somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েব - ইন্টারনেট প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে?

২৮ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আশি'র দশকের শেষের দিকে টিম বার্নার্স-লি যে ওয়েব (Web) নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ওয়েব যে আজকে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াবে সেটা তিনি নিজেই ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। ওয়েব প্রযুক্তি দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে, আমাদের জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর প্রায় সবকিছুই এখন ওয়েবএ পাওয়া যায়। মানুষের সাথে মানুষের এতো সহজ যোগা্যোগ এবং তথ্যের আদান-প্রদান পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি।

আমরা অনেকেই ইন্টারনেট বলতে যা বুঝি সেটা হচ্ছে আসলে ওয়েব। ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেট এর অনেকগুলো আ্যপ্লিকেশন এর একটি। অন্যান্য আরো কিছু আ্যপ্লিকেশন হচ্ছে ইমেইল, এফটিপি (ফাইল ট্রান্সফার প্রোটোকল), এসএসএইচ (SSH) ইত্যাদি। ইন্টারনেট বলতে বস্তুত এই পৃথিবীব্যাপী নেটওয়ার্কেই বুঝায়। ওয়েবই আসলে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে বেশি ব্যাবহৃত ইন্টারনেট আ্যপ্লিকেশন। ওয়েব এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তথ্যের সহজলভ্যতা। তথ্য বলতে যে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় বুঝায় তা কিন্তু নয়। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের যাকিছু জানার প্রয়োজন তাই তথ্য। আমার বন্ধু সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গেছে সেটি একটি তথ্য, সেখানে ও অনেক ছবি তুলেছে সেই ছবিগুলোও একধরণের তথ্য, সেখানে কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায় সেটাও তথ্য। তথ্যের এই বহুমাত্রিকতা শুরু হয় বিশেষ করে সোশাল নেটওয়ার্কগুলোর প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে।

তথ্য আদান-প্রদানই হয়ে উঠছে ওয়েব ভিত্তিক কম্পানীগুলোর মূল ব্যবসা। গুগলের মূল মিশন হচ্ছে বিশ্বজগতের সব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ওয়েব এর প্রথম দিকে ব্যাপারটি ছিলো আমাদের নিজেদের দরকারী তথ্য খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ব্যাপারটি এমন হতে চলেছে যে দরকারী তথ্য আমাদেরকে খুঁজে নিবে . গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ফেইসবুক, টুইটার , উইকিপিডিয়া, ফ্রেণ্ডফিড , মাইস্পেস , অরকুট, ডিগ , টেকমিম সবাই এই তথ্য প্রবাহ এবং যোগাযোগকে মানুষের আরো কাছে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আরএসএস এবং রিয়াল টাইম আপডেট এর মতো প্রযুক্তিগুলো আবিষ্কার হয়েছে এধরণের সেবা দেওয়ার জন্য। গতো কয়েক বছরে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মানুষ সংবাদের জন্য টেলিভিশন-সংবাদপত্র ইত্যাদির চেয়ে ওয়েব এর কাছেই বেশি যাচ্ছে । সংবাদ পড়ার জন্য আগে মানুষ সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, গুগল নিউজ ইত্যাদি সাইটে গেলেও ইদানিং সোশাল নেটওয়ার্ক এবং ব্লগ হয়ে উঠছে সংবাদের নতুন উৎস।

এ ব্যাপারটা প্রথম আমি খেয়াল করি গতো মার্চ মাসে আমেরিকান এয়ারলাইন্স এর একটি প্লেইন নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরী অবতরণ করার পর। এই ঘটনার খবর সবার আগে জনসম্মুখে আসে টুইটারের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের (এবং উদ্ধারকারীদের) মধ্যে অনেকেই টুইটার ব্যবহারকারী ছিলেন এবং তারা প্রতিনিয়ত ছোট ছোট টুইট (১৪০ শব্দের ভেতর এসএমএস এর মতো অনলাইন মেসেজ) দিয়ে ঘটনার আপডেট দিচ্ছিলেন। টুইটারের সুবিধা হলো এটি ব্যবহার করে রিয়াল টাইম সংবাদ দেয়া যায়। এটাকে বলা যায় এসএমএস এর অনলাইন ভার্শন। কিন্তু এসএমএস দিয়ে যেখানে একসাথে একজনকে মেসেজ পাঠানো যায়, টুইটারের সাহায্যে সেখানে আক্ষরিক অর্থেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে মেসেজ পাঠানো যায়। টুইটারের এমন উত্থানের পর সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো অনেক দুশ্চিন্তায় আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিএনএন (@cnnbrk) এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস (@nytimes) দুটি'রই টুইটার একাউন্ট আছে! টুইটারকে অনেকেই বলছে গুগল এবং ফেইসবুকের নতুন প্রতিদ্বন্ধী। ফেইসবুকের সর্বশেষ ডিজাইনটি করা হয়েছে আসলে টুইটারকে নকল করে এবং একে টপকে যাওয়ার জন্য। খেয়াল করে দেখবেন ফেইসবুক সারাক্ষণ সবার স্টেটাস আপডেট আপনার পেইজে নিয়ে আসে। অনেক খবর, যেমন মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু, মানুষ প্রথম জেনেছে ফেইসবুকে বন্ধুদের স্টেটাস মেসেজ থেকে!

