somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ রকম আরও ১০/১২ টা নতুন চাঁদের আনন্দ নির্বাসনে গেলেও কিছু যায় আসেনা

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৯:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেরোজাদাররা সেই প্রথম রোজা থেকে উশখুশ করতে থাকে, রোজাদারদের স্মরণ করিয়ে দেয় রমজানের স্পিরিট। উপবাস ভঙ্গের কালে বিশাল গ্রাস আর ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে ক্লান্ত হয়ে বসা রোজাদারের টুটি চেপে ধরে, কম খা, ভাল করে সংযম কর, নইলে কীসের রমজানের স্পিরিট। দিনের বেলায় আসে পাশে মানুষ খাচ্ছেনা দেখে নিজেদের প্রকাশ্যে খাওয়ার মাঝে একটা অস্বস্তি, আতঙ্ক কাজ করে।চাদর ঢাকা হোটেল গুলোর দিকে চরম বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকায়। চাদরের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে খেতে নিজেকে একটা বিশেষ মতপন্থার মানুষের কাছে জিম্মি, অসহায়, পরাধীন বলে বোধ করতে থাকে। স্বাধীনভাবে খাবারের অধিকার হরণ!তারপর, অপরাহ্নেই শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে খাবারে রাজসিক আয়োজন, বেচা-বিক্রি। সদ্য ডাল-ভাত খেয়ে ওঠা বেরোজাদারদের বিরক্তি চরমে ওঠে। সারাদিন নিজেরা খেলেনা, আমাদেরও শান্তি করে খেতে দিলেনা, এখন আবার অবেলায় কেন ভোজন বিলাস, বাপু?


সারা বছর খেতে না পাওয়া মানুষটিও এ মাসে দু'বেলা অনাহারে থেকে খাবারের খরচ বাচিয়ে একবেলা সন্ধ্যায় কিছু ভাল-মন্দ খেতে চায়। সারাদিন অভুক্ত থেকে খাবারের রুচি হারিয়ে ফেলা মানুষটি রুচি করতে কিছু বাহারি সরবত-জিলাপী কিনে, নিত্যকার ডাল-ভাতের বাইরে কিছু সাটাতে যায়। সাথে সাথে বেরোজাদারের মাঝে রমজানে সংযমের স্পিরিট চাড়া দিয়ে ওঠে। বাজারে মৌসুমী খাবারের বৈচিত্র্য বা বাঙালির ভোজন রসিকতার প্রথাগত শৈল্পিক মূল্যায়ণের বদলে ধর্মিকদের সংযমের নামে ভন্ডামি, স্ববিরোধীতা নিয়ে শোরগোল করে। সারাদিন খালি পেটে ছিলি, বাকিটা রাত আধা পেটা থাক, এই না বলে আসল সংযম!

বিশ্বাসীরা তাই গালি খাবার আতঙ্কে থাকে। সংযম শেষ হলেই নতুন চাঁদের দিনটির জন্য কেন এত দামি পোষাক, কেনই বা নতুন পোষাক, কেনই বা এত ভাল খাবার, এত খরচ, এত বিড়ম্বনা একটা ধর্ম উৎসবকে নিয়ে! সুশীলের দল ধর্মীয় উৎসবকে সামাজিকতার রঙ দিয়ে একটা মধ্যস্থতা করতে চায়। তারপরেও মানুষেরই অভিযোগ থাকে, কেন ধর্ম ভিত্তিক উৎসবে এত ছুটি-ছাটা, অপচয়, বিড়ম্বনা! তিনদিনের সরকারি ছুটি তো চরম বাড়াবাড়ি, এটাকে একদিন করে বাকিটা অনৈচ্ছিক ছুটি হিসেবে দেয়া হোক।

কিংবা গরু-খাসির পরিবর্তে যদি মুরগি কুরবানির চল হত, এত লোক পশু হত্যার নামে বর্বরতা অভিযোগ তুলতোনা। কিংবা জলের জ্যন্ত মাছ ধরে মাছ হত্যা করলেও কারো প্রাণ কাঁদেনা। যত বড় জন্তু বধ হয়, তত বেশি মায়া জেগে ওঠে আমাদের। যত বড় জন্তু, তত বেশি মায়া।মাছ, মুরগির গলা কাটা দেখে কারো মায়া উদ্রেক হয়না, কারণ তা জন্তু হিসেবে নিম্ন শ্রেণীর।আস্ত মুরগি সাটাবো, কিন্তু দুর্বল চিত্তের পুরুষ হবার কারণে মুরগির গলা কাটা দেখতে পারবোনা । বিয়েতে বর-কনের সামনে ফুল, ফল-মূল দিয়ে সাজানো আস্ত খাসিটি কিন্তু এমনি রক্তাক্ত জবাইয়ের পরিণতিতে আজ এতটা সুস্বাদু, সুন্দর, মুখোরচক। মসলা মাখানো নির্বাক খাসির মাংস মূর্তি দেখে হাস্যোজ্জ্বল মানুষ, বর-কনে কারো মাঝে দয়া মায়া এমনকি খাসিটির পূর্বতন জীবিত দশার কথা স্মরণ হয়না।

