উনাদের ব্যাপারে আগ্রহটা বিশেষভাবে দেখাতে হয়, কেউ বলেন আঠার মত লেগে থাকতে হবে।আগ্রহ দেখানোটা তাই এক তরফাভাবেই হয়। কিন্তু আগ্রহ পরবর্তী ফলাফল নির্ভর করবে উনাদের অভিরুচি, মেজাজ-মর্জির উপর।ধরুন পরিচিত হতে চাইলেন।
--"আমি ওমুকের ভাই তমুক, চিনতে পারলেন?"
বলে একটা আগ্রহের বার্তা পাঠালেন, ফিরতি বার্তা পাবার সম্ভাবনা ৫০ ভাগ। তাও ৫০ ভাগ বেশি সময়ক্ষেপণ করে। এই সময়টা ব্যয় হবে সম্ভাব্য আগ্রহপ্রার্থীর চরিত্র নির্ধারণের পেছনে।বিশেষ অনেক কারণ বশত, কোন জবাব নাও পেতে পারেন।
আপনাকে টাউট গোছের দু'পেয়ে জীব মনে করতে পারে, সংশয়টা থাকা স্বাভাবিক।কিন্তু সংশয় দূরীকরণে আগ্রহের অভাব থাকে আবার আরেকটা বিশেষ কারণে। উনাদের যোগাযোগ রাখার মত দু'পেয়ে জীবের অভাব নেই, তাই বাড়তি উটকো ঝামেলা এড়াতে চান।মানুষের ভদ্র আগ্রহবোধটাকে রাস্তার ধূলাবালির মত অগ্রাহ্য করার মত সৌজন্য উনারা হরহামেশাই দেখাতে অভ্যস্ত। অন্তত ভদ্র প্রশ্ন বা কৌতূহলকেও উনারা দু'পেয়ে জীবের দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতার মাঝে ফেলেন।
অন্যভাবেও হতে পারে। ধরুন আপনি আপনার আগ্রহ বার্তা পাঠালেন। আপনাকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক অপরিচিতজন হিসেবে ধরে নিয়ে অন্ততকাল ধরে ঝুলিয়ে রেখে দিবে। ফলত, উনারা প্রকাশ্যে বর্তমান, সরব, সচল থেকেও আপনার মত আপদকে উনাদের আওতামুক্ত রাখবেন। উনারা নিজেরাই নিজেদের পছন্দ বা নির্বাচনের ব্যাপারে আস্থা রাখতে পারেননা বলে একটা সংশয় মাখা ভীতিও কাজ করে , অন্তত ইন্টারনেট তো যোগযোগের নিমিত্তে পরিচিত হবার বিশ্বস্ত মাধ্যম নয়। কী বুদ্ধিদীপ্ত, সুপক্ক মস্তিষ্কেরর ভাবনা!
আগ্রহ দেখানোর সাথে সাথে উনাদের দুর্বোধ্য কিন্তু স্পর্শকাতর কিছু বিষয় মোকাবেলা করার প্রয়োজন হয়।আপনার প্রশ্ন করার ঢং জানতে হবে, ঠিক যেভাবে প্রশ্ন করলে বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা ধনাত্মক হয়। মাথা থেকে বাস্তব চিত্র বা ব্যক্তিমত ঝেড়ে ফেলে বুদ্ধিদীপ্ত তোষামোদ করতে পারলে কিছুটা ফলোদয় হয়। যদি বলে বসেন,
--"আপনার এই কথাটি ভাল লাগেনি", বা
--"এভাবে বলাটা আপনার ঠিক হয়নি",
তাহলে পাকাপাকিভাবে অভদ্রলোকের তালিকায় ঢুকে পড়লেন। কাউকে শিখানো বা উপদেশ দেয়ার মানসে থাকলে অন্য রাস্তা দেখুন, উনারা এসব শুনে, জেনে, মেনে অভ্যস্থ নন। উনাদের রাস্তা কেবল প্রশংসা আর ভক্তির লালা নেবার জন্য সদা উন্মুক্ত। তবে সেখানেও ভক্তকূলের দীর্ঘ সারি থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভক্তির লালা ফেললেই যে তার প্রাপ্তি স্বীকার হবে, তার কোনই নিশ্চয়তা নেই।
আগ্রহকে অগ্রাহ্য করে অপমানিত করার সেকেলে নীতি এখনও জারি আছে। কিন্তু তাতে কাউকে আহত করার কারণে বা নিজের অসৌজন্যতা প্রকাশ হেতু অনুশোচনা কোনটাই উনাদের কাজ করেনা। আগ্রহ প্রাপ্তির সাথে সাথে সমান তালে উনারা শূণ্যে ভাসতে থাকেন, লালা ফেলা জীবের সংখ্যাও ক্রমাগত বেড়ে বেড়ে ভাসমান উনাদের আর মাটিতে নামানো সম্ভবপর হয়না। তারপরেও স্ববিরোধী স্বগোতক্তি চলতেই থাকে উনাদের মুখে,
