হুমায়ুন আহমেদের "জীবন কৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল" বইটার শেষ পৃষ্ঠায় এসে চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। পৃষ্ঠাটি পড়লে প্রতিবারই ভিজে যায়। এক নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক অর্থের লোভ উপেক্ষা করে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক কষ্ট করে অজ গ্রামের ধ্বংস প্রায় একটি বিদ্যালয়ে বদরুল নামের এক প্রতিভাধর ছাত্রকে পড়িয়ে ফলাফলের অপেক্ষা করতে থাকেন। কাহিনীতে অনিশ্চয়তা আসে যখন বদরুল পরীক্ষার দিন প্রচন্ড জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়ে, সবাই আশা ছেড়ে দেন। ফলাফলের দিন রেডিও তে উচ্চারিত হয় ঢাকা বোর্ডে বদরুল আলম ২য় স্থান অধিকার করেছে।
অনেক আগে প্রতি বোর্ডের সেরা তিন জনের নাম উচ্চারিত হত রেডিও তে, তার পরে টিভিতে । ঢাকা বোর্ডে এস এস সি তে প্রথম আইডিয়াল স্কুল, এইচ এস সি তে ঢাকা কলেজ। স্ট্যান্ডের ব্যাপারে ঢাকার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজ গুলোর এক চেটিয়া দাপট। মফস্বলে কেউ স্ট্যান্ড করলে এলাকাবাসী তাকে মাথায় নিয়ে নাচার উপক্রম করত, যেন এলাকার গর্ব। খুব সম্ভব ১৯৯১ সালের এইচ এস সিতে ভয়াবহ একটা ফলাফল হয় ঢাকা বোর্ডে, সেবার ১৮ তম স্থান অধিকারীর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৯৫২ এবং ১ ম স্থান কারী ৯৯৯ নম্বর পেয়ে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড করে ফেলে। জনশ্রুতি আছে তিনি ১০০০+ পেয়েছিলেন যেটা পরে তিন অঙ্কের ঘরে আনা হয়।
টিভিতে প্রচারিত ১ম স্থান অধিকারীর সাক্ষাৎকার গুলো ছিল দেখার মত। একবার মনে পড়ে বই পুস্তক ঘেরা গ্রন্থাগারে একজনের সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছিল, তুমি কত ক্ষণ পড়তে দিনে তার উত্তর ছিল, ১৮ ঘন্টা! স্ট্যান্ড করার যুগটাই ছিল এমন, প্রতিটি নম্বরের জন্য যুদ্ধ, প্রতিটি বানান, উত্তর নিখুঁত করার প্রচেষ্টা। যেটার চর্চা আজ আর নেই।
কলেজের শিক্ষক ক্লাশের প্রথম দিনে পরিচয় পর্বে আমাকে যখন জিজ্ঞেস করলেন "লেটার কয়টাতে?" আট টাতে বলতেই তিনি আতকে উঠলেন।
"তুই স্ট্যান্ড করিসনি?"
"না স্যার"
প্রায় সোয়া নয়শ নম্বর পেয়েও আমার প্রাপ্তি ছিল ৭৫০ পাওয়া ছাত্রের সমান, ছয় মাসে ২৫০০ টাকা করে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেতাম উভয়েই। ২ নম্বরের জন্য স্ট্যান্ড করিনি, ২ নম্বরের জন্য বাংলা লেটার পাইনি (পেলে সেটা হয়ত একালের গোল্ডেন এ + এর তুল্য কিছু একটা হত হয়ত!)।
সেকালে মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ছিলনা। বিনোদনের সঙ্গী ছিল পড়ার বই আর খাতা। সময় নষ্ট করিনি এক মুহূর্তও, এতটা পরিশ্রমের পরে মাত্র ২ নম্বরের জন্য ছিটকে গিয়ে অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিলাম মনে পড়ে যায়। ব্যর্থতার কষ্টটা এর পিছনে দেয়া শ্রমের সমানুপাতিক, যেটার উপলব্ধি হয়ত আজকের ছাত্ররা করেনা। হয়ত অজ পাড়া গায়ের হত দরিদ্র স্কুলের ছাত্র ছিলাম বলে, ওটা আমার প্রাপ্য ছিলনা।
এত স্মৃতির পরেও আমি জি পি এ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন বয়ও ৫ পেয়ে দেশের সেরা ছাত্র হবার সুখে চোখের জল ফেলতে পারছে, এটা তো অসাধারণ পাওয়া। আমাদের সময় সেই স্ট্যান্ড ছিল মফস্বলের জন্য সোনার হরিণের মত সুখ স্বপ্ন যাকে পেতে আমাদের কাটাতে হয়েছিল নিবিড় শ্রম ক্লান্ত দুঃসহ প্রহর গুলো। কারণ অনেকটা নিয়ম মাফিক মুষ্ঠিমেয় সোনার হরিণ গুলো ছিল ঢাকার সেরা স্কুল কলেজ গুলোর জন্য অঘোষিতভাবে বরাদ্দ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


