somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাতচল্লিশ ও একাত্তরের স্বাধীনতা : ইতিহাস, বিশ্বাস ও মিথ

০৪ ঠা জুন, ২০১১ দুপুর ১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। সংক্ষিপ্তভাবে অত্যন্ত যত্নের সাথে নিচের ঐতিহসিক তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন স্বনামধন্য প্রবীণ লেখক। কেউ সত্যান্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখাটা পড়লে তিনিই নিজেই উপকৃত হবেন। মূর্খামীর জোর আর গায়ের জোর ছাড়া কোন যৌক্তিক বিরোধীতা এই তথ্যের উপর কেউ করতে পারবেন বলে মনে হয় না।


এরশাদ মজুমদার



১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যারা দেখেছেন এবং ওই দিন যারা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছেন, তাদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। আগস্টে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুই স্বাধীন রাষ্ট্র ও দেশ সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের ইতিহাস হাজার বছরের। যে অংশ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই ভৌগোলিক এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও হাজার বছরের। প্রাচীন ভারতে বিদেশীদের আগমন পাকিস্তানের তুরখাম সীমান্ত দিয়ে। সাগরপথেও বিদেশীরা ভারতে এসেছে। হাজার হাজার বছর ধরে বহু জাতি ভারতে এসেছে, অনেকেই ফিরে গেছে। ধর্মীয় জাতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি এসেছেন মুসলমান সুফি-সাধকেরা। এরাই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্খায়ী বসতি স্খাপন করে ইসলাম প্রচার করেন। মুসলমান শাসকদের এ দেশে আগমন সুফি-সাধকদের আগমনের অনেক পরে। তবে সামরিক শক্তি নিয়ে সিìধুর তীরে প্রথম আসেন মুহাম্মদ বিন কাশেম। সময় ৭১১ সাল। একই সময়ে মুসলমানেরা স্পেন পৌঁছেন। ১৯৪৭ সাল নাগাদ ভারতে দুই প্রধান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তি ছিল হিন্দু ও মুসলমান। মুসলমানেরা ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু কোনো কোনো ভৌগোলিক এলাকায় মুসলমানদের বসতি ছিল ৬০-৯০ শতাংশ।
সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে বহু আরব মুসলমান ব্যবসায়ী ও প্রচারক এ দেশে আসেন। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর ভাষায় প্রচুর আরবি শব্দের মিশেল পাওয়া যায়। স্খলপথেও বাংলাদেশে মুসলমান শাসক, বণিক ও ধর্ম প্রচারকেরা এসেছেন। ১২০০ সালের দিকে বাংলাদেশ মুসলমান শাসনের অধীনে আসে। দিল্লিতেও মুসলমান শাসন কায়েম হয় ১২০০ সালের দিকে। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলার শাসন দখল করে। ১৮৫৮ সালে প্রকাশ্যে ভারতীয় সৈনিকেরা বাহাদুর শাহকে তাদের নেতা মেনে নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এটাই ছিল ভারতীয়দের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু। এর আগে ১৭৫৭ থেকে ইংরেজদের অধীনতা অস্বীকার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আলেমসমাজের নেতৃত্বে বাংলার কৃষকেরা বিদ্রোহ করে। ইংরেজদের দখলদারিত্ব অস্বীকার করে সারা ভারতে মুসলমান আলেমসমাজই প্রথম ১০০ বছর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ইংরেজ দখলদারিত্বের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ দেশের মুসলমান সমাজ। ৭১১ সাল থেকে হিসাব করলে এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় এক হাজার বছর মুসলমান শাসক চলেছে। ১২০০ থেকে ১৮৫৮ সাল নাগাদ লাগাতার প্রায় ৭০০ বছর মুসলমান শাসন চলেছে। এ দীর্ঘ সময়ই ছিল ভারতের স্বর্ণযুগ। মোগল বাদশাহ ১৮৫৮ সালের শেষে বাহাদুর জাফরের কাছ থেকে ভারতের শাসনভার দখল করে নেন। বাহাদুর শাহকে বন্দী করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠান। