আজ তোমাকে একটি গল্প বলবো। জানি, গল্পটা তোমার ভালো লাগবে না। কারণ, তুমিও এই গল্পের একজন অন্যতম কুশীলব। তোমার প্রতিই অভিসাপের ফনা উদ্দ্যত হয়ে আছে। কারণ, গল্পের শেষ উপাখ্যান তোমার হস্তক্ষেপে চুড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। ফলে এক সময় ট্রয় নগরীর চেয়েও ভঙ্গুর দশায় গল্পের শেষ পরিণতি সবাই প্রত্যক্ষ এবং উপভোগ করেছে!
যাকে নিয়ে গল্পের গোড়াপত্তন তাকে তুমি কখনো দেখনি। লোক মুখে শুনেছ তার কথা। কেউ তাকে ভালো বলে, আবার কেউ কেউ তাকে মেনে নিতে পারে না। এই বিভাজনটা আদর্শিক কারণে। যাকে নিয়ে সমাপ্তী। তাকে তুমি চিন। তার সর্ম্পকে আমার চেয়েও তুমি ভালোই বলতে পারবে।
শুরুটা ছিল ঠিক এভাবে।
জন্মের দীর্ঘদিন পর একটি ছেলে প্রথম তার বাবাকে দেখতে পায়। একদিন সূর্য অস্ত যাওয়ার কিছু আগ মূহুর্তে লোক মুখে শুনতে পায় দীর্ঘ সফর শেষ করে তার বাবা ফিরে এসেছে। বাড়ীর আঙ্গিনা ফেরিয়ে সে তখন সত্যতা খুঁজে পেয়ে ছুটে যায়। বিদেশ ভ্রমন জনিত বিষাদ অবয়বে স্পষ্ট থাকলেও ছেলেটিকে বুকে আগলে নেয়। কিছু দিন পর তার বাবা আবারো কর্তব্য কর্মে ফিরে যায়। এভাবে তিন যুগ অতিক্রম করে শেষে একেবারে ফিরে আসে। বাবাকে পেয়ে ছেলেটি যত না খুঁশি তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। এটার কারণ, তার বাবা যে কোন উপায়ে ছেলের বিয়ে করাতে চায়। তারও একটি কারণ হলো, সংসারে মা ছাড়া আর কোন নারী সদস্য নেই। ফলে তার বিয়ের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী।
কিন্তু ছেলেটি কোন ভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে রাজী নয়। এদিকে সবাই পীড়াপীড়ি করতে থাকে। সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয় অনেকে। তবুও সে তার বিয়ে না করার সীদ্ধান্তের উপর অটল থাকে। কিছুতেই সেই অবস্থান পরিবর্তন করতে না পেরে বাবা একদিন তার প্রতি উত্তেজনাপূর্ণ দূর্ব্যবহার করে। ধীরে ধীরে তার প্রতি কঠোরতা অবলম্বন করেত থাকে। তার চলাচলের পথ ও সম্ভাবনাকে পর্যদস্তু করে। সেটার মাত্রা এক সময় সকল সহ্য ক্ষমতার মাত্রাকে অতিক্রম করে যায়। সইতে না পেরে ছেলেটি শেষ পর্যন্ত বাড়ী ছাড়ে।
নিজে থেকে নির্বাসনে যেতে সে সময়কার পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল। পাহাড়ের পাদ-দেশে সবুজের সোনালী প্রান্তরে সে বনবাস নেয়। পশু-পাখি, তরুলতাকে সেখানে তার কষ্টের কাহিনী ডেকে ডেকে শুনিয়েছে সে। সারা প্রকৃতি তন্ময় হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। সে চোখের পানি ফেলত। সময় সময় বিকট চিৎকার করে কাঁদতো। কান্নার আওয়াজ শুনে পাহাড়ের ওপাশ থেকে কে যেন প্রতিধ্বনি করে সুর মিলাতো। সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে তার ভেতরটা ভেঙ্গে আরো খানখান হয়ে যেত।
তুমি যে মেয়েটিকে চিন। রোজ রোজ দেখ। সেই মেয়েটি একদিন ছেলেটির সন্ধানে আসে। ছেলেটির কাছে বিণয়ে অনুনয় করে। যেন সে নির্বাসন ছেড়ে আবার লোকালয়ে ফিরে আসে। সে ছেলেটিকে তার স্বপ্নের কথা বলে। তার চুড়ান্ত প্রস্তুতি ও সীদ্ধান্তের কথা বলে। অতীতের ভুল শোধরানোর জন্য ক্ষমা এবং সুযোগ প্রার্থনা করে। ছেলেটি তোমার পরিচিত সেই মেয়েটির কথায় আবার লোকালয়ে ফিরে আসে। মেয়েটিকে পূণরায় কোন রকম প্রহসনের আশ্রয় না নেয়ার জন্য শপথ করায়।
