somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রবাসী ভুখা বাঙালির চোখে ডিজুসওয়ালাদের আত্ম সম্মানবোধ

১১ ই ডিসেম্বর, ২০১০ সকাল ৮:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিনোদনের ব্যাপারে নিজের একটা গোঁড়ামি আছে। ভিনদেশি ভাষার ছবি "সাবটাইটেল" সহকারে দেখাটা যন্ত্রণার। "বিনোদনের রস পাওয়ার" চেষ্টা বনাম "ভাষা বুঝবার" চেষ্টার রশি টানাটানিতে সুস্থির থাকা সম্ভব হয়না।তাই বলে শুধু মাতৃভাষায় বিনোদন বলে বাংলা নাটক সিনেমায় বুঁদ থেকে নিজের বিনোদন রুচির উপর আরেক দফা কূপমন্ডূক অত্যাচার করা হয়।

ইংরেজি ছবি। ভাষাটা ভাল ভাবে রপ্ত হয়ে গেলেই "সাবটাইটেলের" জন্য দৌড় ঝাপ লাগেনা, কাহিনী গল্পের মর্ম মাথায় গেথে যায়। বিনোদন বা কাহিনীর একটা আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি মাথায় আসে। ইংরেজি শিখে কী লাভ, কত পয়সার জনশক্তি রপ্তানি হবে, দেশের ভাবমূর্তি ইংরেজি দিয়ে কত বাড়বে, কমবে ইত্যকার বিষয়াদি নিয়ে ভাবনা নেই বা বিরল। কঠিন ভাষা, ছেলে-মেয়েরা এখনও পাবলিক পরীক্ষাগূলোতে ফেল করে, ইংরেজির শিক্ষক সংকট, ইংরেজিতে মন্তব্য করলে সেটিকে রূঢ়তা ধরা হয়, পাছে লোকে গালাগালও করে বসে।

বাংলায় পর্যাপ্ত বিনোদনের অভাব হয়তোবা হিন্দি বিনোদনের প্রসার, প্রচারের কারণ। মধ্যবিত্তের ঘরে ইংরেজিতে ফেল করা মেয়েটিও কৃত্রিম উপগ্রহের মারফতে হিন্দি সিরিয়াল দেখে চোস্ত হিন্দি বলে, বুঝে, পারে। বাংলার কাছাকাছি ভাষা, রপ্ত করা সহজ, অন্তত বিনোদনের খাতিরে রপ্ত করতে না পারলে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত সমাজেই জাত চলে যাবার শংকা থাকে। তাই, বাংলাদেশে থাকবেন, কিন্তু হিন্দি বিনোদনের স্বাদ নিবেন না, এটা প্রায় অসম্ভব। হিন্দি ভাষাটার মাঝে কেন জানি বিটকেলে রোমান্সের ব্যাপার আছে। ভাষাটা যোগাযোগের প্রয়োজনীয় মাধ্যম ছাড়াই শুধু রোমান্সধর্মী বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই ধরা হয়।

শুধু বিনোদনের তাগিদে নতুন ভাষা শেখায় আমার ঘোর আপত্তি, কারণ নতুন ভাষা শেখা যন্ত্রণার। বিশেষত, দেশের মাটিতে থেকে ইংরেজিটা ভাল ভাবে রপ্ত করার কোন সুস্থ মাধ্যম পাইনি। এতে করে বিদেশে (অ-বাঙালি পরিমন্ডলে), দেশের বে-ইজ্জতি হয়, কিনা সেটা নিয়েও মাথা নষ্ট হয়না কারো। আমার দেশের লোকেরা যে শব্দগুলোকে ক্যারিয়ার (Career, কো'রিয়া'র), (Invitation, ইনভিটিশন) ইনভাইটেশন বলে মুখস্থ করে ঢেকুর তুলে আসছে, সেগুলোর ভুল ধরিয়ে দেবার মত আত্মসম্মানধারী ডিজুসওয়ালা নেই (তর্কের খাতিরে তারাই খাস ইংরেজি এবং হিন্দি জানা ভাষাবিদ দো'ভাষী, বাংলাদেশি প্রতিনিধি হিসেবে জনৈক ভারতীয় শিল্পীর মঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন) । এই দো'ভাষীরা আবার কাকতালীয়ভাবে কর্পোরেট ক্যারিয়ারের (হয়তোবা নিজেদের দাস বুঝাতে, শুদ্ধ করে Carrier উচ্চারণ করেন )
সাধনা, ভক্তি করেন।