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ইংরেজরা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ভারত শাসন করে। এই ১৯০ বছরের মধ্যে প্রায় ১৫০ বছর হিন্দু নেতারা ইংরেজ সরকারকে সহযোগিতা করে। ইংরেজদের সাথে সহযোগিতা করে সব সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেয়ার জন্য অক্ষয় দত্ত, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, রামমোহনের ভাবধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। হিন্দু জাতিকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য তারা সবাই পাশ্চাত্য শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মাথায় তখন মুসলমানদের সাথে নিয়ে চলার কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। কারণ তখন মুসলমানেরা একেবারেই পতিত ছিল। ১৮২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাজা রামমোহন হিন্দুদের আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে ভাইসরয় লর্ড আমহার্স্টকে একটি চিঠি দেন। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী ওই চিঠিকে ‘নবযুগের শঙ্খধ্বনি’ বলে অভিহিত করেছেন। ডিরেজিও রামমোহনের চিন্তাধারার একজন বড় শিষ্য ছিলেন। তারা সবাই মিলে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময় ডিরোজিওর শিষ্য ছিলেন রষিককৃষä মল্লিক, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ও রাধানাথ। একই ভাবধারায় মহারাষ্ট্রে কাজ শুরু করেছিলেন মহাদেব গোবিন্দ রানাড়ে, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে এবং বালগঙ্গাধর তিলক। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এর আগেই ১৮৩৮ সালে জমিদার রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে জমিদার সভা প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি। ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। এ ধরনের আরো বহু সমিতি গঠন করে হিন্দুরা সারা ভারতে। এতে ইংরেজদের সরাসরি সমর্থন ছিল। ১৮৮৩ সালে হিন্দুরা সর্বভারতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে। এরপরই জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় লর্ড হিউমের নেতৃত্বে ১৮৮৫ সালে। ফলে ভারতীয় হিন্দুরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকারকে সমর্থন দিতে থাকে।
ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে হিন্দু নেতারা সনাতন হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বলে মনে করতেন। তারা ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতেই পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। ১৯২১ সালে ঐক্যবদ্ধ খেলাফত আন্দোলনের সময় গান্ধীজি হঠাৎ বলে বসলেন, ‘আমি নিজেকে একজন সনাতনী হিন্দু বলিয়া ঘোষণা করিতেছি। কারণ, ০১. বেদ উপনিষদ পুরাণ যাহা কিছু হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বলিয়া পরিচিত তাহার সকল কিছুতেই আমি বিশ্বাস করি, সুতরাং অবতার আর পুনর্জন্মেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে। ০২. বর্ণাশ্রম ধর্মে আমার বিশ্বাস অতি দৃঢ়। সেই বর্ণাশ্রম ধর্ম বর্তমান কালের লৌকিক ধারণা বা স্খূল অর্থে নহে, তাহা এক অর্থে আমার মতে সম্পূর্ণ বেদভিত্তিক ০৩. গোরক্ষা সম্বন্ধেও আমার বিশ্বাস অতি দৃঢ়। আমি মূর্তি পূজায়ও বিশ্বাস করি।’ সনাতনী হিন্দু বলতে কী বুঝায়? গান্ধীজির একনিষ্ঠ অনুচর পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু নিজে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সনাতনীরা পশ্চাৎগতির দৌড়ের প্রতিযোগিতায় হিন্দু মহাসভাকেও বহু দূর পিছনে ফেলে যায়। এই সনাতনীরা এক চরম আকারের ধর্মীয় রহস্যবাদের সহিত ব্রিটিশ শাসনের প্রতি একাগ্র অনুরক্তি যোজনা করিয়া থাকে। গান্ধীজি হিন্দু বলিতে আমরা বলিতেন, আর মুসলমান বলিতে তাহারা বলিতেন। পণ্ডিত জওয়াহের লাল অন্তরে ছিলেন বামপন্থী আর বাইরে ছিলেন দক্ষিণপন্থীদের নেতা। ভারতের বামপন্থী নেতারা গান্ধীজিকে ব্রিটিশ শাসক, জমিদার ও সামন্তবাদীদের প্রকাশ্য অ্যাজেন্ট বালিয়া অভিহিত করিয়াছেন।
ভারতের মুসলমান নেতারা যখন দেখলেন কংগ্রেসে থেকে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় আন্দোলন করা যাবে না, তখনই তারা পৃথক সংগঠন বা প্ল্যাটফরম থেকে কথা বলে দাবি আদায়ের চিন্তা করতে থাকলেন। তারই ফলে ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর নিজেদের সর্বভারতীয় সার্বজনীন রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রচার করে। কংগ্রেস নেতারা ব্রিটিশ সরকারের কাছে কংগ্রেসকে ভারতবাসীর একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে লাগলেন। মুসলমান নেতারাও বসে থাকলেন না। তারাও জানান দিলেন, কংগ্রেস একটি হিন্দু