কয়েকশ’ বছরের বংশ পরম্পরায়ের জুম চাষী মানিক চাকমার মতো আরো শত শত হত -- দরিদ্র জুমিয়ারা জানেন না, কেনো দিন দিন কমে যাচ্ছে তাদের জুম ফসলের উৎপাদন! হাড় ভাঙা শ্রম দেওয়ার পরেও কেনোই বা ‘পাহাড় -- মা’ এমন বৈরী আচরণ করছে পাহাড়েরই সবচেয়ে ভাগ্যহত ভূমিহীন এই সব জুম চাষীর সঙ্গে!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমনি ভাবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান -- এই তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে গঠিত কৃষি প্রধান পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্ত জুম চাষীর জীবনে এখন নেমে এসেছে বড়ই দুর্দিন। বহিরাগতদের অব্যহত জনসংখ্যার চাপ, জুমের জমি সংকুচিত ও পাহাড়ের উর্বরতা নষ্ট হওয়া, বিকল্প আয়ের অভাব, চার দশক ধরে জুম নিয়ন্ত্রনের নামে বন বিভাগের মিথ্যে মামলাসহ নানা হয়রানী --- এসব কারণে অর্থনৈতিকভাবে মার খেতে খেতে প্রান্তিক চাষী জুমিয়াদের জীবন এখন বড়ই বিপন্ন।
বিশিষ্ট পরিবেশবিদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক গৌতম দেওয়ান এই প্রতিবেদককে বলেন, জুম নিয়ে জনমনে তো বটেই, এমন কি সরকারি মহলে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা। এরমধ্যে জুমের আগুনে পাহাড়ের বনজ ও প্রানীজ সম্পদ ধ্বংস, জুমের কারণে পাহাড়ের ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি, জুম একটি পরিবেশ বিরুদ্ধ অবৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি --- ইত্যাদি প্রধান।
তিনি বলেন, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সন্তান জুমিয়ারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই জুমের আগুনে কখনো আগাছা বাদে কোনো বনজ বা প্রাণীজ সম্পদ নষ্ট করে না। এ ছাড়া জুম চাষে লাঙ্গল বা কোদাল ব্যবহৃত হয় না। জুমিয়ারা পাহাড়ে একটি ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে নানা রকম বীজ এক সঙ্গে বপন করেন বলে ভূমি ক্ষয় হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
গৌতম দেওয়ান বলেন, বরং এখন পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পাহাড় কাটার ফলে ভূমি য় তথা পাহাড় ধ্বসের হার অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশী। কিন্তু জনসংখ্যার চাপে জুমের জমি কমতে থাকায় অন্তত পাহাড়গুলোকে ১৫ -- ২০ বছর অনাবাদী রাখা হচ্ছে না বলে প্রাকৃতিক বনের সংখ্যা হৃাস পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য সমতলভূমির সংখ্যা খুবই কম বলে পাহাড়ে জুম চাষের বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি।
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা বলেন, ৬০ দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে প্রথম আঘাত হানা হয় বনাঞ্চলের ওপর। এই বাঁধের কারণে প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যায় বলে চাষের জমিও হয়ে পড়ে সংকুচিত। বাংলাদেশ আমলে পাহাড়ে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে।
তিনি বলেন, এছাড়া শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি বলে এখানে এখনো হয়নি ব্যাপক ও বড় ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আড়াই দশকের অশান্ত পাহাড়ে কৃষির বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। তাই ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে জুম চাষ করছে।
সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমা বলেন, আসলে যে ভাবে পাহাড়ে দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে, ভবিষ্যতে এখানে হয়তো আর জুম চাষ সম্ভব হবে না। প্রায় সাত লাখ ভূমিহীন এসব জুম চাষীদের এখনই পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য প্রাথমিকভাবে তাদের কিছু অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে এবং হর্টিকালচার, ফিসারিজ, কি ছোট ছোট প্রকল্প খাতে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে পুনর্বাসন করা জরুরি। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী জমির বন্দোবস্তি দিতে হবে এই সব বিপন্ন জুম চাষীদের।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জুমলিয়ান আমলাইয়ের রয়েছে জুমচাষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। বম জনজাতির নেতা জুমলিয়ান বলেন, "পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের এই বিজ্ঞান সম্মত চাষাবাদ পৃথিবীতে প্রায় সব দেশেই প্রচলিত। আমি নেপাল ও মিজোরামের পাহাড়ে জুম চাষ দেখেছি। এসব দেশের তুলনায় আমাদের দেশের পাহাড়গুলো অনেক উর্বর। আমাদের জুম চাষীরা শত শত বছর ধরে শুধুমাত্র প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ফলিয়ে আসছেন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফসল, সাক-সব্জি, ফল-মূল। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এখন তারা জুমের জমিতে ব্যবহার করছেন রাসায়নিক সার।"
এদিকে রাঙামাটির ‘জুম নিয়ন্ত্রন বন বিভাগের’ সহকারি বন সংরক্ষক লালচাঁদ সাহা জানান, ১৯৬২ সাল থেকে চলে আসা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে জুমিয়াদের জুম চাষে নিরুৎসাহিত করে তাদের সমতলভূমিতে বা পাহাড়ে বনজ ও ফলজ আধুনিক চাষবাসের মাধ্যমে পুনর্বাসন। তিনি স্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তাদের এই উদ্দেশ্য কখোনোই সফল হয়নি।
জুম চাষীদের এইসব বিপন্নতার প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান বলেন, জুমিয়াদের সঠিক পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ।
তিনি বলেন,“আমি নিজেই বান্দরবানের ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠির এলাকা ঘুরে তাদের সঙ্গে কথা বলে জুম চাষীদের সমস্যার কথা বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদেও পুনর্বাসন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সাপছড়ি ও টংকাবতির পাহাড়ের বেশ কয়েকজন চাকমা ও ম্রো জনগোষ্ঠির জুমিয়া জানিয়েছেন, জুম চাষই তাদের ঐতিহ্যগত জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। চাষের মৌসুমে তারা স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সকলে মিলে কাজ করে ফলান ধান, আদা, আলু, কলা, হলুদ, ভূট্টা, মরিচ, পেঁপেসহ প্রয়োজনীয় সব খাদ্যশষ্য।
জুমিয়ারা জানান, জুমের বীজধানও সমতলের চাষের বীজধানের তুলনায় আলাদা। প্রায় সব ধরনের সাক-সব্জি ফলানো হয় জুম চাষে। জুমে যত ধরনের ধান চাষ করা হয়, তার মধ্যে বিন্নি চাল পাহাড়িদের কাছে খুবই প্রিয়। অন্যান্য ফসলের চেয়ে এর দামও তুলনামূলকভাবে বেশী।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩ টি ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার পাহাড়িদের জনজীবনে রয়েছে জুম চাষের ব্যপক প্রভাব। জুম নিয়ে প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠির মধ্যে চালু রয়েছে লোকজ গান, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ইত্যাদি। জুম পাহারা দেওয়ার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় মাচার ওপর বানানো অস্থায়ী ছোট্ট কুঁড়ে ঘর বা মোনঘর নিয়ে চাকমাদের রয়েছে নানা স্বপ্ন গাঁথা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০০৭ দুপুর ২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