আমি ভিন ভাষা শেখার কষ্টকর বিষয়গুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। বাংলা আর ইংরেজির মাঝে ভাষাগত দূরত্বের কারণ, বাংলা চর্চা করলে ইংরেজিতে দক্ষতাটা ক্ষয়ে যেতে থাকে, রপ্ত করাও কঠিন। তাই বাংলা গোছের নতুন হিন্দি ভাষা বিনোদনের তাগিদে শিখে নিজের সময় নষ্ট করিনি। অন্তত বাঙালি সুলভ 'ক্যারিয়ারের' কথা ভেবেও ইংরেজি শিখছি শৈশব থেকেই । কোন প্রকার হিন্দি বিনোদনের ধারের কাছে নেই, ছিলামনা। ভাষা ভিত্তিক এই গোঁড়ামি বা আত্মসম্মানবোধের কারণে বেশ কিছু বন্ধুকে দেখেছি "ভৌগলিক কারণে" হিন্দি ভাষা অনিবার্যভাবে বুঝতে ও বলতে পারার পরেও ভারতীয়দের সাথে ইংরেজিতেই কথা বলছেন। কোনভাবেই হিন্দি মুখে আনবেন না। এদের সংখ্যা নেহায়েৎ কম। বাকিরা আছেন ভারতীয়দের সাথে হিন্দি বলে, তাদের মাতৃভাষার প্রতি পরম শ্রদ্ধা দেখিয়ে (কিন্তু প্রকান্তরে নিজেদের শ্রাদ্ধ করে), আত্মসম্মান, ভাবমূর্তি উদ্ধারে ব্যতি ব্যস্ত।
জার্মান, ফরাসিরা ইংরেজি বুঝলেও, পারলেও অ-জার্মান, অ-ফরাসি ভাষাভাষীদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলারও শিষ্টাচার দেখাতে চায়না বলে শুনি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে।


জনৈক ভারতীয় শিল্পী, তাঁর জীবদ্দশায় একবার দয়া করে নিকটতম প্রতিবেশি বাংলাদেশে পদধূলি দেবার বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছেন। প্রায় ৪০ বছরের বুড়ো বাংলার মাটিতে তাকানোর সময় হয়নি প্রতিবেশির, টাকার বিনিময়ে, কর্পোরেট মর্জিতে আজ হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও ও ঠিক একই মাপের দয়া করেছিলেন।সুদূর আমেরিকার তথা বিশ্ব নেতা কত আগেই চলে এসেছিলেন, কিন্তু তিনদিক দিয়ে ঘিরা রাখা প্রতিবেশির সংস্কৃতি প্রতিনিধি গতকালই এলেন। আমাদের আত্ম সম্মানবোধ চাঙ্গা হল, সম্মানিত হলাম। ইংরেজিতে ফেল করা কেউকেটা সম্প্রদায়ের লোকজন সারা জীবনের অর্জিত হিন্দি ভাষা জ্ঞানের পবিত্রতার অনুভূতি জানাতে তেজ পাতা খরচ করে প্রতিবেশি শিল্পীর পদধূলি নিতে গেল।

