
প্রথম আলো: আপনি তো রিকশা চালাতেন। কীভাবে এই পথে আসলেন?
আমজাদ: বিসমিল্লাহির রাহমানের রাহিম। আমাকে আল্লাপাক রাব্বিল আলামিন এ জিনিস দান করছেন মানুষের সেবা করার জন্য। মনের আহাঙ্কা (আকাঙ্ক্ষা), ব্যথা বা যন্ত্রণা, কেউ কিডনি খারাপ, জন্টিস (জন্ডিস), রক্ত জন্টিস ইত্যাদি সব রোগের অনুভবটাই আল্লা আমাকে দিছে। জীবনে কোনো লেহাপড়া করি নাই। হয়তো আমার কোনো কাজের বেলায় যাইয়া দামি জিনিস পাইছি। আমার এখানে মনে করেন দুই হাজার, তিন হাজার, চার হাজার লোকও হয়। কিন্তু কারও কাছ থেকে এক টাকা খাওয়ার হুকুম হয় না। যদি কেউ আমাকে টাকা দিত, তাইলে মনে করেন দুই মাসে আমার ছাবড়া (ঘর) ভরে যেত টাকায়। মানে খাইয়া কূল পাইলাম না অইলে।’
প্রথম আলো: আপনি যে চিকিৎসা করছেন, তা কি সঠিক বলে মনে করেন?
আমজাদ: এটা যখন আল্লাপাক আমাকে দান করছেন, এর সত্য-মিথ্যা আমার জাস্টিবিট (জাস্টিফাই) করতে হবে। জাস্টিবিট করতে গিয়া দেখছি লোক ভালো হয়। তাইলে আমি বিশ্বাস করি, এটা ভালো।
আপনি বাচ্চাদের লাথি দিচ্ছেন, পেটে পাড়াচ্ছেন, এতে হাড়গোড় তো ভেঙে যেতে পারে। এটা কেন করছেন?
আমজাদ: হ, এটা ডাক্তারি মতে না। এটা আমাদের আধ্যাত্মিক জগতের। যেমন আপনারা একে একে তিনটা রোগী এভাবে দেখলেন। একটা রোগীর পেট খারাপ। এভাবে করার পর সে প্রসাব (প্রস্রাব) করল, প্রসাব করে রোগী হাসল-খেলল, মায়ের কোলে আরামে রইল। যতই আমি উনিকে লাথি দিতাছি, উনিকে টাঙাইয়া রাখছি, আমরা ভাবতাছি, মনে হয় নাকদা-মুকদা রক্ত আসতে পারে। আবার এমনও দেখা যায়, লাথি দিতাছি, মনে হয় কী যেন হইয়া যাইতাছেগা, মারাও যেতে পারে। কিন্তু আধ্যাত্মিক জীবনে বাচ্চায় আলাপও পায় নাই। একটা ব্যথা বা আঘাত সেটা উনি পাইতাছেন না। যদি উনি পাইতেন, আল্লারই যদি ইশারা না থাকত, তাইলে এই বাচ্চাটা এক মিনিট রাখার মতন ক্ষমতা নাই। নাকদা-মুকদা ডাইরেক (ডাইরেক্ট) রক্ত আইসা পড়ত। যেমন কিছুক্ষণ আগে একটা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াল ফিটার (ফিডার) দিয়া। উনির পেট তো স্বাভাবিক ভরা এখন। যদি বাচ্চাটা সাথে সাথে টাঙ্গাই, তাইলে দুধগুলা তো অবশ্যই নাকদা বাইরা আসব। এটা হয় নাই। তাইলে এটা আল্লা সত্যিকার, আল্লা সত্য, আল্লা আছে বলেই উনি সুস্থ আছেন।
আপনাকে এভাবে চিকিৎসা করাতে কে বলেছেন?
আমজাদ: আল্লা বলেন নাই, কিন্তু উনি আমাকে বাতান (ইশারা করেন), এভাবে এভাবে উনিকে (রোগী) কর। উনিকে আল্লায় ভালো করবে। উনির কথামতো আমি কাজ করি। যে বাচ্চা আসে, আল্লায় তিনিকে মাপ করবে।
প্যারালাইসড (অবশ) রোগীর হাত-পা টানাটানি করছেন। লোকে ব্যথা পাচ্ছে, কাঁদছে...