টুইটার সর্বশেষ সবাইকে টপকে যায় সাম্প্রতিক ইরানের সাধারণ নির্বাচনের সময়। ইরান সরকারের নানারকম সেন্সরশীপের কারণে ইরানের ভেতরের খবর বাইরে যাবার পথ প্রায় বন্ধ তখন। ইরানের জনগণ তখন টুইটার ব্যবহার করে নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন-সহিংসতার খবর ওয়েবে পোস্ট করতে থাকে। সিএনএন এর মতোন সংবাদ সংস্থা যখন সংবাদ সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছিলো টুইটারের মতো অনলাইন মেসেজিং সাইট তখন হয়ে উঠলো সংবাদের প্রধান উৎস। এমনকি টুইটার তাদের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ পিছিয়ে দেয় ইরানের সংবাদ প্রবাহ চালু রাখার জন্য। টুইটারের এমন একচেটিয়া আধিপত্য দেখে গুগল আর ফেসবুক তড়িঘড়ি করে চালু করে ফার্সী সার্ভিস

সারা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যবহার কমে আসছে ওয়েব এর কারণে। এমনকি বিজ্ঞাপন এর একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ওয়েবএ। ওয়েব এর বিজ্ঞাপন বাজার যে কতো বড় সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে গুগল। কেবলমাত্র বিজ্ঞাপন এর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে কম্পানীটি। মাইক্রোসফট প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই বাজারের একটা অংশ ধরার জন্য, যার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে তাদের বিং সার্চ ইঞ্জিন এবং উইন্ডোজ আজুর ওয়েব অপারেটিং সিসটেম। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি ওয়েবএ তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করে তাহলে তাদের ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেটা প্রায় নিশ্চিত!

পৃথিবীজুড়ে ওয়েবএ প্রাপ্ত সার্ভিসগুলো মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো দিবে। অনলাইনে কেনাকাটা, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে ফেইসবুকের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া, বাসার যাবতীয় বিল কম্পিউটারে কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে সেরে ফেলা, বাস-ট্রেইন-প্লেইন এর টিকেট কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলাইনে কিনে ফেলা, যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনার খবর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্লগ ও সোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি সুবিধা ইতোমধ্যে সবাই পেতে শুরু করেছে। এই গতিতে প্রযুক্তি চলতে থাকলে আর দশ-বিশ বছরের মধ্যে জীবন যে কতো সহজ হয়ে যাবে সেটা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ওয়েব সেবা'র ব্যাপ্তি কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের সাহায্যে। ওয়েব একসেস সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনকে এখন বলা হয় স্মার্ট ফোন। কপমিউটার এর চেয়ে অনেক বেশি বহনযোগ্য হওয়ায় মোবাইল এর মাধ্যমে আরো বেশি মানুষকে ওয়েব সেবার আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে। আ্যপলের আইফোন, গুগলের এন্ড্রয়েড, মাইক্রোসফট এর উইন্ডোজ মোবাইল - এগুলো সবই প্রায় ডেস্কটপ কম্পিউটার এর সমান ক্ষমতা সম্পন্ন অপারেটিং সিসটেম মোবাইল এর জন্য। এভাবে মোবাইল ফোনগুলো হয়ে উঠছে একেকটি বহনযোগ্য কম্পিউটার। আমার জীবনের প্রথম কম্পিউটার ছিলো এএমডি কে৬ টু যার প্রসেসর স্পিড ছিলো ৪৫০ MHz. আ্যপলের সর্বশেষ আইফোন এর প্রসেসর স্পিড হচ্ছে ৬৫০ MHz!

ওয়েব কম্পানীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে মানুষ বেশি বেশি সেবা পাচ্ছে কম মূল্যে বা (প্রায়ই) বিনা মূল্যে। গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, টুইটার, ফ্রেন্ডফিড এর মতো কম্পানীগুলো বাঘা বাঘা কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তিকে আরো বেশি মানুষের কাজে লাগানোর জন্য। এতে ওদের ব্যবসা হচ্ছে ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর সভ্যতার চাকাও ঘুরছে সামনের দিকে। মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরো আরামদায়ক। দুখের বিষয় আমরা বাংলাদেশে থেকে এর অনেক কিছুই পাচ্ছিনা শুধুমাত্র ভালো গতির ইন্টারনেট আর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এর অভাবে। আর এভাবেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি বাকী পৃথিবী থেকে। আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী - এরা যেদিন নিজেদের পরিবারের বাইরে দেশের মানুষের কথা ভাবা শুরু করবেন এবং যেদিন আমাদের দেশের মানুষেরা জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসা শুরু করবে, আরো সাহসী আর এডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে বদলে যাওয়া শুরু করবে আমাদের দেশ!



সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০০৯ সকাল ৮:২৮
৭টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×