--"আমি খুব সাধারণ একটা জীব।ইস্ এরা যে কেন এত বিরক্ত করে! অসভ্যের দল সব।"
বিপরীতক্রমে উনারা যদি আগ্রহ দেখান, তো আমাদের আল্লাদে আট খানা হয়ে যাবার নিয়ম।ভালবাসার কথা ভাল করেই বলার নিয়ম। পারলে দু'হাত মুঠি করে হাটু গেড়ে বসে প্রার্থনার ভঙ্গিতে আজীবন সঙ্গ কামনা করা। আমরা পারিও দেখাতে।
উনাদের আগ্রহকে সাদরে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হ্ওয়া মানে আপনি উগ্রপন্থী, রসকষহীন দু'পেয়ে, অভদ্র জন্তু, আদব জানিনা। উনাদের ব্যাপারে না শব্দটা উচ্চরণ করাটাই ভয়ংকর অভদ্রতা, বিদ্বেষ প্রকাশ। এই বিদ্বেষ প্রকাশের কারণে জনতার আদালতে আপনার মানসিক রোগের প্রকট উপসর্গ ধরা পড়বে, কোন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়বেনা।
আবার যোগাযোগ এমনকি আগ্রহ দেখানোর রাস্তাটা আম জনতার জন্য পাকাপাকিভাবে বন্ধও করে দিতে পারেন উনারা।
--"আরে আপনি দেখছি আমার বিভাগের, আগে তো খেয়াল করিনি!"
ভদ্রতা জ্ঞানটা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হলে, পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে,
--"তাই তো! আপনি কোন ব্যাচে ছিলেন?"
কিন্তু আপনার আমার সূক্ষ সুদূরপ্রসারী দূরভিসন্ধি গুলো বুঝবার মত যথেষ্ঠ মানসিক পক্কতা নিয়েই উনারা অবজ্ঞা, অপমান করবেন।ফিরতি কোন উত্তর পাবেননা, তার আগেই সশব্দে যোগাযোগের দরজা লাগিয়ে দিবেন।
ধরুন কথা বলার ফাকে উনি প্রশ্ন করলেন,
--আপনি কোথায় চাকুরি করেন?
আপনি যদি মিথ্যে করে বলেন মতিঝিলের আলিকো অফিসে, মিথ্যে কথা দিয়ে ল্যাঠা চুকিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু সৎ সেজে বলেন,
--"প্রথম পরিচয়ে চাকুরিস্থল জেনে কী করবেন? আমি যদি মিথ্যে করি বলে মতিঝিল আলিকো অফিস, এর চেয়ে না বলাটাই কী ভাল না?"
উনারদের মিথ্যে কথা বলার তুখোড় পারঙ্গমতা দেখে যদি নিজেও সে রাস্তা ধরেন, ধরা খাবার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। উৎকৃষ্ট মাপের মিথ্যেবাদী না হলে, সত্যবাদীতাই উৎকৃষ্ট পন্থা।(কৃতজ্ঞতা: রাসেল অষ্ট ডটু)
কথায় ব্যতিক্রম আর স্বরে নরম সুরের বিকল্প কিছু পেলে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া হবে, "আপনি কথা বলার ধরন জানেন না, আপনি পাগল, মানসিক হাসপাতালে পাঠানো দরকার, বাড়ি নিশ্চয় বরিশাল? পাবনায় গিয়ে ভর্তি হন।"
অথবা সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে পৃথিবীর জঘন্যতম মিথ্যাচার শুনিয়ে দিবে,
--"আমি শুধু একটা ভাল মনের মানুষ চাই, আর কিচ্ছু না।"
এভাবেই উনারা আসেন, একের পর এক কোন নিয়মের ব্যতিক্রম না করে, মাথা ভর্তি ঘেন্না আর সন্দেহের জঞ্জাল নিয়ে যোগাযোগ রাখবে।
শুরুতেই শপথ বাক্য শুনাবে,
--"জীবনে কারো কাছে মন বেচে দিইনি, দিবওনা।আমি ওরকম না।"
উনাদের কথার তালে তালে সায় দিতে হয়,
"জ্বী, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমিই তাহলে খারাপ মানুষ।"
তারপর উনাদের মনে সুখ দিতে ঝেড়ে ঝেড়ে বলি আমার পূর্বেকার বানোয়াট ঘৃণ্য সব লাম্পট্যের ইতিহাস।
"দেখুন না, কত খারাপ আমি! কী জঘন্য চরিত্র আমার, তাইনা?"