আমজাদ: আচ্ছা, তাইলে আমি বলতাছি। যেমন ডাক্তারে বলে স্টক (স্ট্রোক) করেন। স্টকের থেকে কিন্তু প্যারালাইস রোগী এক হাত, এক পা অবশ হই মুখে কথা বলতে পারে না। আমার দয়াল বলছেন, রকগুলা (রগগুলো) খিচ্চা থাকার পর উনি এই হাত আর লাড়তে পারে না, পাও সোজা কইরা হাঁটতে পারে না। তাইলে উনিকে কী করতে হয়? (দয়াল) বলছে, পা সোজা করে উনিকে সরষার তেল ডল। আমাকে একটাই ওষুধ দিছে, এটা যেকোনো কাজে ব্যবহার করো, সে কাজে সহায়তা হবে বা ইনশাল্লাহ ভালো হবে। ওই তেল দিয়া ডলতে হয়। হেই রকগুলো যখন থুবাইয়ে থাকে, তাই টান পড়ে। তাই সিধা করে ডলতে হয়। আবার কোনো কোনো রোগীকে মাঝায় (কোমরে) অথবা হাতে বা পায়ে লাত্থি দিতে হয়। জোর করে রকটারে সিধা করতে হয়।
বাচ্চাদের পেটের ওপর যে দাঁড়াচ্ছেন, বাচ্চার পাকস্থলী, পেটে কি কোনো সমস্যা হয়? আপনার যে ওজন, সেটা আপনে বাচ্চার ওপর দিচ্ছেন। বাচ্চা তো মারাও যেতে পারে। এই চিকিৎসা আপনি কোত্থেকে পেলেন?
আমজাদ: আমি যে ছোটো বাচ্চাকে পাড়া দিচ্ছি, এটা কিন্তু আল্লার ইশারা। আমি যখন কাজ করি, তখন আমি কানে শব্দ পাই। যেটা আপনি শুনতে পান না। আমাকে বলছে, এটা এভাবে কর। আমি যেভাবে জাতা দেই, পায়ে পাড়া দেই, উনি (দয়াল) ওজনটা যদি ওপরের দিকে না রাখত তাইলে এই বাচ্চা আমার মনে হয়, পায়খানার রাস্তা দিয়া নাড়িভুঁড়ি সব বারাইয়া গেলগা অইলে।
আল্লাহ আপনার ওজন ধরে রাখছেন?
আমজাদ: হালকাভাবে (আল্লাহ) তাকে (শিশু) দিচ্ছে। তাকে যদি পুরাপুরি ওজন দিত, তাইলে উনি তো টিকত না। যখন আপনে আমাকে দেখছেন, আমি বাচ্চার উপর পাড়া দিচ্ছি, ভাবতেছেন, আহা রে এটা জানি কী হইতাছে। কিন্তু সব উনির একটা ইশারা, আল্লারই খেলা। আমি হালকা হয়ে যাই। দেখতাছেন আমি কত ওজনের। কিন্তু কাজের বেলায় আমি উনি (শিশু) থেকেও ছোট, যাতে উনি আমার ওজনটা বইতে পারে।
আপনি একটা মহিলাকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলেন। তারপর গলায় কি ঢুকাচ্ছিলেন। উনি তো মানসিক রোগী।
আমজাদ: না, উনি পাগল না। উনির সাথে জিন আছে। জিনের আছর আছে। যেমন বাড়িতে থাকেন। যেমন কাজেকর্মে দেখা গেছে এটাই, যেটা আমাকে উনি (দয়াল) বাতায় গায়েবিভাবে। আমি তো আল্লাকে বিশ্বাস করি। আল্লা না হলে সেটা হইত না। যেমন গায়েবিভাবে আমার কানে শব্দ আসছে যে এটা কর। এটা কর।
আপনি মুখে লাঠি ঢুকিয়ে গোলাপজল খাওয়াচ্ছেন। কেন?
আমজাদ: গোলাপজলের পানি পবিত্র। সেটা মুখে দিলে উনির ভেতরে রক্তের সাথে যত বদ থাকে, সেটা পালাই যায়। যে জায়গায় লাঠির কাম লাঠি দিতে হয়, কারণ এদিক-ওদিক করে।
লাঠি দিয়ে মারছেন, পিটাচ্ছেন, এটা তো কোনো চিকিৎসা না?
আমজাদ: এটা আমার আধ্যাত্মিক। আমারে যেভাবে বলতাছে, আল্লাপাক ইশারা করতাছে, লাঠি দিয়ে বা অন্য কিছু দিয়ে পিটা।
কত দিন ধরে এ চিকিৎসা করছেন?
আমজাদ: আমি এটা করছি আজকে প্রায় দুই মাসের মতো। এক মাস আমার বাড়ির বাইরে ছিল চিকিৎসাটা। গোপন রাখছি।
গোপন রাখার কারণ কী?
আমজাদ: গোপন রাখার কারণ হলো, আমার বয়স তেমন হয় নাই। তা ছাড়া আমি আধ্যাত্মিক জীবনে চলতে গেলে হয়তো মনে করেন আমার এমনও হইতে পারে, যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে।
আপনি নামাজ পড়েন পাঁচ ওয়াক্ত?
আমজাদ: হ্যাঁ, আল্লার রহমত। আপনাদের দয়ায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। মানে আইনগুলা মেনে চলতে হয়। সময়তে স্ত্রীকেও দূরে রাখতে হয়। কারণ, আমি করতে পারমু কি পারমু না, চিন্তা ছিল। এভাবে করতে করতে মানুষে জাইন্না ফালাইছে।
কী জেনেছে?
