১৯৯৮ সাল। বাসায় দৈনিক জনকন্ঠ রাখা হত। "বিরস কাহিনীঃক্লান্ত পথিক" কলামে "তিন দিন ঈদের" ছুটির বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক লেখা দেখে খারাপ লেগেছিল। এখন মনে হয় ঠিকই বলেছিলেন, আমারই বুঝার ভুল ছিল। সংগীত শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী সরাসরি বলেছিলেন, "কুরবানির নামে পশু হত্যাটা আমার কাছে নিষ্ঠুরতা মনে হয়, সেদিন আমি দরজা জানালা বন্ধ করে রাখি। বাসা বাড়ি থেকে দূরে কোথাও এ কাজ টা করা উচিৎ।"
খুব সম্ভব তথ্য প্রযুক্তিবিদ জাকারিয়া স্বপন প্রস্তাব রেখে ছিলেন,
"কোরবানীর নামে পশু হত্যা না করে, সমতুল্য অর্থ গরীব দুস্থদের দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।"
আমরা আজ কুরবানী দিই মাংস খেয়ে নিজের পশু প্রবৃত্তিকে চাঙ্গা করতে।
অন্তত "লোভ রিপু"র চর্চা করি ফ্রিজ ভরে মাংস রাখার ক্ষেত্রে, কারণ ধর্মে এই মাংস খাওয়ার ব্যাপারে বিধি নিষেধ নাই। অনেক নাস্তিকও কুরবানী দেন, সামাজিকতা রক্ষার জন্য। "ঈদ" জিনিস টাকে সামাজিকতা মোড়কে মুড়িয়ে বেপরোয়া ভোজ উৎসব করি, কিছু "ত্যাগের " উদ্দেশ্যকে অন্তঃসার শূণ্য করে ।
সারা বছর হয়ত একবার নামায পড়ার উপলক্ষ হয়, ঈদের মাঠেই। যে খতিবের পিছনে নামায পড়ি, তার বিরুদ্ধেই আমরা বছর ব্যাপী "মৌলবাদী" উচ্ছেদ আন্দোলন করি, কুৎসা রটাই। বে রোজাদারের বাসায় ঈদে আনন্দের ঢল নামে। অথচ গরীব দুঃস্থ যে হাফেজ ছেলেটি সারা মাস এত গুলো মুসলমানকে পিছনে নিয়ে প্রার্থনা করলো, তার ঘরে ঈদের দিন চাল হয়না। খুশি হয়ে নামাযীরা তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলে "ধর্ম ব্যবসার" বিরুদ্ধে আমরাই আন্দোলন করি।
স্বদেশে ঈদ নিয়ে যাদের বেশি বাড়াবাড়ি করতে দেখতাম, ঈদ উপলক্ষে যাদের মুখচ্ছবি,মন্তব্য মিডিয়ায় আসে বারবার তাদের অনেক কেই দেখতাম রোজা রাখেন না। ক্লাস চলছে এ দোহাই দিয়ে রোজা রাখেনা অনেক ছাত্র ছাত্রী, যদিও ওজন বাড়ার কারণে এদের অনেককেই ব্যায়াম বা "ডায়েটিং" করতে দেখা যায়। "ঈদ পোষাক", "ঈদ আনন্দ", "ঈদ বিনোদন" শব্দ গুলো নিয়ে এদেরই বেশি হৈ চৈ করতে দেখা যায়।
দৃশ্যত, ঈদের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই, যদিও এটা বিশেষ ধর্মের ধর্মীয় উৎসব। ঈদকে সুকৌশলে স্বার্থ সুবিধা মত পুরো দস্তুর সামাজিক কাঠামো দেয়া হয়েছে, যার সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। অথচ রোজা রাখা বা ইফতারের মাঝে আমরা সামাজিকতা খুজতে ব্যর্থ হই। সমাজে সবাই যেখানে রোজা রাখছে সেখানে চক্ষু লজ্জা উপেক্ষা করে "একটিও রোজা রাখেনা, কখনও নামায পড়েনা".......কিন্তু ঈদ জিনিসটা আঠার আনা ভোগ করা চাই, লাখ টাকার লেহাঙ্গা বা লাখ টাকার গরু কেনা চাই।
রোজা রেখে ঈদের জন্য প্রতীক্ষা নাই, ক্ষুধার কষ্ট সহ্য হয়না বলে রোজা রাখিনা, নামায পড়ার অভ্যেস নাই তাই নামায পড়িনা, আরবি ভাষা পড়তে জানি দেখে কোরআন পড়িনা, কিন্তু নির্লজ্জের মত ঈদ নিয়ে বাজার করে মাথা খারাপ করি, "ঈদ মোবারক" এর মত অদ্ভুত কিছু শব্দ উচ্চারণ করি, "কোলাকুলি"র মত অহেতুক মেকি ধরনের সৌহার্দ্য দেখাই।
ঈদে আপনজনের সাথে দেখা করা বা ভাল খাবার, পোষাক খুবই ন্যায্যা দাবি। কিন্তু ঈদ উৎসবের কান্ডারি আসনে যখন সব সুবিধাভোগী বে-রোজাদারদের বাড়াবাড়ি করতে দেখি, তখন ঘৃণা থেকে এক প্রকার কষ্ট তৈরি হয়। আমরা কি জানি "ঈদ আনন্দ" কেন, কিসের জন্য, কাদের জন্য?
খুব সম্ভব ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। দামেস্কে ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে। রাস্তা ঘাটে আনন্দের ঢল নেমেছে। এক বিশিষ্ট বুযুর্গ এহতেকাফ ভঙ্গ করে ক্রন্দনরত অবস্থায় মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন। লোকজন ঘিরে ধরে কারণ শুধাল। উনি বললেন, রমজান মাসের প্রতিশ্রুত সৌভাগ্যের অধিকারী যদি না হতে পারি, তাহলে আমার চেয়ে হতভাগা আর কেউ নাই।
ঈদের চাদ দেখা যাওয়ার সাথে সাথে পাপাচারে ভেসে যায় পৃথিবীর মুসলমানরা। পতিতালয়ে খদ্দেরের সংখ্যা বাড়ে, নতুন করে মদ জুয়ার আড্ডায় ফিরে যায় পৃথিবী। ঈদের চাদ রাত প্রার্থনার জন্য কতটা পবিত্র, অসাধারণ সেটা অনুধাবনে থাকেনা কারো।
শবে বরাত, মেরাজ, কদরের নামায আমার পড়া হয়না। দেশে থাকতে তারাবী আর কোরআন পড়া ছেড়ে দিয়েছি বহু আগে, ব্যস্ততার অজুহাতে। ঈদের আনন্দ করা আমার শোভা পায়না, নিজেকে অপবিত্র, পাপী মনে হয়।
অতি ক্ষুদ্র পরিচিত গন্ডির মাঝে ভুল বশত যখন কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, "শেরিফ, তোমার ঈদে প্ল্যান কি?"
তখন কিছু ক্ষণের জন্য ধর্ম বিরোধী হতে ইচ্ছা হয়, সেটা হয়ত সমাজের উপর ক্ষোভ থেকেই। ধর্ম নাশের আশংকা মাথায় রেখে স্পষ্ট স্বরেই বলি,
"দুঃখিত, আমি ঈদে বিশ্বাস করিনা, আমি ঈদ পালন করিনা, ঈদের আনন্দ আমার জন্য না।"
মানসিক রোগের অভিযোগ আবার ফিরে আসে সামাজিক জীব মানুষের মুখে মুখে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