ভারতের প্রতিবেশি বলেই আমাদের ভাষা হিন্দি হবে, বা হিন্দিতে বোধগম্যতা থাকতে হবে, দেখাতে হবে, এমন ভাবনা তেনারা করতেই পারেন। পাশাপাশি, আমরাও ভারতীয় বিনোদন ভালবাসি বুঝাতে হিন্দি ভাষায় দক্ষতার মহড়া, মরীয়া চেষ্টা করি।মহান শিল্পীকে শুধু কোটি কোটি টাকা দিয়ে পোষালোনা, মহান প্রতিবেশী শিল্পীর ইজ্জতের সাথে আবার কেউকেটাদের আত্ম সম্মানবোধের প্রশ্ন জড়িত। সাথে সমগ্র বাঙালি জাতির মর্যাদা। হতেই হবে। তারাই তো কর্পোরেট, ডিজুস, ক্ষুদ্র ঋণের দাদন ব্যবসা করে বিদেশে আমাদের জনপ্রতিনিধি। হিন্দি ভাষার জোশে বাংলাদেশের মত আন্তর্জাতিক পরিসরে "ইংরেজি"তে অনুষ্ঠান পরিচালনার নূন্যতম শিষ্টাচারটাও করতে দেয়া হলনা, সেই জনৈক ভারতীয় শিল্পীকে।

এতকাল ধরে প্রবাসের থেকে বহু দেশের মানুষ দেখলাম, মিশলাম। ভারতীয় সহকর্মীদের সংখ্যা উল্লেখ করার মত। তাদের প্রায় সবারই ধারণা, বাংলাদেশের মানুষ উর্দু ভাষী। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে খাটো করলেও বাংলা শব্দটাকে ধারণ করে যে দেশের নামকরণ, সে দেশের লোকজন মুসলিম হবার পাপে উর্দুতে কথা বলে এমন ধারণা অসংখ্য ভারতীর মাঝে বর্তমান। বাংলা তাদের মতে হিন্দু বাঙালির ভাষা, মুসলিমরা বাঙালি/বাংলা ভাষাভাষী হতে পারে, সেটা তাদের ভাবনার বাইরে। অসতর্ক হলেও ভাবনা আসতে পারে, ভারতীয়রা কি এখনও বাংলাদেশকে পাকি পন্থী বা পাকিস্তানেরই আরেকটা ছিল মহল মনে করে?

পশ্চিমের বড় বড় নাম করা দোকানে মেড ইন বাংলাদেশ লেখা কাপড়ে সয়লাব।তারপরেও বাংলাদেশের কাপড় পরা আমেরিকানটিও হয়তো কোনদিন বাংলাদেশের নাম শুনেনি। কিন্তু আমাদের ভাষা নিয়ে নিকটতম প্রতিবেশীদেরও এমন অজ্ঞতা ভীষণ শংকা জাগায়। আমাদের ইংরেজি ভাষার কান্ডারি প্রজন্ম, ডিজুস ওয়ালারা ভারতের অজপাড়ায় গিয়ে রিক্সাওয়ালার সাথেও ইংরেজি বলে কুলিয়ে উঠতে পারেন না। ইংরেজি না পারার লজ্জা থেকে নিজেদের আত্ম সম্মান আর দেশের ইজ্জত বাচাতে, চোস্ত হিন্দিতে কথা বলা শুরু করেন। জানিয়ে দিয়ে আসেন, আপনারা বাঙালিদের না পুছলেও আমরা আপনাদের পুছে গর্ব অনুভব করি।

এরই মাঝে কোন এক অকালকুষ্মান্ড জনৈক ইলিয়াসের হিন্দি মূর্খতার মহাপাপে এবং ইংরেজিতে প্রবল দুর্বলতার কারণে, বিশাল জনসম্মুখে আতঙ্কিত হয়ে, তাৎক্ষণিক শব্দ চয়নের ত্রুটিতে, ভুলক্রমে "হেইট" শব্দটা উচ্চারণের গুরু অপরাধে, ডিজুস ওয়ালার কী বোর্ড চেপে বেচারা ইলিয়াসের মুন্ডুপাত করছে। আহ্, ইংরেজি মূর্খ হ, ভাল কথা। হিন্দি জানলে, পারলেও তো বাংলাদেশ এত বড় বেইজ্জতির হাত থেকে বেচে যেত। জাতীয় ইজ্জত, বিবেক যারা মহান প্রতিবেশীর কাছে বন্ধক রেখে এসেছেন, তাদের এমন বিদ্রোহী জোশ ওঠা ন্যায্য বৈকি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:১৬
১৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×