somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জ্বি ভাই, আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হতভাগা সন্তান

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মফস্বলের মাঝে গেও গেরামের স্কুলের ছেলে একটু ভাল ফলাফল করলে তাকে নটরডেম কলেজে রপ্তানি করে দেবার প্রক্রিয়া চলে। জমি জমা বেচে হলেও ছেলেকে ভাল কলেজে পড়িয়ে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠিয়ে দিতে পারলেই বাবাদের স্বস্তি। অন্তত বাবাদের আয় রোজগার বা সঞ্চয়ের মূল উদ্দেশ্যই থাকে ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করিয়ে দেয়া। আর নটরডেম মানেই তো নিশ্চিত বুয়েট মেডিক্যাল বা ঢাবির আঙ্গিনায় এক পা পড়া।

আমাদের গেও গেরামে ঢাকা থেকে কোন ছেলে আসলে মনে হত সাক্ষাৎ অবতার, দেখা মাত্রই নমঃ নমঃ করতাম। একবার বিখ্যাত আইডিয়াল স্কুলের ছেলে আসল, আমরা মুগ্ধ হয়ে স্বর্গ দূত দেখি। ঢাকায় বাবার হোটেলে থেকে যারা আইডিয়াল->নটরডেম->বুয়েট বা গভঃ ল্যাব->ঢাকা কলেজ->বুয়েট হয়েছেন তাদের আমার ভীষণ হিংসা হয়। সেখানে এলাকায় নটরডেমিয়ান এলে দুয়া দুরুদ পড়া শুরু করতাম। সামান্য ক'টা নম্বরের জন্য বোর্ড স্ট্যান্ড হাত ছাড়া হয়ে যাওয়াতে, সবাই পরামর্শ দিল নটরডেমে ভর্তি হবার জন্য। নাম করা হলে কী হবে, প্রাইভেট কলেজ। স্কুলের ব্যাক বেঞ্চার গুলো দেখি বাবার টাকায় দিব্বি গিয়ে নটরডেমে ভর্তি হয়ে, পাশ করে এক এক জন জাদরেল ছাত্র হয়ে উঠল চোখের সামনে। আসলেই ছাত্র পিটিয়ে মানুষ করতে নটরডেমের জুড়ি মেলা ভার।

খ্রিস্টান ছাড়া হোস্টেলে জায়গা হবেনা, রামকৃষ্ণ মিশন শুধু হিন্দুদের জন্য এমন তথ্য পাবার পর দেখি ঢাকা শহরে থাকা, খাওয়া পড়া বাবদ বাবার ৪/৫ হাজার টাকা চলে যাবে। বাবা নেহাৎ ছা পোষা সরকারি চাকুরে, যে মাইনে পেতেন তাতে করে মাসে ২ জন স্যারের কাছে ব্যাচে ৩০০+৩০০=৬০০ টাকা দিয়ে পড়ানোর বেশি সাধ্যে কুলাতোনা। কাজেই নটরডেম বা ঢাকার চিন্তা বাদ।

টাকা ওয়ালাদের একটা বিকল্প চিন্তা থাকে। বুয়েট, ঢাবি, কুয়েট, রুয়েটে কম্পিউটারে চান্স না পেলে, ঢাকার একটা ভাল মানের প্রাইভেটে পছন্দের কম্পিউটার বিভাগে ভর্তি হয়ে যাওয়া। এমনকি দম্ভোক্তি শোনা যায়, "রুয়েটের ইলেক্ট্রিক্যালে পেয়েও আমি নর্থ সাউথের কম্পিউটারে পড়ছি। " আমাদের সময় আবার কম্পিউটারের নেশাটা এমন পর্যায়ে ছিল বুয়েটে কম্পিউটার না পেলে অন্য যেকোন ভার্সিটি গিযে হলেও কম্পিউটারে ভর্তি হবে। কিন্তু ঢাকার বাইরে কোথাও ভর্তি হওয়া মানে ৫ বছর পিছিয়ে পড়া, খ্যাত হয়ে যাওয়া। ঢাকা কেন্দ্রীক শিক্ষাবাজারের জোশে টাকাওয়ালারা ঢাকার প্রাইভেটে কম্পিউটারে পড়তে লাগল। টাকাওয়ালারা এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারলেও আমাদের মত ছা পোষা কর্মচারীর সন্তানেরা সম মেধা নিয়ে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়, কেউ যায় খুলনার কম্পিউটারে। একে তো পদার্থ বিদ্যায় চাকুরির বাজার নেই, তার উপর সেশন জট, হতাশা , গরীবের জন্য দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রটা বনবন করে ঘুরতে থাকে।

