ধর্মের আশ্রয়টা এমনই। পাপাচার, পাপানুভূতি ও পাপের প্রায়শ্চিত্যের অনুভব গুলো মানুষকে কুকড়ে ফেলে, নৈতিক, আত্মিক শুদ্ধির ব্যাপারে সব সময় একটা অস্থিরতা কাজ করে। হাসান চিল্লার বদৌলতে উধাও হয়ে গেল। তনিমা ছটফট করে এ অর কাছে ছুটাছুটি করতে থাকে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে, "ভাইয়া, ওকে কী ফিরিয়ে আনা যায়না কোন ভাবেই? "
হাসানে খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু এহসান জানাল, 'কিছু মনে করোনা, ওকে দেখলে তুমি চিনবেনা, বিশাল দাড়ির জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছে আর আলখাল্লা তো আছেই। ওর হ্যান্ডসাম মুখটা দাড়ির আড়ালে ঢেকে গেছে ।'
হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল তনিমা। সত্যি তো কথা, কী দোষ তনিমার যে তাকে এত বড় শাস্তি পেতে হবে। উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়ানো শেষ হয়না, ঘুম, পড়ালেখার ব্যাঘাত। এতকালের অধিকার করে রাখা ভালবাসার গগনটা হঠাৎ শূণ্য হয়ে যাবার যন্ত্রণাটা সে বুঝতে শিখে। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, নিজের নৈতিকতাকে সরিয়ে রেখে শূণ্য গগনে জল ভরা মেঘের খোজ করতে থাকে সে, অন্তত কোন পুরুষের সাথে সঙ্গ বা ভাব বিনিময় করে শূণ্যতার কষ্ট কাটানো। সেই সাথে অনিশ্চয়তা নিয়ে হাসানের পথ চেয়ে বসে থাকা, যদি উগ্র ধর্মের জঙ্গল থেকে সেই পুরনো আধুনিক হাসানকে ফিরে পাওয়া যায়!
বহুদিন পরে হাসান ফিরে আসে ক্যাম্পাসে। এতকালের পছন্দের মানুষকে দাড়ি গোফ আর মধ্যযুগীয় আলখাল্লার মাঝে চিনতে কষ্ট হয়নি তনিমার। কিন্তু দূর থেকে হাসানের সংযত দৃষ্টির পায়চারী দেখে থমকে দাড়ায় তনিমা। এতকালের চেনা জানার অধিকার থেকে একটা ডাক দিয়ে দৃষ্টি ফেরানোর সাহসটুকু আর সঞ্চয় হয়না। উগ্র সাজের হুজুরের দিকে আগ্রহ বা পা বাড়ালে সে যদি বিব্রত হয়, আশে পাশের লোকেরাই বা কি বলবে?
শূণ্যতার আর অসহায়ত্বের সুযোগে দীর্ঘাঙ্গিনী তনিমার পাশে অনেক ছেলে ঘুর ঘুর করতে থাকে। তনিমাও বন্ধুত্ব করতে থাকে। কষ্ট আর প্রতিজ্ঞা করে হাসানের ফোন নম্বর যোগাড় করে কল দেয় সে। এক কালের রমনী মোহন কন্ঠে আজ যান্ত্রিক রুক্ষতা হাসানের।
-'হাসান, তুমি কি আমাকে ভালবাসনা? এভাবে না জানিয়ে ফেলে গেলে কেন আমাকে! এভাবে বদলে গেলে কেন!'
'দেখুন, পরিবর্তনটা নিজের তাগিদ থেকেই এসেছে, আপনাকে কষ্ট দিবার ইচ্ছা থেকে নয়, আমি দুঃখিত !'
আপনি সম্বোধনে হকচকিয়ে যায় তনিমা। মনে পড়ে গেল কোন এক সন্ধ্যায় খুন সুটির মাঝে হাসানকে সে বলেছিল, 'হুজুররা সব খবিশ! চাইল্ড এবিউজার সিক বাস্টার্ড!'