এখানে তোমাকে একটা কথা জানানো খুব জরুরী। ছেলেটি এই মেয়েটির জন্যই পরিবার এবং লোকালয় ছাড়ে। মেয়েটিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো ছেলেটি। সেই ভালোবাসা শিখিয়ে ছিল মেয়েটি। সেটা সম্ভবত: তুমি জানতে না। মেয়েটির অসাধারণ ভঙ্গিমা ছেলেটি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। তার ভেতরে ছেলে পটানোর যাদু আছে বলে সবাই এক বাক্যে বলত। সে কথায় ছেলেটি শুধু হাসতো আর মাঝে মাঝে ঈর্ষাকাতর হয়ে উঠতো। কারণ, এমন স্বভাব তার পচন্দ নয়। মেয়েটি সে কথাটা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য শত শত বার শপথ করত। দূরন্তপনা স্বভাব তাকে এ ব্যাপারে একটু বেশিই উন্মাদনা এনে দিত। ছেলেটি শাসন করত, কিন্তু ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করার পক্ষে যায়নি কখনো।
সম্পর্কের মাঝখানে নানান রকম টানাপোড়েন বিরাজ করলেও এক জনের প্রতি আরেক জনের ভালোবাসার অনুভূতি ছিল অপ্রতিরোধ্য। স্বপ্নের বাসর সাজিয়ে তারা বহুবার পূর্ণিমা রাত যাপন করেছে। সে কথা তুমি জানতে না। এরমাঝে সন্তানের স্বপ্নও দেখে ফেলেছিল তারা। সেটাও তোমার অজানা। এক পর্যায়ে যখন তারা বিয়ে পর্যন্ত চিন্তা করতে শুরু করে তখন বাঁধার দেয়াল গুলো একে একে দৃশ্যত: জেগে উঠতে থাকে।
বিয়ের গুঞ্জনে দু'জনের মাঝখানে একদল প্রতিপক্ষ এসে এক জায়গায় জড়ো হয়। দু'জনকে টলাতে চেষ্টা করে নানা ভাবে। ব্যক্তিগত ভাবে সেখানে তারা সফলতা না পাওয়ায় পারিবারিক আদলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এক সময় সেখানেও ব্যর্থ হয়ে তারা এ সম্পর্ককে ব্যর্থ করার জন্য অন্য রকম কুট-কৌশল আঁটতে শুরু করে। ছেলেটিকে আঘাত করে কোন ফল না হওয়ায় চুড়ান্ত ভাবে মেয়েটিকে টার্গেট করে। তাকে মানসিক ভাবে আক্রান্ত করে। তার দূর্বল অনুভূতিকে বিভ্রান্ত করতে এক সময় সমর্থ হয় তারা। ফলে মেয়েটি যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই পূণরায় ফিরে গেল।
তারপর যা ঘটেছিল তার সবই তোমার জানা। তৃতীয় জন থেকে হঠাৎ করে পক্ষ-প্রতিপক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে। অনাহুত সেই তুমিই হয়ে দাঁড়ালে ছেলেটির শক্ত প্রতিপক্ষ। আর তাতেই ছেলেটি তোমাকে ভাবতে শুরু করে রাস্তার উর্দিহীন কোন এক অবন্তিকা হিসেবে। যারা নাচতে জানে, নাচাতে জানে। যাদের হারানোর কিছু থাকে না। অবলীলায় যারা লজ্জাকে জয় করে সহবাসে অভ্যস্থ।
মেয়েটিকে যারা মানসিক ভাবে আক্রমন করেছিল তাদের অন্যতম একজন হলে তুমি। মেয়েটির পরিবারের একজন তোমার খুব আপন। তার কথায় সায় দিতে গিয়ে তুমি মূলত: মেয়েটিকে শেষ পর্যন্ত পাথর বানিয়ে ক্ষ্যান্ত হলে। এতে সে পুরোপুরি ভুলেই গেল ছেলেটির কথা। অনেক দূরে থেকে তুমি ছেলেটিকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলে। সফল হও নি। কিন্তু মেয়েটি আর শেষ রক্ষা করতে পারেনি নিজেকে। সে তোমার হাতেই সপে দিয়েছিল তার ভালোবাসা, মান-সম্মান, ব্যক্তিত্ব, সম্ভ্রম; সবকিছু।
