সাকিব ফারহান
২১ জুন মঙ্গলবার নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার মাঝামাঝি সাড়ে তিন কলামের একটি ছবি। এর ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার কুলুমছড়া সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৫০ একর বাংলাদেশী জমি জরিপের নামে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা গতকাল তীব্র প্রতিরোধের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দেন এলাকাবাসী।
ছবির নিচে সাড়ে তিন কলামের শিরোণাম - জনতার প্রতিরোধ : গোয়াইনঘাটে বাংলাদেশের ভূমি আবার ভারতকে দেয়ার প্রক্রিয়া ভন্ডুল। শিরোণামের ওপর বডি হরফের চেয়ে বড় করে লেখা রয়েছে, বিজেপি অনুপস্থিত : বাংলাদেশের ৫০ গজের ভেতরে বিএসএফের অবস্থান।
বিস্তারিত বিবরণে পত্রিকাটি লিখেছে, ৪ ও ৫ জুন পাদুয়া সীমান্তের ১২৭০ নম্বর মেইন পিলার থেকে ১২৭১ এর ৭-এস পিলার পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩৫০ একর ভূমি ভারতকে এরইমধ্যে বুঝিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় জনগণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শনিবার বেলা ১১টায় তামাবিল জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন বাংলাদেশের প্রায় তিন একর ভূমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে উভয় দেশের যৌথ জরিপ দল সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করলে এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়ে জরিপ কাজ স্থগিত রাখা হয়। সেখানে শত শত সীমান্তবাসী এবং ব্যবসায়ী ও শ্রমিক দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। একই কায়দায় এবার রুস্তমপুর ইউনিয়নের কুলুমছড়া সীমান্তে গত সোমবার যৌথ জরিপের নামে বাংলাদেশের ৫০ একর ভূমি ভারতের কাছে তুলে দিতে চাইলে স্থানীয় জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সম্মিলিত জনতার প্রতিরোধে বিএসএফ পিছু হটে। যৌথ জরিপ দল কাজ বন্ধ করে প্রস্থান করে।
১২৬৪ নম্বর পিলারের কাছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের উপস্থিতিতে যৌথ জরিপ দল সোমবার দুপুরে কার্যক্রম শুরু করলে স্থানীয় জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা সমবেত হয়ে জরিপ বন্ধ রাখার দাবি জানান। সীমান্তবাসীর আপত্তি উপেক্ষা করে জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়া হলে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল চলতে থাকে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত এ ঘটনা ঘটে। এ সময় সেখানে বিএসএফ উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) কাউকে দেখা যায়নি। এক পর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের ৫০ গজ ভেতরে চলে আসলেও জনতার প্রতিরোধে তারা পিছু হটে। পরে জনতা এক সমাবেশ থেকে বাংলাদেশের ভূমি ভারতকে ছেড়ে দেয়ার আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান। সমাবেশে যেকোনো মূল্যে এই ভূমি রক্ষারও অঙ্গীকার করেন তারা। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তামাবিল জিরো পয়েন্টসংলগ্ন বাংলাদেশের তিন একর ভূমি ভারতকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও একইভাবে জনতা ভন্ডুল করে এর দুই দিন আগে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাটের লিংক হাট সীমান্ত থেকে কুলুমছড়ার পার পর্যন্ত প্রায় এক হাজার একর ভূমি ভারত নিজেদের দাবি করে আসছে। যায়গাগুলো নিজেদের দখলে নিতে বিএসএফ নানা তৎপরতা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার সঞ্জয় ভট্টাচার্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. কামালের নেতৃত্বে একটি দল সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে ডাউকি ও তামাবিলে একাধিক বৈঠক হয়। পাদুয়া, সোনারহাটের লিংকহাট, তামাবিল, নলজুরী এলাকার কিছু স্থান ভারতকে ছেড়ে দেয়ার গোপন সিদ্ধান্ত হয় এসব বৈঠকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ ও ৫ জুন পাদুয়া সীমান্তের ১২৭০ নম্বর মেইন পিলার থেকে ১২৭১ এর ৭-এস পিলার পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩৫০ একর ভূমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এর পরপরই তামাবিল এবং কুলুমছড়ায় অপচেষ্টাটি চালানো হয়।
