এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, একই মালাইকাকে ন্যাস্ত দায়িত্বটি খুব একটা সুবিধার না। আজকালকার হিসেবে প্রতিদিন লাখদেড়েক মানুষের সামনে তো হাজিরা দিতেই হয়, তাছাড়া গোণাগুণতির বাইরে তো প্রাণীজগৎ আছেই আর যদি অণুজীবদের হিসেবে আনা হয় তবে তো কথাই নাই। সংখ্যার হিসেবে ক্যালকুলেটর জ্যাম। তবে জ্বীন আর ইনসান বাদে বাকিদের জন্য সেরকম সৈন্যসামন্ত নিয়ে তাকে হাজির হতে হয়না। এইরকম পড়েছিলাম, সমগ্র প্রাণীজগৎ তাঁর সামনে পরিবেশিত, একটি থালা থেকে খাদ্যের দানা বেছে নেয়ার মতই সহজে প্রাণ সংহারের দায়িত্ব পালনে তিনি সক্ষম। তবে বাকি থাকল বুদ্ধিমান প্রাণ যাদের রয়েছে ভালমন্দের সুযোগ। সৎকর্মশীল আর অপকর্মকারীদের জন্য মৃত্যুর বার্তা ও প্রক্রিয়ার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা একই রকম মনোমুকগ্ধকর ও ভয়াবহ। য়ারো একটি দিক থেকে আমার নিজের কাছে এই মুহূর্তটি খুবই ইন্টারেস্টিং, তা হল, এই নশ্বর খাঁচায় ঢোকার পর এইত প্রথমবারের মত প্রাণের সুযোগ হয় অদৃশ্য জগতের মুখোমুখি হওয়ার। ফলে সেই মুহূর্ত থেকেই সমস্ত বাস্তবতার স্কেল হয়ে যায় পারলৌকিক। কিন্তু পালাবদলের প্রথম ধাক্কাটি হবে দীর্ঘস্থায়ী।
যেকথা বলছিলাম, স্বাভাবিক কৌতুহল হিসেবেই প্রশ্ন ছিল মনের ভেতরে, একই মালাইকা কিভাবে একই সময়ে বহু স্থানে উপস্থিত থাকেন, আর প্রতিজন মানুষের সাথে তার সমপর্যায়ের ব্যাবহার করেন। সহজ জবাব হল, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যখন কাউকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয় তখন তা পালনের পূর্ণ ক্ষমতা সহই দেয়া হয়। তাই ক্যামনে কি? আল্লায় জানে। তবে আমার থিউরি ছিল, এই অল্প সময়ের ভিতরেই ন্যানো আর পিকো সেকেন্ডের ভেতর তিনি প্রতিটি প্রাণ সংহারের দায়িত্ব পালন করেন। অতএব মৃতের সংখ্যার হ্রাসবৃদ্ধিতে তাঁর কোন সমস্যা হয়না। দ্বিতীয় থিউরি ছিল, প্রতিজন মৃতের প্রেক্ষিতে মৃত্যুর প্রক্রিয়ার কালে, সময় নামক উপাদানটি স্থির হয়ে যায়। ফলে মৃত্যুর প্রক্রীয়ার যে দীর্ঘ বর্ণনা আছে, তাতে কোন রকমফের হয়না সেই ব্যাক্তি তার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ শান্তিময় বা অশান্তিময় মৃত্যু উপলব্ধি করে কিন্তু পৃথিবীর হিসেবে সময় বাড়েনা। কদিন আগে আরেকটা আইডিয়া মাথায় আসল, মনে হল পরিস্থিতির সাথে এই সম্ভাবনাটিও অসম্ভব না। তা হল, আমরা বর্তমানে ওয়েব বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে বিভিন্ন কর্মকান্ড করে থাকি, তার সহজ সূত্রটি হল, আমরা (অর্থাৎ ক্লায়েন্ট