ছেলেটি মেয়েটিকে তার জীবনে একনিষ্ঠ ভাবে কামনা করত। মেয়েটিকে বাদ দিয়ে কখনো চিন্তা করতে হবে, এ রকম সে ভাবেনি। ভেবে মেনে নিতে পারছে না যে, মেয়েটি তার জীবন থেকে সরে দাঁড়াবে। ফলে মেয়েটির প্রতি ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে মনের ভেতর অতিমাত্রিক দায়বদ্ধতা লালন করে যাচ্ছিল। তা অঙ্গুরে বিনষ্ট করে তুমি লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছ ছেলেটির জীবন। তুমি হয়ত জান না যে, ছেলেটি এখনো একই রকম দায়বদ্ধতা নিয়ে মেয়েটির পথ চেয়ে কাটাচ্ছে তার দিনরাত।
মেয়েটি যখন আবারো গতিপথ পাল্টালো তোমাদের নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপে। ছেলেটি তখন পাগলপ্রায়। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে যে ছোটাছুটি করতে থাকে দিনের পর দিন। পরাজয়ের গ্লানি তাকে আবারো বিধ্বস্থ করে। ভালোবাসা হারিয়ে সে হয়ে যায় নিরস্ত্র। জীবনের প্রতি ধীরে ধীরে তার সকল মোহ কাটতে থাকে। পাথরের মত জীবন যাপন করার আগে আরেক দফা সে সমাজ-সংসার থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাকে বের করে আনে। ছেলেটি এখন একটি পুরদস্তুর পাথরের মূর্তি। বসতে বললে বসে থাকে। দাঁড়াতে বললে আর হাঁটার সাহস করে না। এখনো যদি কেউ বলে- 'বিয়ে কর। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।' ছেলেটির চোখের কোণে তখন পানি জমতে দেখা যায়। বুক ফুলিয়ে নি:শ্বাস নিতে গিয়ে গোঙ্গাতে দেখা যায় তাকে। এখন তার মানুষ্য কণ্ঠস্বরটা হারিয়ে গেছে।
ছেলেটির সাজানো বাগানে তুমি বিষ ঢেলে দিয়েছ। অন্যায় হস্তক্ষেপে সম্পর্কের মাঝখানে ইতি টেনে দিয়েছ। আমি যখন জানতে পারলাম তখন আমার আকৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলেরা আক্রান্ত বিকারগ্রস্থ রোগীর মত। আর বলেছি, তুমি শুধু ভুল করোনি, পাপও করেছ। সেটা যখন তুমি উপলব্দি করবে, তখন হয়ত আর কিছুই অক্ষত বা অবশিষ্ট থাকবে না। যখন স্বপ্নের ঘোরে দেখতে পাবে ছেলেটি অসহ্য মরণ যন্ত্রণায় ডানা ভাঙ্গা পাখির মত আহাজারি করছে। তখন হয়ত তোমার ঘুম ভাঙ্গবে। আবছায়া দৃষ্টিসীমায় দেখতে পাবে নির্বাক নিশ্চল ছেলেটির ভেতরে শুধু তোমার জন্য সহস্র অভিসাপ আর ঘৃণা। সেই অভিসাপে তুমি কোন বাঁকে পথ হারিয়ে ছত্রখান হবে, তা-ই কল্পনা করতে থাকবে। আমি ত্রস্ত সেই দু:সময়ের ভয়ে। কারণ, আমি তোমার একজন শুদ্ধতম শুভার্থী।
ছেলেটি যখন জানতে পারল, তুমিই তার চুড়ান্ত ক্ষতিটা করেছ। ছেলেটির প্রকৃতি প্রত্যক্ষ না করে অন্যের প্ররোচনায় পড়ে একটি জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছ। তখন সে তোমাকে খুন করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিল। তার রক্তের গতি বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত ছুটতে চেয়েছিল। কিন্তু, না। পরক্ষণে থমকে যায় সে। শেষে আসমানের দিকে তাকিয়ে সেই অভিযোগ কাকে যেন জমা দেয় ছেলেটি। আমি দেখেছি সেই দৃশ্য। দু'চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে কেঁদে স্থির হয়ে যায় পাথর মূর্তির মত। ছেলেটির নির্জীব দেহে সম্পর্কের প্রহেলিকায় জমা হাহাকারে দমের উঠানামা-ই এখন শুধু দৃশ্যমান। সেই বিচ্ছেদ বেদনা আর হাহাকারের কথা শুনে ফিরে আসার সময় ছেলেটির চোখের পাতায় অশ্রুজলে ভেসে থাকতে দেখেছি নিশংসতার ইতিহাস। সেই ইতিহাস বোধহয় আমার পক্ষে ভুলা সম্ভব হবে না।
ভালো থেকো। প্রিয়তমা বধু আমার।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৫:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



