সারা বছর খেতে না পাওয়া মানুষটিও এ মাসে দু'বেলা অনাহারে থেকে খাবারের খরচ বাচিয়ে একবেলা সন্ধ্যায় কিছু ভাল-মন্দ খেতে চায়। সারাদিন অভুক্ত থেকে খাবারের রুচি হারিয়ে ফেলা মানুষটি রুচি করতে কিছু বাহারি সরবত-জিলাপী কিনে, নিত্যকার ডাল-ভাতের বাইরে কিছু সাটাতে যায়। সাথে সাথে বেরোজাদারের মাঝে রমজানে সংযমের স্পিরিট চাড়া দিয়ে ওঠে। বাজারে মৌসুমী খাবারের বৈচিত্র্য বা বাঙালির ভোজন রসিকতার প্রথাগত শৈল্পিক মূল্যায়ণের বদলে ধর্মিকদের সংযমের নামে ভন্ডামি, স্ববিরোধীতা নিয়ে শোরগোল করে। সারাদিন খালি পেটে ছিলি, বাকিটা রাত আধা পেটা থাক, এই না বলে আসল সংযম!
বিশ্বাসীরা তাই গালি খাবার আতঙ্কে থাকে। সংযম শেষ হলেই নতুন চাঁদের দিনটির জন্য কেন এত দামি পোষাক, কেনই বা নতুন পোষাক, কেনই বা এত ভাল খাবার, এত খরচ, এত বিড়ম্বনা একটা ধর্ম উৎসবকে নিয়ে! সুশীলের দল ধর্মীয় উৎসবকে সামাজিকতার রঙ দিয়ে একটা মধ্যস্থতা করতে চায়। তারপরেও মানুষেরই অভিযোগ থাকে, কেন ধর্ম ভিত্তিক উৎসবে এত ছুটি-ছাটা, অপচয়, বিড়ম্বনা! তিনদিনের সরকারি ছুটি তো চরম বাড়াবাড়ি, এটাকে একদিন করে বাকিটা অনৈচ্ছিক ছুটি হিসেবে দেয়া হোক।
কিংবা গরু-খাসির পরিবর্তে যদি মুরগি কুরবানির চল হত, এত লোক পশু হত্যার নামে বর্বরতা অভিযোগ তুলতোনা। কিংবা জলের জ্যন্ত মাছ ধরে মাছ হত্যা করলেও কারো প্রাণ কাঁদেনা। যত বড় জন্তু বধ হয়, তত বেশি মায়া জেগে ওঠে আমাদের। যত বড় জন্তু, তত বেশি মায়া।মাছ, মুরগির গলা কাটা দেখে কারো মায়া উদ্রেক হয়না, কারণ তা জন্তু হিসেবে নিম্ন শ্রেণীর।আস্ত মুরগি সাটাবো, কিন্তু দুর্বল চিত্তের পুরুষ হবার কারণে মুরগির গলা কাটা দেখতে পারবোনা । বিয়েতে বর-কনের সামনে ফুল, ফল-মূল দিয়ে সাজানো আস্ত খাসিটি কিন্তু এমনি রক্তাক্ত জবাইয়ের পরিণতিতে আজ এতটা সুস্বাদু, সুন্দর, মুখোরচক। মসলা মাখানো নির্বাক খাসির মাংস মূর্তি দেখে হাস্যোজ্জ্বল মানুষ, বর-কনে কারো মাঝে দয়া মায়া এমনকি খাসিটির পূর্বতন জীবিত দশার কথা স্মরণ হয়না।
কিংবা বাচ্চা মুরগি বধ! বাচ্চা মুরগি বোধ করি তার বাবা মোরগের চেয়ে কম জান্তব, কম পাপী। সঙ্গীর টাকায় ফূর্তি করে বেড়ানো তরুণীটি চাইনিজ খাবারের রেস্তোরায় বাচ্চা মুরগির স্যুপ গিলে অবলীলায়। তার এই সুখানিভূতিকর মুহূর্তগুলো তুলতুলে বাচ্চা মুরগির গলা ছিড়ে হত্যা করার সুফল-সফল পরিণতি, সে উপলব্ধি তো থাকেনা। সারা বছরের মাংশাসী মানুষ, ধর্মের নামে পশু হত্যা আর