আমজাদ: আমার চিকিৎসা। জানার পরে এই যে এই ব্যাপার। যেমন নুরু মেম্বার। অত্র এলাকার মেম্বার, উনির মা হাঁটতে পারত না। উনিকে ঝাড়ার পর ইনশাল্লাহ ভালো হইছে। এইভাবে কিছু কিছু রুগি ভালো করার পরে এই সব জাইন্না ফেলছে মানুষ। মানুষ এখানে আসে। নিয়ত করে আসে। ভালো হয়ে যায়। কে করায়, আল্লায় করায়। আমার করার মতো শক্তি নাই।
এলাকায় যা করছেন, আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে কি না?
আমজাদ: যখন দূর থেকেও মানুষ বেশি করে আসছে, মানুষের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তখন আমাদের সমাজের এবং আরও বাইরের যারা ছিল, সবাই মিলে একদিন বসল। তখন একটা কমিটি গঠন করা হইছে। আমাকেও বাঁচাইতে হইব। রুগি যারা আসছে, সম্মান দিয়া কীভাবে তাড়াতাড়ি কাজটা হইব, সেই জন্য সহযোগিতা দরকার। কমিটির হেরা একটা সিদ্ধান্ত নিল, উনির (আমজাদ) পাশে না দাঁড়াইলে উনি একলা আর কী করব। এখন মানুষ দেখা গেছে সুন্দরমতো দাঁড়ায়, নিয়মকানুন মানে। এগুলা তো সবকিছু আমার দ্বারা সম্ভব না।
আপনার কাছে যে মানুষগুলো আসে, তারা তো অন্ধবিশ্বাস নিয়ে আসে।
আমজাদ: একটা হইল বিশ্বাস, আরেকটা হইল অন্ধবিশ্বাস। যদি আধাবিশ্বাস করি, আধাবিশ্বাস না করি তাইলে রুগিও অর্ধেক ভালো হবে, অর্ধেক ভালো হবে না। আর যদি পুরাপুরি বিশ্বাস করে দরবারে আসে, তাইলে আমার দয়াল উনিকে পুরাভাবে সুস্থ করে দিবে। এটা আমার দয়ালের প্রতি আমার বিশ্বাস।
Click This Link
বোনাসঃ ভণ্ড পীরের পক্ষে পিপিসহ পনেরো আইনজীবী
মুন্সিগঞ্জের ভণ্ড পীর আমজাদ হোসেন ও তাঁর তিন সহযোগীকে গতকাল রোববার আবার আদালতে হাজির করে জামিনের আবেদন করা হয়। কিন্তু আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করেছেন।
এদিকে বিপজ্জনক ও অবৈজ্ঞানিক কায়দায় চিকিৎসা দেওয়ার দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া এই ভণ্ড পীরের পক্ষে পিপি ও এপিপিরা শুনানিতে অংশ নিয়েছেন।
ভণ্ড পীর আমজাদ হোসেনের পক্ষে গতকাল ১৫ জন আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে সরকারপক্ষের আইনজীবী (এপিপি) রয়েছেন তিনজন।
গতকাল রোববার আমজাদ হোসেন ও তাঁর সহযোগী নুরু মেম্বার, ইলিয়াস মাদবর ও আবুল কালামকে জামিনের জন্য আদালতে হাজির করা হয়। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন আর্শেদ উদ্দিন চৌধুরী, সুভাষ নন্দী, শফিউদ্দিন আহমেদ, এপিপি আবদুল জব্বার, এপিপি শিল্পী আক্তার, এপিপি আনোয়ার হোসেনসহ ১৫ জনের মতো আইনজীবী।
মুন্সিগঞ্জ বারের এক আইনজীবী বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে এই মামলায় (৩০৭ ধারা, হত্যার চেষ্টা) কীভাবে এপিপিরা দাঁড়ান জানি না। তাঁরা দাঁড়াতে পারেন না। কারণ, এ মামলাই যখন চার্জশিটের পরে শুনানিতে যাবে, তখন এই এপিপিরাই দাঁড়াবেন। তখন আবার পক্ষে বলবেন কী করে!’
নিজের বক্তব্য প্রসঙ্গে পিপি আবদুল মতিন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘আমজাদ শুধু ঝাড়ফুঁক দেয়। সে যেভাবে বাচ্চাদের চিকিৎসা দেয় বলে বলা হয়েছে, তা সেভাবে দেয় না।’
এ প্রসঙ্গে এপিপি আবদুল জাব্বার আসামির পক্ষে অংশ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসলে এপিপিরা সরকারি মামলার পাশাপাশি কিছু মামলায় দাঁড়াতে পারবেন। এটা দেশের সব জায়গায়ই হয়।’ বিচারের শুনানিতে আবার পক্ষে বলবেন কী করে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে নাও তো পড়তে পারে।’
দীপা ও নীপা নামে দুটি শিশু এবং মানসিক ভারসাম্যহীন জরিনাসহ অনেক নারী ও শিশু চিকিৎসার নামে নির্যাতনের শিকার হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয় আইনজীবী নাসিমা আক্তার বলেন, ‘এই ঘটনায় নারী ও শিশু আইনে মামলা হতে পারত। তা হলে মামলা আরও ভালো হতো। কিন্তু কেন যে করা হলো না, বুঝলাম না।’
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ৩:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



