সেন্টার ফর মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এমআরটি) গবেষণা ও প্রশিক্ষণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এমআরটি’র গবেষণা কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের জুলাই মাসের ৩১ দিনে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের প্রধান জাতীয় দৈনিকগুলোর সংবাদকে ভিত্তি ধরা হয়েছে।
খুন
জুলাই মাসে মোট খুন হয়েছেন ২৮০ জন। যার মধ্যে ১৭৬ জন পুরুষ, ৮১ জন মহিলা ও ২৩ জন শিশু। প্রতিদিন গড়ে খুন হয়েছে ৯ জন।
উল্লেখ্য, মাসের প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা, ডাকাতি, প্রেমঘটিত বা পারিবারিক বিরোধের কারণে এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯ জুলাই ২০১০ গোপালগঞ্জে খাবার দিতে দেরি হওয়ায় শিমুল মধু নামে জনৈক স্বামীর হাতে স্ত্রী লাইলী মধু খুন হওয়ার ঘটনা সামাজিক অসহিষ্ণুতার চিত্র বহন করে।
আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নিহত ১৫
জুলাই মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। এর মধ্যে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৮ জন। এছাড়া পুলিশ হেফাজতে ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যাদের মধ্যে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অভিযুক্ত ডিএডি আবদুর রহিম অন্যতম।
তাছাড়া ঘুষের টাকা না দেয়ায় ঢাকার দারুসসালামে পরিবহণ শ্রমিক মজিবুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। নিহতের ছোট ভাই মোহাম্মদ রিপন অভিযোগ করেন, ১ জুলাই দুপুরে মজিবুর রহমান তার আট বছরের ছেলে ইকবালকে নিয়ে কাউন্দিয়া মোল্লারটেক শ্বশুর বাড়িতে যান। সন্ধ্যায় তিনি বাসায় ফেরার সময় দারুস সালাম থানার এসআই হেকমত আলী, এসআই সায়েম, এসআই মাসুদ ও পুলিশ সোর্স মহিবুল ও কাজল মিলে শিশু সন্তান ইকবালের সামনে তাকে আটক করে। ওই সময় পুলিশ তার কাছে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ ও সোর্সরা মিলে রাইফেলের বাঁট দিয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়। রাতে মজিবুর বাসায় না এলে পরিবারের সদস্যরা থানাসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পায়নি। পরের দিন সকালে লোকজন বেড়িবাঁধে তার লাশ দেখে বাসায় খবর দেয়।
নিহতের ভাই আরো বলেন, ঘটনার আগের সপ্তাহেও পুলিশ তাকে একবার গ্রেপ্তার করেছিল। ওই সময় ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
অন্য দিকে নিহত মজিবুরের ছেলে ইকবাল জানায়, ১ জুলাই বিকালে ফুটবল কিনে দেয়ার কথা তার বাবা তাকে নিয়ে নদীর ওপারে মোল্লারটেক এলাকায় নিয়ে যায়। মেলায় ঘুরে সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরছিল তারা। এ সময় ৬ জন পুলিশ তার বাবাকে জাপটে ধরলে তিনি নদীতে লাফ দেন। তখন পুলিশ ও দু’জন সোর্সও নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পানির মধ্যেই বেধড়ক পেটাতে থাকে। পরে নদীর পাড়ে তুলে দ্বিতীয় দফায় তারা বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটায়। তার বাবার দেহ নিস্তেজ হয়ে গেলে নদীতে ফেলে দেয়।
এ ধরনের ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থাহীনতা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। (সূত্র : মানব জমিন)
আত্মহত্যা
জুলাই মাসে বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে ৪২ জন। এর মধ্যে নারী ১৯, পুরুষ ১৯ ও শিশু ৪। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ইভটিজিং, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা এবং ধর্ষণের কারণে অপমান বোধ অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে ১ জুলাই ২০১০ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার লিপি আক্তার মামার বাড়িতে যাওয়ার পথে সাইদুর রহমান সাঈদ নামে এক যুবক তাকে ধর্ষণ করে। এতে ক্ষোভে-অভিমানে লিপি আক্তার কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করে।
গত ১০ জুলাই পাবনার আটঘরিয়া উপজেলায় মায়ের কাছে ১শ’ টাকা চেয়ে না পেয়ে অভিমানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে রতন হোসেন (১৪) নামের এক স্কুল ছাত্র। রতন দেবোত্তর কবি বন্দে আলী মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র।
