ছয় ফুটি বাঙালি অপ্রত্যাশিত বলে কিনা জানিনা দূর থেকে দেখলেই "হাই বিগ গাই" সম্বোধন পেয়ে লজ্জায় পড়ে যাই। ধারলো ইউরোপীয়ান চেহারায় অসম্ভব নিষ্পাপ চেহারা আর বাচনভঙ্গী। ফুদ, তক তু মি জাতীয় উচ্চারণ ভঙ্গী। ল্যাবে এক সন্ধ্যায় চুপ চাপ মন খারাপ করে বসে আছে, আমি কথা বলার সময় দৃষ্টি নিচের দিকে। পশ্চিমা ছেলে হয়েও আটলান্টিকের এপাশে এসে ২য় নারীর দিকে মন দেয়নি, গবেষণার মাঝে ঐ মেয়েকে ঘিরেই তার ভয়েস ভিডিও চ্যাট চলতো সব সময়।
সে জানালো তাদের "ব্রেক আপ" হয়ে যাচ্ছে। বললাম কেন? তার বান্ধবী তার জন্য ৩ বছর অপেক্ষা করতে পারবেনা বলেছে।
তুমি পারলে সে পারবেনা কেন?
আই দোন্ত নো....
সে তার মাস্টার্সের সার্টিফিকেট বের করল, "আই স্পেন্ত মাই হোল তু ইয়ারস ফর দিস....বাত হোয়াত দিদ ইত গিভ তু মাই লাইফ...নাথিং..."
ফেডের মানসিক দশা বুঝার চেষ্টা করছি। সে ফট করে বললো, জানো পৃথিবীতে নারীর অভাব নেই, আমি কেন ওর জন্য পাগল হবো? আমি বললাম সেটা ঠিক আছে, কিন্তু "পারফেক্ট ম্যাচ" বা "ইউ টু মেড ফর ইচ আদার" জাতীয় অপার্থিব সৌন্দর্য থেকে তোমরা বঞ্চিত হচ্ছ।
আজ শনিবার উইকেন্ডে প্রায় জনশূণ্য ক্যাম্পাস গলে যখন ল্যাবে গিয়েছি, তার কিছু পরেই সে হাজির। থ্যাংকস গিভিং এর সমস্ত আনন্দ মাটি করে সে এসেছে ল্যাবের ওয়েব ক্যাম দিয়ে ওর সাথে কিছুটা পরাবাস্তব সময় কাটাবে, পশ্চিমা এক ছেলে তার প্রিয় মানুষকে ধরে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে দেখে মুগ্ধতায় হতবাক হয়ে গেলাম।
সবুজ স্থির দৃস্টিতে একবার কোড লিখছে আবার একটু চ্যাট করছে ওর সাথে, বড্ড মায়া হল দেখে। মোটে এক বছরের পরিচয়, সম্পর্ক। ফেড চাইলে যে কোন মার্কিন রমনীর বাহু বন্দী হতে পারে, সে কাজ পাগল, তার সাথে বিশ্বস্তভাবে ভালবেসেছে বহুদূরে ফেলে আসা ঘরের এক মেয়েকে। পিএইচডির ৮ মাসের মাথায় সব ছেড়ে ছুড়ে স্বদেশে ফিরে যেতে চায়। গার্ল ফ্রেন্ডের ৩ বছর লাগবে বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করতে। আমি ট্রান্সফার করে এ দেশে নিয়ে আসতে বললাম, একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করে এক সাথে থাকো ভাল লাগবে। অনিশ্চিত অপারগতার দায়ে মাথা নিচু করে ফেলে সে। আমি "নারী" ও "ভালবাসা" নিয়ে কিছু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠিত ধারণা দিয়ে মন হালকার করার চেষ্টা করি তার। ১৯৭৬ সালের ফরাসি ছবি "দি টেন্যান্ট" দেখার পরামর্শ দিই, কোন সুফলের কারণে নয়, নিজের জীবনকে নাটকের মোড়কে দেখার জন্য।
শেরিফের পরাবাস্তব নেটের জীবনে নারীরা হানা দিয়েছে বেশ কবার, বেশ কজন। খুব ভদ্র, রূঢ় থাকা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, উচ্চ শিক্ষিত পরিবার জেনে পাগলের দশা হয়েছে এই মানসিক রোগীর জন্য। পুরুষের টাকা, ক্যারিয়ার, প্রতিষ্ঠা পাওয়া, পরিবার দেখেই ওদের পাগলামি, ওরা মানুষ, মানুষের মন বিচার করেনা। সব কিছু গুণাবলী নিয়ে এই শেরিফ যদি শুধু ঢাকা কলেজের গ্রাজুয়েট হত, বুয়েটের উচ্চাভিলাষী নারীরা ছায়াও মাড়াতে আসতো না।
পুরুষের মন , রুচি, ব্যক্তিত্ব নিয়ে খেলে, পুরুষের ভালবাসা আর ধর্যের পরীক্ষা নিয়ে এরাই আসে আমাদের "ভালবাসা আর বন্ধুত্বের" সংজ্ঞা ও তফাত বুঝাতে। স্বদেশে থেকে যে পুরুষ নারীর মন পেতনা, সে প্রবাসী হওয়াতে নারীরা আজ কেঁদে বালিশ ভিজায়। এটা কি নিখাদ বিরহ নাকি "প্রবাসী পুরুষ" পাবার আকুতি?
ভালবাসার শুদ্ধতম অনুভূতির সংজ্ঞা বা অস্তিত্ব কোথায়? ডিজুস ঘরানার কর্পোরেট "ফ্লার্ট" বাণিজ্যে নাকি তথাকথিত বন্ধুত্বের নামে ভালবাসার কিছু স্বার্থপর অভিনয়ের সমীকরণে? যেখানে আত্মহত্যা, দেবদাস, ক্যারিয়ার ধ্বংস, পরকীয়া, ঘর ভাঙ্গার মত বাস্তবতার সামনে দাড়িয়ে আমরা , অদূরদর্শীর মত, কোন কারণ অনুসন্ধান ছাড়াই।
জীবন চালানোর ফাঁকে জীবনকে একান্তে নিয়ে ভাব বার সময় কোথায় আমাদের?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

