বাবার স্কুল জীবনের বন্ধুর ছেলে ব্রেইন ক্যান্সার যখন ধরা পড়ল, ভারতে নিয়ে যাওয়া হল চিকিৎসার জন্য।ডাক্তার ততক্ষণে বিদায়ের ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছেন, বাবা-মা কে এখন চোখের সামনে ১৬ বছরের ছেলের তিলেতিলে মৃত্যুর দৃশ্য দেখার শাস্তি ভোগ করতে হবে। ছেলে কোন উচ্চ বাচ্চ্য করেনি, কেন তার 'মাথা ব্যাথা' সারছেনা, কেন কোন চিকিৎসা না করিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হল! মৃত্যু পথ যাত্রী সন্তানকেও তখন মিথ্যে প্রবোধ বাণী শুনাতে হয়। প্রথমেই ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে মস্তিস্কের অক্সিপেটাল লোবে, দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলে সে। এর পর হারায় শ্রবণ শক্তি। ঘ্রাণ শক্তি হারাবার আগে বিকট গন্ধ পেত সে, পঁচে যাওয়া মস্তিষ্কের গন্ধ নাকে আসার আগেই তার ঘ্রাণ শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এভাবে এক এক করে সব ইন্দ্রিয় অনুভূতি হারাতে হারাতে কোন এক রোজা-রমজানের রাতে সেহরী শেষ হবার ৩ ঘন্টা আগে সে মারা যায়। তারিখটা খুব সম্ভব ২৮ শে ফ্রেব্রুয়ারি, ১৯৯৭।
বিদায় দিবার শেষ মুহূর্ত গুলো স্মৃতিতে গেঁথে থাকে ভীষণভাবে। মা স্মরণ করেন তার দাদীকে শেষবারের মত দেখার দৃশ্যটি। মহানন্দা নদীতে নৌকা চলে যাচ্ছে দূরে, তীরে দাদী গালে হাত দিয়ে নদীর পাড়ে বসে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। দৃষ্টি সীমার বাইরে যাবার আগ পর্যন্ত ওভাবেই বসে ছিলেন তিনি। মা যখন নিজের বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে রওনা দিলেন, যাত্রা পথে কেউ একজন ফোন করে মৃত্যুর সংবাদটি দিলেন। যাত্রা পথে সংবাদ টি তিনি নাও দিলে পারতেন। নানাকে শেষবারের মত দেখার দৃশ্যটি মার চোখে বার বার ফিরে আসে। নানা দোতলা বাসার বারান্দার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আছেন, মুখটা বিষন্ন করে গ্রিলের উপর ভর দিয়ে রাখা। মা বারবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে কেন জানি বারবার কেঁদে ফেলছিলেন।
যদি বলা হয় কীভাবে মরতে চাও? দুর্ঘটনা নাকি রোগে ভুগে? রোগে ভুগে প্রিয় মানুষদের চোখের সামনে কষ্ট আর ঝামেলার বস্তু হয়ে থাকতে চাইনা। আবার যদি দুর্ঘটনার কথা বলি, তাহলে শেষ কিছু বলার বা বিদেয় নেবার সুযোগ থাকেনা। ফাঁসির মঞ্চে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাবার আগে সৃষ্টাকে স্মরণ করে পাপ মোচনের , শেষ কিছু বলে যাবার সুযোগ থাকে, সেটিও মন্দ নয়।
রোজা এলো । আমার কোরাআন পড়া হয়না, তারাবী পড়া হয়না। অনিশ্চিত পাপবোধ আমাকে কুঁকড়ে ফেলে। ছোট কালে মনে আছে ঈদের জামা নিতাম না, দিলেও তা ঈদে পরতাম না। কিন্তু নিজের ঘরের ভেতরটায় কেন জানি দম বন্ধ হয়ে আসত। আমি প্রতিটি মুহূর্তে চেষ্টা করতাম চান রাতের আনন্দে ভাসা মুহূর্ত গুলো ভুলে থাকতে, হয়ত কোন কুৎসিত মানসিক বিকারের কারণে। প্রবাসে এসে আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। হয়ত খোলা মাঠে ঈদের নামায আর জনতার উদ্দেশ্যে আমাদের পোপ তথা মুফতির অসম্ভব সুন্দর জ্বালাময়ী ভাষণ আর শোনা হয়না। তবে কোথাও মুবারক বাদ নেই, সাইরেনের শব্দ নেই, ঈদের নামাযের স্থান ও সময় উল্লেখ্ করে কোন মাইকিং নেই, 'রমজানের ঐ রোজার শেষে' এই ভীষণ মন খারাপ করা গানটিও আর কোথাও বাজেনা, রাস্তার ধারে সাজানো ছোলা মুড়ি জিলাপির ইফতারীও নেই । আমি তাই ঘরে থেকে গবেষণাগার আর গবেষণা গার থেকে ঘরে ঘুরি ফিরি।
রমজান মাসে সংযমের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত ক্ষমার যে সুসংবাদ, সেটির যোগ্য মনে করিনা নিজেকে, তাই ঈদে আনন্দের কোন উপলক্ষ নেই। ঈদের দিনে কিছূটা সময় নিয়ে তাই পাপের অনুশোচনায় কাঁদি, কিন্তু নিজের চরম পাপাসক্ত অনুভূতি থেকে মুক্তি পাইনা।কসম খোদা তোমার! আমরা হুর চাইনা, তোমার ভয়ংকর সুন্দর অভূতপূর্ব স্বর্গ না দিলেও আমরা খুশি। কষ্ট জর্জর পৃথিবীর মত আরেকটি পৃথিবীতে অনন্তকালের নির্বাসন দিও আমাদের, তবুও মহা পরাক্রমশালীর নরকের আগুন যেন আমাদের স্পর্শ না করে।মৃত্যু যথন নিশ্চিত জানি, তখন আমাদের মত পাপী মৌলবাদীরা যে অনিশ্চিত-অন্ধকার মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে শঙ্কিত,!
পরমকরুণাময় সৃষ্টা কী এতটা দয়া করবেন, স্রষ্টা কী তার অবুঝ সৃষ্টি গুলোকে কী নরকের অনল থেকে বাঁচিয়ে পরম মমতা দিয়ে আগলে রাখবেন! সৃষ্টার কৃপা কী আমরা পাব, আমাদের দেহ ত্যাগী আত্মার কী আদৌ কোন সদগতি হবে, সৃষ্টা কী তার পাওনা উপাসনা গুলো মাফ করবেন, এতটা উদার কী তিনি হতে পারবেন?
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৫:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