একই খবর আমার দেশ প্রথম পাতায় তিন কলামে ছবিসহ ছেপেছে। তারা শিরোণাম করেছে, সিলেট সীমান্তে জনতার প্রতিরোধে এবার রক্ষা পেল ৫০ একর ভূমি। খবরটি জামায়াতে ইসলামির মুখপাত্র সংগ্রামে প্রধান শিরোনাম হয়েছে। এছাড়া ইত্তেফাকে ভিতরের পাতায় এক কলামে ছাপা হয়েছে ছোট করে। একই দিন পত্রিকাটি ভারতের সেনাপ্রধানের খবরটি বাইরের পাতায় তিন কলাম ছবিসহ গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। পাঠক উভয় খবরটি দেখলে দুটি খবরের তুলনামুলক গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করবেন। একদিকে বাংলাদেশের ভূমি ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার খবর অন্যদিকে ভারতীয় সেনাপ্রধানের বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ আলোচনার খবর। উল্লেখ্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ভারতের কাছে তুলে দেয়ার জন্য প্রস্তাবিত ভূমিটি বাংলাদেশের জনগণের নামে রেকর্ডকৃত। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এসব ভূমি বাংলাদেশী জনগণের মালিকানায় আবাদ বা ব্যবহার হয়ে আসছে।
অন্য সব পত্রিকায় ভারতীয় সেনাপ্রধানের বাংলাদেশ সফরের খবর কেউ প্রথম পাতায় কেউ শেষের পাতায় ছেপেছে কিন্তু বাংলাদেশের ভুমি ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সরকারি প্রচেষ্টার বড় খবরটি কেউ দেয়নি। এটি এমন কোনো দুরহ খবর ছিল না যে সাংবাদিকরা সেটি মিস করবেন। কারণ তার দুদিন আগে তামাবিল সীমান্তে একই ধরনের প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশের জনগণ ভন্ডুল করে দিয়েছিল। সেখবরও আমার দেশ, নয়া দিগন্ত কাভার করেছিল। সে হিসেবে কুলুমছড়ার ঘটনাটি অত্র এলাকায় আগে থেকে ঘোষিত ছিল। অর্থ্যাৎ সচেতনভাবে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের একান্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট খবরটি দেয়নি।
বাংলাদেশের ভূমি ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা এবং জনতার প্রতিরোধে তা আবার ব্যর্থ হয়ে যাওয়া এটি কি বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর জন্য কোনো সংবাদ নয়? বা এটি এমন কোনো সংবাদ যা দায়িত্ব নিয়ে সংবাদপত্রগুলো এড়িয়ে গেল। সাধারণত সংবাদপত্র জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর কোনো বিষয় হলে তা নৈতিকতার কারণে এড়িয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ভূমি প্রতিবেশী দেশ দখল করে নিচ্ছে তা এড়িয়ে যাওয়া কিভাবে বাংলাদেশকে উপকৃত করবে? যদি এমন হতো এই খবর না দিলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ খুশি হয়ে নতুন করে বাংলাদেশী যায়গাটি নিজেদের দখলে নিয়ে যাওয়ার আর চেষ্টা করবে না। তাহলে এক কথা। কিন্তু বাংলাদেশী পত্রিকার নীরবতা নিশ্চই ভারতের জন্য সুযোগ তৈরি করেব। কারণ জাতীয়ভাবে এ ধরনের কর্মকান্ড প্রকাশ হবে না। ফলে স্থানীয় জনসাধারণের ওপর দমননিপীড়ন চালিয়ে ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে তা বাস্তবায়ন করে ফেলা যাবে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশী পত্রিকার নীরবতা ভারতের স্বার্থে কাজ করবে। যুক্তিবাদিরা এখানে সহজ সমীকরণ মেলাতে পারেন, বাংলাদেশের পত্রিকা যেহেতু বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে তাহলে তারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশী ভুখন্ডে থেকে সেই বিপক্ষ দেশের জন্যই কাজ করছে। তাহলে পত্রিকাগুলো সেই বিদেশী দেশের পত্রিকা।
