‘ছাত্রদের যদি অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর দিতে না পারেন, তাহলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কোনো দরকার নেই। কথামতো কাজ না করলে ধর্ষণ ও এসিড মারা হবে।’ মুঠোফোনে খুদেবার্তায় এই হুমকি দেওয়া হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাকে। গত নভেম্বরে হুমকিটি পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানকে জানান। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়। তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যানের পরামর্শে দুই মাস ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি।
এখন ওই শিক্ষিকা আবার ক্লাস নেওয়া শুরু করেছেন। তবে হুমকিদাতা শনাক্ত হয়নি। শিক্ষিকা জানান, তাঁকে জানানো হয়েছে, মুঠোফোনের ওই সিমটি টাঙ্গাইলের বাসাইল থেকে কেনা হয়েছে। ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ তালুকদার জানান, তাঁরা দোষী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
হুমকির পাশাপাশি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের হয়রানি করার কিছু অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষিকা ও ছাত্রীরা অস্বস্তির মধ্যে আছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান। সম্প্রতি সরেজমিনে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মাসের মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। কমিটির আহ্বায়ক হলেন রেজিস্ট্রার আইনুল ইসলাম। কমিটিতে শিক্ষিকাদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও হয়রানির কয়েকটি অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের তদন্ত চলছে। এ ছাড়া দুটি অভিযোগের তদন্ত করছেন প্রক্টর শামসুদ্দীন চৌধুরী।
আইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, বিভিন্ন বিভাগের চারজন শিক্ষিকা তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে পরে কমিটির সামনে তাঁরা সংগীত, বাংলা, হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি ও কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের একজন করে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, সংগীত ও বাংলা বিভাগের একজন করে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ছাত্রীরাও মৌখিকভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। এগুলোরও তদন্ত চলছে। সংগীত বিভাগের ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে নিজ কক্ষে ডেকে অশ্লীল কথা বলার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, বাংলা বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীর কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করা, শ্রেণীকক্ষে অশ্লীল শব্দ বলা এবং শিক্ষিকাদের উদ্দেশ করে অশ্লীল কথা বলার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রীরা অভিযোগ এনেছেন, আন্দোলনও করেছেন।
ওই শিক্ষক বলেন, ‘অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। শ্রেণীকক্ষে পড়ানোর সময় বইয়ে থাকা কিছু অশ্লীল শব্দই বলা হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে বিরোধীরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে।’
এদিকে গত ২২ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। বিভিন্ন সূত্র জানায়, ওই রাতে বাংলা বিভাগের এক শিক্ষিকা ডরমেটরি-১-এ নিজ কক্ষে পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত করছিলেন। একই বিভাগের একজন শিক্ষক তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ওই কক্ষে যান। অল্প কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে ওই কক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন গ্রামবাসীকেও খেপিয়ে তোলে ক্যাম্পাসেরই একটি পক্ষ। এ নিয়ে পরদিন ছাত্রদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন।
ঘটনাটিকে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অভিহিত করে শিক্ষকদের একটি অংশ উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয়। স্মারকলিপিতে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী ও তাঁদের মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। তাঁদের দাবি, কয়েকজন শিক্ষকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে বিপথগামী কিছু ছাত্র শিক্ষকের মর্যাদাহানিকর ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২২ জুলাইয়ের ঘটনাটি নিয়ে কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত খবর প্রচার করেন সাহাবুল নামের এক শিক্ষার্থী। ২৪ জুলাই ওই দুই শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে মিছিলেও নেতৃত্ব দেন তিনি। দুটি অভিযোগই অস্বীকার করে সাহাবুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে বেশ কিছু কপি ছিল, কেউ কেউ সেগুলো নিয়ে পড়েছে। এর অর্থ এই নয় যে আমি পেপার কাটিং বিলি করেছি।’
সর্বশেষ এ ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রেহনুমা ফেরদৌসী বলেন, ‘বিভিন্ন ঘটনা, বিশেষত খুদেবার্তা পাঠিয়ে হুমকি ও ২২ জুলাইয়ের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকেরা কত অসহায়। সহকর্মীরা আমাদের নিয়ে অশালীন, বিভ্রান্তিকর, সম্মানহানিকর মন্তব্য করেন। এতে পারিবারিকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সব মিলে আমরা চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আছি।’
জানা যায়, ২৬ মার্চ কথা ৭১ নামের নাটক মঞ্চায়নের পর বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা মার্জিয়া আক্তারকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে মার্জিয়া বলেন, তিনি মনে করেন প্রতিক্রিয়াশীল লোকজন এ ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে।
শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা অভিযোগ করেন, এর আগে মা, মাটি, দেশ নামের যাত্রার মহড়ার সময় গ্রামবাসী এর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। এতে উসকানি দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই কয়েকজন শিক্ষক। তাঁরা আসলে পদের লোভে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অস্বস্তিতে ফেলতে চান।
শিক্ষিকাদের অভিযোগ, একের পর এক ঘটনা ঘটলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতো শিক্ষক সমিতি নীরব থেকেছে। সমিতির কেউ কেউ কখনো কখনো উসকানিও দিয়েছেন।
উসকানি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা। তবে এ ব্যাপারে সমিতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি বলে স্বীকার করেন তিনি।
শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য সৈয়দ গিয়াসউদদীন আহমেদ বলেন, ‘হয়রানির অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। হাইকোর্ট যৌন নিপীড়নবিরোধী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা শিক্ষকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হাইকোর্টের নির্দেশনা বাংলায় তর্জমা করে ছাত্রদের দেওয়া হবে। কারণ ছাত্রীদের অনেকেই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে আমরা জানতে পারছি।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



