পরিসংখ্যান বলছে দুই বছর এক মাস হয়ে গেছে। আর তার কিছু ওপরেই বলছে এটি দুইশত তম পোস্ট। বেশ অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি সংখ্যাগুলোর দিকে। একটু পাতা ওল্টালে মনে পড়ে প্রথম যখন ১০০তম লেখা পাবলিশ করা হয় তখন অদ্ভূত এক উত্তেজনা ছিল। তাই ব্লগের হিস্ট্রিতে প্রথমবারের মত একটু ফাজলামী নিজের থেকেই করেছিলাম।
আমাদের প্রতিদিনের দরকারী আর বেদরকারী সময় কেড়ে নেয়া এই ব্লগের প্ল্যাটফর্ম নিয়ে প্রায়ই ভাবি। আমরা প্রায় সবাইই জীবনের একাংশ ব্লগে বিনামূল্যে দান করে নিজেরাই তাতে তৃপ্ত হই। সামগ্রিক নেটবিশ্বে ব্লগের যে প্রচলন তার থেকে কিছুটা আলাদাভাবেই বাংলা ব্লগের স্ফুরণ হয়েছে গত তিন সাড়ে তিন বছরে। আধুনিক জনপ্রিয় ব্লগমাধ্যমগুলোর মধ্যে ব্লগস্পট আর ওয়ার্ডপ্রেসের নামই সবার সামনে আসে। কিন্তু এদুটো ছাড়াও অন্যান্য ব্লগিং প্ল্যাটফর্মগুলোও মূলত ব্যাক্তিগত ব্লগের সমাবেশ হিসেবেই গড়ে উঠেছে। সেই তুলনায় বাংলা ব্লগিং এর যেকটি প্ল্যাটফর্ম তার প্রায় সবগুলোই কমিউনিটি ব্লগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর এক অর্থে এই প্রবণতাটি মন্দও নয়। অর্থাৎ একাধিক ব্লগারে লেখা এক পাতায় ছাপা হচ্ছে আবার ব্লগারদের নিজস্ব পাতাও থাকছে। ফলে যারা নিজমনে লিখে যেতে চান তারা তাদের মত লিখছেন আর বাকিরা সবাই প্রথম পাতায় লিখছেন সবার সাথে আইডিয়া শেয়ারে জন্য।
আজকের আন্তর্জাতিক ব্লগচিত্র
আমাদের দেশের অবস্থা আর পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে ব্লগ প্ল্যাটফর্মের প্রতি আমার প্রচন্ড আশা ছিল যে আমাদের সময়ের সমাজ, সংস্কার আর নিয়মতান্ত্রিকতার যে কাঁচের দেয়ালগুলো আছে তার অনেকগুলোই ব্লগ শেয়ায়েরে মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা যাবে। এর মাঝে একটি হল দুই বাংলার মাঝে যে অনতিক্রম্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে গত অর্ধশতাব্দীতে তা দিনে দিনে শুধু উঁচুই হয়ে যাচ্ছে। বাংলার মান আর ব্যাবহার নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, কোলকাত্তাই বাংলাও বাংলা আর ঢাকাইয়া বাংলাও বাংলা। আর ভৌগলিক ব্যারিয়ারের কারণে কাছাকাছি অবস্থানে থাকলেও দিনকে দিন এই দুইয়ের মাঝের বিভেদ বেড়েই চলছে। আর দুই প্রজন্ম পরে আমি বা আপনি পশ্চিমবঙ্গে গেলে বা সেখান থেকে অন্যকেউ এলে আসলেই বিদেশ বিদেশ লাগবে। যদিও একই সূতিকাগারের দুই সন্তান এরা। আমার আশা ছিল ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম দুই বাংলার ব্লগারদের এক ছাদের তলে আনতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা বলে অন্যকিছু। নিতান্ত ভুদাই কিসিমের দুইচারজন পশ্চিমবঙ্গের ক্লেইম করে সামহোয়ারে লেখে আর বাংলাদেশী ব্লগার ওপারের কোন ব্লগ প্ল্যাটফর্মে লেখে বলে তেমন জানিনা। তা হলেও নগণ্যই হবে। ব্লগিং বিশ্বের এক ব্যার্থতাই বলব একে আমি।
