বেশ কিছুদিন থেকেই দেশপ্রেমিক(!) বলে আমাকে হলে খুব অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে! ব্যাপারটা খুলেই বলি। আমরা বন্ধুরা মাঝে মাঝে হলে রাতের বেলাতে দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। অনেক রকম আলোচনা উঠে আসে আমাদের কথাতে। শুধু যে দেশ নিয়ে কথা বলি তেমন কিন্তু না। আমরা আরো অনেক বিষয় নিয়ে তর্ক করি। সেদিনও তেমন কথা বলছিলাম দেশের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে। কথায় কথায় উঠে আসল বিহারীদের ব্যাপারটা। আমি বললাম, শালারা এই দেশের মাটিতে থাকে, খায়। তবুও উর্দুতে কথা বলে নিজেরা নিজেরা! আমার এক বন্ধু আমাকে ভুলটা ধরিয়ে দিল। চট্টগ্রামের মানুষ কি সেখানকার ভাষায় কথা বলে না? সেই রকম বিহারীরাও উর্দু বলে, তাতে ক্ষতি কি! আদতে তো তারা পাকিস্তানী, তাই না? কিন্তু আমাদের দেশের কিছু মানুষ যে পাকিস্তান বাংলাদেশের খেলাতে পাকিস্তান সাপোর্ট করে, তাদের ব্যাপারটা কি? আমি বললাম, তারা সব কুত্তার বাচ্চা। এগুলার রক্তে দোষ আছে। একজন খুব ক্ষেপে গেল! এই দেশের অনেক হিন্দু আছে তারা বাংলাদেশ ভারতের খেলার সময় ভারতকে সাপোর্ট করে, তারা কি? আমি বললাম, তারাও কুত্তার বাচ্চা! একজন আমাকে বুঝাতে চাইল, আসলে খেলায় তো একজন তার পছন্দের একটা দলকে সাপোর্ট করতেই পারে! কিন্তু এসব বুঝার জন্য আমি রাজি ছিলাম না। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা আমাদের উপর এত অত্যাচার করছে তাদের কিভাবে মানুষ সাপোর্ট করে? একজন বলল, দেখ শুধু খেলায় নিজের দেশকে সাপোর্ট করলেই দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। এই রকম মুখে অনেকেই দেশের কথা বলে কিন্তু কাজের বেলায় নাই। এই যেমন তুই বাংলা মুভি দেখিস না, ইংরেজি মুভি দেখিস, কেন? ভাল লাগে তাই! তোর পিসিটা এইচ পির কেন? দোয়েল ব্যাবহার কর। তোর মোবাইল সিম কেন অন্য দেশের? টেলিটক কেন ব্যাবহার করিস না? একজন বলল, তার মামা একবার জাহাজে করে দেশে ফিরছিল। তখন তার সাথে কিছু ইন্ডিয়ান লোকের সাথে দেখা, তারা শীতে কাপছিল, তাদের টাকা ছিল, তবুও তারা শীতের কাপড় কিনছিল না। কারণ, তারা দেশে গিয়ে কাপড় কিনবে। যে টাকা তারা ইনকাম করে নিয়ে এসেছে তারা সেটা নিজ দেশে খরচ করতে চায়। কথাগুলো আমাকে অনেক আঘাত করল। আসলেই কি তাই? তাহলে, দেশপ্রেম জিনিষটা আসলে কি?
নিজেকে সাপোর্ট করতে আমি তখন কিছু যুক্তি দাড় করালাম। এই যেমন, আমাদের দেশের কোন সিনেমা যদি অস্কারের জন্য যায়, সাথে অন্য দেশের একটা সিনেমা যায় যে সিনেমাটা আমার খুবই পছন্দ। তাহলে আমি কি করব? আমি অবশ্যই আমার দেশের সিনেমাটাকেই সাপোর্ট করব, সিনেমাটা আমার ভাল লাগুক কি না লাগুক। এটা ভেতর থেকেই আসে। তেমনি বাংলাদেশ যতই খারাপ খেলুক, আমার সাপোর্ট কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষেই থাকবে। যাইহোক, যারা তর্কের খাতিরে তর্ক করে তাদের যুক্তি দিয়ে হারানো মুশকিল!