ভক্ষণের নাম শুনলে আৎকে ওঠে। আমার পাশের বাসার তরুণী তাই খাসি খেতে পারেনা। শুধু গরু খায়। মায়াবী চোখের ছোট প্রাণী খাসির হত্যা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা। আমার কোন এক তুমুল মাংস খেকো সহপাঠী আকস্মাৎ জীব হত্যার মহাপাপ বোধ করে, স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে নিরামিশভোজী হয়ে ওঠে।
বাঘ-সিংহের জ্যান্ত হরিণ, বাইসন এমনকি মানুষ ছিড়ে, খুবলে খাবার দৃশ্য সে তরুণী দেখেনি। পশুকূলের বর্বরভাবে খাদ্য গ্রহণের অধিকার নিয়ে কেউ বেদনাহত নয়। কিন্তু আমি মানুষ হয়ে মানুষের ধর্ম মানি পশু খাবার জন্য, আমার ক্ষুধার্ত দাঁত-পেট চার টুকরো মাংসের অস্থির হয়ে ওঠে। তরুণী মাংস খাবেনা, রেধেও দিবেনা আমায়। আমি তাই রমজানের দুপুরে পর্দার আড়ালে স্বাদ করে, ঢেকুর তুলে গো মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে আসি। পর্দার বাইরে এসেই নিপাট ভদ্রলোকের মত রমজানের স্পিরিট, সংযমের বাণী ছাড়ি, ধর্মের নামে ব্যাপক, প্রকাশ্য গো হত্যার বিরুদ্ধে বর্বরতার অভিযোগ আনি।
এতদিন দিনের বেলায় অভুক্ত থাকতাম। হঠাৎ একদিন সূর্যের মুখ দেখে দুধ-কর্ন ফ্লেক্স মাখিয়ে খেয়ে কফি হাতে ভিনদেশের রাস্তায় নেমে পড়ি।এক পাশ ছিড়ে যাওয়া ভুসভুসে রঙ ওঠা জিনস দেখে কারো অরুচি হবেনা, এই দিনে, এই রাস্তায়।ঝুলে পড়া বহু পুরনো টি শার্ট দেখে কেউ বলবেনা, এমন দিনে এ কী পোষাক তোমার!
তারপরেও অনিচ্ছাবশত ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাইবে, আজ সেই বিশেষ দিন। কতগুলো ভোগবাদী ধর্মান্ধ মানুষ অহেতু নিজেদের এক মাস ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে এই নতুন চাঁদের দিনে নাকি অসংযম চর্চা করে। ভর পেটা খেয়ে নাকি আনন্দ উৎসব করে। নিউমার্কেটের চারপাশে ঠাসা মানুষের ভিড়, কিনবা চানরাতের আলোকিত শহর-জনপদ কোনটাই আমার স্মৃতিতে ভিড়তে দিইনা।
মানসিকভাবে আজ ছুটি ভেবে নিজেকে বিভ্রান্তও করতে চাইনা।সংযম করেছি বলে মাস শেষে নতুন চাঁদের দিনে আনন্দ করা বাধ্যতামূলক এমন তো কোন ধর্মবাণী থাকতে পারেনা। বছরের পর বছর অপ্রাপ্তির অভ্যেস গুলো আমাকে তাই নতুন করে কোন কিছু হারাবার কোন কষ্ট আক্ষেপ দেয়না। তাই, বছরের সেই একটি কথিত নতুন চাঁদের আনন্দের দিনেও পেটের দায়ে পা চালিয়ে খুব দ্রুত কর্মস্থলে হাজিরা দিই।
ভিনদেশে নির্বাসনে তাই ছুটির দিনেও কাজ, ভিক্ষাবৃত্তি থেমে নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