এছাড়া প্রেম করে বিয়ে করায় পরিবার মেনে না নেয়ায় কিশোরগঞ্জের ওয়াজিউদ্দিন ও দিলারা বেগম চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
ধর্ষণ
মে মাসে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয় মোট ৫১ জন। যার মধ্যে ২০ জন নারী ও ৩১ জন শিশু। এ ক্ষেত্রে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি । এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৯জনকে।
উল্লেখ্য, ৫ জুলাই টাঙ্গাইলের সখীপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। ধর্ষিতা কিশোরী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। গত ৫ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সখীপুর বাজারে আসে খাতা কিনে বাড়ি ফেরার সময় হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিব, ছাত্রলীগ নেতা আরিফ, সখীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ স¤পাদক শওকত সিকদারের ভাগ্নে বাবুল, নাতি আকাশ মেয়েটিকে মোটরসাইকেলে করে হাজিপাড়ায় ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে হাবিব মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। এ সময় তার সহযোগীরা ধর্ষণের চিত্র ভিডিও করে। পরে আরেকজন ধর্ষণ করতে গেলে মেয়েটি সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মেয়েটিকে ধাওয়া করে ছাত্রলীগ নেতারা। এ সময় মেয়েটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে। পরিস্থিতি টের পেয়ে ধর্ষণকারী ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়।
ফিল্মি স্টাইলে এ ধরনের ধর্ষণের ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র প্রকাশ করে।
সীমান্ত সন্ত্রাস
জুলাই মাসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিহত হয়েছে ১০ জন। প্রায় ক্ষেত্রেই বিএসএফ তাদেরকে গুলি করে হত্যা করেছে। এছাড়া সীমান্তে বিএসএফের হাতে আহত হয়েছে ১১ জন এবং অপহৃত হয়েছে ৩২ জন।
সাংবাদিক নির্যাতন
জুলাই মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন ৯ জন সাংবাদিক। এদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় দৈনিক মাথা ভাঙ্গা এবং দৈনিক পশ্চিমাঞ্চল পত্রিকার দুই সাংবাদিককে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই
২০১০ সালের জুলাই মাসে সারাদেশে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মোট ১৩০টি ঘটনা রেকর্ড করেছে এমআরটি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে ২১ জন। আর আহত হয়েছে ২২৮ জন।
সড়ক দুর্ঘটনা
জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩৫৪ জন। যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২০৮ জন অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৯ জন।
গত ৩১ জুলাই গোপালগঞ্জ যাওয়ার পথে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিসিক চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
রাজনৈতিক সহিংসতা
গত জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৬ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১১০০ জন। এ সময় শাসকদল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের আভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৫০টি। এর মধ্যে ৫ জুলাই ২০১০ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে প্রক্টরসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়। এ সময় প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মীদেরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে চারতলা থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়। ৬ জুলাই এ ঘটনার সংবাদ ও ছবি ছাপা হয় প্রত্যেকটি দৈনিকে। প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর এ ধরনের হামলা ও নির্যাতন বর্বর যুগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
অপরাধের ধরণ সংখ্যা
খুন ২৮০
ধর্ষণ ৫১
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মৃত্যু ১৫
আত্মহত্যা ৪২
সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা ১০
সীমান্তে বাংলাদেশী অপহরণ ৩২
চুরি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ১৩০ (নিহত ২১)
সাংবাদিক নির্যাতন ৯ জন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