সংগঠন এবং হিন্দুদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কংগ্রেস নেতারা শিখ বৌদ্ধ জৈন ও খ্রিষ্টান জনগণের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন। ক্ষুদ্র ধর্ম-গোষ্ঠী ও জাতিগুলো নিজেদের আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কট্টর হিন্দু নেতা গান্ধীজির নেতৃত্বে কংগ্রেসের স্বপ্ন ছিল ইংরেজদের কাছ থেকে তারা একাই ক্ষমতা বুঝে নেবে। প্রথম দিকে মুসলমান নেতারা কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস করেছিলেন। এমনকি ১৯৩৪ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার পরও ওই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন অখণ্ড ভারতে মুসলমানেরা তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পাবে। কিন্তু দু:খের বিষয়, কংগ্রেস নেতারা মুসলিম লীগের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায়নি। মুসলমানরা ভারতীয় হলেও তাদের আলাদা সত্তা আছে এ কথা হিন্দু নেতারা কখনোই মেনে নিতে চাননি। কংগ্রেসের এই মনোভাবকে শাসক গোষ্ঠীও পছন্দ করেনি। এমনি করেই একসময় পাকিস্তান প্রস্তাব সামনে এসে যায় এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে খুবই অল্প সময়ে। আজ ভারতীয় নেতারাও অনুভব করছেন, কংগ্রেসের উদারতা আর সহনশীলতার অভাবেই ভারত বিভক্ত হয়েছে। ভারতের নতুন প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে, কংগ্রেসের হীনমন্যতা ও হিন্দুত্ববাদীতাই ভারত বিভক্তির জন্য দায়ী। মুসলমানেরা একটি আলাদা জাতি, এ কথা প্রমাণ করার জন্যই তারা পাকিস্তান প্রস্তাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস বিভক্ত ভারতে একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়ল। কংগ্রেস যদি হিন্দু ভারত না চাইত তাহলে ভারত ভাগ হতো না এবং নতুন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানও প্রতিষ্ঠা হতো না।
এতক্ষণ যা বলেছি তা সবই পুরনো কথা এবং ইতিহাসের পাতা থেকে নেয়া। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্ম ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান সৃষ্টির বিষয়টা আজো ভালো করে জানে না। তাই পুরনো কথাগুলো নতুন করে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য বলতে হয়েছে। শিক্ষিত সমাজের ৯০ ভাগই জানেন বা বলেন জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে ভারত ভাগ হয়েছে। হ্যাঁ, জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা বলেছেন। কিন্তু কখন এবং কেন? কংগ্রেস যদি হিন্দু রাষ্ট্র ভারত না চাইত তাহলে পাকিস্তান হতো না। আগেই বলেছি, কংগ্রেস যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস না করত তাহলে মুসলিম লীগের জন্মই হতো না। ভারতের মুসলমানেরা এখনো দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। সে হিসাবে তারা এখনো অধিকারবঞ্চিত। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে অসাম্প্রদায়িক বলে কথিত কমিউনিস্ট পার্টি ৩৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতি সুবিচার করা হয়নি। ভারতের সব রাজনৈতিক দলই মোটামুটি হিন্দু ভারতে বিশ্বাসী। ’৪৭ সালেও কংগ্রেস মুসলিম মেজরিটি এলাকা পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করে। বাঙালিরা হিন্দু মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন অখণ্ড বাংলাদেশ চেয়েছিল। সেটাও কংগ্রেস মানেনি।
’৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর রাজধানী নির্ধারণ করা হয় সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে। ঢাকা প্রাদেশিক সরকারের রাজধানীতে পরিণত হয়। প্রাক ’৪৭ সময়ে সারা ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালি মুসলমানের তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সামরিক বাহিনী ও সিভিল সার্ভিসের উচ্চ পদগুলোতে চাকরি লাভ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের অফিসারেরা। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চ পদগুলোতেও অবাঙালি অফিসারেরা নিয়োগ লাভ করেন। ভারত বিভক্তির ফলে ভারত থেকে লাখ লাখ অবাঙালি সরকারি কর্মচারী পূর্ব পাকিস্তানে আসতে শুরু করে। তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব পড়ে প্রাদেশিক সরকারের ওপর। আজকের মোহাম্মদপুর সে সময়ের সৃষ্টি। রেলের বড় বড় চাকরিগুলো লাভ করেন অবাঙালি অফিসাররা। পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে ছিল এক বিরাট চাকরিদাতা। প্রদেশের জেলাগুলোতে অনেক অবাঙালি ডিসি, ডিএম ও এসপি চাকরি পান। