somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ (তিন)

১৮ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ব্রিটিশ আমলের ছোট্ট পাহাড়ি শহর রাঙামাটির উপকন্ঠে দুর্গম ফুরামন পাহাড়ের সাপছড়ির যুবক চাষী মানিক কুমার চাকমা (৩০) এবার তার জুম চাষ (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ ধরণের চাষাবাদ) নিয়ে খুবই হতাশ। আলাপ -- চারিতায় ভাঙা বাংলায় তিনি জানালেন, আদৌ তার জানা নেই, কেনো এবার বছর পাঁচেক পর একই পাহাড়ে চাষ করেও জুমের ধান ভাল হচ্ছে না।

কয়েকশ’ বছরের বংশ পরম্পরায়ের জুম চাষী মানিক চাকমার মতো আরো শত শত হত -- দরিদ্র জুমিয়ারা জানেন না, কেনো দিন দিন কমে যাচ্ছে তাদের জুম ফসলের উৎপাদন! হাড় ভাঙা শ্রম দেওয়ার পরেও কেনোই বা ‘পাহাড় -- মা’ এমন বৈরী আচরণ করছে পাহাড়েরই সবচেয়ে ভাগ্যহত ভূমিহীন এই সব জুম চাষীর সঙ্গে!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এমনি ভাবে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান -- এই তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে গঠিত কৃষি প্রধান পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্ত জুম চাষীর জীবনে এখন নেমে এসেছে বড়ই দুর্দিন। বহিরাগতদের অব্যহত জনসংখ্যার চাপ, জুমের জমি সংকুচিত ও পাহাড়ের উর্বরতা নষ্ট হওয়া, বিকল্প আয়ের অভাব, চার দশক ধরে জুম নিয়ন্ত্রনের নামে বন বিভাগের মিথ্যে মামলাসহ নানা হয়রানী --- এসব কারণে অর্থনৈতিকভাবে মার খেতে খেতে প্রান্তিক চাষী জুমিয়াদের জীবন এখন বড়ই বিপন্ন।

বিশিষ্ট পরিবেশবিদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক গৌতম দেওয়ান এই প্রতিবেদককে বলেন, জুম নিয়ে জনমনে তো বটেই, এমন কি সরকারি মহলে রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা। এরমধ্যে জুমের আগুনে পাহাড়ের বনজ ও প্রানীজ সম্পদ ধ্বংস, জুমের কারণে পাহাড়ের ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি, জুম একটি পরিবেশ বিরুদ্ধ অবৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি --- ইত্যাদি প্রধান।

তিনি বলেন, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সন্তান জুমিয়ারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই জুমের আগুনে কখনো আগাছা বাদে কোনো বনজ বা প্রাণীজ সম্পদ নষ্ট করে না। এ ছাড়া জুম চাষে লাঙ্গল বা কোদাল ব্যবহৃত হয় না। জুমিয়ারা পাহাড়ে একটি ছোট্ট গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে নানা রকম বীজ এক সঙ্গে বপন করেন বলে ভূমি ক্ষয় হওয়ারও প্রশ্ন আসে না।

গৌতম দেওয়ান বলেন, বরং এখন পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পাহাড় কাটার ফলে ভূমি য় তথা পাহাড় ধ্বসের হার অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশী। কিন্তু জনসংখ্যার চাপে জুমের জমি কমতে থাকায় অন্তত পাহাড়গুলোকে ১৫ -- ২০ বছর অনাবাদী রাখা হচ্ছে না বলে প্রাকৃতিক বনের সংখ্যা হৃাস পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য সমতলভূমির সংখ্যা খুবই কম বলে পাহাড়ে জুম চাষের বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি।

পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা বলেন, ৬০ দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে প্রথম আঘাত হানা হয় বনাঞ্চলের ওপর। এই বাঁধের কারণে প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যায় বলে চাষের জমিও হয়ে পড়ে সংকুচিত। বাংলাদেশ আমলে পাহাড়ে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন, এছাড়া শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি বলে এখানে এখনো হয়নি ব্যাপক ও বড় ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আড়াই দশকের অশান্ত পাহাড়ে কৃষির বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। তাই ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে জুম চাষ করছে।

সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমা বলেন, আসলে যে ভাবে পাহাড়ে দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে, ভবিষ্যতে এখানে হয়তো আর জুম চাষ সম্ভব হবে না। প্রায় সাত লাখ ভূমিহীন এসব জুম চাষীদের এখনই পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য প্রাথমিকভাবে তাদের কিছু অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে এবং হর্টিকালচার, ফিসারিজ, কি ছোট ছোট প্রকল্প খাতে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে পুনর্বাসন করা জরুরি। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী জমির বন্দোবস্তি দিতে হবে এই সব বিপন্ন জুম চাষীদের।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জুমলিয়ান আমলাইয়ের রয়েছে জুমচাষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। বম জনজাতির নেতা জুমলিয়ান বলেন, "পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের এই বিজ্ঞান সম্মত চাষাবাদ পৃথিবীতে প্রায় সব দেশেই প্রচলিত। আমি নেপাল ও মিজোরামের পাহাড়ে জুম চাষ দেখেছি। এসব দেশের তুলনায় আমাদের দেশের পাহাড়গুলো অনেক উর্বর। আমাদের জুম চাষীরা শত শত বছর ধরে শুধুমাত্র প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ফলিয়ে আসছেন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফসল, সাক-সব্জি, ফল-মূল। নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এখন তারা জুমের জমিতে ব্যবহার করছেন রাসায়নিক সার।"

এদিকে রাঙামাটির ‘জুম নিয়ন্ত্রন বন বিভাগের’ সহকারি বন সংরক্ষক লালচাঁদ সাহা জানান, ১৯৬২ সাল থেকে চলে আসা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে জুমিয়াদের জুম চাষে নিরুৎসাহিত করে তাদের সমতলভূমিতে বা পাহাড়ে বনজ ও ফলজ আধুনিক চাষবাসের মাধ্যমে পুনর্বাসন। তিনি স্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তাদের এই উদ্দেশ্য কখোনোই সফল হয়নি।

জুম চাষীদের এইসব বিপন্নতার প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান বলেন, জুমিয়াদের সঠিক পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ।

তিনি বলেন,“আমি নিজেই বান্দরবানের ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠির এলাকা ঘুরে তাদের সঙ্গে কথা বলে জুম চাষীদের সমস্যার কথা বুঝতে চেষ্টা করেছি। তাদেও পুনর্বাসন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

সাপছড়ি ও টংকাবতির পাহাড়ের বেশ কয়েকজন চাকমা ও ম্রো জনগোষ্ঠির জুমিয়া জানিয়েছেন, জুম চাষই তাদের ঐতিহ্যগত জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। চাষের মৌসুমে তারা স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সকলে মিলে কাজ করে ফলান ধান, আদা, আলু, কলা, হলুদ, ভূট্টা, মরিচ, পেঁপেসহ প্রয়োজনীয় সব খাদ্যশষ্য।

জুমিয়ারা জানান, জুমের বীজধানও সমতলের চাষের বীজধানের তুলনায় আলাদা। প্রায় সব ধরনের সাক-সব্জি ফলানো হয় জুম চাষে। জুমে যত ধরনের ধান চাষ করা হয়, তার মধ্যে বিন্নি চাল পাহাড়িদের কাছে খুবই প্রিয়। অন্যান্য ফসলের চেয়ে এর দামও তুলনামূলকভাবে বেশী।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩ টি ক্ষুদ্র জাতিস্বত্তার পাহাড়িদের জনজীবনে রয়েছে জুম চাষের ব্যপক প্রভাব। জুম নিয়ে প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠির মধ্যে চালু রয়েছে লোকজ গান, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ইত্যাদি। জুম পাহারা দেওয়ার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় মাচার ওপর বানানো অস্থায়ী ছোট্ট কুঁড়ে ঘর বা মোনঘর নিয়ে চাকমাদের রয়েছে নানা স্বপ্ন গাঁথা।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০০৭ দুপুর ২:৪৯
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×