বছর ঘুরে সেই পুরনো ল্যাবে পড়ে থেকে যন্ত্রগণক আর কল কব্জা নাড়তে থাকি, বাইরে তুষারপাত হয়। ল্যাবের শেষ ছেলেটিও হ্যাপি হলিডেইজ বলে বিদায় নিয়ে ল্যাব শূণ্য, নিস্তব্দ করে চলে যায়। কেউ কেউ বান্ধবীকে বাহুবন্দী করে বহু দূর অভিসারে চলে যায়। জনাথনের চোখেমুখে বাড়ি যাবার আনন্দ ঝিলিক দেখে দীর্ঘ শ্বাস চাপা হিংসার অনুভূতি হয়। ঈদের ছুটি এলেই সেই রাত জেগে ব্যাগ গোছানো, খুব ভোরে ওঠে হলের বেডিং গুটিয়ে ব্যাগ কাধে বেরিয়ে পড়া। ল্যাব থেকে বেরিয়ে যাবার প্রাক্কালে জনাথন বলল,
-ডোন্ট ইউ শেয়ার গিফটস ইন ক্রিসমাস?
-নট রিয়েলি, আই ডোন্ট নো হোয়েদার ইট হ্যাজ এনি থিং টু ডু উইথ রিলিজিয়ন...
-এনিওয়ান ক্যান গিফট ইন ক্রিসমাস.....
-ওয়েল, মেই বি আই হ্যাভ নো ওয়ান হেয়ার টু শেয়ার ক্রিসমাস গিফট, পসেব্লি ব্যাক এট মাই হউম কান্ট্রি আই ক্যান মেইক ইট।
জনাথন ভুলেও কখনও প্রশ্ন করেনি আমি কোন দেশ থেকে এসেছি, সে ধরেই নেয় আমি ভারতীয়। আমাকে শুধাল, ক্রিসমাসের প্ল্যান কি, থার্টি ফাস্র্ট নাইটের আতশবাজী দেখতে যাব কিনা? ভিতরের বিমর্ষতাকে খুব করে গোপন করে হেসে বললাম,
-আই এ্যাম নট গোইং এনিহোয়ার, আই উইল বি হেয়ার। আই এ্যাম স্পেন্ডিং মোর টাইম ইন মাই প্রোজেক্ট টু লিভ ফর মাই কান্ট্রি আর্লি।
জানি দেশে ফিরলে আমার প্রবাস জীবনের মুহূর্তগুলো ঘোর লাগা স্বপ্নের মত মনে হবে, হয়ত রিক্সায় চড়লে সহসাই কোন ছিনতাইকারীর হাতে ঘড়ি, ওয়ালটে, সেল ফোন হারাবো, কিংবা দূর পাল্লার কোন বাস উল্টিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ব, দিনভর ভিক্ষাবৃত্তি শেষে রাতে গরমে ঘরে ফিরে লোড শেডিং এর কারণে কলে পানি আসার অপেক্ষা করব, হোটেলের টাউফয়েড, জন্ডিসের জীবাণু মাখানো ডাল-ভাত খেয়ে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকবো, হয়তবা বমিও করব।
জনাথন খানিকটা অবাক হয়।
-আই আন্ডার স্ট্যান্ড ইয়োর পয়েন্ট, বাট ইউ ক্যান সেল ইউর ডিগ্রি হেয়ার এজ ওয়েল এন্ড হ্যাভ ফার বেটার চান্স টু লিভ এন্ড আর্ন।
-জনাথন, হাউ ডু ইউ ফিল হোয়েন এ পেইনফুল সেমিস্টার এন্ডস উইথ এ ক্রিসমাস ব্রেইক এন্ড মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি হোয়েন ইউ গেট এ গ্রেইট টাইম এন্ড চান্স টু মিট ইয়োর ফ্যামিলি?
জনাথন আর কথা না বাড়িয়ে হাসি মুখ দেখিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে যায়। আমি বাইরে ক্রিসমাস বেলের শব্দ পাই, ক্রিসমাস ট্রির আলোকসজ্জা দেখি রাস্তায় একলা হেটে হেটে, আরেকটি নববর্ষের আতশবাজীর অপেক্ষায় থাকি। ওরা সবাই তাদের ঈদে বাড়িমুখো হয় প্রিয়জনের সাথে ঈদ করতে, আমি আমার পুরনো মেসে একলা বেওয়ারিশ জীবের মত পড়ে থাকি। গুনগুন করে ঘরে ফেরার গান গাইতে গিয়ে কষ্টে চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসে।
সত্যিকার অর্থে সেই গান গাইবার দুর্লভ, বিস্মৃতপ্রায় মুহূর্তটির জন্য এভাবে অনিশ্চিত, অনন্ত প্রহর অপেক্ষায় থাকতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ৭:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



