবার কহিতে লাগিলো, "ইহা তুমি কি করিলা?? ইহা তুমি কি করিলা?? কিছু না জানিয়া, না শুনিয়া ইহা তুমি কি করিলা??"
এত এত বীর একইসাথে একইদিনে একই ক্ষনে আপন আপন বিজ্ঞ পোকা শয়ন কক্ষে রাখিয়া দিন চরিতে গেলো কি করিয়া, তাহা ভাবিয়া কূল পাইনাই। কৈশরে সম্ভাব্যতার গণিত কষিয়াছিলাম। আমার মনে লয়, ইহা সেইরূপ কোন এক গণিতের খেইল। সকল বীর পুরুষ একত্রে আপন আপন বিজ্ঞ পোকা মনের ভুলে একইসাথে একইদিনে একই ক্ষনে শয়ন কক্ষে রাখিয়া গিয়াছিলো ঠিক আমারই মতন। এইরূপতো হয়না!! ইহা গণিতের খেইল নয়তি কি!! আশা করিতেছি এইরূপ মনের ভূল রোজ রোজ সকলের হইবেনা! আর রোজ রোজ এমন অনাকানক্ষিত ঘটনাও ঘটিবেনা। কিন্তু লাভ হয়নাই, আমার বিজ্ঞ পোকা আমার মাথা কুড়িয়া খাইতে লাগিলো, নিদ্ আসে নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

