somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আসুন প্রবাসীরা দেশের অন্তত একজন করে 'বঞ্চিত' ছাত্রের খোরপোশ দিই

১১ ই জুন, ২০১০ রাত ১১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সুজনের খাওয়াটা দেড় বেলা হয়। কূপি বাতির তেলের খরচ, স্কুল-পরীক্ষার বেতন, খাতা-কলমের দাম, পুরনো জামার জন্য নিজের পেটকে বঞ্চিত করে কিছু পয়সা বাচানো অপুষ্ট মুখের সংখ্যা এখনও অগণিত। সুজনের বেলায় অর্থের যোগানটা আসতো বয়সের ভারে ক্লান্ত তার ফুফুর কাছ থেকে। মা মারা গেলে, বাবারা নিয়ম মত অন্যত্র বিয়ে করে চলে যায়। ভিক্ষাজীবী ফুফু এ বাড়ি ও বাড়ি করে পড়ুয়া সুজনের কথা বলে হাত পাতে।

অজগ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছে সুজন। দেশব্যাপী জিপি ৫ এর মহোৎসবে যেসব দুঃস্থ মানব সন্তান ৫ পেয়েছে শুধু তারাই সচ্ছল মানুষের কৃপা প্রার্থী হতে পেরেছে।সুজনের সব বিষয়ে সর্বোচ্চ গ্রেড থাকলেও ইংরেজিতে বেশ খারাপ হয়ে যাওয়াতে আর জিপি ৫ পাওয়া হয়নি। তার অভুক্ত, বঞ্চিত প্রহরগুলোর কথা ভুলে গেলেই মনে হবে, ছেলেটি ইংরেজিতে কাঁচা অথবা ইংরেজি শেখায় তার আগ্রহ, যত্নের ঘাটতি ছিল।

জিপি ৫ এর নিচে কোন ফলাফলকে ফলাফল হিসেবেই গণ্য করেননা অনেকেই। কপাল ফেরে কলেজের আঙ্গিনায় পা রাখা হয়না তাদের অনেকেরই, সেখানে 'ভাল' কলেজ অসম্ভব কিছু একটা। সুজন দমে যায়নি-- এটা জানাতে যে, তার চেষ্টা, আগ্রহের ঘাটতি নেই, ছিলনা।জেলা শহরের সবচেয়ে সেরা কলেজ দুটোর একটায় ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করে সুজন, অসংখ্য জিপি ৫ পাওয়া ছাত্রদের পিছে ফেলে।

দু'দিন বাদেই গর্তে পড়ে পা মচকে যায়। নদীর চরের উপর কাচা বাড়িতে স্বামী পরিত্যক্তা ফুফুর সাথে থাকে।ঔষধ-পথ্য আর বিশ্রামের অভাবকে অবজ্ঞা করে নদী পার হয় প্রায় প্রতিদিন। আরো চার কিলোমিটার পথ খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেটে ধূলো ঘাম মেখে শহরের সুবিধাভোগী সন্তানদের মাঝে বসে পড়ালেখার সুযোগ হারাতে চায়না। হাজিরা দেয় কলেজে।যাতায়াত খরচ তো নেই।

ভর্তি হতেই সুজনের হাজার খানেক টাকা লাগবে। ভিক্ষাজীবী ফুফু তাই সুজনের নম্বরপত্র হাতে নিয়ে স্বচ্ছল মানুষের দুয়ারে ভিক্ষা করে বেড়ায়। সুজনকে সাথে নিয়ে যেতে চাইলে হাত পাতার লজ্জায় তার ছোট অপুষ্ট মাথা নুয়ে আসে। জিপি ৫ পায়নি, তাই কোন মুখ নিয়ে এখন মানুষের সামনে যাবে? ক্ষুধার্ত পেটের অজুহাত সরিয়ে আত্মগ্লানি আর হতাশার কষ্টে পুড়তে থাকে সে। নিজের ব্যর্থতার উপর ক্ষোভ, কষ্ট দুটোই চেপে বসে সুজনের। আবার দিনে অন্তত একবার, রাতের আঁধারে ভাঙ্গা পা, জীর্ণ পোষাকে স্রষ্টার সামনে দাড়িয়ে প্রার্থনা করতে তার ভুল হয়না।