উনারা আনন্দের চোটে স্বভাবজাত হিস্টিয়ার মত খলখল করে হেসে উঠেন। উপহাসিত হবার কষ্টে চোখ-মুখ শক্ত হয়ে আসে, কিন্তু সেদিনের মত অব্যক্ত থাকে।
কিন্তু প্রচন্ড অপমানবোধ মাথায় রেখে যখন সুকৌশলে ঠান্ডাভাবে ঢুকে পড়তে হয় মনোজগতে। কী বোর্ড চেপে চেপে প্রতি শব্দে, বাক্যে সিডাকসিনের তীব্র নেশা ধরা বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়, খুব ধীরে, নির্বিকারভাবে। উনারা আসেন লাঞ্ছিত করে অনিবার্যভাবে চলে যাবার নিয়তে, তাই বিদায় বেলায় নেশা গ্রস্থ করে ছুড়ে ফেলতে একটু বিবেকে বাধেনা আমার।
কোন এক সকালে উঠে অদ্ভুত ভাষায় অর্থহীনভাবে প্রলাপ বকতে থাকে আকুলভাবে, উনারা কিছু একটা চান, কিন্তু বলতে পারেননা।
"উহু, আমি না অদ্ভুতুড়ে জীব, অসুস্থ লোক, চরিত্রহীন পশু, অসামাজিক দুর্মুখ! ভুলে গেলেন নাকি! আপনিই না বলতেন, ভাল মানুষ চান। কোন মানসিক বিপর্যয় হলনা তো আপনার , আরেকটিবার ভেবে দেখুন! রাতে ঘুমের সমস্যা হয়েছিল? লোডশেডিং না মশার উৎপাত!"
মোহাবিষ্টতার সংজ্ঞা বুঝিয়ে লাভ হয়না। নেশাগ্রস্থ জীব চাহিদার দন্ত-নখর দিয়ে খামচে ধরকে চায় ওপাশের মানুষটিকে।
"আপনি যখন, যেভাবে, যেমন চাইবেন, সেভাবেই হবে...."
বাড়িয়ে দেয়া হাতের আঙ্গুলের নখের নেইল পলিশ তখন মানুষের বুক খামচানো রক্ত মনে হয়, লিপস্টিক হয়ে যায় নরমাংস কামড়ে খাওয়া রক্তাক্ত কোন মুখ।
আমি ভীষণ ক্লান্তি ভরে হাই দিয়ে উঠি।
"আপনি না শপথ পাঠ করেছিলেন প্রথম দিনে নিজের আত্মাকে স্বেচ্ছায় কোথাও জড়াবেন না, কখনও জড়াননি বলে দম্ভভরে আমার 'অন্ধকার-অপ্রিয় সত্য গল্প' শুনে আমায় ঘিন্না করা শুরু করেছিলেন।"
শোক, রাগ, স্বভাবজাত কুৎসিত অভিমান নিয়ে হাউমাউ করে ওঠে, জীবনের ইচ্ছা, চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাবার কষ্টে। অভিশাপ দেয়।
"আজ আমার মত আপনারও এমন পরিণতি হবে, আমার কোন দিন হয়নি, হবার কথা ছিলনা। আপনারও এমন দশা হবে, বুঝবেন তখন কেমন লাগে, আপনাকে বুঝতেই হবে। "
বিরক্ত হয়ে কী বোর্ড চেপে দু'জনের মাঝে অন্ততকালের জন্য উচু প্রাচীর তুলে দিই। মানুষের সম্মানবোধ, অর্থ-সময় কষ্ট, অসহায়ত্ব, কঠিন বাস্তবতাকে আমলে না এনে যারা নিজেদের একান্ত স্বার্থ, পছন্দ, প্রয়োজন ও আবদারে বুঁদ থাকেন, তাদেরকে মানসিকভাবে হারানোর আর শূণ্যতার কষ্ট দিয়ে শাস্তি দিলে কোন পাপ হয়না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

