somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বসন্ত বিরতি

২৭ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দশ দিনের ছুটি নিয়ে ইটালি গিয়েছিল ফেডরিক। ল্যাবে ফিরে আসতে না আসতেই আবার লাপাত্তা। তাই দেখা হতেই, "কী, বেশ ফুরফুরে লাগছে, তাই না?" খুব খুশি খুশি দেখালো তাকে। একটা পেপার জমা দেয়ার ডেডলাইন ধরার চেয়ে এই ছুটিটা বরং তার বেশি দরকার ছিল। তারপরেই দেখালো আইসল্যান্ডের ছাই মেঘের দৃশ্যটি,

-ভাগ্যিস আগে আগে চলে এসেছি, দেরি করলে আরো কটা দিন আটকে যেতাম।

তার হাই স্কুল শিক্ষক বাবার কথা বলল, বাবা জোর দিয়েছেন জীবন উপভোগ করতে। পিএইচডি করার নামে বছরের পর বছর কম্পিউটারের সামনে বসে কাটিয়ে দেবার কষ্টকর মুহূর্তগুলো পরে হয়ত আর অনুভূত হবেনা। কিন্তু এক সপ্তাহ কাটানো সুখ স্মৃতিগুলো পরে প্রায়শই রঙিন থাকবে।

-তারপর, তুমি তো এত দিন আছ এদেশে, একদিনও ছুটি নিলেনা, কোথাও ঘুরতে গেলেনা!

ফেডরিকের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারলামনা। 'তোমার জীবন', 'তোমার পছন্দ', 'কারো কিছু বলার নেই'--জাতীয় অভয় দিতে লাগল সে। উল্টো তাকে আমার কিছু দেশীয় দায়বদ্ধতা ও সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয় বারবার।ডিগ্রি হলে একেবারেই দেশে চলে যাব, ঘুরে বেড়ানোর মত বিলাসিতা আমার জন্য নয়। "লাক্সারি অফ লেইজার" বনাম "লিবার্টি অফ লেইবারের" কথাটা মাথায় টনটন করতে থাকল। আমি বিরতিহীনভাবে কাজ করে যাবার স্বাধীনতাটা উপভোগ করি হয়ত।

আমার আন্তরিক সৌজন্য প্রকাশ প্রায়শই এদের কাছে গুরুতর অনধিকার চর্চার পর্যায়ে গিয়ে দাড়ায়।ফেডরিক সেদিন বলেই রেখেছিল, আজ তার বান্ধবী ল্যাবে আসবে দেখা করতে।অন্যের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এড়াতে আমি তাই অন্যখানে গিয়ে কাজ করছিলাম। বহু পরে ফিরে গিয়ে দেখি ফেডরিক তখনও বান্ধবীর সাথে । আমাকে দেখা মাত্রই পরিচয় করিয়ে দিল ক্যাথরিনের সাথে। খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে, 'হ্যালো' বলেই আমাদের দেশীয় কায়দায় জানালাম,

-তোমার কথা শুনেছি ফেডরিকের কাছে অনেক! [হাসিমুখ]

অপরিচিত কিন্তু নাম শোনা মানুষের সাথে তাৎক্ষণিক পরিচয় পর্বে এর চেয়ে বেশি কিছুর বলার চিন্তা মাথায় আসেনি, কিন্তু দ্রুত একটা কিছু বলে পরিচয় পর্বটা মার্জিত করার তাগাদা ছিল।
পরেই দেখলাম ঘরে উপস্থিত মানুষগুলো থতমত খেয়ে দাড়িয়ে আছে। ফেডরিক রীতিমত অপমানিত। আমিও ভীষণ বিব্রত হয়ে অপরাধবোধে ভুগছি, না জানি কী ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি। পরে জানলাম এদের কাছে গার্লফ্রেন্ড বিষয়টি একান্ত ব্যক্তিগত, ফেডরিকের কাছে তার বান্ধবীর কথা শোনাটা যেমন অনধিকার চর্চা, তেমনি তার বান্ধবীকে জানানো যে, "আমি তার কথা আগে শুনেছি" এটা আরো বড় মাত্রার অভদ্র আলাপ। অথচ আমাদের দেশীয় পরিচিত হবার কায়দাটা এমনি, সেটি একান্তে ফেডরিককে বুঝিয়ে খুব উপকার হল বলে মনে হলনা।

কথা প্রসঙ্গে মিতালি একবার বলেছিল, আমি নাকি নিজের জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। বিপরীত জেন্ডারের সাথে খুনসুটির নামে আবেগ চর্চা, কিংবা ভদ্রলোকি সামাজিকতার চর্চা কোনটাই অলসতা ও আগ্রহের অভাবে করা হয়ে উঠেনি। ব্যাপারটি মিতালির চোখে পড়েছিল,
-আপনাকে এতদিনে একবারও হাসতে দেখলামনা!

হাসি দেবার মত প্রসঙ্গ উঠেনি অথবা মুগ্ধ বা আনন্দিত হবার স্নায়ুবিক ক্ষমতাগুলো অনভ্যেসের কারণে শুকিয়ে গিয়েছে হয়ত। তাই, আনন্দ করার বিরল মুহূর্ত এলে চোখে পানি আসে হাসিমুখের বদলে। রাত করে ঘরে ফিরে ক্লান্তি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, জীবন নিয়ে ভাববার সময় কোথায়?

তারপরেও ফ্রিজ ভর্তি খাবার-পানীয়, ফেনা ওঠা বাথটাবের গরম পানিতে গা এলিয়ে শুয়ে থাকা কিংবা বর্ষার ঠান্ডা আলো আধারি দিনে ফায়ার প্লেসের আগুনে নিজের অজ্ঞাতসারে দৈহিক সুখগুলো যাপন করছি। কিন্তু আমার দৈহিক অবসরের মুহূর্ত গুলোতেও দুশ্চিন্তা ভর করে, অনাগত ভবিষ্যত মনটাকে অস্থির রাখে সবসময়। সেটি ভুলতে আবার কাজে ফিরে যাই, এই চক্রের মাঝে সর্পিল আকারে ঘুরে ঘুরে জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

তাই একটা সজ্ঞান মানসিক বিরতি দরকার ভীষণ, দরকার পুরোপুরি ভাবনা মুক্ত কিছু প্রহর।




সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:৩৬
৯টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×