সকালে খাবার অভ্যেস নেই। তাই স্বভাবমত খালি পেটে অনেক সাহস আর আশা নিয়ে সুজন আসে। ওর ফুফু ওকে আশ্বাস দিয়ে নিয়ে আনে। চার হাজার টাকা! সে তো অনেক! কে দিবে? কেন দিবে আমায়? সুজন ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে সামনে দাড়ায়। দু'পায়ের উপর অদম্য ইচ্ছা শক্তি নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কঙ্কালসার অপুষ্ট দেহ আর কিছুই দেখা যায়না। ময়লা শার্টের ফাক দিয়ে পাজরের হাড়গুলো উকি দিচ্ছিল।

-কত লাগবে তোমার ভর্তি বাবদ?
সুজন কাটায় কাটায় হিসেব করে বলল, ৪০৭৫ টাকা। বেশি বাড়িয়ে বলেনি সে।যদিও বলতে পারতো, কেউ তো আর খোঁজ নিতে যাচ্ছেনা।বরং আরো কমিয়ে বললে টাকাটা পাবার সম্ভাবনা যদি কিছুটা বাড়ে! তাকে পুরো ৫০০০ টাকাই দেয়া হল। হকচকিয়ে যায় সুজন। এত টাকা!

ভর্তি খরচ আর কলেজে যাবার মত কিছু ভাল পোষাক কেনার পর, সুজনের সামনের দুটো শিক্ষা বর্ষের প্রায় পুরোটাই থাকবে ক্ষুধায় গ্রাস করা আর্থিক অনটনের বিষন্ন মেঘ।মাসে কত টাকা লাগবে সুজনের তিন বেলা খাবারের জন্য?

--২০০০ টাকা? গ্রামের খরচে।
২০০০ টাকা মানে কত? ৩০ ডলার, ২০ পাউন্ড!!!

দেশে একটা পরিবারের কাছে মাসে ২০০০ অনেক টাকা। এ টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে ৩টা বুয়ার বেতন হতে পারে। সংসারের খরচের মাঝে ২০০০ টাকা সরিয়ে বাইরের কোন বেকার মানুষের পেটের পিছে 'অহেতু' খরচ করতে সায় দিবেনা অনেকেরই। দুঃস্থ মানুষের পাওনা যাকাত না দিয়ে পেনশনের টাকা ব্যাংকে রেখে মাস শেষে সুদের টাকায় চলা পরিবার অগণিত। পবিত্র সংসার ধর্মের চক্করে পড়ে টাকা উপার্জন আর সংসারের খরচের ব্যাপারে মানুষ উগ্রতা, ব্যগ্রতা দুটোই বাড়তে থাকে। এটা অনিবার্যভাবেই হয়।

২০০০ টাকা হিসেবে কিন্তু প্রবাসীদের কাছে মাসে মাত্র ৩০ ডলার। বিদেশে যারা আয় উপার্জন করে অর্থ জমাচ্ছেন, তাদের কাছে এটা 'মাত্রই'। মোবাইল, সিগারেটের অহেতু খরচ বাবদ মাসে ১৫০-২০০ ডলার চলে যায়। বন্ধুদের নিয়ে কফি খেতে গেলেও ১০/২০ ডলার এক দিনেই যায়। ১০/২০ ডলার তখন প্রবাসীদের হাত থেকে ঠিক ১০/২০ টাকার মত বের হয়, অন্তত আমার অনুভূতিটা এমনি।

দেশের অর্ধেক মানুষ ২০১০ এসেও বিদ্যুতের আলো পায়না। সম্পূর্ণ কূপিবাতির আলোতে পড়া লেখা করে দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ কৌশল নিয়ে লেখা পড়া করেছে এমন দৃষ্টান্ত পেতেও বেশিদূর যাবার দরকার নেই। কিন্তু ক্ষুধা নিয়ে, মাইলের পর মাইল পথ চলা বিদ্যার্থীর সংখ্যা তো এখনও কমে যায়নি। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা জেনেও লেখাপড়া ছেড়ে দেয়নি সুজনেরা।

স্বচ্ছল এক একজন প্রবাসী কী পারিনা মাসে একটা ছেলেকে ২০/৩০ টাকা (ডলার) দিয়ে ক্ষুধা মুক্ত পড়া লেখা নিশ্চিত করতে? এতে নিজের উপার্জনের শুদ্ধি, লোভাতুর মনের শুদ্ধি আর একজন বঞ্চিতের অধিকার প্রাপ্তি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১০ সকাল ৭:০৮
২৪টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×