কিংবা বাচ্চা মুরগি বধ! বাচ্চা মুরগি বোধ করি তার বাবা মোরগের চেয়ে কম জান্তব, কম পাপী। সঙ্গীর টাকায় ফূর্তি করে বেড়ানো তরুণীটি চাইনিজ খাবারের রেস্তোরায় বাচ্চা মুরগির স্যুপ গিলে অবলীলায়। তার এই সুখানিভূতিকর মুহূর্তগুলো তুলতুলে বাচ্চা মুরগির গলা ছিড়ে হত্যা করার সুফল-সফল পরিণতি, সে উপলব্ধি তো থাকেনা। সারা বছরের মাংশাসী মানুষ, ধর্মের নামে পশু হত্যা আর ভক্ষণের নাম শুনলে আৎকে ওঠে। আমার পাশের বাসার তরুণী তাই খাসি খেতে পারেনা। শুধু গরু খায়। মায়াবী চোখের ছোট প্রাণী খাসির হত্যা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। আমার কোন এক তুমুল মাংস খেকো সহপাঠী আকস্মাৎ জীব হত্যার মহাপাপ বোধ করে, স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে নিরামিশভোজী হয়ে ওঠে।

বাঘ-সিংহের জ্যান্ত হরিণ, বাইসন এমনকি মানুষ ছিড়ে, খুবলে খাবার দৃশ্য সে তরুণী দেখেনি। পশুকূলের বর্বরভাবে খাদ্য গ্রহণের অধিকার নিয়ে কেউ বেদনাহত নয়। কিন্তু আমি মানুষ হয়ে মানুষের ধর্ম মানি পশু খাবার জন্য, আমার ক্ষুধার্ত দাঁত-পেট চার টুকরো মাংসের অস্থির হয়ে ওঠে। তরুণী মাংস খাবেনা, রেধেও দিবেনা আমায়। আমি তাই রমজানের দুপুরে পর্দার আড়ালে স্বাদ করে, ঢেকুর তুলে গো মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে আসি। পর্দার বাইরে এসেই নিপাট ভদ্রলোকের মত রমজানের স্পিরিট, সংযমের বাণী ছাড়ি, ধর্মের নামে ব্যাপক, প্রকাশ্য গো হত্যার বিরুদ্ধে বর্বরতার অভিযোগ আনি।

এতদিন দিনের বেলায় অভুক্ত থাকতাম। হঠাৎ একদিন সূর্যের মুখ দেখে দুধ-কর্ন ফ্লেক্স মাখিয়ে খেয়ে কফি হাতে ভিনদেশের রাস্তায় নেমে পড়ি।এক পাশ ছিড়ে যাওয়া ভুসভুসে রঙ ওঠা জিনস দেখে কারো অরুচি হবেনা, এই দিনে, এই রাস্তায়।ঝুলে পড়া বহু পুরনো টি শার্ট দেখে কেউ বলবেনা, এমন দিনে এ কী পোষাক তোমার!

তারপরেও অনিচ্ছাবশত ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবে, আজ সেই বিশেষ দিন। কতগুলো ভোগবাদী ধর্মান্ধ মানুষ অহেতু নিজেদের এক মাস ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে এই নতুন চাঁদের দিনে নাকি অসংযম চর্চা করে। ভর পেটা খেয়ে নাকি আনন্দ উৎসব করে। নিউমার্কেটের চারপাশে ঠাসা মানুষের ভিড়, কিনবা চানরাতের আলোকিত শহর-জনপদ কোনটাই আমার স্মৃতিতে ভিড়তে দিইনা।

মানসিকভাবে আজ ছুটি ভেবে নিজেকে বিভ্রান্তও করতে চাইনা।সংযম করেছি বলে মাস শেষে নতুন চাঁদের দিনে আনন্দ করা বাধ্যতামূলক এমন তো কোন ধর্মবাণী থাকতে পারেনা। বছরের পর বছর অপ্রাপ্তির অভ্যেস গুলো আমাকে তাই নতুন করে কোন কিছু হারাবার কোন কষ্ট আক্ষেপ দেয়না। তাই, বছরের সেই একটি কথিত নতুন চাঁদের আনন্দের দিনেও পেটের দায়ে পা চালিয়ে খুব দ্রুত কর্মস্থলে হাজিরা দিই।

ভিনদেশে নির্বাসনে তাই ছুটির দিনেও কাজ, ভিক্ষাবৃত্তি থেমে নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৯:৫২
১৯টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×