একই ভাবে দায়িত্বপূর্ণ পেশাজীবিদের কর্মজীবনের চিত্র ব্লগের মাধ্যমে কিছুটা হলেও ফুটে উঠবে বলে আমি আশাবাদী ছিলাম। যদিও এখন পর্যন্ত এর তেমন কোন প্রয়োগ পাইনি কিন্তু আশা করি এর জন্য এখনো অনেক সময় আছে। তবে কিছু ব্যাতিক্রম আছে, যেমন সচলে যুবরাজ নিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক সদস্য লাইবেরিয়ার বাংলাদেশ বাহিনীর ওপরে নিয়মিত লিখে গেছেন। অনেক বাংলাদেশী বিদেশ থেকে তাদের ব্লগ লিখছেন নিয়মিত কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো ব্যাক্তিগত লেখাই উঠে এসেছে, পেশাজীবনের ছাপ তাতে কমই। মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই তাদের লেখায় টুকটাক ব্লগিয়ে থাকেন। হাসিনার পুত্র জয় বেশ কিছুদিন হয় ব্লগ লিখছেন। সেটি নিয়েও মাঝেমধ্যে বিতর্কের ঝড় ওঠে। ব্লগের মাধ্যমে পৃথিবীকে কাঁপানোর সবচেয়ে দর্শনীয় উদ্যোগ মনে হয়েছে মাহাথির মোহাম্মাদ। আজকের মালেশিয়াকে নিতান্ত পাড়াগাঁ থেকে আধুনিক রাষ্ট্রে রুপান্তরের সফল প্রণেতা হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য আর কয়েক দশক দেশ পরিচালনার পরে স্বেচ্ছায়ই ছেড়ে দিয়েছেন ক্ষমতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। তবে ক্ষমতায় থাকার পরে ক্ষমতাহীন হয়ে কাটানো এক বিচিত্র অনুভূতি। তাই নিয়মিত ব্লগ লেখেন প্রাক্তন এই রাষ্ট্রপতি। কখনো ইংরেজী আর কখনো মালে ভাষায় লেখা এই ব্লগ মালেশিয়ার প্রথম দশটি জনপ্রিয় ওয়েব ঠিকানার একটি হয়ে গেছে।
আমার ব্যাক্তিগত ব্লগিং এর দিকে ফিরে তাকালে নিজেই মাঝেমধ্য অবাক হতে হয়। তবে প্রথম বছর ব্লগীয় ইন্টারএকশনে যতটা নিয়মিত ছিলাম আজকাল অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে পড়েছি। নিজের ব্যাক্তিগত ব্লগেই সাধারণত কমেন্টের জবাব দেয়া হয় আর তার বাইরে তেমন কমেন্ট করা হয়না, যদিও মাঝেমধ্যে ব্লগ খুলে অন্যদের লেখা পড়ি। নিয়মিত ব্লগানোর ফলে লাভের মধ্যে মাথার চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে এক দুপাতায় নিয়ে আসার অভ্যাস মনে হয় আরেকটু সুশৃঙ্খল হয়েছে আর একই সাথে বাংলা বইয়ের সঙ্ঘবদ্ধ তথ্যমাধ্যম হিসেবে বইমেলার আজকের অবস্থানের পেছনেও ব্লগ কমিউনিটির অবদান অনস্বীকার্য।
ব্লগের নিয়মিত প্রসারের পরিমাপযোগ্য ফলাফল হিসেবে এবারের বইমেলার চেয়ে ভাল উদাহরণ মনে হয় নেই। ইতিমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক বই বের হয়েছে যাদের লেখকদের মূল পরিচয় হল তারা ব্লগার আর তাদের অনেকেই ব্লগিং এর প্ল্যাটফর্মে না এলে তাদের প্রথম বই কখনোই ছাপাখানার মুখ দেখত না। একই সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, কর্পোরেট ইররেসপনসিবিলিটি আর অসহায়ের সাহায্যে ব্লগাররা ঐক্যবদ্ধভাবে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন সেগুলো অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। একই সাথে এক্সট্রা হিসেবে আছে ফিরে দেখা ৭১ আর অপর বাস্তব সিরিজের মত বইগুলি।
এবারের বইমেলার সময় ব্লগের কর্তৃপক্ষ আমার বইমেলার তথ্যসূত্র ব্যাবহার করে যে চমৎকার টুলটি সবাইকে উপহার দিয়েছেন আর একই সাথে অপর বাস্তব-৩ এর অনলাইন রিসেলার হিসেবে বইমেলার লিঙ্ক ব্যাবহারের জন্য তাদের প্রতি অভিনন্দন। মনে হয় দুইশ পোস্ট পূর্তির জন্য এর চেয়ে চমৎকার সময় আর হোতনা।
তাই সকল ব্লগবাসীকে অভিনন্দন। আপনাদের ব্লগিং কার্যকরী, আনন্দদায়ক আর কল্যাণকর হোক। ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