সমকাল, কালের কণ্ঠ, ডেইলি স্টার, সংবাদ, যুগান্তর, ইনকিলাব, মানবজমিন খবরটি দেয়নি।
সেকেন্ড লাইন খবরটি কখন দিবে
এখবরটি সচেতনভাবে প্রথম আলো এড়িয়ে গেছে। তবে তারা খবরটি দেবে। বাংলাদেশ ভারত প্রশ্নে কয়েক বছর তারা এভাবেই চালাচ্ছে। সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারা খবরটি আগেভাগে প্রচার করে দায় নিবে না। মোটামুটি কোনো না কোনোভাবে প্রচার হয়ে গেলে এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ হলে দেশব্যাপী চাউর হয়ে গেলে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা (বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে) বজায় রাখার জন্য খবরটি ছাড়বে। তখন ভারতীয় দূতাবাস থেকে মনিটরকারিরা এ নিয়ে প্রথম আলোকে দোষারোপ করতে পারবেনা। তাদের কাছে উত্তর থাকবে আমরা দিলেও এর কোনো বাড়তি ইমপেক্ট নেই। কারণ এরই মধ্যে সবাই তা জেনে গেছে। আর আমরা প্রকাশ না করার মাধ্যমে এখন খবরটি গোপন বা সেমি গোপন রাখা যাবে না। অন্যদিকে যদি খবরটি না দেই তাহলে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে। যারফলে পরবর্তীতে আরো বেটার সার্ভিস দেওয়া যাবে না। আসলে যেভাবে আমরা সার্ভিসটা দিয়ে থাকি।
সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দুটি কথা
খবর অনুযায়ী, সম্মিলিত জনতার প্রতিরোধে বিএসএফ পিছু হটে। যৌথ জরিপ দল কাজ বন্ধ করে প্রস্থান করে। প্রশ্ন হচ্ছে জনতার প্রতিরোধ কেন? সরকারের দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমির মালিকানা রক্ষা করা। যদি কোনো অপদখলীয় ভূমি বাংলাদেশের মধ্যে থাকে তা ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আওতায় মীমাংসা হবে। অন্যদিকে ভারতের ভিতর থাকা বাংলাদেশের জমিও একই কায়দায় উদ্ধার হবে। জনগনকে কিছু না জানিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি প্রশাসনের অগোচরে সংগোপনে একতরফাভাবে বাংলাদেশি ভূমি ভারতের কাছে হস্তান্তর কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।
বিচ্ছিন্নভাবে গোপনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের দাবি করা ভূমি তুলে দেয়ার জন্য সরকারের এ প্রচেষ্টা নিয়ে জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ১৯৭৪ সালে উভয় সরকারের মাঝে যে সীমান্ত চুক্তি হয়েছে সে অনুযায়ী কেনো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সে অনুযায়ী যদি সীমান্ত বিবাদ মেটানো হয় তাহলে ১০ লাখ একর জমি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। অল্প কিছু জমি বাংলাদেশের ভিতর থেকে তারাও পাবে। শেখ হাসিনা সরকার তার বাবার আমলে করা সে চুক্তির বাস্তবায়নের দিকে না গিয়ে একপাক্ষিকভাবে ভারতীয় দাবি মতে ভারতীয় স্বার্থ অনুযায়ী কেনো সাড়া দিচ্ছেন তা বুঝে আসে না। অপদখলীয় ভূমি নিয়ে সমস্যার সমাধানের জন্য একতরফাভাবে কেনো বাংলাদেশের জমি ভারতের পেটে যাবে। ভারতের কাছে বাংলাদেশের জমিগুলোওতো বাংলাদেশে আসবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে গোপনেও বিচ্ছিন্নভাবে দেশবিরোধী এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অংশগ্রহণ অনিবার্য। কিন্তু এ ধরনের ভমি ভারতকে বুঝিয়ে দেয়ার সময় সেখানে যৌথ জরিপ টিম এবং শুধু বিএসএফের উপস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। সেখানে রাখা হচ্ছে না বিডিআরের নব সংস্করণ বিজিবিকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