এই ঘটনার পরে হলে আমার নাম হয়ে গেল দেশপ্রেমিক! আর বন্ধুরা নিজেদের রাজাকার উপাধি নিয়ে নিল, আর বিভিন্নভাবে আমাকে খেপানোর চেষ্টা করতে থাকল। কাল রাতে তারা ঠিক করল আজকে তারা কাল কাপড় পরবে! আজকে তাদের শোক দিবস! এই দেশ স্বাধীন হয়ে কি লাভ হয়েছে?
এই দেশে আছে এক বিদঘুটে কোটা পদ্ধতি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকরি দিতে হবে যোগ্যতা একটু কম থাকলেও। সন্তান না থাকলে নাতি নাতনীদের দিতে হবে! এবার তো মনে হয়, শুধু মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য একটা বিসিএস হচ্ছে। এক বন্ধু বলল, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হলেই যে সে দেশপ্রেমিক হবে এমন কোন কথা আছে? নাতি নাতনী তো অনেক দূরের ব্যাপার! আর অনেক ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে দেশে। যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করতেই হয় তাহলে তাদের মাসে মাসে ২০,০০০ টাকা দাও। এই দেশে কয়জন মুক্তিযোদ্ধা আছে? সবাইকে দাও। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যে তাদের বাবা মাকে দেখে এমন গ্যারান্টি আছে?
আগে পাকিস্তানী শাসকরা আমাদের শাসন করত, এখন করে এই দেশের কিছু লোভী মানুষ। এই দেশের টাকা আগে পাকিস্তানীরা নিয়ে যেত, এখনও তো দেশের টাকা কিছু মানুষ বিদেশের ব্যাংকে পাচার করে। আগে পাকিস্তানী সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললে, শাস্তি পেতে হত, এখনও তো তাই হচ্ছে। সরকারি একটি বাহিনী যখন যাকে ইচ্ছা ধরে নিয়ে যেতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। এমনকি তারা যখন ধরতে আসে, কেউ আইডি কার্ড চাওয়ার সাহস করতে পারে না। বিদেশে কোথাও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ আসলে, চাওয়ার আগেই তারা নিজে থেকে আইডি কার্ড দেখায়। তাহলে আমাদের দেশে এমন হতে সমস্যা কোথায়? আইডি কার্ড না দেখানোর সুযোগ নিয়ে কিছু ভুয়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মানুষের টাকা পয়সা ডাকাতি করে না? তাহলে আমরা কোন দিক দিয়ে স্বাধীন হলাম? এখনো তো আমাদের পরাধীন হয়ে থাকতে হয়। তাই বিজয় দিবসে আমরা কালো ব্যাজ পরব, এই দেশ স্বাধীন হয় নি, হলেও আমাদের কোন লাভ হয়নি!
নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের সময় মানুষের জাতীয়তাবাদী চিন্তা ভাবনা ছিল না তেমন। তারা ভাবত আগে নবাব আমাদের শাসন করত, এখন ইংরেজরা আমাদের শাসন করবে! তফাতটা কি? আফসোস হয় যখন দেখি এই যুগেও আমাদের দেশের কিছু তরুণ যারা দেশের ভবিষ্যৎ তারাও এভাবে দেখে ব্যাপারটা।
এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে সকাল বেলা বাইরে আসলাম। আকাশের দিয়ে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। আজ বিজয় দিবস। এটা আমার বাংলাদেশ। যে যাই বলুক, আমি আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক। কোন দেশ নিজে থেকে উন্নত হয় না। তাকে উন্নত করতে হয়। আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে? প্রশ্ন রাখলাম সবার কাছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