টাকাওয়ালা শুধু টাকায় সম্পদশালী নয়। মামা চাচাদেরও অবস্থা গতিক ভালই থাকে। কাজেই পাশ করলেই চাকুরি এমন একটা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রাইভেটে পড়া লেখা করে। ঢাকার প্রাইভেটের ছেলে, ভাল ইংরেজি জানে, গণ যোগাযোগের বিষয় গুলো রপ্ত আছে সেখানে মফস্বলে পড়া খ্যাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে কে পাত্তা দিবে? ঢাকার বাইরে মানে পিছিয়ে পড়া , পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মনে হানাহানি-- এ বোধ বিশ্বাস থেকে দেখা যায় ঢাকার অনেকেই রুয়েটে কম্পিউটারে পেয়েও ঢাকায় থেকে প্রাইভেটে পড়ছে। অন্তত মেয়েদের বলা হচ্ছে এত দূরে গিয়ে কাজ নেই, প্রাইভেটই এখন ভাল, বাসার কাছে থেকে টাকা দিয়ে সময় মত ডিগ্রী শেষ করা যায়।

পাবলিকের উচু ডিগ্রিধারী শিক্ষকেরা পেটের দায়ে পাবলিকের ফরয ক্লাশ নেয়া বাদ দিয়ে প্রাইভেটে শিক্ষাদান করছেন। প্রাইভেটের মান তাই বাড়ছে বৈকি। এখনকার পরিস্থিতি শুনি আরো ভয়াবহ। জিপিএ ৫ না থাকলে নাকি বুয়েটের ফরমই তোলার যোগ্যতা বাতিল করে দেয়া হয়েছে।ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে পাবলিকের এত উন্নাসিক ভাব টিকবে তো? ঢাকার মানুষের যত বড় বড় টাকার গাছ আর খরচের ইয়া বড় হাত ----তাতে করে সামনের দিন গুলোতে গরীবের বিনে পয়সার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কিনা, ভাবনার বিষয়। প্রাইভেটের বেলায় ৪/৫ এর মাঝে একটা কিছু থাকলেই হল, ভর্তির এই উদারীকরণে তাই ছাত্রদের বেশ হিড়িক। জিপিএ ৫ এর হিড়িকের যুগে যারা দুর্ভাগ্য বশত (!!!) জিপিএ ৫ পাননি, তাদের জন্য না হয় প্রাইভেটের দরজা খোলা আছে। কিন্তু গরীবের সন্তানের বাবার পকেটে তো পয়সা নেই, অন্তত সরকারি চাকুরেদের দুর্নীতির হাত যশ না থাকলে প্রাইভেটের উচ্চ বেতন পরিশোধ করা অসম্ভব। আবার গরীবের ছেলের ঘোড়ার রোগ, কম্পিউটারে পড়তে চায়।

জ্বি উপায় তো আছেই। দিনাজপুরের হাজী দানেশ, টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়। বা সম্প্রতি কুমিল্লা, নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়। ছা পোষা লোকের সন্তানের মাঝে মাঝে ডাক্তারি পড়ার রোগ ধরে। পাবলিক মেডিক্যাল /ডেন্টালে না পেলেও পাওনিয়ার ,সাপ্পোরো, সিকদার, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কমিউনিটি বেইজড আরো কত কী আছে! গরীবের সন্তানকে ১০-২০ লাখ টাকা দিয়ে ডাক্তার বানিয়ে টাকাটা ঠিক মত উঠে আসবে তো বাংলাদেশে? না হলে সিলেটে চট্রগ্রাম ভেটেরিনারি কলেজে ভর্তি করিয়ে দাও কী আর করা! গরু ছাগলের ডাক্তার হয়ে থাকুক।

বাপের পকেটে টাকা থাকলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খুনাখুনি, ছাত্র রাজনীতি, সেশন জটের বিরুদ্ধে কথা বলে জাত নামানো খুব সোজা ----সেই সাথে প্রাইভেটকেও দশ হাত উপরে উঠিয়ে দেয়া যায়, যাতে মাটিতে পা না পড়ে। মাঝে মাঝে ভাবি ছেলেকে নটরডেমে পড়িয়ে সুস্থ মানুষ বানাতে বাবা না হয় ক'টা টাকা বাম হাত দিয়েই উপার্জন করতেন। অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে খুব বুঝদার, জানে ওয়ালা কর্পোরেট গ্রাজুয়েট বানাতেন মুড়ি মুড়কির মত বৈধ পথেই টাকা আসতো। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি, খুনাখুনি , সেশন জটের অভিযোগ-অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতাম। অন্তত ভাইভা বোর্ডে গিয়ে দেখতে হতনা স্কুলের পুরনো সহপাঠী প্রাইভেট থেকে খুব দ্রুত পাশ করে এখন আমার বস, আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, খ্যাত মফস্বলের পিছিয়ে পড়া ছেলেটিকে চটকে দিচ্ছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়ে।

কী যে পাপ করেছিলাম গরীবে ঘরে জন্মে আর পাবলিকের অভিশপ্ত শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা নিয়ে। প্রাইভেট ওলারা আজ সুযোগ বুঝে আমায় মূর্খ, মানসিক রোগী ডাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৪
৫৫টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×