নিয়তির ফেরে তার ভালবাসার মানুষটি আজ জঙ্গী-জঙ্গলিদের দলের কেউ একজন! তারপরেও ভালবাসার কথা ভুলতে পারেনা সে, পছন্দ নিয়ে দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে যায়।
'প্লিজ, প্লিজ....' বলে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয় তনিমা। চিল্লা থেকে ফিরে চাঙ্গা হওয়া ধর্মানুভূতি থেকে এক চিলতে নড়েনা হাসান, 'দেখুন আপনার কিছু বলবার থাকলে বাবা মা কে বলুন, বিয়ে করা ছাড়া কোন প্রকার সম্পর্ক রাখতে আমি পারছিনা, দুঃখিত! '
'তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে, কেন ভালবেসেছিলে... কী চাও এখন তুমি!'
ছাত্রাবস্থায় বিয়ের কথায় বেকে বসে তনিমা, ভুলে যাবার চেষ্টা করে হাসানকে। ছেলে বন্ধুর সঙ্গ আর সময়ের অভাব হয়না তার। স্বাধীনভাবেই থাকতে পছন্দ করে সে, সেই সাথে পুরুষ আর ধর্মের ব্যাপারে ঘৃণা লালন করতে থাকে। হঠাৎ মনে পড়ে শেষবারের ডেটিং এর আগে হাসান চুমু দিতে চেয়েছিল, তনিমা রাজি হয়নি। ধর্মের খোলসে ঢুকে পবিত্র হবার আগে নোংরামি করতে চেয়েছিল হাসান, ছিঃ! ঘৃণায় গায়ে কাটা দেয় তনিমার। সহপাঠী সৌরভের সাথেই সে সময় কাটায় ক্যাম্পাসে, হুট করে হাসান হেটে গেলে মাথা ঘুরিয়ে না দেখার ভান করে।
কী স্বার্থপর পুরুষ! কী উদ্ভট ধর্মীয় বিধি নিষেধ! তারপরেও রাত এলে তনিমার ঘুম আসেনা। অন্য পুরুষের কন্ঠে সেই 'কবিতার মত ছন্দ' আর 'নাটকের মত' শুদ্ধ সাবলীল গোছানো বাচন ভঙ্গি সে পায়না কোথাও। যদি বিয়েতে রাজি হয় তবে হয় তো ধর্মের প্রথা মত ঘর বন্দী করবে আমাকে কিংবা বোরখা নামক কালো কাফনে মুড়িয়ে আমার মানসিক মৃত্যু ঘটাবে। কী বীভৎস জীবনাচার! তনিমা তাই আজ হন্যে হয়ে ক্যাম্পাসে পর পুরুষের মাঝে সুন্দর দাঁত খুঁজে, দীর্ঘ দেহের চওড়া বক্ষ খোজে, ভরাট গলায় গোছানো কাব্যিক গল্প শুনতে চায়, শুনতে চায় জীবন, বিজ্ঞান আর ভালবাসার ক্লান্তিহীন উপন্যাস। কিন্তু পায়না, তাই ঘুরে ফিরে দাড়ির জঙ্গলে প্রবল আতঙ্ক মাখা আকর্ষণ নিয়ে ফিরে যায়। হাসান ফিরিয়ে দেয় তাকে,
-'আমি তো হুজুর এখন, নোংরা প্রজাতি, আমাকে সে ভেবেই ভুলে যাওয়া উচিৎ তোমার।'
জীবন গল্পের অনেক টানাপোড়েন চলে। তিন বছর পরে আমি হতভম্ব হয়ে দেখি তাদের হানিমুনের ছবি। আটোসাটো টি শার্ট জিনস পরা তনিমার পাশে ঢিলে ঢালা লম্বা পোশাকে বিশাল দাড়ি জঙ্গল নিয়ে দাড়িয়ে আছে হাসান ! দাড়ির ফাক গলে এক চিলতে হাসি!
'লাভ উইনস ওভার ফেইথ এন্ড রিলিজিয়ন', অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে এল শব্দ গুলো।
[সত্য ঘটনা অবলম্বনে]
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৯ ভোর ৬:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