বা আমাদের কম্পিউটার) থেকে কোন একটি সার্ভিসের জন্য অনুরোধ করি। সেটি হতে পারে কোন ওয়েবপেজ ব্রাউজিং এর জন্য, বা মেইল চেকের জন্য পপ সার্ভিস বা ফাইল লেনদেনের জন্য এফটিপি। এই অনুরোধগুলো করে থাকি আমরা কোন সুনির্দিষ্ট সার্ভারকে। এই সার্ভার সাধারণত একটি বা একাধিক কম্পিউটার যারা একত্রে এক কম্পিউটারের মত কাজ করে। আর এই একই সার্ভারে কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে শুধু আপনি বা আমিই যুক্ত নই, বরঞ্চ অনেক সময়েই আরো শত বা হাজার বা লাখো কম্পিউটার সার্ভিস নিচ্ছে। আর বেশীরভাগ সময়েই একই সার্ভিসের জন্য প্রতিটি ভিন্ন ক্লায়েন্ট বা আবেদনকারীকে একই সার্ভার ভিন্নভাবে আচরণ করছে। উদাহরণ হিসেবে একই হটোমেইল বা ইয়াহুর সার্ভারে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢুকছে, তারা প্রত্যেকে শুধু নিজের সম্পর্কিত মেইলই পাচ্ছে, অন্যদেরটা না। তাই একই সার্ভার মাল্টিথ্রেডিং আর প্যারালাল প্রসেসিং এর মাধ্যমে একই সময় অসংখ্য গ্রাহকের চাহিদা মেটাচ্ছে। হতে পারে মৃত্যুর প্রতিনিধির সাথেও একই রকমের ঘটনা। আপনার জন্য তিনি হয়ত সুসজ্জিত সুবেশী ব্যাক্তির ন্যায় হাজির হয়ে চিরকল্যাণের সুসংবাদ নিয়ে আসবে, একই সময়ে পৃথিবীর অপরপ্রান্তে কোন অত্যাচারী তার চির শাস্তির প্রথম ধাক্কা মেটাবে।
ধ্যাত্তেরিকা, শুরু করেছিলাম কোরবানীর সিজন নিয়ে। আজকালকার উৎসর্গগুলো হয় প্রাণহীন আর রিক্ত। আমার নানার ঘটনা শুনেছিলাম। কৃষকের ছেলে হিসেবে অসম্ভব শখ ছিল গরু পালার। রেলওয়ের চাকুরীর সুবাদে প্রায়ই বাড়িতে যথেষ্ট যায়গা থাকত গরু রাখার। একবার এক গাভীর খুবই স্বাস্থ্যবান বাছুর জন্ম হয়। নিয়মিত পরিচর্যা আর খাবার পেয়ে অল্প দিনেই বেড়ে ওঠে। পরের বছর যখন কোরবানীর সময় আসে, বাড়ির গরুগুলোর মধ্যে সেটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর আর পুষ্ট। স্বাভাবিক চয়েস হিসেবে নানাকে সেবার নিজ হাতে বড় করা প্রিয় বাছুরটিকেই বেছে নিতে হয়। নিজ হাতে গলায় ছুরি চালানোর সময় অঝোর বর্ষণে কেঁদেছিলেন। আশা করি নিজ ভালবাসার এই আত্মত্যাগ পরম করুণাময়ের দরবারে কবুল হয়েছিল। যদি কখনো সুযোগ পাই তাহলে আমিও চেষ্টা করব হয়ত ঈদের আগেরদিন না কিনে নিজের প্রিয় পশুটিকে উপস্থাপন করার।
আমাদের মত পাপাচারী মানুষের অন্তরের কলুষতার যে দুটি প্রতিষেধকের তথা বলা হয়েছে, তার মাঝে মৃত্যুর স্বরণ একটি, কুরআনুল করীমের তিলাওয়াত অন্যটি। আমাদের সমগ্র মানবজাতির স্বচ্ছ ও পবিত্র আত্মা নিয়ে মৃত্যুর সৌভাগ্য হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