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের নাম তখন ছিল ইস্ট বেঙ্গল। কলকারখানা যা ছিল তার মালিকরা থাকতেন কলকাতায়। অধিবাসীদের ৯০ শতাংশই ছিলেন কৃষক। সত্যি কথা বলতে কী, প্রদেশটি দীর্ঘকাল ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারদের শোষণের ফলে নি:স্ব হয়ে পড়েছিল। সচিবালয়ে মাটিতে চাটাই বিছিয়ে কর্মচারীরা কাজ করেছেন। মন্ত্রীরা তিন-চারজন মিলে একটি গাড়ি ব্যবহার করতেন। ১৯০৫ সালে গঠিত প্রদেশ ব্যবস্খা যদি টিকে থাকত, তাহলে সদ্য স্বাধীন প্রদেশের এমন দুরবস্খা হতো না। রেডি প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়া যেত, যা অন্য প্রদেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল। খুব বেশি পিছিয়ে পড়া এই প্রদেশের উন্নতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের যেসব জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার দরকার ছিল, তা তারা নিতে পারেনি। হয়তো তারা এর প্রয়োজন বোধ করেনি। হয়তো প্রদেশ সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। ১২০০ মাইল দূরে অবস্খিত এই প্রদেশের সাথে কেন্দ্রের শক্তিশালী টেলিযোগাযোগ বা বিমান যোগাযোগ ছিল না। ফলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বিলম্ব হয়ে যেত। নুরুল আমিন সাহেবের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথায় বিষয়টি খুবই স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য যে বিশেষ ব্যবস্খা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল তা কেন্দ্র কখনোই অনুভব করেনি। অথবা তারা পুরো বিষয়টাকে অবহেলা করেছে। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানীকে অবজ্ঞা করা মোটেই বুদ্ধির পরিচায়ক হয়নি। প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নেতাদের খামখেয়ালিপনা ও অদূরদর্শিতার ফলেই মওলানা ভাসানী মধ্যবিত্ত তরুণ নেতাদের নিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। দুর্বল মুসলিম লীগ সংগঠনের বিপরীতে আওয়ামী মুসলিম লীগ খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। মুসলিম লীগকে রাজনীতি থেকে বিদায় দেয়ার জন্য মওলানা ভাসানী ’৫৪ সালের নির্বাচনের জন্য শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে যুক্তফন্সন্ট গঠন করেন। নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। এরপর পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। অথচ এই দলটি নির্যাতিত মুসলমানদের বাঁচানোর তাগিদেই ’৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। হিন্দু প্রাধান্যের সামনে তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্যই পাকিস্তানের জন্য জান দিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মাথায় প্রদেশের মুসলমানেরা নিজেদের বাঙালি ভাবতে শুরু করে। সত্তরের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একধরনের গণভোটের মতো। এই নির্বাচন ছিল বাঙালি-অবাঙালির নির্বাচন। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক গোষ্ঠী তা একেবারেই অনুধাবন করতে পারেনি। তারা আলোচনার দুয়ার বìধ করে দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে পাকিস্তান রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানকে রক্ষা করা যায়নি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে গেল। আমরা এবার ষোলআনা বাঙালি হিসেবে স্বাধীন হলাম। ’৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছিলাম মুসলমান হিসেবে। মাত্র ২৩ বছরে পাকিস্তান খণ্ডিত হয়ে গেল। এটাই পাকিস্তানের ডেস্টিনি ছিল। ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টে ইন্দিরা গান্ধি বলেছিলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া।’ কেন বলেছিলেন তা এক লম্বা ইতিহাস। ইতিহাস সচেতন সব মুসলমানেরই জানার কথা। শুরু হলো বাঙালি মুসলমানের নবযাত্রা। ’৭১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৪০ বছর। আমাদের আত্মপরিচয় এখনো নির্ধারণ হয়নি। আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী তাও ঠিক করে বলতে পারি না। আমরা মুসলমান না বাঙালি? একদল বলে পাকিস্তানের বিদায়ের সাথে সাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর হয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে বাঙালিতত্ত্বের ভিত্তিতে। এসব হচ্ছে রাজনীতির বাহাস বা বিতর্ক। রাজনীতিকরা বিতর্ক করেন তাদের ভোট এবং রাজনীতির জন্য। কিন্তু গবেষকেরা বলবেন, প্রতিষ্ঠিত গবেষণার ভিত্তিতে। আওয়ামী লীগ ও তার দলীয় ভক্তরা মনে করে, আমাদের জাতীয়তা এবং ঐতিহ্য হচ্ছে ভাষাভিত্তিক, যা কলকাতা আর দিল্লির রাজনীতিক আর বুদ্ধিজীবীরা তাদের মাথায় ঢুকিয়েছেন। এখনো দুই বাংলা মিলে মুসলমানরা মেজরিটি। খোদা কখনো বেকুবদের যদি শুধু ভাষাই হতো, তাহলে তো ’৪৭ সালেই বাংলাদেশ অখণ্ড, এক থাকার কথা ছিল। এক থাকেনি, কারণ সংগ্রেস তা চায়নি। কারণ অখণ্ড বাংলাদেশে মুসলমানেরা ছিল মেজরিটি। যে ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন আর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য আন্দোলন করেছেন, তিনিই এখন আমাদের জাতীয় দর্শন হতে চলেছেন। যিনি বৈদিক ধর্ম ও আদর্শে বিশ্বাস করেন, তারই বন্দনায় আমরা পাগল হতে চলেছি। যিনি জমিদার হিসেবে একসময় এ দেশের গরিব কৃষকদের শোষণ করেছেন। তার অত্যাচারের নমুনা কী ছিল তা কাঙ্গাল হরিণাথ আর গগন হরকরার লেখা পড়লেই বুঝতে পারবেন। এই মহা ভাগ্যবান মহাপুরুষের জন্মজয়ন্তী উৎসব পালনের জন্য বহুজাতিক কোম্পানির অর্থের ভাণ্ডার সব সময় খোলা থাকে। মানবতার কবি নজরুলের এসব আয়োজন কখনোই জোটে না। এর রহস্য কী আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কখনো ভাবার সুযোগ পান না।
বাংলাদেশের অধিবাসীর ৯০ শতাংশ মুসলমান। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে আমাদের ধর্ম ও ধর্মীয় দর্শন নিবিড়ভাবে জড়িত। ধর্মকে আমাদের জীবন থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। যেমন গান্ধীজি বলেছিলেন, তিনি প্রথমে হিন্দু তারপরে জাতীয়তাবাদী। ধর্মের বিনিময়ে তিনি স্বাধীনতাও চান না। তিনিই হচ্ছেন ভারতের বাপুজি। তিনি তার হিন্দুত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্যই ভারত বিভক্তিকে সমর্থন করেছেন। আর আমরা জিন্নাহকে সাম্প্রদায়িক বলে গালাগাল দিই। ভারতের কট্টর হিন্দুবাদীরা ভারতীয় জাতীয়বাদের নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। তা হলো ভারতবাসী সবাই ভৌগোলিক কারণে হিন্দু। মুসলমানদের বলতে হবে, হিন্দু মুসলমান। ভারতের হিন্দু নেতারা এখনো স্বপ্ন দেখেন অখণ্ড ভারতের এবং হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার। আমাদের দেশে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেন, তারা জ্ঞানপাপী আর হিন্দু সাম্রাজ্যবাদের দালাল। তারা জেনেশুনে আমাদের জাতিসত্তাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কারণ আমাদের জাতিসত্তার প্রধান উপাদান হচ্ছে আমাদের ধর্ম। এই ধর্মই আমাদের ’৪৭ সালে ভারত থেকে আলাদা করেছে। এই ধর্মের কারণেই ১৭৫৭ সালে হিন্দুরা ক্লাইভকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এই ধর্মের কারণেই হিন্দুরা ১৫০ বছর ইংরেজ শাসনকে সমর্থন করেছে। ’৭১ সালে আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছি অর্থনৈতিক কারণে। বাঙালি বলে নয়। ছয় দফা ছিল অর্থনৈতিক শ্লোগান ও দাবি। ছয় দফায় ধর্মনিরপেক্ষতা বা বাঙালি বলে কোনো শ্লোগান ছিল না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যদি ছয় দফা মেনে নিত, তাহলে পাকিস্তান আজ খুব বেশি হলেও একটি কনফেডারেশন হতো। বঙ্গবন্ধুও হয়তো তাই চেয়েছিলেন। তাই তিনি স্বাধীনতার কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা দেননি। কিছু লোক এখন তার নামে নানা ধরনের ঘোষণা প্রচার করে বেড়াচ্ছে। জিন্নাহ ভারত ভাগ করেছেন আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন­ হচ্ছে রামায়ণ মহাভারতের মতো একটা মীথ। ভারতের হিন্দুরা এই মহাকাব্য দু’টি ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা একটা হচ্ছে ইতিহাস, আরেকটা মিথ। অনেক সময় মিথ ইতিহাসের চেয়ে বহু গুণে শক্তিশালী হয়।
লেখক : কবি সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×